বেকারত্বের জ্বালা - মঽম্মদ ফারুক

27th April 2020 ছোটগল্প
বেকারত্বের জ্বালা - মঽম্মদ ফারুক


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ০৬

গল্প - বেকারত্বের জ্বালা

লেখা-  মঽম্মদ ফারুক

সকাল আটটা রহিম ঘরের মধ্যে বসে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলো। হঠাৎ শুনতে পেল বাইরে থেকে এক বয়স্কা মহিলার গলা। মহিলাটি রহিমের মা কে জিজ্ঞেস করছে তোমার ছেলে কি করে? রহিমের মা বলল ও তো এই সবে অনার্স কমপ্লিট করে চাকরির জন্য চেষ্টা করছে। বয়স্ক মহিলা টি তার উত্তরে বলল ও তার মানে বেকার এত বড় ছেলে এখনো কিছু করে না। কথাটা শুনে রহিমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কেপে উঠলো এবং সে নিজেকে খুব অসহায় মনে করতে লাগল এবং হীনমন্যতায় ভুগতে লাগলো। তখন ঐ মহিলাটি বলল যে আচ্ছা তাহলে তোমাদের সংসার চলে কি করে? রহিমের মা উত্তরে বলল সে ওই রহিম কিছু টিউশনি পড়ায়,রহিমের বাবা সবজি ফেরী করে। তাতেই মোটামুটি খেয়ে পরে চলে যায়। এইভাবে ওই বয়স্ক মহিলা রহিমের মায়ের সাথে গল্প করতে লাগলো।বাড়িতে যেই আসুক একই কথা বলে। এইভাবে রহিমের দিন চলতে থাকে।
স্কুল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা, ক্লার্কশিপ পরীক্ষা সমস্ত রকম কম্পিটিটিভ পরীক্ষা গুলো দিতে থাকে ।মাঝে মাঝে এমন হয় ওই কম্পিটিটিভ পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের পয়সাটা তো জোটে না। এভাবে অনেক পরীক্ষায় সে বসতেও পায়না। এইভাবে সে একদিন এসএসসি পরীক্ষায় অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার পদে পাস করল। টেট ,সাবজেক্ট ,ইন্টারভিউ সব পাস করার পর লিস্টে তার নাম এলো। সে ভাবল হয়তো এবার তার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। কিন্ত সে জানতো না বিধাতা তার কপালে সুখ কোনদিনও লেখেনি। অনেকদিন হয়ে যাওয়ার পরও সে কাউন্সেলিংয়ে ডাক পেল না। কোন এক অজানা কারণে সে কাউন্সেলিংয়ে ডাক পেলো না কিন্তু তার আগের রেঙ্ক পর্যন্ত কাউন্সেলিং হলো। কিন্ত রহিম এবং তার পরিবার আশায় বুক বেঁধে রইলো যে পাস যখন করেছে চাকরী তখন ঽবেই।কিন্ত পাঁচ বছর কেটে গেলেও চাকরী হলোনা।আবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার এর বিজ্ঞপ্তি বেরোলো।কিন্তু এবার আর রহিম এসএসসি পরীক্ষায় বসতে পারবেনা কারণ তার বিএড করা নেই। এবছর থেকে স্কুল সার্ভিস কমিশন রুলস করেছে যে বিএড ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ফরম ফিলাপ করা যাবে না। রহিম বিজ্ঞপ্তি দেখে হতাশ হয়ে গেল তার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তার সমস্ত স্বপ্ন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল ।সে বুঝে গেল তার এতদিনের নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে লড়াই করে পড়াশুনা করা আজ বিফল হয়ে গেল। অনেক ছোটবেলাতেই রহিমের পড়াশোনা শেষ হয়ে যেত কিন্তু সে নিজের জেদ এর উপর পড়াশুনা চালিয়ে গেছে তার বই-খাতা ঠিকমতো ছিল না। সে যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল তখন তার কাছে একটা বইও ছিল না। তার এক সিনিয়র দাদার কাছে বইপত্র দুই সপ্তাহের জন্য ভাড়া নিয়ে এসে পড়েছিল। তাতে খুব ভালো ফল না হলেও সে 74 শতাংশ নাম্বার তুলেছিল। এভাবেই তার পড়াশোনার চলতে থাকে। মাঝে মাঝে তার এমন অবস্থা হয় যে পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকাও সে জোগাড় করতে পারে না বন্ধুদের কাছে ধার নিয়ে সাহায্য নিয়েছে ফরম ফিলাপ করে এভাবেই তার পড়াশোনা চলতে থাকে। এভাবেই লড়াই করে সে মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট করে। মাস্টার ডিগ্রী কমপ্লিট করার সময় তার খরচা যোগানোর জন্য সে পার্ট টাইম একটা দোকানে কাজ করতো। এখন বিএড করা ছাড়া তার জীবন বেকার ।তার স্বপ্ন অসম্পূর্ণ হয়ে রয়ে যাবে। বিএড করার মত এত টাকা সে জোগাড় করতে পারবে না। সে ভালো করেই জানে তার আত্মীয়-স্বজনরা টাকাপয়সা থাকা সত্ত্বেও ,প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্বেও তাকে কোন প্রকার সাহায্য করবে না তাই সে কারো কাছে হাত পাতলো না। এভাবে তার বয়স বাড়তে লাগল । চাকরির বয়সও প্রায় শেষ। এমন সময় তার বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো। বাবাকে ভালোমতো চিকিৎসা করানোর মতো তার কাছে কোন টাকা পয়সাই ছিলো না। রহিমের আত্মীয়-স্বজনরা কেউ তার বাবার চিকিৎসার ব্যাপারে কোন প্রকার সাহায্য করল না ।একদিন হঠাৎ রহিমের বাবা মারা গেলেন। মারা যাবার আগের দিন অবধি অশ্রুসজল চোখে রহিম কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তো চাকরিটা হবে তো বাবা ? এখন রহিম সম্পূর্ণভাবে অসহায় হয়ে গেল, অনাথ হয়ে গেল, বেকার হয়ে গেল। উপরন্ত রহিমের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন সবাই বলতে লাগল রহিম ওর বাবাকে চিকিৎসা করাই নি তাইতো ওর বাবা মারা গেলো। ছেলেটা একদম ফালতু। রহিম আর এসব গঞ্জনা সহ্য করতে পারলো না। সে ভেবেই নিল যে পৃথিবীটা হয়তো তার সুখের জন্য নয় ।এই পৃথিবী থেকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় নেওয়া যায় ততই ভালো। সে মনে মনে বলে উঠল আমি আর পারছিনা আমি আর পারছিনা। তারপর একদিন হঠাৎ রহিমের মায়ের কাছে খবর এলো যে রহিম আর নেই, ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে।
.................... সমস্ত গল্পটি পড়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। এই গল্পটি পড়ার সাথে সাথে আমাদেরকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে .................... এই গল্পটির মাধ্যমে আমি কিছু বিষয় বর্তমান সামাজিক কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি মাত্র।
১)কোন ছাত্র যদি রেজাল্ট খারাপ করে আমরা বলে দিই ছেলেটা খারাপ ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো না। কিন্তু তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা আমরা একটু জানার চেষ্টা করি না বা তাকে সাহায্য করার কোন চেষ্টাই করিনা কিন্তু সে পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ করলে আমরা তাকে খারাপ ছেলে বলি বলি ও ফাঁকিবাজ বলে তাকে সবার সামনে অপমান করে বসি।
২)আবার কোন বেকার ছেলেকে দেখে বলি এ বেকার ,এর কোনো যোগ্যতা নেই তাই ও চাকরি পায়নি ।এটাও জানার চেষ্টা করি না, তার চাকরি না পাওয়ার পিছনের কারণ গুলো ,আমরা জানার চেষ্টা করি না সে কেন চাকরি পাচ্ছে না ? সাহায্য করা তো দূরে থাক আমরা তাকে ছোটো করে দেখি।
৩)বেকারত্ব যে কত বড় অভিশাপ কত বড় যন্ত্রণার আর সেটা একজন বেকার ভালো বোঝে। তাই কোন বেকারকে এইভাবে মানসিক কষ্ট দেবেন না । ক্ষমতা থাকলে তার পাশে দাঁড়ান ,তাকে সাহায্য করুন ,তার আত্মবিশ্বাস কে বাড়িয়ে তুলুন।
৪)বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের সবথেকে বড় সমস্যা হচ্ছে বেকার সমস্যা , তাই এই সমস্যা দূর করার জন্য প্রত্যেক ভারতবাসীকে উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে হবে।
এছাড়াও কোন গরীব মেধাবী ছাত্র অর্থনৈতিক কারণে যাতে তার পড়াশোনা শেষ না হয়ে যায় তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে না যায় তার জন্য আমাদের প্রত্যেককে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এই গল্পের রহিমের মতো কোটি কোটি রাম-রহিম শেষ হয়ে যাচ্ছে। রহিম এর মত অন্য কারো অবস্থা যেনো না হয় অকালে যাতে কাউকে প্রাণ না দিতে হয় ,সে ব্যাপারে আমাদের সকলকে উদ্যোগ নিতে হবে।





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।