প্ৰবন্ধ :- " দানবীর দয়ার সাগর - বিদ্যাসাগর "
লেখক :- গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
*********
দয়ার সাগর, মাতৃভক্ত , সমাজসংস্কারক পরম শ্রদ্ধেয় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তিরোধান দিবসে ওনার উদ্দেশ্যে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম এবং নিবেদন করি এই শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর , যতার্থ নামের মর্মার্থ !" ঈশ্বর" মানে পরম করুণাময় বিশাল উদার হৃদয় সম্পন্ন সৃষ্টিকর্তা, "চন্দ্র" - চাঁদের কোমল জোৎস্নার স্নিগ্ধতা যাঁর অন্তঃকরণ জুড়ে বিরাজিত, "বিদ্যাসাগর"- যাঁর আছে বিবিধ বিষয়ে অথৈ জ্ঞানের ভান্ডার, তিনিই তো ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।
মানুষের মনে যখন দয়ার স্রোত অপ্রতিহত প্রভাবিত হয় , তখন হয় ত্যাগের উদয়। মনে জাগে মানুষের উপকার করার বাসনা। সর্বস্য ত্যাগ করেও আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা। প্রয়োজন হলে ধার করে বা লগ্নী করে হলেও মানুষের উপকার করার প্রেরণা। স্রেফ এই নয় সার্বিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে ওনাকে সমাজ সহ উচ্চ প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য ব্যক্তিদের তির্যক বা আকারে ইঙ্গিতে অপমান সহ্য করতে হয়েছে , স্বয়ং ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র ও তার ব্যতিক্রম হন নি। বিধবা বিবাহের আইন প্রচলন করার প্রয়াসরত ঈশ্বর চন্দ্রের উদ্দেশ্যে তির্যক করে ওনার রচিত "বিষবৃক্ষ" উপন্যাসে পাত্রী সূর্যমুখীকে দিয়ে বলিয়েছিলেন " যে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা করে, সে যদি পন্ডিত হয়, তবে মূর্খ কে !" ইত্যাদি ইত্যাদি। সমাজের বিরোধিতা অপমান কোন কিছুই টলাতে পারে নি অটল সিদ্ধান্তের অধিকারী ঈশ্বর চন্দ্রকে। অনুরুপ, প্রশংসাও বিচলিত করতে পারেনি ঈশ্বর চন্দ্রকে! এই ঈশ্বর চন্দ্র সম্বন্ধে পরমহংস ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বলেছিলেন ওনার " সাগর দর্শন " হল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদার, স্নেহপূর্ণ হৃদয় বা নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করার মানসিকতাকে প্রত্যক্ষ অনুভব করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এরকম আরও অনেকে পেয়েছিলেন দয়াময়ী মায়ের মত স্নেহময় প্রাণের পরশ। যার জ্বলন্ত উদাহরণ ঈশ্বর চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় "বিদ্যাসাগর" মহাশয়।
ভারতবর্ষ তথা বাংলার ইতিহাসে আঠারশ এবং উনিশের দশক এক গৌরবময় এবং স্মরণীয় কাল , পুনর্জাগরণের কাল। মহাপুরুষদের আবির্ভাবের কাল। সমাজে প্রভাবশালীদের নিজেদের স্বার্থে প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক এবং ন্যায়পূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করার কাল। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই সকল মহান নির্ভিক , উদার ,মানব দরদী কর্মবীর সমাজ সংস্কারকদের মধ্যে অন্যতম একজন মহাপুরুষ। যিনি অন্তরমন দিয়ে অনুভব করেছিলেন মানুষের অধিকার এবং মানুষের মূল্য। সামাজিক কুপ্রথা , কুরীতির শিকার হয়ে অপমানিত ,অবহেলিতকে দিয়েছিলেন সমাজে সসম্মানে বাঁচার অধিকার , শিক্ষার অধিকার। শিক্ষার প্রসার করে সর্ব সাধারণের সঙ্গে স্ত্রীজাতির শিক্ষা প্রাপ্তের অধিকার বিস্তার করলেন। কারন,দয়া এবং কোমল মনের অধিকারী বিদ্যাসাগর মহাশয় মানতেন যে নারী শিক্ষিত না হলে দেশের উন্নতি কদাপি সম্ভবপর নয়। নারী শিক্ষা উচিৎ কি উচিৎ নয় অথবা এই প্রথা ধর্মের বিরোধী কিনা, এই প্রশ্নের সমাধান করা বা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন সেটা ঠিক কিনা , এই বিচার করতে আয়োজিত হয় এক বিশাল মহা পন্ডিতগনের সভা। সেই সভায় উপস্থিত সকল পন্ডিতের একই সুর , নারী শিক্ষার প্রচলন এদেশে হবে না কারন ধর্মানুসারে সমাজে নারীর বাইরে বেরনো বা শিক্ষা গ্রহন করা পাপ। শুরু হল সভায় প্রচন্ড বিরোধ। তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় সমাজে নারীর অবদানের কথা ইতিহাসের পাতা থেকে একের পর এক তুলে ধরেন। প্রমান করলেন পশুপালন থেকে কৃষি সবকিছুতেই আছে নারীর মুখ্য ভূমিকা। তুলে ধরলেন বেদে উল্লেখিত বিদুষী নারীদের নাম - গার্গী, অপালা, ঘোষা, লোপামুদ্রা, খনা ইত্যাদির নাম।সকলেই বিভিন্ন বিদ্যায় বিদুষী। কঠিন শব্দে সভায় প্রশ্ন নিক্ষেপ করে বললেন মহাকবি কালিদাস কার বরপুত্র ? জ্ঞান বা শিক্ষার জন্য উপস্থিত আমরা কার উপাসনা করি অথবা প্রার্থনা করি ? সেই শুদ্ধ জ্ঞানের দেবী সরস্বতী, কিন্তু একজন নারী ! এরপর একের পর এক শ্লোকের উচ্চারণ করে তার ব্যাখ্যা করে প্রমান দিয়ে স্বীকৃত করালেন নারী শিক্ষার ঔচিত্যকে। ভেঙে দিলেন নারী শিক্ষায় বাধার সমস্ত বাঁধ। উদাহরণে বললেন ইউরোপের শিক্ষা ব্যবস্থায় নারী শিক্ষায় কোন বাধা না থাকায় ঐ দেশগুলির উন্নতি অপ্রতিহত। ওনার মায়ের প্রতি অসীম ভক্তি শ্রদ্ধা থেকেই উৎপত্তি নারী জাতির প্রতি আন্তরিক অগাধ সম্মান। শহর থেকে দূর দুরান্তের মফঃস্বলে , গ্রামে প্রসারিত করেছিলেন শিক্ষার আলো।
সমাজে প্রচলিত বাল্যবিবাহ এবং নিষ্ঠুর কুলীন প্রথা ,যার শিকার হয়ে অবোধ ,অপ্রাপ্তবয়স্ক , বালিকাদের অকাল বৈধব্যের কষ্ঠময় জীবনের যন্ত্রণাকে উনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন এবং বন্ধ করিয়েছিলেন সরব হয়ে। স্বর্গবাসী স্বামীর আলয়ে কলঙ্কিত দাসীত্যের অপমানিত জীবন যাপন করতে বাধ্য অথবা পিত্রালয়ের বোঝা হয়ে অকারনে হতভাগী , ডাইনী ইত্যাদির উপাধি নিয়ে পালিত কুকুর বিড়ালের চেয়েও নিম্নমানের জীবন যাপনে বাধ্য হওয়া নচেৎ উভয় কূল থেকে বিতারিত হয়ে আশ্রম নিবাসিনী , দাসী বিনোদিনী সেবাদাসীর জীবন যাপন করতে বাধ্য হওয়া নাহলে বারবণিতার জীবন যাপন করতে বাধ্য হওয়া ছাড়া আর কোন রাস্তাই ছিলনা এই অসহায় অপ্রাপ্তবয়স্কা বালিকাদের সামনে। চলছিল সমাজে কী নিষ্ঠুর পরিহাস! পুরুষ প্রধান সমাজে স্ত্রী জাতীর মানবিক অপমান! প্রথানুযায়ী জারী ছিল স্ত্রীজাতির জন্য অথবা অন্দরমহলে শিক্ষার আলোর প্রবেশ করতে না দেবার ফরমান! সহ্য হল না এই রকম অমানবীয় সামাজিক প্রথার বা রীতি নীতির চলন ব্যবস্থা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের। ব্যথিত হৃদয়ে অনুভব করলেন অমানবীয় সামাজিক প্রথানুযায়ী অবোধ , অপরিপক্ক বুদ্ধিসম্পন্ন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী জাতিকে বাল্য বিধবাদের কঠোর ,কষ্টময় কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং নিষ্ঠুর সামাজিক প্রথার শিকার অপমানিত , কলঙ্কিত হয়ে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত অনিশ্চিত জীবন যাপনে বাধ্য হওয়াকে। সরবে প্রতিবাদ করে সশক্ত বিরোধ করলেন প্রচলিত এই সমাজিক নিষ্ঠুর ব্যবস্থার। বিধবা পুনর্বিবাহের আইন পাস করার জন্য জনমত সংগ্রহীত করে সরকারের কাছে যুক্তি তর্ক সহ আবেদন প্রস্তুত করলেন। কিন্তু, ব্রিটিশ সরকার এই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে পন্ডিত মহলের বিদ্রোহের আশঙ্কায় আইন প্রণয়ন করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করল। তবে, যদি শাস্ত্রে কোন বিধান থাকে এই মর্মে , যে বিধবা পুনর্বিবাহ সম্ভব, সেই সাক্ষ্য বা প্রমান পেলে আইন প্রণয়ন করা সম্ভব। ঈশ্বর চন্দ্র কিন্তু পিছিয়ে যাবার ব্যক্তিত্ব নন। দিন রাত এক করলেন, নিরলস। সমস্ত পুঁথি , শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে লাগলেন, শুধু একটাই চিন্তা, যেকরেই হোক বিধবা বিবাহের প্রচলন করাতেই হবে , শেষ করতে হবে আমানবীয় নির্যাতন। বারবার ওনার সম্মুখে ভেসে উঠতে থাকে দেশের লক্ষ লক্ষ অসহায় বিধবা নাবালিকাদের করুন মুখের ছবি। সমুদ্রে মুক্তো খোঁজার মত চেষ্টা করতে লাগলেন ঈশ্বর চন্দ্র। অবশেষে এল সেই দিন, পেয়ে গেলেন শাস্ত্রের স্পষ্ট নির্দেশ, আর কোনও শক্তি পারবে না আটকাতে বিধবা বিবাহ সমর্থিত আইনের। পরাশর সংহিতায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে এই শ্লোকের মাধ্যমে , যাতে করে বিধবা বিবাহ বা নারীর পুনর্বিবাহ অনৈতিক নয় -
" নষ্টে, মৃতে, প্রবর্জিতে , ক্লীবে চ পতিতে পতৌ / পচস্বাপতসু নারীনাং পতিরন্য বিধয়তে "।
অর্থাৎ
"স্বামীর মৃত্যু হলে, সন্যাস গ্রহণে , নিখোঁজ হলে , সন্তানগ্রহণে অক্ষম হলে , অধার্মিক এবং অত্যাচারী হলে পত্নী পুনর্বিবাহ করতে পারে।" হিন্দু শাস্ত্র মতে আর কোনও বাধা না থাকায় ২৬ শে জুলাই ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন পাস করে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আবেদনের পক্ষে আইন করে বিধবা বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করলেন। জয় হল সত্যনিষ্ঠ প্ৰচেষ্টার ! কোমল হৃদয় সম্পন্ন এবং নির্ভীক ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় সক্রিয়তার সঙ্গে সমাজে প্রচলিত কুরীতিকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে পরবর্তী কালে প্রবল সামাজিক বিরোধিতা সত্বেও আইনের সহায়তা নিয়ে বিধবা বিবাহ শুরু করালেন এবং স্ত্রীজাতির উচিৎ সম্মান রক্ষা করে বাল্য বিধবাদের সসম্মান সুখী জীবন যাপন করে সংসার করার অধিকার দিলেন। শিক্ষার প্রসার করে সর্ব সাধারণের সঙ্গে স্ত্রীজাতির শিক্ষা প্রাপ্তের অধিকার বিস্তার করলেন। বিদ্যার সাগর ,দয়ার সাগর ,সমাজ সংস্কারক , শিক্ষার প্রসারক , সরল গদ্যের জনক , সরল আক্ষরিক বর্ণের প্রবত্যক , সংবাদপত্র এবং পাণ্ডুলিপী , পুস্তকাদি ছাপার অক্ষরে প্রকাশক , সরল ব্যাকরণ আদির লেখক , প্রচুর বিদ্যান এবং উচ্চপদের অধিকারী হওয়া সত্যেও নির্লোভ সরল নিরহংকারী , অতিসাধারণ জীবন যাপনকারী , নির্ভীক দেশপ্রেমী , কর্মঠ নিরলসকর্মী , পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শ্রীচরণে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে ওনার বিশাল কর্মময় জীবনের এক অতি ক্ষুদ্রতম অংশের উপর আলোক সম্পাত করার দুঃসাহসীক প্ৰচেষ্টা করলাম।