একটি হাত - শেখ রমজান আলী

26th April 2020 ছোটগল্প
একটি হাত - শেখ রমজান আলী


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ০২

একটি হাত

লেখা - শেখ রমজান আলী

 

সন্ধ্যা সাতটার সময় অফিসের কাজ শেষ করে,কোর্টটা গায়ে দিয়ে অফিস থেকে বেরোলো মনিকান্ত।একই ভরা পৌষমাসের শীত তারপর সন্ধ্যায় একপশলা বৃষ্টি কোনো রকমে কাঁপতে কাঁপতে সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে সাড়ে সাতটায় সময় হাওড়া স্টেশনে পৌছালো সে।
আটটা দশে আরামবাগ লোকাল ট্রেন।
প্রতি সপ্তাহ শনিবারে এই সময়ই সে আরামবাগের গ্রামের বাড়িতে আসে,রবিবার বাড়িতে থেকে সোমবার অফিসে আবার রওনা দেয়।

স্টেশনে পৌঁছে মনিকান্ত দেখে ট্রেন আসতে এখনো চল্লিশ মিনিট দেরি,কি আর করা বাধ্য হয়েই প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে থাকলো মনিকান্ত।হটাৎ পিছন থেকে একটা হাত তাঁর পিঠে পড়তেই।,চমকে উঠলো মনিকান্ত।হকচকিয়ে গেল সে,তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দেখলো,এক পঁচাত্তর আশি বছরের বৃদ্ধা,তার মুখ হাত শুকনো,শরীরের চামড়া শুকিয়ে হাঁড়ে অবশিষ্ট,পরনে আধ ছেঁড়া ময়লা কাপড় উস্কো খুস্কো পাকা চুল,চোখের দু'কোণে পিচড়ি জমা।
একটু বিরক্ত হয়েই মনিকান্ত বললো,কে আপনি?বৃদ্ধা একবার মনিকান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে,তারপর মাথাটা নিচু করে নিলো,কিছু বললো না।
মনিকান্ত রেগে গিয়ে কড়া মেজাজে ধমক দিয়ে বললো,আপনার ভিক্ষা দরকার সেটা তো আপনি আমার সামনে এসে বলতে পারেন,এইভাবে আচমকা পিঠের উপর হাত রাখার কি দরকার।বৃদ্ধা মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো মনিকান্তর কোনো কথার উত্তর দিলো না সে।

এরইমধ্যে আটটা দশের ট্রেন ঢুকলো।
তারপর মনিকান্ত পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বৃদ্ধাকে বললো,নিন টাকাটা ধরুন,বৃদ্ধা টাকাটা নিলো না।এইবার বিরক্ত হয়েই মনিকান্ত বললো,ধ্যাৎ যত্তসব,তারপর টাকাটা পকেটে রেখেই ছুটলো ট্রেনের দিকে,ট্রেন ছেড়ে দিলো,কিছু দূর যাবার পর পকেটে হাত দিয়েই মনিকান্ত চমকে উঠলো তার মানি ব্যাগ নেই।তিন হাজার টাকা ছিল তার মানি ব্যাগে।মনিকান্ত ভাবলো ভিড়ের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে উঠতে গিয়েই মানি ব্যাগটা পড়ে গেছে হয়তো।

মন খারাপ নিয়েই বাড়ি পৌঁছালো মনিকান্ত।সোমবারে অফিসেও গেল সে সারা সপ্তাহ অফিসের কাজের ব্যস্ততায় মানিব্যাগের কথা ভুলেই গেল মনিকান্ত,পরের সপ্তাহে শনিবার বাড়ি আসবে বলে আটটা দশের ট্রেনের অপেক্ষায় প্ল্যাটফর্মে বসে আছে মনিকান্ত।
এমন সময় একটা হাত পিঠে পড়তেই চমকে উঠলো,পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে সেই বুড়িটা এইবার আরো রেগে গিয়ে মনিকান্ত কিছু বলতে যাবে,এমন সময় বৃদ্ধা একটা কালো মানিব্যাগ বের করে মনিকান্তর হাতে দিলো,,তারপর সেটা মনিকান্তকে দিয়ে বললো,এটা আপনার গত সপ্তাহে আপনি ট্রেনে ওঠার সময় পড়ে গিয়েছিল।আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম,আপনাকে ফেরত দেব বলে,
অবাক হলো মনিকান্ত তাঁর রাগ,তাঁর মেজাজ মুহূর্তের মধ্যে ঠান্ডা বরফ হয়ে গেল। মানিব্যাগে দেখলো তিন হাজার টাকায় আছে,আশ্চর্য্য হলো মনিকান্ত।তারপর,মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা নিয়ে বৃদ্ধাকে দিতে গেল,বৃদ্ধা বললো বাবা আমি ভিখারি নয়,তারপর কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো,তিন মাস আগে আমার ছেলে আমাকে এখানে রেখে কোথায় চলে গেছে আর ফিরে আসেনি,সেই থেকে আমি আমার ছেলেকে খুঁজছি।
আমি ভিখারি নয় বাবা,,,,আমি ভিখারি নয়,,,,বলতে বলতে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল
চোখ ছলছল করে উঠলো মনিকান্তর
মাথা নিচু করে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বসে রইল,আজ নিজের কাছে ছোট হয়ে গেছে সে।গত শনিবারের ঘটনা তার অন্তরাত্মাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।এমন সময় আটটা দশের ট্রেন এসে পৌঁছালো স্টেশনে,ধীর পায়ে ট্রেনে গিয়ে বসলো মনিকান্ত।

,,,,,,,,,,,,,,,সমাপ্ত,,,,,,,





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।