বিচ্ছেদ

3rd August 2020 7:16 pm রাফিয়া সুলতানা
বিচ্ছেদ


* বিচ্ছেদ *
--- রাফিয়া সুলতানা 
17.04.20

দেশটা হলো বাংলাদেশ। তবে তখন ছিলো পূর্ব পাকিস্তান। সেখানে ঢাকা শহরের কাছে জয়পাড়া নামক গ্রামে ছিলো সম্ভ্রান্ত একটি হিন্দু পরিবারের বাস। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা দুই পারেই ছিলো তাদের কাপড়ের রমরমা ব্যবসা। সেই পরিবারে গৌরীর জন্ম। তার নামটি যেমন মিষ্টি, দেখতেও তেমনই সুশ্রী সে। আর তেমনই সুন্দর ছিলো তার গানের গলা। সেদিন পাড়ার ক্লাবের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলো গৌরী। সবাই খুব প্রশংসা করেছিলো। তবে একজনের প্রশংসা তার মনে দাগ কেটেছিলো খুবই। নাম তার আকবর।  আকবর সেদিন তার পিঠে আলতো করে সস্নেহে একটি টোকা দিয়ে বলেছিলো--বাহ! এতো সুন্দর গান গাইতে পারিস তুই! চালিয়ে যা! দেখিস, একদিন খুব নাম করবি ! 
কিশোরী মনে যেন খুশির তুফান উঠেছিলো সেদিন তার সেই কথাগুলো শুনে! কেমন যেন অভিভূত হয়ে পড়েছিলো গৌরী ! সেকি অনুরাগের অনুভূতি? এতদিন তো সে চিনতো না তাকে! তবে? পরে অবশ্য জেনেছিলো, আকবর তার দাদারই পরিচিত একজন, বন্ধুরই মত।

 গৌরীর বই পড়ারও খুব নেশা ছিলো। আর তাই জন্য প্রায় সে দাদার আলমারি ঘাঁটাঘাটি করে বইয়ের থাক সব ওলোট পালোট করে দিতো। দাদার কাছে মাঝে মধ্য ধমকও খেতে হতো সেই কারণে। একদিন আলমারিতে সে নতুন একটা ম্যাগাজিনের দেখা পেলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে চোখে পড়লো ছোট্ট একটা গল্প। দাদার সেই বন্ধু আকবরেরই লেখা। ভারি ভালো লাগলো পড়ে।তারপর, দেখতে পেলো, পাশে আরও কয়েকটা ম্যাগাজিন। সবক'টি পাড়ার ক্লাব কতৃক প্রকাশিত। সে তাড়াতাড়ি পাতা উল্টে সেগুলো পরখ করতে লাগলো। সেখানে আকবরের আরও দু-একটা লেখার সন্ধান পেলো সে। চুপ করে সেগুলো নিয়ে এসে বালিসের নীচে লুকিয়ে রাখলো। তারপর একে একে পড়ে ফেললো সব। প্রতিটা লেখা তার এতো ভালো লাগলো, যে সে এক প্রকার আকবরের অনুরাগীই হয়ে পড়লো। 

দুচারটে বাড়ি পেরিয়েই থাকতো লুৎফা পিসী।আকবরের দুরসম্পর্কের দিদি ছিলেন তিনি। লক্ষী পুজোর সময় তিনি বলে যেতেন গৌরীর মাকে, আমার লগে বেশি কইরা নাড়ু বানাবা! ঘরে তুইলা রাখুম। কাজের ফাঁকে বড্ড খিদা লাগে! তখন একটা কইরা খামু। 
মাও বেশি করে নারকেলের আর তিলের নাড়ু বানিয়ে  পিসীর জন্য কৌটোয় ভরে  গৌরীকে বলতো, যা দিয়ে আয় লুৎফা পিসীর বাড়ি। 

শবেবরাতে পিসীর বানানো হালুয়া রুটি বড় প্রিয় ছিলো তাদের সকলের। ঈদের দিনতো সারা দিনের দাওয়াত থাকতো সেখানে। পিসীর এক মেয়ে নিলুফা খুব বন্ধু ছিলো গৌরীর। সরস্বতী পুজোর দিন দুজনে মিলে শাড়ি পরে একসঙ্গে স্কুলে যেতো। 

সেদিন পিসীর বাড়িতে দেখা হলো আকবরের সঙ্গে। গৌরী আর দেরি না ক'রে সেই সুযোগে জানিয়েই দিলো তার গল্পের প্রতি নিজের ভালোলাগার কথা। জানালো, আরো লেখা পড়তে চায় সে। এবারে কিছু লিখলে, তাকে যেন আগেই দেখানো হয়। গৌরীর লজ্জা জড়ানো সেই আবদারে, একটু খানি হাসলো আকবর। বললো, বেশ, তাই হবে! গৌরীর অনুরাগের ছোঁয়া যেন আলতো ভাবে স্পর্শ ক'রে গেলো তাকে! 

সত্যি সত্যিই এরপর থেকে নতুন কিছু লিখলেই, আগেই তা পাঠিয়ে দিতো আকবর গৌরীর কাছে নিলুফার মাধ্যমে, তার মতামত জানতে।  গৌরীও অকুণ্ঠ প্রশংসা করতো সেগুলোর একটা ক'রে ছোট্ট চিঠি লিখে । ভারি তৃপ্ত হতো আকবর সেগুলি পড়ে।সেও উত্তর দিতো দুচার লাইন লিখে,একটা চিরকুটে। এমনি করে ,কবে যে তিল তিল ক'রে দুজনে আবদ্ধ হয়ে গেলো এক- নিষ্পাপ নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে, টেরও পেলো না। 

সেদিন আকবরের দাদুর পারলৌকিক ক্রিয়া ছিলো। সেখানে নিমন্ত্রিত ছিলো গৌরীও। রাতের বেলায় বাড়ি ফিরতে দিলো না বন্ধু নিলুফা ও আকবরের দিদি এবং বোনেরা। মনে মনে ভয় পেলো গৌরী। বললো, না ফিরলে বাড়িতে বকবে। ধমক দিয়ে বললো রাবেয়া,আকবরের দিদি--কেন বকবে? আমরা কি পর? আমি নাহয় পৌঁছে দেবো তোকে। নিলুফাও নাছোড়বান্দা। থাক না। খুব মজা করবো সবাই! সত্যি খুব মজা হলো! অনেক রাত পর্যন্ত হৈ হৈ করলো সকলে। একবার রাবেয়া তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললো - খবরদার কষ্ট দিবা না আমার ভাইকে! বড্ড ভালোবাসে সে তোমায়! লজ্জায় লাল হয়ে গেলো গৌরী। একসময় গৌরী নিলুকে খুঁজতে গিয়ে ঢুকে পড়ে,তাদের বৈঠক খানায়। গিয়ে দেখে কেউ নেই সেখানে, শুধু আকবর চুপ করে বসে আছে এক কোণে। কি হয়েছে! কাকে খুঁজছিস? প্রশ্ন করে আকবর। গৌরী পালিয়ে আসতে গিয়েও পারে না। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। আকবর এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখে তার। কি হলো? ভয় পেলি? গৌরী মাথা নেড়ে জবাব দেয়- "না। ভয় পাবো কেন?" তখন  তার মনে যে অনুরাগের আবেশ! প্রণয়াবেগের বিহ্বলতা!
যাক সে যাত্রা বাঁচলো সে,সেই ঘোর থেকে--। পরের দিন রাবেয়া পৌঁছে দিলো তাকে।গৌরী ফিরেছিলো দুরু দুরু বুকে, সারা রাত পরবাসের পরে। বাড়িতে অবশ্য কেউ কোন উচ্চবাচ্য করেনি সেই নিয়ে। 
------------
এমন সময় শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। চারিদিকে তীব্র হলো বিক্ষোভ, বিদ্রোহ! আন্দোলন। গৌরীর দাদা অতনু এবং আকবর সহ তার বন্ধু বান্ধবেরা যোগ দিলো আন্দোলনে। যুদ্ধ শুরু হলো। চারিদিকে চললো ধরপাকড়, হানাহানি ,হত্যাযজ্ঞ। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে নিহত হলো হাজার হাজার বাঙালি। নেমে এলো ভীষণ দুর্দিন। এই সময় সুবিধাবাদীরা শুরু করলো বিভাজনের রাজনীতি।  চারিদিকে অশান্তি আর অবিশ্বাসের আগুন জ্বলে উঠলো।হিন্দুরা দলে দলে ঘরবাড়ি জমিজমা ছেড়ে পাড়ি দিলো ভারতে। সেই আঁচ এসে লাগলো গৌরীদের পরিবারেও। তারাও ঠিক করলো এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে ভারতে। 
গৌরী এই প্রথম অনুভব করলো, আকবর আর সে আলাদা ,আলাদা সম্প্রদায় ।   তাদের মধ্যে মিলন কখনোই সম্ভব নয়। সে হিন্দু।আর  আকবর মুসলিম। এ দেশ মুসলমানের। আর তাই তারা এই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সারারাত খুব কাঁদলো সে। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিলো। তার প্রিয় বন্ধু নিলুফাকে ডেকে বললো , খুব ভালো বাসে সে আকবরকে। তাকে ছাড়া বাঁচা যে সে কল্পনাও করতে পারে না। নিলুফা অনেক বোঝালো তাকে। এদিকে বাড়িতে  দেশ ছাড়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। গৌরীর বাবা , মা, ভাইবোন এখনই চলে যাবে কলকাতায় । শুধু কিছুদিন তার বড়দা থেকে যাবে এখানে।

গৌরী একদিন লুকিয়ে দেখা করলো আকবরের সঙ্গে। কথা মত আকবর দাঁড়িয়ে ছিলো তাদের বাড়ির পিছনের আমবাগানে, দীঘির ঘাটে। গৌরী গুটি গুটি পায় দাঁড়ালো গিয়ে সেখানে,মাথা নীচু করে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। তারপর গৌরীই মুখ তুলে তাকালো আকবরের দিকে। দেখলো আকবর তার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে আছে। বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে গৌরীর। বলতে চায় সে যেতে চায় না তাকে ছেড়ে। কিন্তু বলতে পারলো না। 
আকবরই মুখ খুললো এবার- যা তুই বাবা মা'র সঙ্গে। পৃথিবীতে বাবা মায়ের মত কেউই আপন নয়। কেউ বুঝবে না তাদের মতো তোর ভালোমন্দ! তুই না গেলে ওনারা খুব কষ্ট পাবেন। বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে এ জগতে কিছুতেই সুখী হওয়া যায় নারে! 
আমি চিরদিন তোর কথা মনে রাখবো। এই নে, এটা পড়িস।এই ব'লে  কিছু কাগজের তাড়া তার হাতে গুঁজে দিলো সে। 
গৌরী হাউ হাউ করে কেঁদে তার পায়ে গিয়ে পড়লো! আকবর সস্নেহে তার হাত ধরে ওঠালো । তারপর, মাথায় হাত রেখে বললো- ভালো থাকিস। চিঠি দিস।
গৌরী কাগজ গুলো বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে পালালো সেখান থেকে। 

গোছগাছ সব কমপ্লিট।সব প্রতিবেশী সহ লুৎফা পিসী কাঁদতে কাঁদতে দেখা করতে এলো। 

গৌরীর দাদা অতনু ইতিমধ্যে টের পেয়ে গেছিলো আকবরের প্রতি তার  দুর্বলতার কথা। গৌরীর বইয়ের মধ্যে একদিন তার চিঠি পায় সে। অতনু ও ভালোবাসতো আয়েষা ব'লে তার এক প্রতিবেশিনী কে। কিন্তু তাকেও  ছেড়ে যেতে হবে দেশ। ছেড়ে যেতে হবে তার ভালোবাসা! অর্থাৎ ঘটনাচক্রে সেও গৌরীর মতই পরিস্থিতির শিকার। অতনু গৌরীকে একদিন হাত ধরে টেনে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো, তোর যেতে ইচ্ছা না হলে---- আমার কাছে থেকে যেতে পারিস। আমিই তোর সঙ্গে আকবরের বিয়ে দিয়ে যাবো। তোর কোনো চিন্তা নেই। 
গৌরীর  মনে পড়লো আকবরের কথাগুলো ।দুচোখ জলে ভরে উঠলো তার। সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে তার অসম্মতি জানালো,  দাদার সেই প্রস্তাবে। 

রেলস্টেশনে যেন জনসমুদ্র। যত না মানুষ, তার চেয়ে তাদের মালপত্র ঢের বেশি। চিরদিনের জন্য দেশ ছাড়া। তাই যতটুকু পারা যায় সহায় সম্বল গুটিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে সবাই। মাতৃভূমিকে চিরবিদায় জানিয়ে সকলে চলেছে এক- অজানা ভবিষ্যতের দিকে। অচেনা দেশ। অনিশ্চিত ভাগ্য। তবু যেতে হবে। অনেকেই চলেছে কিছু আত্মীয় স্বজনদের ঠিকানা সম্বল ক'রে। যতদিন না নিজের পায়ের নীচের মাটি জোগাড় হচ্ছে,ততদিন হতে হবে তাদেরই দয়ার মুখাপেক্ষী । গৌরীরও এক পিসী থাকেন কলকাতায়। আপাততঃ সেটিই তাদের গন্তব্য। 

হঠাৎ গৌরীর চোখে পড়লো, দূরে এক ছাতিম তলায় নীল পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরে এক- যুবক তাকে হাতের ইশারায়  ডাকছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো, সে আর কেউ নয়, আকবর। 
গৌরী চট্ করে সবার চোখের আড়ালে সেখান থেকে সরে এসে পৌঁছালো সেই ছাতিম তলায়। গাছের পিছনে তার হাত ধরে টেনে আকবর একটা ছোট ব্যাগ গুঁজে দিলো হাতে। বললো-তোকে তো দেবার মত আমার কিছু নাই। তাই সামান্য একটু উপহার দিলাম। আর দিলাম আশীর্বাদ। অনেক সুখী হবি তুই! হারমোনিয়ামটা নিয়েছিস তো? খবরদার রেওয়াজ করা ছাড়িস না যেন!
ব্যাগটা নিতে গিয়ে কেঁপে গেলো গৌরীর হাত! বুকের ভিতরটা যেন দুমরে মুচড়ে যাচ্ছে! কোন কথা বেরলো না মুখ দিয়ে! শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। 
এদিকে ট্রেনের সিগনাল পড়ে গেছে। আকবর ধীর পায়ে ,এগিয়ে দিতে এলো তাকে। তার দাদাও এসেছিলো। দুজনে মিলে মালপত্র গুলো তুলে দিয়ে গুছিয়ে দিলো ঠিক ঠাক ক'রে। হুইশল বাজতেই ট্রেন থেকে নেমে গেলো তারা।

 ট্রেন ধীর গতিতে এগিয়ে চললো। জানালার ধারে বসে অপলক দৃষ্টিতে গৌরী চেয়ে রইলো বাইরের দিকে। হাত নাড়াচ্ছিলো দুজনে। ক্রমে চলে গেলো তারা চোখের আড়ালে। ছলছল চোখে গৌরী তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ বাইরের দিকে, শূন্য দৃষ্টিতে। 
------
তারপর গৌরীর একদিন বিয়ে হলো। স্বামী ব্যবসায়ী। সংসারের চাপে ভুলতে হলো সব। ফিকে হয়ে গেলো অতীত। তবে এখনও সযত্নে রাখা আছে আকবরের দেওয়া সেই স্মৃতি চিহ্ন, সেই ব্যাগটা, আর তার ভিতরে দুজোড়া বালা, একটা হেয়ার ব্যান্ড। আর সেই কাগজের তাড়া। একটি গল্প- আকবরের লেখা--" জয় জয়ন্তী "। সে যেন তাদেরই প্রেম কাহিনী। 
আজও মাঝে মাঝে নেড়ে চেড়ে দেখে গৌরী সেগুলো। বালা দুটি বা হেয়ার ব্যান্ড-কখনো গায়ে তোলা হয় নি সেগুলো। শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। সাক্ষী হয়ে এক- অপূর্ণ প্রেমগাথার । 
গৌরীর ভীষণ ইচ্ছে হতো আকবরের খবর জানতে!
তার চিঠি পেতে! তার একটু কণ্ঠস্বর শুনতে! কিন্তু কোনদিন তা আর মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারেনি প্রিয় বান্ধবী নিলুফার কাছে! হ্যাঁ, নিলুফার মাধ্যমেই কিছুটা হলেও ছিলো তার মাতৃভূমির সঙ্গে যোগাযোগ। তার মাধ্যমেই যেটুকু খবরাখবর পাওয়া যেতো আকবরের। শুনেছিলো, আকবরের বিয়ে হয়েছে। সন্তান হয়েছে। খুব সাধ হতো একটি বার দেখার-সেই মানসপ্রতিমকে।জানতে সেও কি মনে রেখেছে তাকে?
------
দেখতে দেখতে কেটে গেছে পঞ্চাশটি বছর। গৌরীর এখন স্বামী ও এক ছেলে নিয়ে ভরা সংসার। থাকে ব্যারাকপুরে। স্বামীর মুদিখানার ব্যবসা। ছেলে চাকুরে। কলকাতায় পোস্টিং।  সে রোজ ট্রেনে যাতায়াত করে। গৌরী সারাদিন ব্যস্ত থাকে দোকান ও সংসার সামলাতে। স্বামী হার্টের রুগী। নিজের চোখে ছানি পড়েছে। অপারেশনেরও ফুরসৎ নেই।

হারমোনিয়ামটা সেই থেকে তোলা আছে তো আছেই। হাত পড়েনি আর। ধুলো পড়ে ময়লায় বুঁজে গেছে সেটা। কোনদিন সময় হয় না সেটি ঝেড়ে ঝুড়ে মুছে রাখার। সেটার দিকে চোখ পড়লেই, মনে পড়ে আকবরের কথা।ভবিষ্যদ্বাণী ক'রে বলেছিলো সে, অনেক বড় গাইয়ে হবে গৌরী ।হয়নি তা। তার মতো আর কোন উৎসাহী ও অনুরাগী পায়নি আর জীবনে । স্বামী কোনদিনও মুখ ফুটে বলেনি গান শোনানোর কথা। সবাই যে যার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সংসার বুঝি এমনই হয়! তবু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে মন! হাঁপিয়ে ওঠে সংসারের কলুর ঘানি টানতে টানতে! ছুটে পালাতে চায় কোন নিরালা শান্তির ছায়াতলে! চায় এক দন্ডের নিভৃত আশ্রয়! একটু খোলা বাতাসে নিশ্বাস নিতে! একটু গলা ছেড়ে কাঁদতে! একান্তে! আজও যে পিছুটানে ব্যথাতুর সেই অতীত! 

অনেক কষ্টে  একটি পাসপোর্ট করিয়েছিলো গৌরী। উদ্দেশ্য -জীবনে যদি অন্ততঃ একটি বারের জন্যও ফেরা হয় দেশে। দেখা পাওয়া যায় আকবরের। ফিরে পাওয়া যায় সেই নিতান্ত অবোধ কৈশোরের দিনগুলি ! কিন্তু না। বিধি বাম। খবর এলো একদিন (নিতান্ত বজ্রাঘাতের মতই!) মারা গেছে আকবর -মধ্য রাতে ঘুমের ঘোরে, হার্টঅ্যাটাকে ! ঝপ ক'রে নিভে গেলো গৌরীর সব স্বপ্ন! শেষ আশা মাত্র একটি বারের সাক্ষাতের! অবশেষে---বুঝি হলো তাদের সত্যিকারের বিচ্ছেদ!

 

 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা