মহাকবি কালিদাস --- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী

1st July 2020 12:55 pm প্রবন্ধ
মহাকবি কালিদাস --- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী


নিবন্ধ :- " মহাকবি কালিদাস "
লেখক :- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী

বাংলা মাসের আষাঢ়ের প্রথমে প্রথা মত স্মরণ করা হয় মহাকবি কালিদাসকে। আমিও ওনার উদ্দেশ্যে অর্পণ করলাম যথাসাধ্য শ্রদ্ধাঞ্জলী এবং ভক্তিপূর্ণ প্রণাম।
সাহিত্য রচনা করা হয় শব্দের জাল বুনে। সেই নীরস শব্দগুলিকে মধুর রসে সিক্ত করেই সাহিত্যকে করা হ​য় শ্রুতিমধুর। যেমন নীরস পাথর থেকে বেরিয়ে আসে মধুর শব্দের ধ্বনী, আবার শুকনো এবং সূক্ষ্ম তার থেকেও বেরিয়ে আসে মধুর সপ্তসুর ও ধ্বনী ! শুকনা চামড়া থেকে উৎপন্ন বাদ্যযন্ত্র হয় এবং সেই যন্ত্রের থেকে উৎপন্ন হয় তাল ! সেই রকম যিনি এই সাহিত্য সৃজন কর্মে নিপুন হতে পারেন তিনিই পান শ্রেষ্ঠতার মুকুট। সেরকমই ঘটিত হয়েছিল মহাকবি কালিদাসের ক্ষেত্রে !
আবহ কাল থেকে প্রচলিত প্রবাদানুসারে জানা যায় আজকের কিংবদয়ন্তী মহাকবি কালিদাসের বিদ্যা ও বুদ্ধির পরিমাপ কি ছিল। যদি না পেতেন উনি - জ্ঞান বিদ্যা দায়িনী মা সরস্বতী বাগদেবীর বরদান, তবে কি আজকের বিশ্ব করতে পেত সাহিত্য সুধারসের অমৃতপান! ! পারতেন কি কালিদাস আজ থেকে দুই হাজারেরও বেশী কাল পূর্বের, অর্থাৎ তখনকার বিশাল ভারতবর্ষের সুশাসক এবং গুণীজনপ্রেমী পরম প্রতাপ ও প্রতিপত্তিশালী সম্রাট বিক্রমাদিত্যের রাজসভাতে নবরত্নের শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করতে! ?
সাহিত্য রসিকগণ প্রত্যেকেই পান করেছেন তাঁর রচিত সাহিত্যসুধা এবং বর্তমানেও সাহিত্যপ্রেমীগণ করছেন মহাকবি কালিদাস রচিত অমৃত সুধাময় সাহিত্য গ্রন্থের এবং কাব্যবিথীর সাহিত্যরস । শুধু সেটাই নয় ,সমগ্র বিশ্বের সাহিত্য রসিকজনের কাছে মহাকবি কালিদাস এবং সেই সঙ্গে ওনার সম্বন্ধে প্রচলিত দন্তকথার কাহিনী আবাল বৃদ্ধ বণিতা সকলেই বিশদ বা অল্প বিস্তর অবগত আছেন , তাই , আমি আর ওনার জীবনীর বর্ণনা করে সময়ের অপব্যয় না করে সাহিত্য সৃজনে মহাকবি কালিদাস সামান্য শব্দকেও শ্রুতিমধুময় করতেন, সেই বিষয়ে একটু চেষ্টা করি। যে কারণে উনি মহাকবি! !
মন চাইছে প্রসঙ্গত একটা ছোট কাহিনীর উল্লেখ করতে। অবশ্য ,আপনারাও জানেন। তবুও বলি , ছোটদের জন্য -
সম্রাট বিক্রমাদিত্যের রাজাসভায় বিভিন্ন বিষয়ে অনেক জ্ঞানী, গুণী, বিদ্বানজনের স্থান ছিল। বিশেষ করে সমস্ত জ্ঞানী গুণীজনের মধ্য থেকে ওনাদের শ্রেষ্ঠতা অনুযায়ী নয় (৯) জনকে বেছে নিয়ে সম্রাট গড়ে ছিলেন "নবরত্নের সভা "। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সেই সময়কার বিখ্যাত বিদ্যান এবং বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারীগণ। তাঁরা হলেন :- (১) অমর সিংহ (২) কালিদাস (৩) বরাহ মিহির (৪) ক্ষপনক (৫) ঘটকর্পক (৬) ধন্বন্তরী (৭) বররুচি (৮) শঙ্কু (৯) বেতালভট্ট আদি।
সেই নবরত্নের সভাতে সন্মান জনক আসন করে নেবার জন্য অথবা সম্রাটের প্রিয় পাত্র হবার জন্য চলত জ্ঞানী গুনীজনেদের মধ্যে পারস্পরিক তীব্র প্রতিযোগিতা। কালিদাসও রেহাই পাননি ঈর্ষা বা প্রতিদ্বন্দিতার শিকার হওয়া থেকে। সম্রাটের রাজ সভাতে ছিলেন একজন প্রচণ্ড পন্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞানী, লেখক, গুণীজন পন্ডিত বিদ্যাপতি। কালিদাসকে সম্রাট অধিক স্নেহ এবং পছন্দ করতেন বলে উনি সর্বদাই কালিদাসকে মনে মনে ঈর্ষা করতেন এবং সম্রাটের নবরত্ন সভায় স্থান পাবার জন্য ইচ্ছা পোষণ করতেন। সেটা সম্রাটেরও নজর এড়াত না। তাই একদিন সম্রাট মনে মনে স্থির করলেন যে, কি কারনে উনি কালিদাসকে স্নেহ অথবা পছন্দ করেন সেটা বিদ্যাপতিকে বুঝিয়ে দিতে হবে। সুপরিকল্পিত ভাবে একদিন সম্রাট বিক্রমাদিত্য সম্পূর্ণ মন্ত্রীমন্ডল , সভাসদগণদের সঙ্গে করে নগর পরিভ্রমনে যাত্রা করলেন। সেই সময় দেখা গেল পথে একটা শুকনো গাছ পড়ে আছে। উপযুক্ত সময় বুঝে সম্রাট পন্ডিত বিদ্যাপতি মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করলেন যে সামনে পড়ে আছে ঐ বস্তুটা কি ? পন্ডিত বিদ্যাপতি নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার সুযোগ পেয়ে কালবিলম্ব না করে সাহিত্যিক রসে উত্তর দিলেন। সম্রাট , " শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে "! অর্থাৎ , একটি শুকনো কাঠ সামনে পড়ে আছে!।
এবার সম্রাট কালিদাসকে সেই একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন ,সামনের ঐ বস্তুটি কি ?
কালিদাস প্রশ্নের উত্তর এভাবে দিলেন - সম্রাট , " নীরস: তরুবর: পূরত ভাগে " । অর্থাত , একটি রসহীন (শুকনো) গাছ সম্মুখে পরে আছে।
এবার সম্রাট জনে জনে শুধালেন যে কার উত্তরটা ছিল বেশী শ্রুতীমধুময় ?
উপস্থিত প্রত্যেকেরই একবাক্যে প্রশংসার সঙ্গে সমর্থন করলেন কালিদাসের দেওয়া উত্তরকে!। পন্ডিত বিদ্যাপতিও মেনে নিলেন কবি কালিদাসের শ্রেষ্ঠতাকে !
এটাই ছিল অন্যজনের সাথে কালিদাসের সাহিত্য বা কাব্য রচনাতে শ্রুতিমধুর শব্দচয়ন শৈলীর দক্ষতার ভিন্নতা। সেই জন্যই মহা পন্ডিত বানভট্ট রচিত "হর্ষ চরিত" গ্রন্থে কালিদাসের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
এই কারণেই কিংবদয়ন্তী , মহাকবি কালিদাস !
মহাকবি কালিদাস রচিত কিছু কাব্যগ্রন্থ এবং রচনাবলী :- মেঘদূতম , কুমার সম্ভবম ,রঘুবংশম , ঋতুসংহার , শৃঙ্গার রসাষ্টক , শৃগার তিলক , পুষ্পবাণ বিলাস , দ্বাদশ পুত্তলিকা , অভিজ্ঞান শকুন্তলম ইত্যাদি।
ওনাকে জানাই পুনঃ ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ॥
*****





Others News

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক


প্রবন্ধ :-  "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" 
লেখক :-  ডঃ .গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
                         ***
     "জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ "
                             * 
   " স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার, যেটা আমি নিয়েই ছাড়ব।"  পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সিংহের রাজত্বকালে সর্বপ্রথম গর্জে উঠেছিলেন এক নির্ভিক ভারতীয় সিংহ,যিনি একাধারে বিদ্বান, অর্থলোভমুক্ত, ত্যাগী, সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিন্দু রাষ্ট্রবাদের জনক, লোকসেবক শক্তিমান পুরুষ, যাঁকে সর্বলোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" বলে সম্বোধন করে, তিনি হলেন বাল গঙ্গাধর তিলক (আসল নাম কেশব গঙ্গাধর তিলক, বিবাহের পরে ওনার স্ত্রীর বংশানুসারে " কেশব গঙ্গাধর "  নামের পরিবর্তিত হয়ে "বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে পরিচিত হলেন)। মহারাষ্ট্রের  চিক্কন গ্রামে ২৩/০৭/১৮৫৬  সালে ওনার জন্ম হয় এবং ০১/০৮/১৯২০ সালে বোম্বাই এ বর্তমানে ( মুম্বাই) ওনার দেহত্যাগ হয়।  
        ডীকান কলেজ থেকে বি.এ.পাস করার পরে উনি গভর্নমেন্ট " ল " কলেজ ( ইউনিভার্সিটী অফ বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে  "ল" পাস করেন, কিন্তু, অর্থ লোভমুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি , নিজেকে সমাজ  কল্যাণে সমর্পিত করেছেন, তিনি " ল " পাস করেও আদালতে ওকালতি না করে শিক্ষার প্ৰসারের জন্য স্কুলে শিক্ষকের চাকুরীতে যোগ দিলেন এবং ১৮৮০ সালে স্থাপনা করলেন " ন্যু ইংলীশ স্কুলের" । কিছু বছর পরে স্থাপনা করলেন    " ফারগুইজন " কলেজের। বিদ্বান, ত্যাগী,  সরল,  নিঃস্বার্থ পরোপকারে এবং সমাজের কল্যাণ সাধনে সমর্পিত নিরলস নির্ভিক স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়কে মহারাষ্টের লোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" নামে সম্বোধন করতে আরম্ভ করল। সেই থেকে উনি "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে ভারতে তথা  বিশ্বে পরিচিত হলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা ছিল লোকমান্যের! স্বাধীনতার জন্য চলছে আন্দোলন কে তীব্র করার জন্য জনমত এবং  জনচেতনাকে জাগিয়ে তুলে সংবাদ আদান প্রদানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচলিত করেছিলেন " গনেশ উৎসব" এর । 
  ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র জনান্দোলন এবং আলোচনা করার জন্য ইংরেজ সরকার ওনার উপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ লাগিয়ে ৬ বছরের জন্য দেশের বাইরে করার আদেশ দিয়ে বর্মার মান্ডালে জেলে পাঠিয়ে দিল,  কিন্তু, কর্মতৎপর লোকমান্য তিলক মহাশয় জেলে বন্দী অবস্থায় রচনা করেছিলেন " গীতা রহস্য " এর। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে যখন উনি "গীতা রহস্য" এর প্রকাশণ করেছিলেন তখন ভীষণ জন আলোরণ তৈরী হয় সম্পূর্ণ দেশে। 
     নির্ভিক সাংবাদিক লোকমান্য তিলক দুটি সংবাদ পত্রের প্রকাশণ করেছিলেন - একটি ইংরাজীতে       " মারাঠা"  নামে এবং অপরটি মারাঠী ভাষায় "দৈনিক কেশরী" নামে। প্রকাশিত সংবাদপত্র গুলির মাধ্যমে লোকমান্য তীব্রভাবে ইংরেজ শাসনের নিন্দা এবং সমালোচনা শুরু করেছিলেন, যার জন্য ওনাকে প্রায়ই জেলে যেতে হত। স্বায়ত্ব বা সুশাসনের দাবী তুলে আন্দোলন চালিয়ে ১৯১৬ - ১৮ সালে  গঠণ করলেন "অল ইন্ডিয়া রূল লীগের"। ক্রান্তিকারী আন্দোলনের সমর্থক তিলক সম্পূর্ণভাবে গান্ধীজীর অসহযোগ অন্দোলনকে মেনে নিতে পারেননি। লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, এনী বসন্ত, মহম্মদ আলী জীন্নাহ  ইত্যাদি মহান ব্যাক্তিত্বের সংযুক্ত আন্দোলনে বিচলিত হয়েছিল ইংরেজ প্রশাসন। সম্পূর্ণ ভারতে তখনকার দিনের একটা বহুল প্রচলিত শ্লোগান ছিল "লাল বাল পাল "। বিখ্যাত তিন মহান ব্যাক্তিত্ব !
  ভারত মায়ের মহান সন্তান লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক। ওনার নাম আজ ও স্বাধীন ভারতবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে । 
  লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়ের শ্রীচরনে জানাই আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ।