জীবন নদীর ঢেউ - দিলীপ কুমার খাটুয়া

27th April 2020 ছোটগল্প
 জীবন নদীর ঢেউ -   দিলীপ কুমার খাটুয়া


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ০৪

** জীবন নদীর ঢেউ **
লেখা-  দিলীপ কুমার খাটুয়া

 

রেলপুলের উঁচু পাড়ের কিনারায় বসে বিধ্বস্ত অতসী। ধূলা মাখা পোষাকে শুকনো ঘাসের থুৎকার। পিঠের ব্যাগ যথাস্থানে, গলায় ঝুলছে মোবাইলটা, শুধু হেডফোনের প্রান্ত দুটা লটকে আছে নিচে।
এবারেও সে হেরে গেলো জেতা লড়াইটা। যুদ্ধ কালীন ক্রোধ ঘৃণা দলা পাকিয়ে লজ্জা হয়ে আটকে গেছে তার গলায়। না পারছে চিৎকার করতে না পারছে কাঁদতে। দুহাতে মুখ ঢেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রেলপুলের খাড়া পাড় বেয়ে তলায় গড়িয়ে পড়া রক্তাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে । ক্ষত বিক্ষত দেহটাকে টেনে তুলে সে উঠে বসেছে কোনক্রমে। তবু অনাবিল তৃপ্তি তার মুখে, বেদনার লেশমাত্র নেই।
বাকরুদ্ধ অতসী হতবিহ্বল, এক লহমায় পাল্টে গেছে পৃথিবী। পুরানো সব ধারনা মুছে সামনে এক অচেনা জগত। যমালয় থেকে ফিরে আসা জীবন্ত মানুষের মত দেখছে নতুন দুনিয়া। কুণ্ডলী খোলা পটের মত ভাসছে অতীত। এই গা ছমছমে শালবনের পথ এই নদী এই রেলপুল তার কত পরিচিত, সাবলীল, স্বচ্ছন্দ। আর পুলের তলায় যে লালু ঝড় সামলে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে সে তো তার সহপাঠী। ঢ্যাপসা প্যান্ট পরা তেলেমাথা মুখচোরা ছেলেটা বরাবর বসত পিছনের সারিতে। সেখ পাড়ার ধুনুরীর ছেলের হিম্মত হত না সামনে তাকানোর। সেথা অলিখিত সংরক্ষণ বাবু বাড়ির। স্যারের বাঁপাশে দুটো বেঞ্চ মেয়েদের। সেখানে সামনের সিট অতসীর, পাশে বান্ধবী আয়েসা, কাজী সাহেবের মেয়ে। প্রাথমিকে ওরাই বরাবর প্রথম, দ্বিতীয় হত, পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল লালু।
ক্যাবলা ছেলেটার মুখে আচমকা আলো পড়ল বার্ষিক ফলাফলে।অধীর অপেক্ষা শেষে টাঙানো হল তালিকা। আর অবাক্ কাণ্ড, অতসী এবার দ্বিতীয়, প্রথম স্থান ফাঁকা। খোঁজ খবরে জানা গেল ফিস্ বাকি থাকায় নাম ওঠেনি লাল মহম্মদের। সেই প্রথম অতসীর হার, তাও আবার পিছনের সারির লালুর কাছে। মন থেকে মানতে পারেনি অতসী। তবে ছাত্রমহলে খাতির বাড়ে লালুর, স্নেহের দৃষ্টি স্যারেদের। কিন্তু লালু নিস্পৃহ , নিরুত্তাপ। তার বিচরণ সেই পিছনেই।
ক্লাসে ছেলেদের সর্দার ধনীর দুলাল সুদর্শন রাকেশ, সেই মনিটর। সাদাসিধে লালুকে কেউ আমল না দিলেও রাকেশ সমীহ করে তার প্রতিভাকে। অতসীর আধিপত্য খর্বের যোগ্য হাতিয়ার সে। তাকে আরো কার্যকর করতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে টেনে নামায় রাকেশ। প্রয়োজনীয় বইপত্র সেই জুটায়।
শুধু পড়াশোনায় নয় অতসী অপ্রতিদ্বন্দ্বী আবৃত্তি গান ও সঞ্চালনে। রাকেশ চায় তার দেমাক ভাঙতে। নিমরাজি লালুকে পটিয়ে পাটিয়ে পাঠায় আবৃত্তি প্রতিযোগিতার মঞ্চে। জীবনে প্রথম ভরা হলঘরে মুখচোরা ছেলে অস্বস্তিতে ঘামতে থাকে। ক্লাসে ভাল হলেও এখানে সে ডাহা ফেল। চোখ নামিয়ে ঝড়ের বেগে মুখস্থ বলে হাজার টিটকারির মাঝে মঞ্চ ছাড়ে। মুখ টিপে হাসে মেয়েরা। ঠোঁট উল্টে নিজের মুন্সিয়ানা জাহির করে অতসী। রাকেশ হাত কামড়ায়।
তমাল নদীতে জল খেতে খেতে ঘর বাহির চিনতে শিখেছে লালু। জন্মেছে মান অপমান বোধ। তবু স্বভাবগত ভাবে সে নির্লিপ্ত, শান্ত। তথাপি সেদিনের তাচ্ছিল্য বিষাক্ত কাঁটার মত গেঁথেছে তার বুকে। তাই নিবিড়ভাবে শুরু আগামীর প্রস্তুতি। তার পিছনে পূর্ণ সহযোগ রাকেশের।
শুক্লপক্ষের চন্দ্রকলায় বাড়ে এই বয়সটা। ছেলেরা সিগারেটে টান দেয়, মেয়েদের মন সাজগোজে। এই সন্ধিক্ষণে এলো জেলার আবৃত্তি প্রতিযোগিতা । সবাইকে অবাক করে এবার বিজয় মঞ্চের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে লালু। একটা একটা করে মুকুট হারিয়ে ফুঁসছে অতসী, মুসড়ে পড়েছে ছাত্রীরা। আর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ভেদে উজ্জীবিত রাকেশ ও দলবল। কিন্তু লালু সেই শীতল নির্জীব।
পরের দিন অতসী ইস্কুল প্রাঙ্গণে পা পিছলে পড়ে যায়। হো হো করে হেসে উঠে দাঁড়িয়ে থাকা রাকেশ ও সঙ্গীরা। অভিযোগ যায় সোজা বড় স্যারের টেবিলে। ডাক পড়ে রাকেশ, লালু সহ পাঁচ জন আর অতসীর। ছড়ি হাতে স্যার একে একে সাবার কথা শুনেন। শুধু লালুকে কিছু না বলেই ছেড়ে দেন। বাকিরা যখন বেরিয়ে আসে সবার মুখ থমথমে কাল। এবার শুধু হার নয় কঠোর তিরস্কারে ক্ষেপে যায় অতসী। গুমরাতে থাকে রাকেশ। লালুর বাড়বাড়ন্তে হিংসায় জ্বলতে থাকে তারা।
তারপর সমাজ জীবনে এলো কালো দিন। কোথায় এক মসজিদ ভাঙা হল তো গাঁয়ে গাঁয়ে ছড়ালো বিদ্বেষ ঘৃণা হিংসা । লালুর বাবা লেপ বানাতে গিয়ে হারিয়ে গেল চিরতরে। পড়া বন্ধ হল লালুর। বাবার পেশা নিয়ে হতভাগ্য মেধা ঘুরে পাড়ায় পাড়ায়।
অতসী তখন কলেজে। সেদিন দুপুরে সে ফিরছে একা। কানে গোঁজা হেডফোন।মাথা দুলিয়ে হেঁটে চলছে রেলপুলে উঠবে বলে। উলঠো দিক থেকে আসছে লালু, দৃষ্টি তার দিকে। পিছিয়ে যাওয়ার ইশারা করে দ্রুত এগিয়ে আসছে সে। তাকে ভ্রূক্ষেপ না করে পাশ কাটানোর চেষ্টায় অতসী। জাপটে ধরে লালু তাকে টেনে নামায় লাইনের বাইরে। নিজেকে সামলে এক রামধাক্কায় লালুকে ঠেলে দেয় নিচে। খুলে যায় হেডফোন। টাল সামলাতে না পেরে নিজে পড়ে যায় মাটিতে। পিছনে তখন বিকট শব্দ। দুরন্ত গতির ট্রেন পাশ ঘেঁষে উঠে রেলব্রিজে। খিলখিলিয়ে হাসে জীবন নদীর ঢেউ।





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।