বোবা বাঁশি - তামস চক্রবর্তী

22nd May 2020 5:36 pm ছোটগল্প
বোবা বাঁশি - তামস চক্রবর্তী


ছোটগল্প প্রতিযোগিতা - ১৬

 

বোবা বাঁশি

তামস চক্রবর্তী

মেঘ পাহাড়ি গ্রামের পারাং নদীর গা ঘেঁষে ছিল হারাধন বেসরার দোচালা কুঁড়ে ঘর । বরেন তার মা মরা একমাত্র ছেলে ।সে অনেক দিন আগের কথা ,বরেন তখন বছর একুশের তরতাজা যুবক ।হালকা শ্যামবর্ণ মাথায় এলোমেলো কোঁকড়ানো চুল । পেটানো শরীর ।কোদাল কাঁধে মাঠে যাওয়ার সময় মাথার হলদে গামছার পাগড়ীতে গোঁজা থাকত একটা নীল রঙের আড় বাঁশি ।অপূর্ব বাজাতো ছেলেটা ,অনন্ত বেদনাময়একটা করুণ 

কান্না যেন ঘুরে বেড়াতো চারপাশে । আশেপাশের পাঁচ গাঁয়ের মানুষ বরেনের বাঁশির সুর ঠিক চিনে নিতে পারতো । 

সে বারই তো গাঁয়ের রঞ্জন মাস্টার পারাং এর পাড় ধরে স্কুলে যাওয়ার পথে বরেনকে ডেকে বলেই ফেললেন- ' বরেন, এ বাঁশি তুই ছেড়ে দে, কেন বাজাস তুই এতো করুন সুর ,কিসের এতো দুঃখ তোর? তার চেয়ে স্কুলে ফিরে চল । নীরবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল বরেন,কিছু বলতে পারেনি ।একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে।

এক সময় রঞ্জন মাস্টারের স্কুলের সেরা ছাত্র ছিল সে।বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে ।এক অজানা শূন্যতায় শরীরটা কেঁপে ওঠে । পারাং এর পাড় ঘেঁষে নুইয়ে পড়া চালতা গাছের ছাওয়ায় ঠায় দাঁড়িয়ে পড়েন মাষ্টার মশাই ,ঘড়ির কাঁটায় সময় ধরে চলা রঞ্জন রায় । বরেনের সরল নিষ্পাপ, ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখ আর ছল্ ছল্ করে ওঠা চোখের দিকে তাকিয়ে একটা বুক ভাঙা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে । এক নিবিড় স্নেহে বরেনকে কাছে ডেকে মাথায় গায়ে হাত বোলান । স্নেহের পরশে হু হু করে কেঁদে ওঠে বরেন  । চোখ ফেটে জল আসতে চায় রঞ্জনের, ছাত্র অন্তঃপ্রাণ মাষ্টার মশাই, ভালোবাসতে জানেন ।

কয়েকটা মহুর্ত কেটে যায়, ছাত্রের হাত ধরে অন্তহীন বেদনায় গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে আস্তে আস্তে বলেন,-'বাজা না বাবা বাজা সেই গানটা,যেটা একটু আগেই তুই বাজাচ্ছিলি ওই যে' - খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে '। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বরেনের, বাধ্য ছেলের মতো তার প্রিয় নীল বাঁশিটায় সুর তোলে , নির্জন পারাং এর ঘাট আদ্র হয়ে ওঠে সুরের যাদুতে । চালতা গাছের তলায় ভিজে মাটির উপর বসে মাষ্টার মশায়ের অনুরোধে বরেন বাজিয়ে চলে একের পর এক সুর-রাগ,সুরের নেশায় যেন পাগল হয়ে ওঠে দুজনেই, কতটা সময় কেটে গেছে খেয়াল হয় নি ,শুধু সুরের মূর্ছনায় নির্জন পারাং এর নিথর জল কেঁপে কেঁপে ওঠে । 

হঠাৎই বাঁশি থেমে যায় বরেন চমকে ওঠে, কঠিন অঙ্কের সহজ সমাধান করা কড়া শিক্ষক রঞ্জন রায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে । বরেনের নিষ্পাপ চোখেও অশ্রুপ্লাবন । 

মাষ্টার মশাই ধুতির খুঁটে চোখ মুছে বরেনের বাঁশি টা চেয়ে নেয়, ডুকরে আসা দীর্ঘশ্বাস চেপে নীল রঙা বাঁশিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন । কি যেন খোঁজেন  ।আলতো করে হাত বুলিয়ে বাঁশি টা মুখের কাছে তুলে ধরে নিজেই একবার বাজানোর চেষ্টা করেন। ফুঁ দেন ,কিন্তু সুর ওঠে না।বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেন ।ব্যর্থ হন। নিষ্পলক চোখে বরেনের দিকে তাকান।তারপর হঠাৎই তীব্র আক্রোশে বাঁশিটা ছুঁড়ে দেন নদীর জলে।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়ে বরেন। ক্ষনিকের মধ্যেই সম্বিত ফেরে, দ্রুত নদীতে লাফিয়ে পড়ে সে । ক্ষীণ স্রোতা পারাং, এক বুক জল ,খুব বেশি বেগ পেতে হলো না ,একটু খানি সাঁতরে বাঁশি টা তুলে আনে বরেন । ভিজে সপ্ সপে শরীর, মুখে এক মুখ হাসি , যেন যুদ্ধ জয়ের বিজয়ী সৈনিক ।

মাষ্টার মশাই পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে, তিতিরের মতো ঘন কালো চোখে বিশ্বের প্রশান্তি ।কি যেন বলতে গিয়েও গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না, শুধু ঠোঁট দুটো বার কয়েক কেঁপে উঠল । গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্কুল পালানো ছেলের মতো বাড়ীর পথ ধরে ফিরতে থাকেন অঙ্কের মাষ্টার মশাই । সেদিন গোধুলির আবছা আলোয় বাড়ী ফেরে বরেন।

 

তারপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে,  রঞ্জন মাস্টারকে আর কেউ কখনো স্কুলে যেতে দেখেনি । বরেনও আর কোনোদিন সুর তোলেনি । শত অনুরোধেও শুধু ম্লান হাসে বরেন । মাথা নাড়ায় ।  নির্বাক বরেনের হৃদয়ে সুর ওঠে,কান্না আসে । এখনো মাঠে যাওয়ার সময় মাথার হলদে গামছায় গোঁজা থাকে তার সেই প্রিয় নীল বাঁশিটা।,যা আর কোনোদিন   সুর তোলেনি এক বুক দীর্ঘশ্বাসের মতো।মাঝে মাঝে বাঁশিটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে বরেন,দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে । তারই মতো বাঁশিটাও যেন বোবা হয়ে গেছে ।।





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা ১ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।