একটি মেয়ের ভালোবাসার করুন কাহিনী - বিচ্ছেদ

23rd April 2020 গল্প
একটি মেয়ের ভালোবাসার করুন কাহিনী - বিচ্ছেদ


* বিচ্ছেদ *
--- রাফিয়া সুলতানা
 

দেশটা হলো বাংলাদেশ। তবে তখন ছিলো পূর্ব পাকিস্তান। সেখানে ঢাকা শহরের কাছে জয়পাড়া নামক গ্রামে ছিলো সম্ভ্রান্ত একটি হিন্দু পরিবারের বাস। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা দুই পারেই ছিলো তাদের কাপড়ের রমরমা ব্যবসা। সেই পরিবারে গৌরীর জন্ম। তার নামটি যেমন মিষ্টি, দেখতেও তেমনই সুশ্রী সে। আর তেমনই সুন্দর ছিলো তার গানের গলা। সেদিন পাড়ার ক্লাবের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলো গৌরী। সবাই খুব প্রশংসা করেছিলো। তবে একজনের প্রশংসা তার মনে দাগ কেটেছিলো খুবই। নাম তার আকবর। আকবর সেদিন তার পিঠে আলতো করে সস্নেহে একটি টোকা দিয়ে বলেছিলো--বাহ! এতো সুন্দর গান গাইতে পারিস তুই! চালিয়ে যা! দেখিস, একদিন খুব নাম করবি !
কিশোরী মনে যেন খুশির তুফান উঠেছিলো সেদিন তার সেই কথাগুলো শুনে! কেমন যেন অভিভূত হয়ে পড়েছিলো গৌরী ! সেকি অনুরাগের অনুভূতি? এতদিন তো সে চিনতো না তাকে! তবে? পরে অবশ্য জেনেছিলো, আকবর তার দাদারই পরিচিত একজন, বন্ধুরই মত।

গৌরীর বই পড়ারও খুব নেশা ছিলো। আর তাই জন্য প্রায় সে দাদার আলমারি ঘাঁটাঘাটি করে বইয়ের থাক সব ওলোট পালোট করে দিতো। দাদার কাছে মাঝে মধ্য ধমকও খেতে হতো সেই কারণে। একদিন আলমারিতে সে নতুন একটা ম্যাগাজিনের দেখা পেলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে চোখে পড়লো ছোট্ট একটা গল্প। দাদার সেই বন্ধু আকবরেরই লেখা। ভারি ভালো লাগলো পড়ে।তারপর, দেখতে পেলো, পাশে আরও কয়েকটা ম্যাগাজিন। সবক'টি পাড়ার ক্লাব কতৃক প্রকাশিত। সে তাড়াতাড়ি পাতা উল্টে সেগুলো পরখ করতে লাগলো। সেখানে আকবরের আরও দু-একটা লেখার সন্ধান পেলো সে। চুপ করে সেগুলো নিয়ে এসে বালিসের নীচে লুকিয়ে রাখলো। তারপর একে একে পড়ে ফেললো সব। প্রতিটা লেখা তার এতো ভালো লাগলো, যে সে এক প্রকার আকবরের অনুরাগীই হয়ে পড়লো।

দুচারটে বাড়ি পেরিয়েই থাকতো লুৎফা পিসী।আকবরের দুরসম্পর্কের দিদি ছিলেন তিনি। লক্ষী পুজোর সময় তিনি বলে যেতেন গৌরীর মাকে, আমার লগে বেশি কইরা নাড়ু বানাবা! ঘরে তুইলা রাখুম। কাজের ফাঁকে বড্ড খিদা লাগে! তখন একটা কইরা খামু।
মাও বেশি করে নারকেলের আর তিলের নাড়ু বানিয়ে পিসীর জন্য কৌটোয় ভরে গৌরীকে বলতো, যা দিয়ে আয় লুৎফা পিসীর বাড়ি।

শবেবরাতে পিসীর বানানো হালুয়া রুটি বড় প্রিয় ছিলো তাদের সকলের। ঈদের দিনতো সারা দিনের দাওয়াত থাকতো সেখানে। পিসীর এক মেয়ে নিলুফা খুব বন্ধু ছিলো গৌরীর। সরস্বতী পুজোর দিন দুজনে মিলে শাড়ি পরে একসঙ্গে স্কুলে যেতো।

সেদিন পিসীর বাড়িতে দেখা হলো আকবরের সঙ্গে। গৌরী আর দেরি না ক'রে সেই সুযোগে জানিয়েই দিলো তার গল্পের প্রতি নিজের ভালোলাগার কথা। জানালো, আরো লেখা পড়তে চায় সে। এবারে কিছু লিখলে, তাকে যেন আগেই দেখানো হয়। গৌরীর লজ্জা জড়ানো সেই আবদারে, একটু খানি হাসলো আকবর। বললো, বেশ, তাই হবে! গৌরীর অনুরাগের ছোঁয়া যেন আলতো ভাবে স্পর্শ ক'রে গেলো তাকে!

সত্যি সত্যিই এরপর থেকে নতুন কিছু লিখলেই, আগেই তা পাঠিয়ে দিতো আকবর গৌরীর কাছে নিলুফার মাধ্যমে, তার মতামত জানতে। গৌরীও অকুণ্ঠ প্রশংসা করতো সেগুলোর একটা ক'রে ছোট্ট চিঠি লিখে । ভারি তৃপ্ত হতো আকবর সেগুলি পড়ে।সেও উত্তর দিতো দুচার লাইন লিখে,একটা চিরকুটে। এমনি করে ,কবে যে তিল তিল ক'রে দুজনে আবদ্ধ হয়ে গেলো এক- নিষ্পাপ নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে, টেরও পেলো না।

সেদিন আকবরের দাদুর পারলৌকিক ক্রিয়া ছিলো। সেখানে নিমন্ত্রিত ছিলো গৌরীও। রাতের বেলায় বাড়ি ফিরতে দিলো না বন্ধু নিলুফা ও আকবরের দিদি এবং বোনেরা। মনে মনে ভয় পেলো গৌরী। বললো, না ফিরলে বাড়িতে বকবে। ধমক দিয়ে বললো রাবেয়া,আকবরের দিদি--কেন বকবে? আমরা কি পর? আমি নাহয় পৌঁছে দেবো তোকে। নিলুফাও নাছোড়বান্দা। থাক না। খুব মজা করবো সবাই! সত্যি খুব মজা হলো! অনেক রাত পর্যন্ত হৈ হৈ করলো সকলে। একবার রাবেয়া তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললো - খবরদার কষ্ট দিবা না আমার ভাইকে! বড্ড ভালোবাসে সে তোমায়! লজ্জায় লাল হয়ে গেলো গৌরী। একসময় গৌরী নিলুকে খুঁজতে গিয়ে ঢুকে পড়ে,তাদের বৈঠক খানায়। গিয়ে দেখে কেউ নেই সেখানে, শুধু আকবর চুপ করে বসে আছে এক কোণে। কি হয়েছে! কাকে খুঁজছিস? প্রশ্ন করে আকবর। গৌরী পালিয়ে আসতে গিয়েও পারে না। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। আকবর এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখে তার। কি হলো? ভয় পেলি? গৌরী মাথা নেড়ে জবাব দেয়- "না। ভয় পাবো কেন?" তখন তার মনে যে অনুরাগের আবেশ! প্রণয়াবেগের বিহ্বলতা!
যাক সে যাত্রা বাঁচলো সে,সেই ঘোর থেকে--। পরের দিন রাবেয়া পৌঁছে দিলো তাকে।গৌরী ফিরেছিলো দুরু দুরু বুকে, সারা রাত পরবাসের পরে। বাড়িতে অবশ্য কেউ কোন উচ্চবাচ্য করেনি সেই নিয়ে।
------------
এমন সময় শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। চারিদিকে তীব্র হলো বিক্ষোভ, বিদ্রোহ! আন্দোলন। গৌরীর দাদা অতনু এবং আকবর সহ তার বন্ধু বান্ধবেরা যোগ দিলো আন্দোলনে। যুদ্ধ শুরু হলো। চারিদিকে চললো ধরপাকড়, হানাহানি ,হত্যাযজ্ঞ। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে নিহত হলো হাজার হাজার বাঙালি। নেমে এলো ভীষণ দুর্দিন। এই সময় সুবিধাবাদীরা শুরু করলো বিভাজনের রাজনীতি। চারিদিকে অশান্তি আর অবিশ্বাসের আগুন জ্বলে উঠলো।হিন্দুরা দলে দলে ঘরবাড়ি জমিজমা ছেড়ে পাড়ি দিলো ভারতে। সেই আঁচ এসে লাগলো গৌরীদের পরিবারেও। তারাও ঠিক করলো এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে ভারতে।
গৌরী এই প্রথম অনুভব করলো, আকবর আর সে আলাদা ,আলাদা সম্প্রদায় । তাদের মধ্যে মিলন কখনোই সম্ভব নয়। সে হিন্দু।আর আকবর মুসলিম। এ দেশ মুসলমানের। আর তাই তারা এই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সারারাত খুব কাঁদলো সে। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিলো। তার প্রিয় বন্ধু নিলুফাকে ডেকে বললো , খুব ভালো বাসে সে আকবরকে। তাকে ছাড়া বাঁচা যে সে কল্পনাও করতে পারে না। নিলুফা অনেক বোঝালো তাকে। এদিকে বাড়িতে দেশ ছাড়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। গৌরীর বাবা , মা, ভাইবোন এখনই চলে যাবে কলকাতায় । শুধু কিছুদিন তার বড়দা থেকে যাবে এখানে।

গৌরী একদিন লুকিয়ে দেখা করলো আকবরের সঙ্গে। কথা মত আকবর দাঁড়িয়ে ছিলো তাদের বাড়ির পিছনের আমবাগানে, দীঘির ঘাটে। গৌরী গুটি গুটি পায় দাঁড়ালো গিয়ে সেখানে,মাথা নীচু করে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। তারপর গৌরীই মুখ তুলে তাকালো আকবরের দিকে। দেখলো আকবর তার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে আছে। বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে গৌরীর। বলতে চায় সে যেতে চায় না তাকে ছেড়ে। কিন্তু বলতে পারলো না।
আকবরই মুখ খুললো এবার- যা তুই বাবা মা'র সঙ্গে। পৃথিবীতে বাবা মায়ের মত কেউই আপন নয়। কেউ বুঝবে না তাদের মতো তোর ভালোমন্দ! তুই না গেলে ওনারা খুব কষ্ট পাবেন। বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে এ জগতে কিছুতেই সুখী হওয়া যায় নারে!
আমি চিরদিন তোর কথা মনে রাখবো। এই নে, এটা পড়িস।এই ব'লে কিছু কাগজের তাড়া তার হাতে গুঁজে দিলো সে।
গৌরী হাউ হাউ করে কেঁদে তার পায়ে গিয়ে পড়লো! আকবর সস্নেহে তার হাত ধরে ওঠালো । তারপর, মাথায় হাত রেখে বললো- ভালো থাকিস। চিঠি দিস।
গৌরী কাগজ গুলো বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে পালালো সেখান থেকে।

গোছগাছ সব কমপ্লিট।সব প্রতিবেশী সহ লুৎফা পিসী কাঁদতে কাঁদতে দেখা করতে এলো।

গৌরীর দাদা অতনু ইতিমধ্যে টের পেয়ে গেছিলো আকবরের প্রতি তার দুর্বলতার কথা। গৌরীর বইয়ের মধ্যে একদিন তার চিঠি পায় সে। অতনু ও ভালোবাসতো আয়েষা ব'লে তার এক প্রতিবেশিনী কে। কিন্তু তাকেও ছেড়ে যেতে হবে দেশ। ছেড়ে যেতে হবে তার ভালোবাসা! অর্থাৎ ঘটনাচক্রে সেও গৌরীর মতই পরিস্থিতির শিকার। অতনু গৌরীকে একদিন হাত ধরে টেনে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো, তোর যেতে ইচ্ছা না হলে---- আমার কাছে থেকে যেতে পারিস। আমিই তোর সঙ্গে আকবরের বিয়ে দিয়ে যাবো। তোর কোনো চিন্তা নেই।
গৌরীর মনে পড়লো আকবরের কথাগুলো ।দুচোখ জলে ভরে উঠলো তার। সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে তার অসম্মতি জানালো, দাদার সেই প্রস্তাবে।

রেলস্টেশনে যেন জনসমুদ্র। যত না মানুষ, তার চেয়ে তাদের মালপত্র ঢের বেশি। চিরদিনের জন্য দেশ ছাড়া। তাই যতটুকু পারা যায় সহায় সম্বল গুটিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে সবাই। মাতৃভূমিকে চিরবিদায় জানিয়ে সকলে চলেছে এক- অজানা ভবিষ্যতের দিকে। অচেনা দেশ। অনিশ্চিত ভাগ্য। তবু যেতে হবে। অনেকেই চলেছে কিছু আত্মীয় স্বজনদের ঠিকানা সম্বল ক'রে। যতদিন না নিজের পায়ের নীচের মাটি জোগাড় হচ্ছে,ততদিন হতে হবে তাদেরই দয়ার মুখাপেক্ষী । গৌরীরও এক পিসী থাকেন কলকাতায়। আপাততঃ সেটিই তাদের গন্তব্য।

হঠাৎ গৌরীর চোখে পড়লো, দূরে এক ছাতিম তলায় নীল পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরে এক- যুবক তাকে হাতের ইশারায় ডাকছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো, সে আর কেউ নয়, আকবর।
গৌরী চট্ করে সবার চোখের আড়ালে সেখান থেকে সরে এসে পৌঁছালো সেই ছাতিম তলায়। গাছের পিছনে তার হাত ধরে টেনে আকবর একটা ছোট ব্যাগ গুঁজে দিলো হাতে। বললো-তোকে তো দেবার মত আমার কিছু নাই। তাই সামান্য একটু উপহার দিলাম। আর দিলাম আশীর্বাদ। অনেক সুখী হবি তুই! হারমোনিয়ামটা নিয়েছিস তো? খবরদার রেওয়াজ করা ছাড়িস না যেন!
ব্যাগটা নিতে গিয়ে কেঁপে গেলো গৌরীর হাত! বুকের ভিতরটা যেন দুমরে মুচড়ে যাচ্ছে! কোন কথা বেরলো না মুখ দিয়ে! শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
এদিকে ট্রেনের সিগনাল পড়ে গেছে। আকবর ধীর পায়ে ,এগিয়ে দিতে এলো তাকে। তার দাদাও এসেছিলো। দুজনে মিলে মালপত্র গুলো তুলে দিয়ে গুছিয়ে দিলো ঠিক ঠাক ক'রে। হুইশল বাজতেই ট্রেন থেকে নেমে গেলো তারা।

ট্রেন ধীর গতিতে এগিয়ে চললো। জানালার ধারে বসে অপলক দৃষ্টিতে গৌরী চেয়ে রইলো বাইরের দিকে। হাত নাড়াচ্ছিলো দুজনে। ক্রমে চলে গেলো তারা চোখের আড়ালে। ছলছল চোখে গৌরী তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ বাইরের দিকে, শূন্য দৃষ্টিতে।
------
তারপর গৌরীর একদিন বিয়ে হলো। স্বামী ব্যবসায়ী। সংসারের চাপে ভুলতে হলো সব। ফিকে হয়ে গেলো অতীত। তবে এখনও সযত্নে রাখা আছে আকবরের দেওয়া সেই স্মৃতি চিহ্ন, সেই ব্যাগটা, আর তার ভিতরে দুজোড়া বালা, একটা হেয়ার ব্যান্ড। আর সেই কাগজের তাড়া। একটি গল্প- আকবরের লেখা--" জয় জয়ন্তী "। সে যেন তাদেরই প্রেম কাহিনী।
আজও মাঝে মাঝে নেড়ে চেড়ে দেখে গৌরী সেগুলো। বালা দুটি বা হেয়ার ব্যান্ড-কখনো গায়ে তোলা হয় নি সেগুলো। শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। সাক্ষী হয়ে এক- অপূর্ণ প্রেমগাথার ।
গৌরীর ভীষণ ইচ্ছে হতো আকবরের খবর জানতে!
তার চিঠি পেতে! তার একটু কণ্ঠস্বর শুনতে! কিন্তু কোনদিন তা আর মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারেনি প্রিয় বান্ধবী নিলুফার কাছে! হ্যাঁ, নিলুফার মাধ্যমেই কিছুটা হলেও ছিলো তার মাতৃভূমির সঙ্গে যোগাযোগ। তার মাধ্যমেই যেটুকু খবরাখবর পাওয়া যেতো আকবরের। শুনেছিলো, আকবরের বিয়ে হয়েছে। সন্তান হয়েছে। খুব সাধ হতো একটি বার দেখার-সেই মানসপ্রতিমকে।জানতে সেও কি মনে রেখেছে তাকে?
------
দেখতে দেখতে কেটে গেছে পঞ্চাশটি বছর। গৌরীর এখন স্বামী ও এক ছেলে নিয়ে ভরা সংসার। থাকে ব্যারাকপুরে। স্বামীর মুদিখানার ব্যবসা। ছেলে চাকুরে। কলকাতায় পোস্টিং। সে রোজ ট্রেনে যাতায়াত করে। গৌরী সারাদিন ব্যস্ত থাকে দোকান ও সংসার সামলাতে। স্বামী হার্টের রুগী। নিজের চোখে ছানি পড়েছে। অপারেশনেরও ফুরসৎ নেই।

হারমোনিয়ামটা সেই থেকে তোলা আছে তো আছেই। হাত পড়েনি আর। ধুলো পড়ে ময়লায় বুঁজে গেছে সেটা। কোনদিন সময় হয় না সেটি ঝেড়ে ঝুড়ে মুছে রাখার। সেটার দিকে চোখ পড়লেই, মনে পড়ে আকবরের কথা।ভবিষ্যদ্বাণী ক'রে বলেছিলো সে, অনেক বড় গাইয়ে হবে গৌরী ।হয়নি তা। তার মতো আর কোন উৎসাহী ও অনুরাগী পায়নি আর জীবনে । স্বামী কোনদিনও মুখ ফুটে বলেনি গান শোনানোর কথা। সবাই যে যার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সংসার বুঝি এমনই হয়! তবু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে মন! হাঁপিয়ে ওঠে সংসারের কলুর ঘানি টানতে টানতে! ছুটে পালাতে চায় কোন নিরালা শান্তির ছায়াতলে! চায় এক দন্ডের নিভৃত আশ্রয়! একটু খোলা বাতাসে নিশ্বাস নিতে! একটু গলা ছেড়ে কাঁদতে! একান্তে! আজও যে পিছুটানে ব্যথাতুর সেই অতীত!

অনেক কষ্টে একটি পাসপোর্ট করিয়েছিলো গৌরী। উদ্দেশ্য -জীবনে যদি অন্ততঃ একটি বারের জন্যও ফেরা হয় দেশে। দেখা পাওয়া যায় আকবরের। ফিরে পাওয়া যায় সেই নিতান্ত অবোধ কৈশোরের দিনগুলি ! কিন্তু না। বিধি বাম। খবর এলো একদিন (নিতান্ত বজ্রাঘাতের মতই!) মারা গেছে আকবর -মধ্য রাতে ঘুমের ঘোরে, হার্টঅ্যাটাকে ! ঝপ ক'রে নিভে গেলো গৌরীর সব স্বপ্ন! শেষ আশা মাত্র একটি বারের সাক্ষাতের! অবশেষে---বুঝি হলো তাদের সত্যিকারের বিচ্ছেদ!





Others News

একটি সুন্দর গল্প - চুল

একটি সুন্দর গল্প - চুল


অনেক ক্ষণ ধরে পুরোনো ফোন নিয়ে ঘাঁটছিলাম। বিরক্ত হয়ে স্ত্রী বললেন - "এবার রাখো। তোমার মেয়ে খাবার নিয়ে তখন থেকে বসে আছে। খেতে চাইছে না। একটু দেখো।"

অগত্যা। গিয়ে দেখি একতাল আতপ চাল আর ঘি মাখানো ভাত নিয়ে সে বিরসবদনে বসে। খুব রাগ হল তার মা এবং আমার নিজের মায়ের প্রতি। সত্যি তো, এমন বিস্বাদ খাবার খেতে কেন যে জোর করে.. !

মাাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম- "মা রে, দুটো খা। অন্ততঃ আমার কথা ভেবে।" মন্ত্রের মত কাজ হল। টলটল চোখে সে বলল - "বাবা, খাচ্ছি। কিন্তু আমার একটি চাওয়া আছে তোমার কাছে। দেবে?"

কোন বাবা তার সন্তানকে না দিয়ে পারে! বললাম - "নিশ্চয় মা। কিন্তু কম্পিউটারের মত দামী কিছু চেয়ে বসিস না। এখনি অতটা সামর্থ্য তো নেই।"

মেয়ের চোখ থেকে এবার মুক্তোদানা ঝরে পড়ল। "আমি কি তোমায় বিব্রত করতে পারি?" - প্রশ্ন সে দৃষ্টিতে। আমি লজ্জিত হলাম।

খাওয়া শেষ করে সে বলল - "এবার বলি?"

তার ঠাকুমা, মা এবং আমার সপ্রশ্ন দৃষ্টি এখন তার দিকে। সে ধীরে ধীরে বলল - "আমি ন্যাড়া হতে চাই।"

ছুঁচ পড়লে শোনা যাবে এমন নীরবতা ভাঙ্গল আমার স্ত্রীর হুঙ্কারে - "মাথা খারাপ হয়েছে তোর। মেয়েরা কেউ ন্যাড়া হয়..!"
আমার মা রেগে গিয়ে বললেন - "যত্তোসব পাগলামি। আমাদের পরিবারে এমন অনাসৃষ্টি কেউ কখনও করে নি। এবার টিভি দেখে বিলেতের অন্ধানুকরণ।"

পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠছে দেখে সামলাতে চাইলাম - "মা রে, তোর ওমন গোছাভরা সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেলবি? কিন্তু কেন?"

শান্ত কিন্তু প্রত্যয়ী কণ্ঠে মেয়ে বলল - বাবা, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে আমায়। তুমি নিজেই তো কতবার আমাকে সত্যবাদী হরিশচন্দ্রের ঘটনাটা বলেছ। শিখিয়েছ - সত্যবাদীতার জন্য জীবনপণ করা যায়। তাহলে এখন নিজের কথা রাখতে চাইছ না কেন?"

জয় হল তার। একমাথা রেশমী চুল মুড়িয়ে সন্ন্যসিনীর মত দেখতে হল তাকে। আমার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তার ঠাকুমা, মা তো কথা বলাই ছেড়ে দিল আমার সঙ্গে মেয়ের এমন বিচিত্র আব্দারে তাল দেবার জন্যে।

প্রতিদিনকার মত তাকে স্কুলে ছাড়তে গেলাম। আমার আদরের ন্যাড়ামাথা স্কুলের গেটের দিকে এগোচ্ছে। ঠিক সেই সময় একটি গাড়ি থামল। শুনলাম - আমার কন্যের নাম ধরে কেউ ডাকছে - "সিধুজা।"

মেয়ে থমকাল। তার মুখে অনাবিল হাসি। দেথলাম গাড়ি থেকে নামলেন এক ভদ্রমহিলা আর ছোট্ট একটি ছেলে। তার মাথাটিও ন্যাড়া। আমি ভাবলাম - সিধুজা তবে একা নয়, এটাই নতুন ফ্যাশন!

অচীরেই আমার ভুল ভাঙ্গালেন ছেলেটির মা। বললেন - "বিরলতম অনুূভূতিপ্রবণ আপনার মেয়ে। গতসপ্তাহে আমাদের বাড়ি এসেছিল আমার ছেলেকে দেখতে। ওর কেমোথেরাপি চলছে। ফলে সব চুল ঝরে গেছে। স্কুলে গেলে পাছে বন্ধুরা পিছনে লাগে তাই আসতে রাজী হচ্ছিল না। তা শুনে আপনার মেয়ে সিধুজা তখনই বলেছিল - স্কুলে আসতে। মাথায় চুল না থাকার কারণে পিছনে কেউ লাগবে না। এখন বুঝলাম সমাধানটা। স্কুলের সেরা ছাত্রী নিজেই যদি মুণ্ডিতমস্তক হয়, আমার ছেলেকে কে আর রাগাবে..!!"

আমি নির্বাক। দেখলাম আমার সিধুজা, মহাপ্রাণ সিধুজা তার বন্ধুর হাতটি ধরে গেট পেরোল। মাথা থেকে তার পদপ্রান্তে এসে আমার দৃষ্টি ঝাপসা হল।