কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত

1st July 2020 11:57 am প্রবন্ধ
কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত


প্রবন্ধ :- "কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত"
লেখক :- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
******
প্রখ্যাত কবি, নাট্যকার, অনুবাদক, বহু ভাষায় বিদ্বান , বাংলা সনেটের জন্মদাতা মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিরোধান দিবসে প্রণাম জানিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ করি বিদগ্ধ কবিকে।
ভারত বা বিশ্ব ধন্য হয়েছিল মাইকেল মধুসূদনের মতো একজন প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক,কবি,নাট্যকারকে পেয়ে। যিনি দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন পরিচয়। জন্ম দিয়েছিলেন "বাংলা সনেটের"। প্রচলিত বাংলা কাব্যছন্দকে নবীন রূপ দিয়ে সাহিত্য জগতকে দিলেন এক চমৎকার আধুনিক ছন্দ যার নাম "অমিত্রাক্ষর ছন্দ"।
১৮২৪ খ্রী. মধুসূদন দত্ত বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার সম্ভ্রান্ত দত্ত পরিবারে জন্ম নেন। মেধাবী মধুসূদন দত্ত বাল্যকাল থেকেই নূতন নূতন খোঁজে উৎসাহ রেখে এবং আধুনিক ইউরোপীয়ান বিচার ধারায় জীবন যাপন করা পছন্দ করতেন।
বাংলা, ইংরাজী, সংস্কৃত, পার্সী ভাষায় অসাধারন পারদর্শী এবং জ্ঞানী ছিলেন মধুসূদন দত্ত।
দত্ত পরিবার যশোর থেকে কলকাতায় এসে বসবাস কালে মধুসূদন দত্ত কলকাতা হিন্দু কলেজে পড়াশুনা করতেন। পাশ্চাত্য জীবন শৈলীকে পছন্দের কারনে মধুসূদন দত্ত খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে "মাইকেল" উপাধী ধারণ করলেন। সামাজিক এবং ধার্মিক মতবাদের বিরুদ্ধ প্রতিফলে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ওনার পরিবার এবং সমাজ বহিষ্কার করে। যার জন্য মধুসূদন দত্তকে পিতার সংসার ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। শুধু তাই নয়, কলিকাতা হিন্দু কলেজে অহিন্দু অথবা খ্রীষ্টানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকার জন্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে কলকাতা হিন্দু কলেজ থেকেও বহিষ্কার করা হয়। বাধ্য হয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলকাতায় ব্যাপ্টীস কলেজে ভর্তী হলেন। প্রচণ্ড আর্থিক অভাব অনটনের জন্য মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যাপ্টীস কলেজেও পড়াশুনা অপূর্ণ রেখে সুদূর মাদ্রাজ এ (বর্তমানে চেন্নাই) চলে যেতে বাধ্য হলেন এবং মাদ্রাজ অরফান আশ্রম স্কুল থেকে অধ্যয়ন পূর্ণ করে ঐ সংস্থাতেই শিক্ষকতা শুরু করলেন। প্রচণ্ড আর্থিক অনটণে দিশা হারা মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিন্তু সাহিত্য চর্চা করতে ছাড়েননি। ইংরেজী ভাষাতে ওনার প্রথম কবিতা "Captive lady and visions of the past." এর প্রকাশন হয়। দিশাহীন এবং আর্থিক দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এবং ইংরাজী ভাষায় সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাদ্রাজ থেকে ইউরোপে পারী দিলেন। কিন্তু, পরবর্তী কালে উনি লন্ডন, ফ্রান্স সহ আরও অনেক ইউরোপীয়ান দেশ পরিভ্রমণ করে আবার কলকাতাতেই ফিরে এলেন। বাংলা সাহিত্যের শোচণীয় অবস্থা দেখে দুঃখিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজের অত্যন্ত আর্থিক দুর্গতি থাকা সত্যেও বাংলা সাহিত্যকে পুনরুদ্ধার করার জন্যে আরম্ভ করলেন বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা। শুরু করলেন সংস্কৃত ভাষাতে লেখা মহাকাব্য গুলির বাংলা অনুবাদ দিয়ে। ওনার রচিত প্রথম নাটক " শর্মিষ্ঠা "। তারপর একের পরে এক রচনার প্রকাশন - "একেই কি বলে সভ্যতা", "বুড়ো শালিখের ঘাড়ে রো" , "মেঘনাদ বধ", "কৃষ্ণ কুমারী", "ব্রজঙ্গনা কাব্য "।
জীবনের শেষ সময়ে রচনা করলেন "মায়া কানন "।
মাইকেল মধুসূদন বাংলাভাষা এবং বাংলাদেশকে কত শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালবাসতেন সেটা ওনার রচিত " কপোতক্ষ নদ " কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায় :-
"সতত,হে নদ,তুমি মনে পড় মোর মনে,
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে,
সতত(যেমতি লোক নিশারী স্বপনে
শোনে মায়া মন্ত্র ধ্বনি ) তব কল কলে
জুড়াই আমি দেখিয়াছি বহু নদ - দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ স্রোতরূপী তুমি জন্মভূমি স্তনে।
আর কি হবে দেখা ? যত দিন যাবে,
প্রজারূপে রাজরূপে সাগরেরে দিতে
বারি - রূপ কর তুমি, এ মিনতি, গাবে,
বঙ্গজ জনের কানে, এ প্রবাসে মজি প্রেম ভাবে
লইছে যে নাম তব বঙ্গের সংগীতে"॥
-------------------------
আবার লন্ডন ত্যাগ করার সময় লিখেছেন -
"Forget me not, O Mother,
Should I fail to return
To try hallowed bosom.
Make not the lotus of memory
void of its nectar Madhu."

গোপাল চন্দ্র মুখার্জী





Others News

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক


প্রবন্ধ :-  "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" 
লেখক :-  ডঃ .গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
                         ***
     "জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ "
                             * 
   " স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার, যেটা আমি নিয়েই ছাড়ব।"  পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সিংহের রাজত্বকালে সর্বপ্রথম গর্জে উঠেছিলেন এক নির্ভিক ভারতীয় সিংহ,যিনি একাধারে বিদ্বান, অর্থলোভমুক্ত, ত্যাগী, সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিন্দু রাষ্ট্রবাদের জনক, লোকসেবক শক্তিমান পুরুষ, যাঁকে সর্বলোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" বলে সম্বোধন করে, তিনি হলেন বাল গঙ্গাধর তিলক (আসল নাম কেশব গঙ্গাধর তিলক, বিবাহের পরে ওনার স্ত্রীর বংশানুসারে " কেশব গঙ্গাধর "  নামের পরিবর্তিত হয়ে "বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে পরিচিত হলেন)। মহারাষ্ট্রের  চিক্কন গ্রামে ২৩/০৭/১৮৫৬  সালে ওনার জন্ম হয় এবং ০১/০৮/১৯২০ সালে বোম্বাই এ বর্তমানে ( মুম্বাই) ওনার দেহত্যাগ হয়।  
        ডীকান কলেজ থেকে বি.এ.পাস করার পরে উনি গভর্নমেন্ট " ল " কলেজ ( ইউনিভার্সিটী অফ বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে  "ল" পাস করেন, কিন্তু, অর্থ লোভমুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি , নিজেকে সমাজ  কল্যাণে সমর্পিত করেছেন, তিনি " ল " পাস করেও আদালতে ওকালতি না করে শিক্ষার প্ৰসারের জন্য স্কুলে শিক্ষকের চাকুরীতে যোগ দিলেন এবং ১৮৮০ সালে স্থাপনা করলেন " ন্যু ইংলীশ স্কুলের" । কিছু বছর পরে স্থাপনা করলেন    " ফারগুইজন " কলেজের। বিদ্বান, ত্যাগী,  সরল,  নিঃস্বার্থ পরোপকারে এবং সমাজের কল্যাণ সাধনে সমর্পিত নিরলস নির্ভিক স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়কে মহারাষ্টের লোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" নামে সম্বোধন করতে আরম্ভ করল। সেই থেকে উনি "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে ভারতে তথা  বিশ্বে পরিচিত হলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা ছিল লোকমান্যের! স্বাধীনতার জন্য চলছে আন্দোলন কে তীব্র করার জন্য জনমত এবং  জনচেতনাকে জাগিয়ে তুলে সংবাদ আদান প্রদানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচলিত করেছিলেন " গনেশ উৎসব" এর । 
  ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র জনান্দোলন এবং আলোচনা করার জন্য ইংরেজ সরকার ওনার উপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ লাগিয়ে ৬ বছরের জন্য দেশের বাইরে করার আদেশ দিয়ে বর্মার মান্ডালে জেলে পাঠিয়ে দিল,  কিন্তু, কর্মতৎপর লোকমান্য তিলক মহাশয় জেলে বন্দী অবস্থায় রচনা করেছিলেন " গীতা রহস্য " এর। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে যখন উনি "গীতা রহস্য" এর প্রকাশণ করেছিলেন তখন ভীষণ জন আলোরণ তৈরী হয় সম্পূর্ণ দেশে। 
     নির্ভিক সাংবাদিক লোকমান্য তিলক দুটি সংবাদ পত্রের প্রকাশণ করেছিলেন - একটি ইংরাজীতে       " মারাঠা"  নামে এবং অপরটি মারাঠী ভাষায় "দৈনিক কেশরী" নামে। প্রকাশিত সংবাদপত্র গুলির মাধ্যমে লোকমান্য তীব্রভাবে ইংরেজ শাসনের নিন্দা এবং সমালোচনা শুরু করেছিলেন, যার জন্য ওনাকে প্রায়ই জেলে যেতে হত। স্বায়ত্ব বা সুশাসনের দাবী তুলে আন্দোলন চালিয়ে ১৯১৬ - ১৮ সালে  গঠণ করলেন "অল ইন্ডিয়া রূল লীগের"। ক্রান্তিকারী আন্দোলনের সমর্থক তিলক সম্পূর্ণভাবে গান্ধীজীর অসহযোগ অন্দোলনকে মেনে নিতে পারেননি। লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, এনী বসন্ত, মহম্মদ আলী জীন্নাহ  ইত্যাদি মহান ব্যাক্তিত্বের সংযুক্ত আন্দোলনে বিচলিত হয়েছিল ইংরেজ প্রশাসন। সম্পূর্ণ ভারতে তখনকার দিনের একটা বহুল প্রচলিত শ্লোগান ছিল "লাল বাল পাল "। বিখ্যাত তিন মহান ব্যাক্তিত্ব !
  ভারত মায়ের মহান সন্তান লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক। ওনার নাম আজ ও স্বাধীন ভারতবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে । 
  লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়ের শ্রীচরনে জানাই আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ।