বিলম্বিত বসন্ত

3rd August 2020 7:03 pm রাফিয়া সুলতানা
বিলম্বিত বসন্ত


* বিলম্বিত বসন্ত *
--- রাফিয়া সুলতানা 

কলেজে ভর্তির দিন ফর্ম ফিলাপ করতে গিয়ে মণিদীপা দেখে সে বাড়ি থেকে আসার সময় তাড়াহুড়োয় পেনটাই আনতে ভুলে গেছে। কী করবে এখন? বার বার ব্যাগের এ পকেট, সে পকেট হাতড়াতে থাকে। তারপরে খেয়াল হলো ভর্তির জন্য টাকাটা যে পার্সে নিয়েছিলো, সেটাও আনা হয়নি। অথচ আজকেই ভর্তির লাস্ট ডেট। বাড়ি ফিরে গিয়ে যে আবার আসবে, সেটাও সম্ভব নয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুকনো মুখে এদিক সেদিক তাকাতে থাকে মণিদীপা। পাশের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি বোধহয় লক্ষ্য করছিলো সব।জিজ্ঞাসা করলো, 
"কোন অসুবিধায় পড়েছো? এনি প্রবলেম?"
মণিদীপা কাচুমাচু মুখ করে বলবে কি বলবে না ভাবতে ভাবতে বলেই ফেললো শেষ পর্যন্ত। হাসি মুখে নিজের পেনটা মণিদীপার দিকে এগিয়ে দিয়ে ছেলেটি বললো, "এটা নিতে পারো,অসুবিধা না থাকলে। "
তারপর নিজের প্যাান্টের পকেট থেকে প্রয়োজনীয় টাকাটা গুণে তার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো,
" নো প্রবলেম, পরে কোনসময় ফেরত দিলেই চলবে। "
মণিদীপা অবাক বিস্ময়ে খানিকক্ষণ হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো ।সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটা মানুষের এমন সহৃদয় ব্যবহারে।তারপর সম্বিত ফিরতেই, "ওকে, থ্যান্কিউ ",বলে হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে।
অনেকক্ষণ পর সব কাজ সারা হয়ে গেলে এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে অচেনা ছেলেটিকে, পেনটা ফেরত দেয়ার জন্য। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পায় না তাকে। বোধহয় ততক্ষণে বাড়ি চলে গেছে সে।
প্রথম যেদিন ক্লাস শুরু হলো, কলেজের ব্যালকনিতে সেই ছেলেটিকে চিনতে পেরে এগিয়ে গেলো মণিদীপা তার দিকে। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প করছিলো সে। মণিদীপা তার সেই পেনটা ফেরত দিতে তার দিকে এগিয়ে দিতেই, ছেলেটি প্রথমে একটু অবাক হলো, তারপর হো হো করে হেসে বললো,
 "ও! এই ব্যাপার! পেনটা কি ফেরত দিতেই হবে? থাক না ওটা তোমার কাছে! কেন, রাখতে কি খুব আপত্তি আছে? " 
মণিদীপা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো, "না না,ঠিক আছে, ধন্যবাদ! " 
তারপর পার্স থেকে সেদিনের ধারের টাকাটা মিটিয়ে দিলো। হাসিমুখে ছেলেটি টাকাটা নিয়ে নিজের মানিব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। গুণে নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলো না। মণিদীপা চরম বিস্মিত হলো তার আচরণে। 
সেদিন, সেখান থেকে ফিরে এলেও ছেলেটির হাসিমুখ এবং কথাগুলো কেমন যেন ঘুরপাক খেতে লাগলো তার মাথার মধ্যে। মনে মনে অস্থির হয়ে উঠলো সে, ছেলেটির নাম জানার জন্য। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না অবশ্য। ছুটির সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ সেই ছেলেটি পাশে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, "এক্সিউজ মি, পরিচয়টাতো বাকি রয়ে গেছে। আমি কৌস্তভ! ফার্স্ট ইয়ার, সায়েন্স। তোমার নামটা ?"
মণিদীপা প্রথমে চমৎকৃত হলো। তারপর কিছুটা ইতস্ততঃ করে হ্যান্ড সেকের জন্য নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো "আমি, মণিদীপা,ফার্স্ট ইয়ার আর্টস"।
সেই শুরু। তারপর বন্ধুত্ব, আলাপ চারিতা ক্রমে ঘনিষ্ঠতা, তারপর প্রেম। প্রথম বছরটা ভালোই কাটলো। কিন্তু কপালে সে সুখ বেশিদিন সইলো না। একদিন মণিদীপার বইয়ের ফাঁকে কৌস্তভের একটি প্রেমপত্র আবিষ্কার করে ফেলে তার রাশভারী বাবা। এবং আচমকাই একদিন তিনি পার্কে গিয়ে , হাতে নাতে ধরে ফেলেন তাদের দুজনকে । লোকজন সঙ্গেই ছিলো। তাদের দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে কৌস্তভ কে সেখান থেকে বের করে দেয়া হলো। তারপর টানতে টানতে মণিদীপাকে গাড়িতে চাপিয়ে বাড়ি নিয়ে এলেন বিশ্বম্ভর বাবু। তারপর বেশ করে শাসানি ধমকানি চললো। এমন কি মণিদীপাকে দিয়ে চাপ দিয়ে, কৌস্তভকে ফোন করিয়ে বলিয়ে নেয়া  হলো---  
যে সে আর অনিন্দ্যর সঙ্গে কোনরকম সম্পর্ক রাখতে চায় না। কারণ এ সম্পর্কে তার বাড়িতে তীব্র আপত্তি আছে। এবং তার জন্য বাড়িতে অনেক অশান্তি হচ্ছে। 
তাই এরপর থেকে সে যেন আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনরকম চেষ্টা না করে। 
অনেক কষ্ট হয়েছিলো সেদিন, মণিদীপার এই কথা গুলো বলতে। প্রতিটি কথা যেন এক একটা চাবুক হয়ে পড়ছিলো কৌস্তভের পিঠে! আর তা টের পেয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিলো মণিদীপার হৃদয়! কিন্তু কী করবে সে? সে যে বড়ো নিরুপায়! সারা রাত মণিদীপা অনেক কাঁদলো।বড়লোক বাড়ির ছেলে  হলেও কৌস্তভ ছিলো মা মরা সন্তান। জন্মের সময়ই মাকে হারায় সে। ফলে তাকে মানুষ করার জন্য বাবা আবার বিয়ে করে। কিন্তু সেই মায়ের যখন নিজের সন্তান হলো, তখন থেকে তিনি আর ভালো চোখে দেখতেন না তাকে। সৎমায়ের অবজ্ঞা ও অবহেলায় কৌস্তভ সব সময় মর্মপীড়ায় মনমরা হয়ে থাকতো। মণিদীপা তার জীবনে যেন নতুন এক আনন্দের বাতাস বয়ে আনে। ফলে কিছুদিন সে খুব হাসিখুসি ও সুখী ছিলো। এখন এই ঘটনা তার জীবনে যে কি ভয়ঙ্কর অন্ধকার নিয়ে আসবে, সেটা অনুভব করে মণিদীপার কষ্ট যেন আরো বেড়ে গেলো। সে লুকিয়ে বারকয়েক কৌস্তভকে ফোন করার চেষ্টা করলো। কিন্তু প্রত্যেকবারই সুইচ অফ বললো। 
তারপর থেকে কৌস্তভের সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ হয়নি মণিদীপার। সেই ঘটনার পর সেই কলেজও ছেড়ে চলে যায় কৌস্তভ । পরে, তার বন্ধুর মুখে শুনেছিলো মণিদীপা,কৌস্তভ নাকি এরপর মানসিক ভাবে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকদিন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা চলে তার। 
এদিকে মণিদীপাও ভীষণ মনোকষ্টে ভুগতে থাকে। মাস তিনেক ভালো করে পড়াশুনাই করতে পারেনি সে। শুধু মনে হতো কৌস্তভকে ছাড়া কিছুতেই বাঁচতে পারবে না যেন । সেই শোক সামলাতে পাঁচ-পাঁচটা বছর লেগে যায় মণিদীপার। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, কোনদিন আর কাউকে বিয়ে করবে না মণিদীপা। কারণ তার মনে কৌস্তভের যে জায়গা,তা আর কাউকে কোনমতে দিতে পারবে না সে। 
পড়াশোনা শেষ করার পর সৌভাগ্য বশতঃ একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে যায় মণিদীপা। বাড়িতে অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও সত্যি সত্যিই আর কোনদিন কারো সঙ্গে জড়ায়নি সে জীবনে। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কখন কোনদিক দিয়ে যে কেটে গেছে, টেরও পায়নি আর। গঙ্গা দিয়ে অনেক জলও বয়ে গেছে এতদিনে। 
সেদিন কলেজের বান্ধবী সুজাতার কাছে হঠাৎ খোঁজ পায় সে কৌস্তভের। ফেসবুকে নাকি পাওয়া গেছে তাকে। মনটা কেমন যেন নেচে ওঠে তৎক্ষনাৎ। তার কাছ থেকে কৌস্তভের ফেসবুকের আইডির লিঙ্ক জোগাড় করে সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয় মণিদীপা । কৌস্তভও তাকে চিনতে পেরে, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাক্সেপ্ট করে নেয় সেটা। সেই থেকে আবার তাদের পুরনো বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নেওয়ার সূচনা। সে যে কী আনন্দ মণিদীপার মনে সেদিন, সে আর বলে বোঝানো যায় না! বাইশ বছরের ফেলে আসা দিন যেন আবার ফিরে আসে তাদের জীবনে। চল্লিশ বছর বয়সে আজ তার মনে অষ্টাদশীর উচ্ছ্বলতা, আবেগ,প্রেমের উচ্ছ্বাস ! কত কথা, কত গল্প দুজনের। বলে বলে যেন শেষই হতে চায় না। তারা বুঝেছে, এখনো তেমনই ভালোবাসে তারা দুজন দুজনকে। মণিদীপার মত কৌস্তভও কাউকে দিয়ে দেয় নি তার হৃদয়ে মণিদীপার স্থান।বুঝি একেই বলে সত্যিকারের ভালোবাসা!
ফ্রান্স থেকে প্রমোশন নিয়ে আজ দেশে ফিরছে সে।সেখানে একটা বেসরকারী কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং এর চাকরি করতো কৌস্তভ । কোম্পানি থেকে বড়ো একটা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ভারতে ফিরছে তাই। 
এসে মণিদীপার কাছেই উঠবে। শহরের এক প্রান্তে নিরিবিলি পরিবেশে ছিমছাম মণিদীপার দুকামরা ফ্ল্যাট। নিরালা সেই নীড় বুঝি এতদিন দিন গুনছিলো তারই আসার প্রতীক্ষায়। মণিদীপা তাই আজ খুব খুশি। স্কুলে এখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। তাই কাজেরও কোন তাড়া নেই। একমনে, মণিদীপা তাই ফুলদানিতে রজনীগন্ধা ফুলগুলো গোছাতে গোছাতে মনে মনে রচনা করছে হাজারো স্বপ্নের কল্পনা জাল! তবে কি এতদিন পরে, তাদের অধরা স্বপ্ন ধরা দিতে চলেছে অবশেষে ? তবে কি আজ সত্যিই দেখা দিতে চলেছে তার জীবনে হারানো বসন্ত? হোক না তা বিলম্বিত! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা