গোস্বামী তুলসীদাস মহারাজ

28th July 2020 8:58 pm প্রবন্ধ
গোস্বামী তুলসীদাস মহারাজ


প্রবন্ধ :- " গোস্বামী তুলসীদাস মহারাজ "
লেখক :- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
*****
** জন্মতিথী উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলী **
জন্মলগ্ন থেকেই নিয়তীর নিষ্ঠুর পরিহাস বহন করে আবির্ভুত হলেন সর্বজন পূজ্য রামবোলা নাম থেকে তুলসীরাম এবং পরে বিশ্ববিখ্যাত হিন্দি ভাষী কবি, সাহিত্যকার, দার্শনিক, ধর্মসংস্কারক,পরমবৈষ্ণব , যিনি পরবর্তিকালে কাশীধামের পণ্ডিত মহলে "অভিনব বাল্মীকি " উপাধীতেও সম্মানিত হন এবং স্বামী রামানন্দ গুরু পরম্পরাগত, হনুমানদেবের কৃপালাভে ধন্য হয়ে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সাক্ষাৎ দর্শণ প্রাপ্ত গোস্বামী তুলসীদাস।
শ্রাবণের শুক্ল সপ্তমী তিথীতে মূল নক্ষত্র যুক্ত এবং ১২(বারো) মাস কাল মাতা হুলসীদেবীর গর্ভে থেকে পূর্ণদন্তপংতি নিয়ে পরিপুষ্ট শিশু রাম নাম উচ্চারণ করতে করতে জন্ম নেন এক অদ্ভুত বালক!। জন্ম লগ্ন থেকেই রাম নাম বলার বা নেবার জন্যে বালকের নাম রাখা হয় রামবোলা। নিয়তির নিষ্ঠুর লীলায় জন্মের ঠিক দুই দিন পরে মাতা হুলসীর মৃত্যু হয়। ভীত পিতা অশুভের আশংকায় অবোধ শিশু বালককে পরিত্যাগ করে চুনিয়া নামক এক দাসীকে দিয়ে দেন। কিন্তু, শিশু রামবোলার ভাগ্য বিরূপ,স্নেহ সুখ হীন। শিশু রামবোলা মাত্র সারে পাঁচ বছর বয়সেই হারাল তার একটা নিশ্চিত মমতাময় আশ্রয়, দেহত্যাগ করল পালিকা মাতা চুনিয়া। পিতার আশ্রয় থেকে বিতারিত অবোধ অসহায় শিশু বালক রামবোলার পথে পথে, দ্বারে দ্বারে ঘোরা এবং অপরের করূণার পাত্র হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই রইল না। ঠিক এই সময়ে রামবোলার জীবনে দেবদুত সম আবির্ভুত হলেন স্বামী রামানন্দ, উনি ছিলেন সাধক নরহরি বাবা মহারাজের শিষ্য। তিনি অবোধ, নিরাশ্রয় শিশু বালক রামবোলাকে উদ্ধার করে সঙ্গে করে নিজের আশ্রমে নিয়ে গেলেন। বালক রামবোলার নতুন নামকরণ করলেন নরহরি বাবা " তুলসী রাম "। দিলেন আশ্রয়, নিশ্চিন্ত জীবন, দিলেন শিক্ষা, করলেন বালকের উপনয়ন সংস্কার।
ছোট একটা ঘটনায় অথবা তুলসীরামকে প্রত্যাখ্যান করে দোহার মাধ্যমে পত্নী রত্নাবলীর দেওয়া উপদেশ থেকেই আবির্ভুত হলেন বর্তমানের পরমপূজ্য কবি, সাধক গোস্বামী তুলসীদাস।
বিবাহের অনেক বছরপর তুলসীরাম নিজের নিবাসে আনতে গেলেন পত্নী রত্নাবলীকে পিত্রালয় থেকে, তখন রত্নাবলী তুলসীরামকে প্রত্যাখ্যাত করে দোহার মাধ্যমে উপদেশ দিলেন :-
" অস্থি চর্মময় ইহ দেহ না এসী প্রীতি।
নেকু জো হোতী রাম সে তো কাহে ভয় ভীত॥ "
পত্নীর এই কথায় নীরবে ফিরে গেলেন তুলসীরাম। মগ্ন হয়ে নিমজ্জিত হলেন শ্রীরাম নামে। হনুমানদেবের অসীম দয়ায় দর্শণ লাভ করলেন শ্রীরাম চন্দ্রের। সুদীর্ঘ দুই বছর আট মাসের অক্লান্ত অধ্যবসায় এবং পরিশ্রমে রচনা করেছিলেন হিন্দী সাহিত্য জগতের অদ্ভুত কির্তী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা " রামচরিত মানস " এর। গোস্বামী তুলসীদাস রচিত রামচরিত মানসের খ্যাতীতে কাশীর পন্ডিত মহল ঈর্ষাগ্রস্থ এবং হিংস্র হয়ে পুস্তক রাম চরিত মানসের ক্ষতি করে নষ্ঠ করার প্রচেষ্টায় উদ্যমী হয়ে উঠল, ঠিক সেই সময়ের কাশীর বিখ্যাত এবং শ্রেষ্ঠ বিদ্বান পন্ডিত মধুসূদন সরস্বতী তুলসীদাস রচিত রামচরিত মানসের উপর মন্তব্য করে বলেন -
" কাশী কে আনন্দবন মে তুলসীদাস সাক্ষাৎ চলতা-ফিরতা তুলসী কা পৌধা হৈ। উসকী কাব্য মঞ্জরী বড়ী হী মনোহর হৈ, জিস পর শ্রীরাম রুপী ভ্রমরা ভন্ডরাতা রহতা হৈ॥ "
অর্থাৎ
" কাশীর আনন্দবনে তুলসীদাস একজন চলমান তুলসীগাছ। যার কাব্য মঞ্জরী বড়ই মনোহর, যাতে শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং ভ্রমর রূপে সর্বদা মজে আছেন"।
গোস্বামী তুলসীদাস রচনা করলেন - দোহাবলী, কবিতাবলী, হনুমানচালীসা , বৈরাগ্য ,সন্দীপনী, জানকী মঙ্গল,পার্বতী মঙ্গল আদি অনেকানেক কাব্য। কাশীতে ১২৬ বছরের আয়ুতে গোস্বামী তুলসীদাস যখন প্রচণ্ড শারীরীক কষ্টে কষ্ট পাচ্ছিলেন তখন হনুমান দেবের কৃপা দর্শণলাভ করেন এবং হনুমান দেবের নির্দেশানুসারে রচনা করলেন " বিনয় পত্রিকা " র। বিনয় পত্রিকা শ্রীরাম চন্দ্রের শ্রীচরণে অর্পণ এবং শ্রীচরণ স্পর্শ করে কাশীর আসীঘাটে দেহত্যাগ করেন গোস্বামী তুলসিদাস। বর্তমান সময়েও গোস্বামী তুলসীদাসের সরল এবং স্থানীয় ভাষায় রচিত কাব্য তথা সাহিত্যের সুদূর প্রসারী প্রভাবে প্রভাবিত ভারতীয় কলাশিল্প, সংস্কৃতি, সামাজিক জীবনশৈলী, তৈরী হয়েছে স্থানীয় ভাষায় রামলীলা নাটক, দূরদর্শণের জনপ্রিয় ধারাবাহিক, শাস্ত্রীয় সংগীত আদি। আজ শতশত বছর পরেও গোস্বামী তুলসীদাস মানুষের অন্তরে সশ্রদ্ধ অবস্থান করে পূজ্য।।





Others News

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক


প্রবন্ধ :-  "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" 
লেখক :-  ডঃ .গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
                         ***
     "জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ "
                             * 
   " স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার, যেটা আমি নিয়েই ছাড়ব।"  পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সিংহের রাজত্বকালে সর্বপ্রথম গর্জে উঠেছিলেন এক নির্ভিক ভারতীয় সিংহ,যিনি একাধারে বিদ্বান, অর্থলোভমুক্ত, ত্যাগী, সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিন্দু রাষ্ট্রবাদের জনক, লোকসেবক শক্তিমান পুরুষ, যাঁকে সর্বলোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" বলে সম্বোধন করে, তিনি হলেন বাল গঙ্গাধর তিলক (আসল নাম কেশব গঙ্গাধর তিলক, বিবাহের পরে ওনার স্ত্রীর বংশানুসারে " কেশব গঙ্গাধর "  নামের পরিবর্তিত হয়ে "বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে পরিচিত হলেন)। মহারাষ্ট্রের  চিক্কন গ্রামে ২৩/০৭/১৮৫৬  সালে ওনার জন্ম হয় এবং ০১/০৮/১৯২০ সালে বোম্বাই এ বর্তমানে ( মুম্বাই) ওনার দেহত্যাগ হয়।  
        ডীকান কলেজ থেকে বি.এ.পাস করার পরে উনি গভর্নমেন্ট " ল " কলেজ ( ইউনিভার্সিটী অফ বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে  "ল" পাস করেন, কিন্তু, অর্থ লোভমুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি , নিজেকে সমাজ  কল্যাণে সমর্পিত করেছেন, তিনি " ল " পাস করেও আদালতে ওকালতি না করে শিক্ষার প্ৰসারের জন্য স্কুলে শিক্ষকের চাকুরীতে যোগ দিলেন এবং ১৮৮০ সালে স্থাপনা করলেন " ন্যু ইংলীশ স্কুলের" । কিছু বছর পরে স্থাপনা করলেন    " ফারগুইজন " কলেজের। বিদ্বান, ত্যাগী,  সরল,  নিঃস্বার্থ পরোপকারে এবং সমাজের কল্যাণ সাধনে সমর্পিত নিরলস নির্ভিক স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়কে মহারাষ্টের লোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" নামে সম্বোধন করতে আরম্ভ করল। সেই থেকে উনি "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে ভারতে তথা  বিশ্বে পরিচিত হলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা ছিল লোকমান্যের! স্বাধীনতার জন্য চলছে আন্দোলন কে তীব্র করার জন্য জনমত এবং  জনচেতনাকে জাগিয়ে তুলে সংবাদ আদান প্রদানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচলিত করেছিলেন " গনেশ উৎসব" এর । 
  ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র জনান্দোলন এবং আলোচনা করার জন্য ইংরেজ সরকার ওনার উপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ লাগিয়ে ৬ বছরের জন্য দেশের বাইরে করার আদেশ দিয়ে বর্মার মান্ডালে জেলে পাঠিয়ে দিল,  কিন্তু, কর্মতৎপর লোকমান্য তিলক মহাশয় জেলে বন্দী অবস্থায় রচনা করেছিলেন " গীতা রহস্য " এর। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে যখন উনি "গীতা রহস্য" এর প্রকাশণ করেছিলেন তখন ভীষণ জন আলোরণ তৈরী হয় সম্পূর্ণ দেশে। 
     à¦¨à¦¿à¦°à§à¦­à¦¿à¦• সাংবাদিক লোকমান্য তিলক দুটি সংবাদ পত্রের প্রকাশণ করেছিলেন - একটি ইংরাজীতে       " মারাঠা"  নামে এবং অপরটি মারাঠী ভাষায় "দৈনিক কেশরী" নামে। প্রকাশিত সংবাদপত্র গুলির মাধ্যমে লোকমান্য তীব্রভাবে ইংরেজ শাসনের নিন্দা এবং সমালোচনা শুরু করেছিলেন, যার জন্য ওনাকে প্রায়ই জেলে যেতে হত। স্বায়ত্ব বা সুশাসনের দাবী তুলে আন্দোলন চালিয়ে ১৯১৬ - à§§à§® সালে  গঠণ করলেন "অল ইন্ডিয়া রূল লীগের"। ক্রান্তিকারী আন্দোলনের সমর্থক তিলক সম্পূর্ণভাবে গান্ধীজীর অসহযোগ অন্দোলনকে মেনে নিতে পারেননি। লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, এনী বসন্ত, মহম্মদ আলী জীন্নাহ  ইত্যাদি মহান ব্যাক্তিত্বের সংযুক্ত আন্দোলনে বিচলিত হয়েছিল ইংরেজ প্রশাসন। সম্পূর্ণ ভারতে তখনকার দিনের একটা বহুল প্রচলিত শ্লোগান ছিল "লাল বাল পাল "। বিখ্যাত তিন মহান ব্যাক্তিত্ব !
  ভারত মায়ের মহান সন্তান লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক। ওনার নাম আজ ও স্বাধীন ভারতবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে । 
  লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়ের শ্রীচরনে জানাই আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ।