বঞ্চিতা

4th August 2020 9:48 am রাফিয়া সুলতানা
বঞ্চিতা


* বঞ্চিতা *
----- রাফিয়া সুলতানা 
              
সম্প্রতি বিভাষবাবুর পদার্থবিজ্ঞান সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র সারাদেশে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। শহরের সবক'টি নামী সংবাদপত্রের শিরোনামে নিবন্ধ ছাপা হয়েছে তাঁর নামে। শোনা যাচ্ছে সরকার এবার তাঁকে পদ্মবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী অধ্যাপক, বিভাষ বন্দ্যোপাধ্যায় সারাদিনই প্রায় তাঁর গবেষণার কাজে নিযুক্ত থাকেন। স্ত্রী পদ্মিনী একাহাতেই ঘরসংসার সামলে এসেছে এতদিন। বিয়ের আগে পাড়ার একটি নাট্যদলে যুক্ত ছিলো সে। অভিনয়ে বেশ সুনাম ছিলো তার। বিয়ের পর সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে ঘোর সংসারী বনে যায় । 

পদ্মিনীর শাশুড়ি আবার সেকেলে ভাবনার মানুষ। নারী স্বাধীনতা, নারী মুক্তি এমন কি নারীর যে একটা স্বাধীন সত্তা বলে কিছু আছে, সেটাই বিশ্বাস করেন না তিনি। ছেলেও হয়েছে সেরকম। শিকড় যেমন হবে, গাছও তো তেমনই হবে।তাই বাড়ির সকলের সুখের কথা, সংসারের শান্তির কথা ভেবে বহির্জগৎ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেয় পদ্মিনী ।সতেরো বছরের সংসার জীবন নির্বিঘ্নেই কেটে গেলো তার ।    

          সেদিন হঠাৎ পদ্মিনীর বাপের বাড়ির পাড়ার ছেলে এবং সেই নাট্যদলের তার পুরোনো বন্ধু নোটন এসে হাজির তার শ্বশুরবাড়িতে।আগামী দুর্গা পুজোয় শহরের বড়ো ক্লাবে তাদের যে নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা আছে, আর অন্যতম নায়িকা মঞ্জুষা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় দেখা দিয়েছে ভয়ানক বিপত্তি। নাটক ঠিক সময়ে মঞ্চস্থ করতে না পারলে পুজোকমিটি বিড়াট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবী করবে,বলে সতর্ক করে দিয়েছে  ।এদিকে হাতে বেশি সময়ও নেই। তাই নিজেদের এই আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে, নোটন আজ পদ্মিনীর কাছে ছুটে এসেছে। তার বিশ্বাস, একমাত্র সেইই উদ্ধার করতে পারে, তাদের এই সংকট থেকে। 

এদিকে, কিছুদিন হলো অবসর সময়ে কিছু লেখা লেখির অভ্যেস গড়ে তুলছিলো পদ্মিনী।  কিছু পত্র পত্রিকায় লিখছিলোও নিয়মিত। ইতিমধ্যে পাঠকমহলে বেশকিছুটা জনপ্রিয়তাও দেখা গিয়েছিলো তার। লেখালেখিতে নিযুক্ত থাকায় সংসারের কাজকর্ম বিঘ্নিত হচ্ছে কিছুটা। সেটা যেন সহ্য হচ্ছিল না বিভাষবাবু ও তাঁর মায়ের। স্ত্রীলোকের সংসারধর্মই প্রধান ও মূল কাজ, তারপর সময় পেলে অন্যকিছু। এটাই হলো তার শাশুড়ি মা ও বিভাষবাবুর বদ্ধমূল ধারণা। তাই মাঝে মধ্যেই বাড়িতে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হতো তাদের । তার উপর আবার অভিনয়ে অংশগ্রহনের ডাক! এটা তো পদ্মিনীর কাছে একটা উটকো দুঃস্বপ্নের মতো । কিন্তু মানুষ মাত্রই নিজেকে মেলে ধরতে চায়, আত্মপ্রকাশ করতে চায় স্বমহিমায়,  স্বীকৃতি পেতে চায় সবার মাঝে নিজের প্রতিভার , হলেও বা সে স্ত্রীলোক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যতই মুখে আমরা নারী স্বাধীনতার স্লোগান দিই না কেন, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এখনো কোথাও কোথাও স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে সেই মান্ধাতা আমলের ধারণাটা- বদলায়নি একটুও । তবে আশার কথা, সেই ছোটবেলার মুখচোরা মেয়েটা সংসার সমরাঙ্গনে পড়ে অনেকটাই বদলে গেছে এখন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছে সে, শিখেছে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকারটুকু দাবী করতে। তাই ঠিক করলো , নোটনের আহ্বানে সাড়া দেবে সে।              

 সেদিন বিকেলবেলা যথাসময়ে সংসারের কাজ সামলে, প্রস্তুতি নিয়ে রিহার্সালের জন্য বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। কিন্তু ভাগ্য অসহায়ক। বাড়ি ফিরতেই শুরু হলো তুমুল অশান্তি। শাশুড়ির গঞ্জনায় কান পাতা দায় হয়ে উঠলো। বিভাষবাবু দিলেন চরম হুঁশিয়ারি । তবে সেটাকে আমল দিলো না পদ্মিনী। নির্দিষ্ট দিনে নাটক প্রদর্শিত হলে, সেরা নাটকের পুরস্কার ছিনিয়ে নিলো সেটি। পদ্মিনীর অভিনয়ে চমৎকৃত দর্শকবৃন্দ অভিভূত হয়ে গেলো।পদ্মিনী ফিরে পেলো তার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের জগৎ, যা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে রীতিমত। যেখান থেকে সে নিয়েছিলো স্বেচ্ছানির্বাসন। কিন্তু তার বদলে সংসার তাকে কিছুই দেয়নি, যা দিয়েছে তা হলো একজন পরিচারিকার দর্যা। তাই আবার যোগ দিলো সে নাট্যদলে। এখন সে নিয়মিত অভিনয়ে অংশগ্রহণ করে থাকে। দেখতে দেখতে তার জনপ্রিয়তা অনেক দূর পৌঁছালো।রাজ্যের সেরা দল থেকে অভিনয়ের আমন্ত্রণ পেলো সে।  

এদিকে শাশুড়ির গঞ্জনার মাত্রাও দিনকে দিন বেড়ে চললো। --- এ আবার কেমন বৌ! কেমন ধারা মেয়েমানুষ! ধেই ধেই করে পরপুরুষদের সঙ্গে সঙ সেজে নেচে নেচে বেড়ায়! আমাদের সময়, আমরা তো স্বামীর সেবায় দিনরাত পড়ে থেকেছি। স্বামী বাইরে থেকে খেটে খুটে এলে, জল দিয়ে তার পা ধুইয়ে দিয়েছি। নিজের এলো চুলে তার পা জোড়া মুছিয়ে দিয়েছি। খাবার সময় পাশে বসে হাতপাখা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে  বাতাস করেছি। শোবার সময় পায়ে তেল মালিশ করেছি। শত লাথি ঝাঁটা খেয়েও, মুখে একটু রা কাড়িনি। আর এই মেয়ে কিনা কথায় কথায় উত্তর দেয়, নিজের অধিকার দাবী করে! নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। প্রতিভার স্বীকৃতি চায়! এ হেন মেয়েমানুষের তো গলায় দড়িই জোটা উচিত। মায়ের উস্কানি পেয়ে, বিভাষের গাত্রদাহের অগ্নিতে যেন ঘৃতাহুতি পড়ে। চিৎকার করে ওঠেন তিনি। ---- তুমি কি আমার সমকক্ষ হতে চাও! সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে চাও! সেলিব্রিটি হতে চাও! ক'পয়সা রোজগার করো তুমি এর থেকে?  এখানে থেকে এসব চলবে না। তাহলে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।            আর সহ্য হয় না পদ্মিনীর। রোজ রোজ একই তামাসা! কাঁহাতক আর বরদাস্ত করা যায়? উচ্চশিক্ষিতা সেও।বাংলা সাহিত্যে এম এ ডিগ্রী থাকা সত্ত্বেও সংসার করবে বলে প্রথমদিকে কোন রকম চাকরির চেষ্টা করেনি। নিজের সবটুকু দিয়ে মেয়েদের মানুষ করতে চেয়েছিলো। সংসারটাও তো একটা প্রতিষ্ঠান! এটা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো।তাই, সেখানেই নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে নিয়োজিত করতে চেয়েছিলো। আজ মেয়ে দুটো অনেক বড়ো হয়ে গেছে। নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছে! তাই সে খোলাবাতাসে প্রাণ খুলে একটু শ্বাস নিতে চেয়েছিলো!কিন্ত পারলো না! সংসার তাকে সে সুযোগ দিলো না। তাই বলে তার চোখরাঙানীকেও ভয় করেনি পদ্মিনী । কারণ তার জানা ছিলো তার এক বান্ধবীর বোনের কাহিনী। তার নাম ছিলো সুতপা। স্বামীর সকল ইচ্ছের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো সে, নিজের আত্মাভিমান কে জলাঞ্জলি দিয়ে। তার প্রতিটি কথায় উঠতো বসতো, প্রতিটা কথা সরল মনে বিশ্বাস করতো।এমন কি নিজের বাপেরবাড়ির সঙ্গেও সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলো সুতপা,তার কুচক্রী স্বামীর কথায় একান্তভাবে ভরসা করে। পাড়া প্রতিবেশী কারো সঙ্গেই মিশতো না সে । হয়তো মনের গভীরে কোন ক্ষত ছিলো তার, কিন্তু, নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছেও কখনো প্রকাশ করতো না  নিজের মনের ব্যথা। অবশেষে তিলে তিলে শেষ হয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নিঃশেষ করে দিলো সে নিজের জীবনকে। পদ্মিনী নিজেকে কিছুতেই সুতপার মত দুর্ভাগ্যের শিকার হতে দেবে না। তাই,সংসারের কঠোর বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলো সে,সব কিছু ত্যাগ করে।               

আজ সে একজন প্রতিষ্ঠিতা নাট্যশিল্পী, লেখিকা ও নাট্যকার। চারিদিকে তার অনেক নামডাক! অনেক টাকাপয়সা! এখন সে রীতিমত সেলিব্রিটি ! বড় বড় খবরের কাগজে ছাপা হয় তার নাম ও ছবি! আজ সে নারী হয়েও, একার প্রচেষ্টায় সমাজে নিজের একটা স্থান করে নিতে পেরেছে! কিন্তু তার বদলে হারিয়েছে অনেক বড়ো একটা জিনিস! তার মেয়েদের মুখ থেকে শোনা - সেই 'মা' ডাকটা ! সংসারের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও হারিয়েছে সে! বিভাষও তার সঙ্গে মেয়েদের আসতে দেয়নি। আর সেও সাহস করেনি নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে মেয়েদের সুদূর সম্ভাবনাময়  ভাগ্যকে জড়াতে! তাই খালি হাতেই বেরিয়ে এসেছিলো সে! 

বিভাষ অবশ্য বিয়ে করে নিয়েছে আরেকটা। নিজের ইউনিভার্সিটিরই এক ছাত্রীকে! কিন্তু পদ্মিনী হারিয়েছে তার সংসার! তার সঙ্গে হারিয়েছে তার মাতৃত্বও! এক অসম্ভব শূন্যতা গ্রাস করেছে আজ তার বিলাসবহুল বর্ণাঢ্য জীবনকে! এক সর্বহারার হাহাকার ভরিয়ে রেখেছে তার সবকিছু। সব থেকেও যেন কিছু নেই তার ! সংসার বঞ্চিত করেছে তাকে সব পাওয়া থেকে! সত্যি এটাই কি চেয়েছিলো সে? কেন, সংসার কি পারতো না দিতে তাকে একসঙ্গে  সবকিছু? বিভাষওতো সব সময় ডুবে থাকে তার নিজের জগতে, নিজের কাজের মধ্যে । স্ত্রী, সন্তান এমন কি মায়ের চেয়েও তার কাছে, তার কাজটাই বড়ো! কই তার জন্য, তাকে তো হারাতে হয়নি কোন কিছু? তাহলে পদ্মিনীকে কেন হারাতে হলো? আর কতদিন সহ্য করতে হবে- স্ত্রীজাতিকে এই বঞ্চনা? আর কতদিন পদ্মিনীর মত মেয়েদের হতে হবে নিজের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিচা?আর কতদিন? 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা