লাল গোলাপ --- তারিফ আলম

7th July 2020 9:52 am তারিফ আলম
লাল গোলাপ --- তারিফ আলম


লাল গোলাপ

লেখা - তারিফ আলম

 

নিলু জিদ ধরেছে পার্কে এর মধ্যে যাবে । মিতালী একটু রেগে গিয়েই বকান দিল ছেলে নিলুকে , “ কিছু বলা হয় নি বলে একদম মাথায় উঠে গিয়েছ , চুপ করে গাড়ির মধ্যে বসে থাকো , এমন করলে আর কোথাও নিয়ে যাব না তোমায় “।
নিলু কাঁদো কাঁদো হয়ে এবার বাবার কাছে আবদার ধরল পার্কে ঢুকার জন্য । দিঘা গিয়েছিল অজিত একটা বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে যোগদান করতে । সঙ্গে সহধর্মিণী মিতালী আর তাদের একমাত্র পুত্র মিনুকে সঙ্গে নিয়ে নিজস্ব মারুতি তে । মারুতি নিজেই চালাচ্ছিল অজিত রায় । ফেরার পথে এগরার কাছে রাস্তের ধারে একটা সুন্দর পার্ক দেখে সেই পার্কে প্রবেশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলো মিনু । ছেলের মন খারাপ দেখে অজিত মারুতি নিয়ে গিয়ে সেই পার্ক এর গেটের পাশে থামাল ।
মিতালী বিরক্তি প্রকাশ করে স্বামীকে বলল , “ ছেলে যা বলবে তোমাকে তাই করতে হবে , তুমি ছেলেটার স্বভাব খারাপ করে দেবে দেখছি “।
অজিত একটু হেসে বলল , “একটা মাত্র ছেলে , তার কষ্ট হতে দি কি করে । আমদের সাথে তুমিও চল পার্ক টা একটু ঘুরে আসবে “।
মিতালী রাগ দেখিয়ে বলল “ আমি যাব না , তুমি তোমার ছেলে কে নিয়ে বেড়িয়ে আসো । আমি গাড়িতেই বসবো “।
অজিত আর কথা না বাড়িয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে পার্ক এর মধ্যে চলে গেল । মিতালী গাড়ি থেকে বেড়িয়ে দাঁড়িয়ে জায়গাটা দেখছিল । এমন সময় দেখল পার্ক এ প্রবেশ পথের পাশে একটা লোক অনেক গুলো হাতে লাল গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । যে সব প্রেমিক – প্রেমিকা পার্ক এ প্রবেশ করছে তাদের হাতে একটা করে গোলাপ দিচ্ছে , কিন্তু কারো কাছে থেকে কোন মুল্য অর্থাৎ টাকা নিচ্ছে না ।
মিতালী একটু পাশে গিয়ে লোকটাকে ভালো করে লক্ষ্য করলো , অনেক টা পাগলের মত চেহারা , মাথায় বড় বড় চুল , মুখ বড় দাড়িতে ভরা , জামা কাপড়ও ময়লা আর কয়েক জায়গায় ছেঁড়া ।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক এর কাছে মিতালী কৌতূহল বশত জানতে চাইল ঐ লাল গোলাপ ফুল দেওয়া লোক টা কে ?
লোকটি বলল , ঐ যে গোলাপ ফুল দিচ্ছে সবাইকে বিনে পয়সায় , সেই ছেলেটি প্রতি রবিবার এই খানে অনেক গোলাপ নিয়ে কোথা থেকে আসে । দুপুর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বসে থাকে একা । মনে হয় যেন কারো জন্য অপেক্ষা করে । তারপর তার কাছে থাকা সব লাল গোলাপ ফুল গুলো যারা পার্কে প্রেমিক –প্রেমিকা প্রবেশ করে , তাদের হাতে দিতে থাকে । যখন সব লাল গোলাপ ফুল শেষ হয়ে যায় তখন সে চলে যায় ।
মিতালীর খুব অবাক লাগলো । ছেলেটি কি পাগল ? কার জন্যই বা সে অপেক্ষা করে ? কেনই বা সে লাল গোলাপ ফুল নিয়ে এসে বসে থাকে ?
মিতালীর মনে কৌতূহল দানা বাঁধল । একটু এগিয়ে গিয়ে ছেলেটিকে ভালো করে দেখতে চেষ্টা করলো । হটাত ছেলেটির দৃষ্টি মিতালীর উপরে পড়ল । কেমন যেন ছেলেটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিতালীকে দেখতে লাগলো । তারপর মিতালীর দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো । পাশে এসে মিতালীর হাতে একটা লাল গোলাপ তুলে দিতে গেল । এমন সময় অজিত এসে মিতালীকে সঙ্গে নিয়ে মারুতি তে এসে বসল । তাদের পার্ক এ ঘোরা শেষ হয়ে গিয়েছিল ।
অজিত গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে মিতালীকে জিজ্ঞাসা করলো ,” ঐ পাগল টা কি বলছিল “?
মিতালী মাথা নেড়ে বলল –“ কিছু না , একটা গোলাপ ফুল দিতে চাইছিল বোধহয় । ও পাগল নয় । এখানে প্রতি রবিবার এসে কারো জন্য অপেক্ষা করে , আর শেষে সব লাল গোলাপ ফুল গুলো সবাই কে দিয়ে চলে যায় “ ।
অজিত গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল । কিন্তু মিতালী দেখল গাড়ির পেছনে ঐ ছেলেটি ছুটে ছুটে আসছে । মিতালী অজিত কে গাড়ি থামাতে বলল । কিন্তু অজিত রেগে গিয়ে বলল , “পাগলরা এমনি গাড়ির পেছনে ছুটে । তার জন্য গাড়ি থামানোর কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না” ।
অজিত গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল । ছেলেটি গাড়ির পেছনে পাগলের মত ছুটতে ছুটতে হোঁচট খেয়ে খুব জোরে আছড়ে পড়ল মাটিতে । মাটিতে পড়ে একটা বিকট জোরে চিৎকার করে ডাক দিল ......পরী ..র..র.রররররর....রর
“ পরী “ শব্দ টা কানে যেতেই মিতালী আচমকা জোরে কেঁদে ওঠে ।
অজিত ভেবে পেল না মিতালী কেন এমন চিৎকার করে কেঁদে উঠল । গাড়ি সজোরে ব্রেক কসে থামিয়ে পিছনে বসা মিতালীর পাশে যেতেই দেখল সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে । অজিত দ্রুত গাড়ি চালিয়ে মিতালীকে নিয়ে বেলদার একটি নারসিংহোম এ এনে ভর্তি করলো ।
******************
................... পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মিতালী দেখল সে নার্সিং হোমের ব্যাডে শুয়ে আছে । গত কাল নার্সিং হোম এ আনার পর জ্ঞান ফিরেছিল । তারপর মিতালীর মধ্যে চঞ্চলতা লক্ষ্য করে ডক্টর ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন । তাই একটু দেরি করে ঘুম ভেঙ্গেছে ।
মিতালী শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো ...... ‘পরী ‘ , হ্যাঁ এই নামেই তো তার প্রথম ফেসবুক প্রোফাইল ছিল । সবে মাত্র উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছিল খুব ভালো নাম্বার পেয়ে । তাই বাবা খুশি হয়ে একটা দামি মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন । ফেসবুক এ নিজের নাম না দিয়ে পরী নাম দিয়েছিল । কারন বাবা জানলে মোবাইল নিয়ে নেবেন । আর প্রথম দিন ই ফেসবুকে পরিচয় হয় অঞ্জন এর সঙ্গে । অঞ্জন একটা কোম্পানিতে কাজ করত । খুব ভালো ছেলে । তার সাথে রোজ ম্যসেঞ্জারে চেট করত । সারাদিন একে অপরকে কি কি কাজ করতো , কি খেত এই রকম সব কিছু নিজেদের মধ্যে শেয়ার করতো । সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে রাত্রে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত । তারপর ফোনেও তাদের কথা হতে লাগলো । এমনি এক মাস চলার পর একে অপরকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল । এক মুহূর্তও একে অপর এর কথা না ভেবে থাকতে পারত না ।
একদিন অঞ্জন বলে “ আমার শরীর খারাপ , আমি যদি মরে যায় তুমি দুঃখ পেয়ো না “।
সেদিন অঞ্জন এর কথা গুলো শুনে কেঁদে ফেলেছিল মিতালী । আর বলেছিল “ তুমি যদি মরে যাও আমিও মরে যাবো , আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না “।
সে দিন থেকে দুজনের ভালোবাসা আরও গভীর হয়ে গিয়েছিল । দুজনে বিয়ে করে সংসার করার স্বপ্ন দেখতে লাগলো । নিজেদের সন্তানদের নামও ঠিক করে নিয়েছিল তারা দুজনে ।
কিছু দিন পর তারা সিধান্ত নেয় দেখা করার । ঠিক হয় সামনের রবিবার মধুবনি নামক পার্ক এর সামনে দুজনে যাবে ।
অঞ্জন জিজ্ঞাসা করে “ তোমার জন্য কি নিয়ে যাবো “?
মিতালী বলেছিল “ শুধু লাল গোলাপ নিয়ে আসবে , আর কিছু না” ।
মিতালীর একটা অভ্যাস ছিল সে সারাদিন যা যা করতো তার ডাইরিতে লিখে রাখতো । রবিবার সকাল থেকে বেশ একটু সাজগোছ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল । অন্যদিকে টেনশনও ছিল । বেলদা থেকে বাসে এক ঘণ্টা লাগবে এগরা পৌঁছতে । অঞ্জনও কাথি থেকে এগরা এসে মধুবনি পার্ক এর সামনে অপেক্ষা করবে তার জন্য । মিতালী স্নান করতে ঢুকল । এদিকে মিতালীর মা অরুনা দেবী মেয়ের সাজগোছ দেখে সন্দেহ করলেন । মিতালীর বিছানার উপরে রাখা তার ডাইরি টা নিয়ে পড়তে লাগলেন আর সব জেনে গেলেন । সঙ্গে সঙ্গে স্বামী বিজেন বাবুকে গিয়ে জানিয়ে দিলেন । প্রচণ্ড রাগী মানুষ তিনি । মিতালী স্নান করে বেরোতেই বিজেন বাবু জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিলেন । মিতালী বাবাকে খুব ভয় করতো । বিজেন বাবু মেয়ের মোবাইল কেড়ে নিলেন এবং ঘরে প্রায় বন্দী করে দেন । মিতালী সেদিন আর যেতে পারে নি বা ফোন করে অঞ্জনকে জানাতে পারে নি কিছুই ।
বাবা তাকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে সাত দিনের মধ্যে নিজের বন্ধুর ছেকে অজিত এর সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন । মিতালী অনেক কেঁদেছিল অঞ্জন এর কথা ভেবে । বিয়ের পর মনে করেছিল – অঞ্জনও হয়তো তাকে ভুলে গিয়ে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে সুখে সংসার করছে । কিন্তু তার ধারনা যে ভুল তা প্রমান হয়ে গেল গতকাল । পাঁচ বছর ধরে তার জন্য একি জায়গায় অপেক্ষা করে রয়েছে অঞ্জন । উফ ......এই কি ভালোবাসা ? মিতালীর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো । সে আর দেরি করতে চায় না । সেলাইন এর সিরিঞ্জ টা হাত থেকে খুলে নিয়ে সবার অলক্ষে দ্রুত নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে রোড এ যাওয়া একটা এগরা গামী বাস কে হাত দেখিয়ে উঠে পড়ল ।
এক ঘণ্টার মধ্যেই বাস এসে থামল এগরাতে । মিতালী বাস থেকে নেমে প্রায় ছুটে পার্ক এর কাছে গেল । কিন্তু সেখানে অঞ্জনকে খুঁজে পেল না । তখন মিতালী পাশের চা দোকানের লোকদের জিজ্ঞাসা করলো অঞ্জন এর সম্পর্কে । তাদের মধ্যে একজন দূরে ভুসিলাম দোকানে একটা দশ বছর বয়সী ছোট ছেলেকে দিখিয়ে বলল “ ঐ ছেলেটার নাম সানু , ওই ছেলেটা ওর ভাইপো । “ এই বলে সানু নামের ছেলেটিকে ডেকে আনল মিতালীর কাছে ।
মিতালীর কাছে এসে ছেলেটি মিতালীকে ভালো করে দেখে বলল “ তুমি পরী?”
মিতালী মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বলল ।
ছেলেটি বলল আমার সঙ্গে আসো । মিতালী সানুর সঙ্গে হেঁটে চলতে থাকলো ।
জানো পরী , কাকু সারাক্ষন তোমার কথা আমাকে বলতো । তোমার ছবি সারা দিন দেখত । কখনও তোমার কথা ভেবে একা একা জোরে হেসে উঠত , আবার কখনও তোমার ছবি বুকে চেয়ে ধরে কাঁদতে থাকতো । আমি জিজ্ঞাসা করলে বলতো “ আমার পরী একদিন আসবে , দেখিস সানু আমার ভালোবাসার টানে সে আসবেই , সে খুব ভালো রে , সে আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না “।
মিতালী সানু কে জিজ্ঞাসা করলো – ‘ তোমার কাকু অন্য মেয়ে কে বিয়ে করে নি কেন”?
সানু বলল “ আমি তো জানি না , আজ থেকে পাঁচ বছর আগে নাকি এখানে এসেছিল , আর বাড়ী ফিরে যায় নি । আমার বাবা মা বাইক এক্সিডেন্ট এ মারা যায় দু বছর আগে । তখন কাকু আমাকে নিয়ে এসে নিজের সঙ্গে রেখেছেন” ।
তারা দুজনে চলতে চলতে একটা টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়ীর কাছে এসে দাঁড়ালো । মিতালী দেখল বাড়িটা বেশ ভাঙ্গাচোরা আর ছোট । বাড়ীর সামনের দিকে লাল গোলাপ ফুলের বাগান । কিন্তু কেউ সব ফুল গুলোকে নিষ্ঠুর ভাবে ছিরে ফেলেছে ।
গেট খুলতে খুলতে সানু বলতে লাগলো “ কাকু গতকাল পথে কোথাও পড়ে গিয়েছিল । মাথার অনেকটা অংশ ফেটে গিয়েছিল । কিন্তু ডাক্তার এর কাছে যায় নি । বাড়ী ফিরে এসে লাঠি দিয়ে সমস্ত গোলাপ ফুল এর উপরে আঘাত করতে লাগলো , ছিরে ফেলল সব ফুল । তারপর তোমার ছবি বুকে নিয়ে অন্ধকার ঘরের মধ্যে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো । আমি খাবার নিয়ে গেলও খেল না । রাতে কাকুর খুব জ্বর হল । শুয়ে শুয়ে জ্বরের ঘোরে শুধু পরী পরী বলছিল আর কাঁদছিল ।সকালে উঠে দেখি কাকু উঠে নি । অনেক ডাকলাম তাও উঠলো না । তাই আমি ডাক্তার এর কাছে গিয়েছিলাম । কিন্তু ডাক্তার বাড়ীতে ছিলেন না ।
মিতালী আর দেরি না করে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে । দেখল অঞ্জন শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে । চোখের কোনে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ । মাথায় ফাটা অংশ তে এখন রক্তের দাগ লেগে আছে । মিতালী পাশে বসে অঞ্জন এর গায়ে হাত দিল । প্রচণ্ড গরম । জ্বরে প্রায় সারা শরীর যেন পুড়ে যাচ্ছে । আস্তে করে ডাক দিল - ‘ অঞ্জন , দেখ আমি এসেছি , তোমার পরী । অঞ্জন ......অঞ্জন ...”
অনেক কষ্টে অঞ্জন চোখ মেলে তাকাল , পরী কে দেখে তার মনের সকল আশা যেন পুরন হয়ে গেল । ঠোটে একটু হাসির রেখে । তাকিয়ে ছিল তার প্রিয় পরির দিকে .........চোখ দিয়ে শুধু একটু জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে । তাকিয়ে ছিল ......তার আর চোখের পাতা পড়ে না ......স্থির , নিথর ।
মিতালী ‘অঞ্জন’ “অঞ্জন’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে জোরে জোরে নাড়া দিতে লাগলো তার নিথর দেহকে । বহু দিন পর যেন আজ তার অতৃপ্ত আত্মা শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে ......... আর কোন দিনও সে জাগবে না ।





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?