অশরীরি - দেবযানী রায় ঘটক

27th April 2020 ছোটগল্প
অশরীরি - দেবযানী রায় ঘটক


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ০৩

অশরীরি

লেখা - দেবযানী রায় ঘটক


শিব্রাম কাল সারারাত ধরে কাজ করে প্রায় শেষ রাতের দিকে বিছানায় শুতে গেলো। উপন্যাসটি কালকের মধ্যে শেষ করতেই হবে। শারদীয়া পূজা সংখ্যার জন্য লেখা দিতে হবে পাঁচটি পত্রিকায় একইসাথে। শিব্রামের লেখার খুবই চাহিদা থ্রিলার গল্পলেখক হিসেবে। বাড়িতে সদস্য বলতে ও আর ওর বৌ কালিন্দী। ওরা নিঃসন্তান। শিবু বলে এক চাকর আছে অবশ্য। সে আজ দুদিন হলো দেশে গেছে। শিবু খুব নিরীহ প্রকৃতির অত্যন্ত অনুগত প্রভুভক্ত এক ভৃত্য। বাবু আর মা অন্ত প্রাণ। বাবুর কথা বেদবাক্য। মা'কেও খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে। এ হেন ভৃত্যের অনুপস্থিতিতে মা বাবু দুজনেই খুব অসুবিধায় পরেছেন। সারা রাত বাবু জেগে লেখালেখির কাজ করেন আর শিবু চা-পানি,জল-পান সবই এক এক করে জোগান দিতে থাকে। আজ পাঁচ বছর পর সে তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে দুচার দিনের জন্য দেশে গেছে। শ্রাদ্ধ কর্ম শেষ করেই চলে আসবে।
ঘড়িতে প্রায় রাত বারোটা। আরও বেশ কিছুটা লেখা বাকি। শেষ না করে আজ নিস্তার নেই। "আহা শিবু থাকলে কি ভালোই না হতো। এইসময় একটু লাল চা পেলে লেখাটা আরও জম্পেশ হতো।" মনে মনে ভাবছিলো শিব্রাম। গল্পের শেষ'টা নিয়ে একটু চিন্তায় আছে। অনেক কিছু আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল। টেবিলের ওপর উবু হয়ে লিখতে লিখতে হঠাৎ শিব্রাম বুকে কেমন একটা চিন্ চিনে ব্যাথা অনুভব করলো। আহ্ ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়তে থাকলো। একি !! গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না যে, কালিন্দী এইসময় ভিতরঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আহ্ কি অসহ্য ব্যাথা বুকে। দমটা যেনো বন্ধ হয়ে আসছে....মাথার মধ্যে কতো এলোমেলো চিন্তা ঘুরছে। চোখ জুড়ে যেনো রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে.....এমন সময় বহুদূর থেকে শুনতে পেলো শিবুর গলা। "বাবু বাবু আমি এয়েচি বাবু। আপ্নেরে নিতি এলাম বাবু। এই তো আর এট্টুন পরেই দ্যাখবেন সব সয়ে আসপেনে। এই আমার ঝ্যামন হইছে। এখন কিরম হাল্কা ভাসি বেড়াতে পাচ্চি বাতাসির মদ্দ্যি। এই তো আমি এয়েচি বাবু আপ্নারে নিতি".....ধীরে ধীরে শিবুর অবয়বের সাথে সাথে কথাগুলোও যেনো বাতাসে মিলিয়ে যেতে থাকলো। শিব্রামের দু চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো।
পরেরদিন হঠাৎ করে কালিন্দীর পরিত্রাহি চিৎকারে আচমকা শিব্রামের সম্বিত ফিরলো। একি এতো চিৎকার করে কাঁদছে কেনো কালিন্দী !! কি হয়েছে? শরীর'টা বেশ হাল্কা লাগছে। বাহ চমৎকার বেশ খাসা তো শরীর'টা যেনো হাওয়ায় ভাসছে। আরে ওই তো শিবু দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে।
--"হ্যাঁ রে শিবু শেষ পর্যন্ত এলি। তোকে ছাড়া বাবু মায়ের যে এক মুহুর্তও চলে না। এই কালিন্দী এতো গলা ছেড়ে কাঁদছে কেনো রে ?
শিবু বলল--"বাবু টেবিলের দিকে ভালো করে চেয়ে দ্যাখেন। আপুনি যে আর ইহজগতে নাই বাবু।" --"সেকি রে শিবু, তবে এই যে তোর সাথে কথা বলছি !!"
"হ্যাঁ বাবু আমিও তো তাই। কাল রেতের বেলা বাস দুগ্ঘটনায় আমিও তো পগার পার। এই আপনাদের একবার চোখের দ্যাখা দেখতে এয়েছিলুম বাবু। কাল রেতের বেলা এসে দ্যাখলুম এই ব্যাপার। তা বাবু এ কয়দিন আপ্নের ঠিকঠাক যত্ন হয়নি কো। মনে হয় আপ্নের সেই পেশারের ওষুধটা ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। তবে এই বেশ ভালো হলো বাবু..... ভালোই হলো। চলেন বাবু সকালের লালা চা টা আমার হাতেই খাবেন। চলেন বাবু চলেন।"
অশরীরি শিব্রাম বাতাসে ভেসে উড়ে চলল শিবুর পিছন পিছন। পিছনে পরে রইলো তার বিধবা স্ত্রী কালিন্দী তার সখের ঘর দূয়ার আর কিছু অসমাপ্ত উপন্যাসের অসমাপ্ত কাহিনী।

★নাম/ঠিকানা
দেবযানী রায় ঘটক
ই/২৪, রামগড়
নাকতলা
কলি-৭০০০৪৭





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।