রেহাই

4th August 2020 9:51 am রাফিয়া সুলতানা
রেহাই



* রেহাই *
------রাফিয়া সুলতানা 

 কলকাতা শহরে একটা হাউজিং কমপ্লেক্সে থাকে অরিন্দম, স্ত্রী নন্দিনী ও পুত্র কৃষ্ণেন্দুকে নিয়ে। সকাল থেকেই নন্দিনীর বাড়িতে যেন ঝড় ওঠে একটা। স্বামীর অফিসের ভাত রান্না , ছেলের  স্কুলের টিফিন বানানো,  স্কুলের বই গোছানো, ছেলেকে স্নান করিয়ে, ড্রেস পরিয়ে রেডি করা,  সব মিলিয়ে একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড! নন্দিনী যেন তুফান এক্সপ্রেস বনে যায় তখন। অরিন্দম কে সি-অফ করে, কৃষ্ণেন্দু কে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে ,তবেই শান্তি! একটু যেন দম ফেলার ফুরসৎ পায় সে। তারপর ধীরে সুস্থে বাড়ির অন্যান্য কাজে হাত লাগায়। টুকিটাকি কাজ সেরে একটু বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে,টিভি দেখে নাহয় মোবাইলটা ঘাঁটা ঘাঁটি ক'রে আয়েস করে একটু। বেশ কয়েকদিন টানা বৃষ্টি হওয়ার পর আজ একটু থেমেছে। ঠাণ্ডা ফুরফুরে হাওয়ায়, ঘুমের আমেজে চোখটা যেন তাই এঁটে এসেছিলো । হঠাৎ একটা বাজ পড়ার বিকট আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেলো তার। তাকিয়ে দেখে, চারিদিক অন্ধকার করে মেঘ করে এসেছে আবার। ছুটে গিয়ে, ফ্রিজ আর টিভির প্লাগটা খুলে ফেলে, বাইরে মেলা ভিজে কাপড় গুলো একদৌড়ে তুলে এনে ঘরে ঢুকতেই একসঙ্গে অনেক গুলো মেসেজ যেন আছড়ে পড়লো তার মোবাইল টাতে। এমন সময় মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। 

            নন্দিনী মোবাইলের মেসেজ গুলো খুলে পড়তে থাকে, একটার পর একটা। এবারে বাজ টা যেন তার মাথাতেই ভেঙে পড়লো।জানতে পারলো, পাঁচদিন টানা প্রবল বর্ষণের জেরে অরিন্দমের বহুতল অফিসের কিয়দংশ হঠাৎ  ই ভেঙে পড়েছে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি পুরনো একটা বহুতল বিল্ডিং এ ছিলো তার অফিস। অরিন্দমের ই কলিগ এর বৌ-রা মেসেজগুলো পাঠাচ্ছে তাকে একটার পর একটা। তাদের স্বামীরাও এই দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।ফোন করে করে কেউ কোন সাড়া পাচ্ছে না তাদের স্বামী দের।সবাই খুব চিন্তিত। টি. ভি তে নাকি লাইভ দেখাচ্ছে সেই দুর্ঘটনার দৃশ্য। খবর টা শুনে, নন্দিনীর মাথার ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে যাচ্ছে,কিছুই ভাবতে পারছে না সে। এমন সময় দরজায় শোনা গেলো কলিংবেলের শব্দ। প্রতিবেশী লীলা বৌদি দৌড়ে এসেছে খবর টা পেয়ে। তাকে দেখে একটু সাহস সঞ্চয় করে টিভিটা খুললো নন্দিনী। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য সেট্ টপ বক্সে সিগন্যাল আসছিলো না। ফোন করলো অরিন্দম কে। বললো সুইচ অফ। ফলে টেনশন যেন আরো বেড়ে গোলো তার। ঠিক সেই সময় দাদা সমরেশের ফোন এলো তার মোবাইলে। সে তাকে আশ্বস্ত করে বললো, চিন্তা না করতে। সে নিজেই ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়ে দেখতে এসেছে ব্যাপারটা। দমকল বাহিনী ইতিমধ্যেই এসে হাজির হয়েছে সেখানে। যুদ্ধ কালীন তৎপরতার সঙ্গে উদ্ধার কার্য চলছে। প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা হাজির হয়ে তদারকি করছে উদ্ধার কার্যের। খারাপ আবহাওয়া জন্য উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে খুব। বাড়ির ভাঙা অংশ গুলো সরানো হচ্ছে ক্রেনে করে। ধ্বংস স্তুপ সরিয়ে বের করে আনার চেষ্টা হচ্ছে আঁটকে পড়ে থাকা বন্দী মানুষ জনকে। বেশ কিছু অফিস ছিলো সেখানে। সবাই প্রায় জীবন্ত সমাধিস্থ হয়েছে। রক্তাক্ত লাশের ছড়াছড়ি। নিকট আত্মীয় স্বজন দের কান্নার রোলে ভারী হয়ে উঠেছে সেখান কার বাতাস। এখনো অনেক ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেছে।  বেশির ভাগ দেহই উদ্ধার হলো একে একে। দুচার জন কে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেলেও, তারা গুরুতর ভাবে জখম হওয়ায় দ্রুত স্থানান্তরিত করা হলো নিকটবর্তী হাসপাতালে। 
কিন্তু ঘটনার পর বারো ঘণ্টা কেটে গেলেও, অরিন্দমের কোন খোঁজ পাওয়া গেলো না সেখান থেকে ।

      এখন প্রায় রাত বারোটা। নন্দিনী তো সারাদিন কেঁদে কেঁদে বেজায় অবসন্ন হয়ে পড়েছে। বাড়িতে দাদা, বৌদি, মা সবাই এসে উপস্থিত হয়েছেন। সকলে অরিন্দমের বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। সারা বাড়ির পরিবেশ শোক সন্তপ্ত এবং থমথমে।রাতে কারো তেমন খাওয়া দাওয়া হয় নি। কৃষ্ণেন্দু বার বার বাবার খবর জানতে চেয়ে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।  ছোটবেলায় পিতৃহারা হয়েছে নন্দিনী। মা কে দেখেছে সে, কত কষ্ট করে মানুষ করেছেন তাদের দুই ভাই বোন কে। শেষ পর্যন্ত তার কপালেও কিনা মায়ের দশাই জুটলো! কী পোড়া কপাল নিয়েই না জানি জন্মেছিল সে! কি করে মানুষ করবে সে এই টুকু ছেলেকে? সারা জীবন টাই বা কি করে কাটাবে অরিন্দম কে ছাড়া? ভাবতে ভাবতে দুচোখ বার বার অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। বুকটা ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। 

         এমন সময় হঠাৎ একটা ফোন আসায়, ক্লান্তি, অবসন্নতা কাটিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসে, মোবাইল টা হাতে নিলো নন্দিনী। ভিডিও কল। স্ক্রীনে ভেসে উঠলো অরিন্দমের মুখ। 

যারপরনাই বিস্মিত ও আশ্বস্ত হয়ে নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলো, অরিন্দম কে, "তুমি কোথায় আছো ? কি করছো? "

"আর বলোনা, এতো ব্যস্ততার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলাম যে, ফোন করার অবকাশ টুকুও পাইনি।" -------ওপার থেকে ভেসে এলো অরিন্দমের কণ্ঠস্বর।

 তার সব কথা শুনে যা বোঝা গেলো তা হলো এই যে, আজ অফিস যাওয়ার পথে, বাল্য বন্ধু দীপকের স্ত্রী ,বাসবীর একটা এমারজেন্সী ফোন পেয়ে আর অফিসে যাওয়া হয়নি অরিন্দমের।  হঠাৎ সকাল বেলা সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় বন্ধু দীপকের। দীপকের নিঃসন্তান স্ত্রী অত্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ফোন করে অরিন্দম কে তার সাহায্য চেয়ে। অরিন্দম তড়িঘড়ি তার গন্তব্য বদলে ,গাড়ি নিয়ে ,হাজির হয় বন্ধুর বাড়ি। তাড়াতাড়ি হসপিটালে ভর্তি করে তাকে। শুরু হয় যমে মানুষে টানাটানি। মস্তিষ্কে ক্লট জমে যাওয়ায়, এমারজেন্সী অস্ত্রোপচার করতে হয় দীপকের মাথায়। দীর্ঘক্ষণ অপারেশনের পর,অবস্থার কিছু টা উন্নতি হলেও, জ্ঞান ফিরছিলো না দীপকের। খুব কান্নাকাটি করছিলো বাসবী। তাই তাকে একলা ফেলে আসতে পারছিল না অরিন্দম । এইমাত্র জ্ঞান ফিরে আসায়, সবাই এখন স্বস্তিতে। টেনশনে এতক্ষণ কোন হুঁশ ই ছিলো না অরিন্দমের। তাই এখন সম্বিত ফিরে পেয়ে খবর টা জানাচ্ছে সে। আজ আর বাড়ি ফিরতে পারবেনা । কাল সকালে ফিরবে। 
খবর টা পেয়ে নন্দিনী ও তার বাড়ির লোকেরা কী যে রেহাই পেলো,দুঃসহ এক যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি থেকে, সে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? বার বার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে লাগলো সবাই, অরিন্দমকে সুস্থ ও বহাল তবিয়তে ফিরে পাওয়ার জন্য। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা