একটি অনুগল্প - আত্মহত্যা

26th April 2020 গল্প
একটি অনুগল্প - আত্মহত্যা


আত্মহত্যা

আমার লাশটা গত তিন ঘন্টা ধরে সিলিং এর
সাথে ঝুলে আছে। কেউ আসছে না ঘরে।
আসতে পারছে না আসলে। মা এসে এর মধ্যে
দু তিনবার নব ঘুরিয়েছে, টের পেয়েছি।
প্রথমবার ভেবেছে হয়তো একা থাকার জন্য
লক করেই রেখেছি। তবুও পরে আবারো
এসেছে এর মধ্যে লক খুলেছি কিনা দেখতে।
যদিও আমি ভেবেছিলাম মা আর আমার রুমে
আসবে না। যে কড়া ধমক দিয়ে শেষবার
বলেছি মা কে ঘরে না আসতে! তারপরও মা
কি উৎকণ্ঠা নিয়ে পায়চারি করছে ঘরের
বাইরে। বাবাও ডাইনিং এ কয়েকবার এসে খুব
চিন্তিত মুখে বসে থেকে থেকে নিজের ঘরে
চলে গেলেন। খুব অদ্ভুত ব্যাপার, মৃত্যুর পর
থেকে কে কি ভাবছে আমি সব বুঝতে
পারছি। আমি ভেবেছিলাম আমি এ প্লাস না
পাওয়ায় বাবা কি চরম কষ্টই না পেয়েছেন।
হয়তো সকাল থেকে ভাবছেন কারো সামনে
মুখ দেখাতে পারবেন না। এদিকে বাবা
এখনো ভাবছেন কিভাবে আমার মন একটু
ভালো করা যায়। এ প্লাস পেলে যে
বলেছিলেন ল্যাপটপ কিনে দেবেন সেটা
দুদিন আগে থেকেই কিনে আলমারিতে রাখা
হয়েছে। বাবা ভাবছেন কখন আমি দরজা খুলব,
ল্যাপটপটা আমার হাতে তুলে দেবেন। তাতে
যদি আমার মন খারাপ একটু কমে। আমার
বন্ধুরা কি ভাবছে তাও বুঝতে পারছি। শুভ
আর আকাশ এর মধ্যেই প্ল্যান করেছে কাল
দলবল মিলে বাড়িতে এসে আমাকে চমকে
দেবে। সবাই মিলে কেএফসি তে নিয়ে
যাবে। আকাশ আমাকে নিয়ে মজার একটা
কবিতা লিখেছে, বেঁচে থাকলে এই মুহুর্তে
যেটা পড়ে আমি হো হো করে হেসে
ফেলতাম। অথচ আজ বিকালেও আমি
ভাবছিলাম সবাই আমাকে নিয়ে কত উপহাসই
না করছে। হয়তো আমার সাথে এখন আর কথা
বলবে না, মিশবে না। আচ্ছা সবার বন্ধুরাই
কি এতো ভালো হয়? মা ভাবছে আমার প্রিয়
চিংড়ি মাছের মালাইকারি তরকারিটা ঠান্ডা হয়ে
গেলে আমি আর খেয়ে তেমন মজা পাবো
না। তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলে আমাকে
বুঝিয়ে শুনিয়ে খাওয়াতে নিয়ে যাবে। আমি
সেই দুপুর থেকে রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে
ছিলাম বলে মা সারাদিন কিছুই খায়নি। তবু
সে ভাবছে আমি সারাদিন না খেয়ে আছি
তাই নিয়ে। একবার বাবাকে গিয়ে কি ভীষণ
বকাও দিয়ে দিল, “তোমাকে বলেছিলাম না
রেজাল্ট নিয়ে এত চাপাচাপি করো না?
ছোট মানুষ, এত কি বোঝে?” আমার ধারণা
ছিল বাবা পাল্টা তর্ক করবেন, কিন্তু কি
অদ্ভুত, বাবা চুপচাপ মেনে নিয়ে বললেন,
ঠিকই বলেছ। এবার কলেজে উঠলে ও
যেভাবে পড়ুক, যা রেজাল্ট করুক, কোন
চাপাচাপি করবো না। রেজাল্ট এর চেয়ে
ছেলে বড় !” কথাটা শুনে আমি বেঁচে থাকলে
কাঁদতাম, অবশ্যই কাঁদতাম। হঠাৎ মনে হলো
অযথাই সারাদিন কেঁদে চোখ ফুলাচ্ছিলাম,
অযথাই কান্ডটা করলাম। জীবন কত সুন্দর। এ
প্লাস পাওয়ার চেয়ে আরো অনেকগুণ সুন্দর
মায়ের হাতে এক নলা ভাত খাওয়া! বাবার
পাশে বসে ফুটবল/ ক্রিকেট খেলা দেখা, বন্ধুদের সাথে
ক্ষণিকের খুনসুটি। মা এখন দরজায় জোরে
জোরে নক করছে। বাইরে থেকে বলছে,
“বাবা খেয়ে নে, আর কখনো বকবো না,
দরজা খোল বাবা”। খুব বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, এই
দরজা কখনো খুলো না মা। কখনো খুলো না এই দরজা।।।

Image may contain: one or more people, sky and nature





Others News

একটি সুন্দর গল্প - চুল

একটি সুন্দর গল্প - চুল


অনেক ক্ষণ ধরে পুরোনো ফোন নিয়ে ঘাঁটছিলাম। বিরক্ত হয়ে স্ত্রী বললেন - "এবার রাখো। তোমার মেয়ে খাবার নিয়ে তখন থেকে বসে আছে। খেতে চাইছে না। একটু দেখো।"

অগত্যা। গিয়ে দেখি একতাল আতপ চাল আর ঘি মাখানো ভাত নিয়ে সে বিরসবদনে বসে। খুব রাগ হল তার মা এবং আমার নিজের মায়ের প্রতি। সত্যি তো, এমন বিস্বাদ খাবার খেতে কেন যে জোর করে.. !

মাাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম- "মা রে, দুটো খা। অন্ততঃ আমার কথা ভেবে।" মন্ত্রের মত কাজ হল। টলটল চোখে সে বলল - "বাবা, খাচ্ছি। কিন্তু আমার একটি চাওয়া আছে তোমার কাছে। দেবে?"

কোন বাবা তার সন্তানকে না দিয়ে পারে! বললাম - "নিশ্চয় মা। কিন্তু কম্পিউটারের মত দামী কিছু চেয়ে বসিস না। এখনি অতটা সামর্থ্য তো নেই।"

মেয়ের চোখ থেকে এবার মুক্তোদানা ঝরে পড়ল। "আমি কি তোমায় বিব্রত করতে পারি?" - প্রশ্ন সে দৃষ্টিতে। আমি লজ্জিত হলাম।

খাওয়া শেষ করে সে বলল - "এবার বলি?"

তার ঠাকুমা, মা এবং আমার সপ্রশ্ন দৃষ্টি এখন তার দিকে। সে ধীরে ধীরে বলল - "আমি ন্যাড়া হতে চাই।"

ছুঁচ পড়লে শোনা যাবে এমন নীরবতা ভাঙ্গল আমার স্ত্রীর হুঙ্কারে - "মাথা খারাপ হয়েছে তোর। মেয়েরা কেউ ন্যাড়া হয়..!"
আমার মা রেগে গিয়ে বললেন - "যত্তোসব পাগলামি। আমাদের পরিবারে এমন অনাসৃষ্টি কেউ কখনও করে নি। এবার টিভি দেখে বিলেতের অন্ধানুকরণ।"

পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠছে দেখে সামলাতে চাইলাম - "মা রে, তোর ওমন গোছাভরা সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেলবি? কিন্তু কেন?"

শান্ত কিন্তু প্রত্যয়ী কণ্ঠে মেয়ে বলল - বাবা, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে আমায়। তুমি নিজেই তো কতবার আমাকে সত্যবাদী হরিশচন্দ্রের ঘটনাটা বলেছ। শিখিয়েছ - সত্যবাদীতার জন্য জীবনপণ করা যায়। তাহলে এখন নিজের কথা রাখতে চাইছ না কেন?"

জয় হল তার। একমাথা রেশমী চুল মুড়িয়ে সন্ন্যসিনীর মত দেখতে হল তাকে। আমার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তার ঠাকুমা, মা তো কথা বলাই ছেড়ে দিল আমার সঙ্গে মেয়ের এমন বিচিত্র আব্দারে তাল দেবার জন্যে।

প্রতিদিনকার মত তাকে স্কুলে ছাড়তে গেলাম। আমার আদরের ন্যাড়ামাথা স্কুলের গেটের দিকে এগোচ্ছে। ঠিক সেই সময় একটি গাড়ি থামল। শুনলাম - আমার কন্যের নাম ধরে কেউ ডাকছে - "সিধুজা।"

মেয়ে থমকাল। তার মুখে অনাবিল হাসি। দেথলাম গাড়ি থেকে নামলেন এক ভদ্রমহিলা আর ছোট্ট একটি ছেলে। তার মাথাটিও ন্যাড়া। আমি ভাবলাম - সিধুজা তবে একা নয়, এটাই নতুন ফ্যাশন!

অচীরেই আমার ভুল ভাঙ্গালেন ছেলেটির মা। বললেন - "বিরলতম অনুূভূতিপ্রবণ আপনার মেয়ে। গতসপ্তাহে আমাদের বাড়ি এসেছিল আমার ছেলেকে দেখতে। ওর কেমোথেরাপি চলছে। ফলে সব চুল ঝরে গেছে। স্কুলে গেলে পাছে বন্ধুরা পিছনে লাগে তাই আসতে রাজী হচ্ছিল না। তা শুনে আপনার মেয়ে সিধুজা তখনই বলেছিল - স্কুলে আসতে। মাথায় চুল না থাকার কারণে পিছনে কেউ লাগবে না। এখন বুঝলাম সমাধানটা। স্কুলের সেরা ছাত্রী নিজেই যদি মুণ্ডিতমস্তক হয়, আমার ছেলেকে কে আর রাগাবে..!!"

আমি নির্বাক। দেখলাম আমার সিধুজা, মহাপ্রাণ সিধুজা তার বন্ধুর হাতটি ধরে গেট পেরোল। মাথা থেকে তার পদপ্রান্তে এসে আমার দৃষ্টি ঝাপসা হল।