হারিয়ে পাওয়া

10th August 2020 8:09 pm রাফিয়া সুলতানা
হারিয়ে পাওয়া



* হারিয়ে পাওয়া*
রাফিয়া সুলতানা 

মোবাইলের মেসেঞ্জারে লেখাটা ভেসে উঠতেই দিলীপ বাবুর চোখটা আনন্দাশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এলো। আতিক  ওরফে আতিকুর রহমানের বয়স এখন বছর পঁচিশেক । প্রতীক থাকলে, আজ সেও এতবড়োই হতো। একথা মনে পড়লে আর কষ্ট হয়না দিলীপবাবুর। আতিকের মধ্যেই পরিপূর্ণ রূপে ফিরে পান তিনি প্রতীককে। 

সম্প্রতি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন দিলীপবাবু। হঠাৎ  দীর্ঘদিনের কর্মজীবন শেষ হয়ে যাওয়ায়, সময় যেন কাটতেই চায় না আর। ক্লান্তিকর অবসরে কেমন যেন নাভিশ্বাস হয়ে ওঠেন তিনি। মোবাইলটাই এখন একমাত্র সম্বল। অসময়ের বন্ধু। ফেসবুকে পুরনো বন্ধু দের খুঁজে বের করা এখন নতুন কাজ হয়েছে ওঁর। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় কেটে যায় অনেকটা সময়। ছেলে বাইরে। পত্নী ঘরসংসারে ব্যস্ত। তাই এই মোবাইল ই এখন তাঁর অবসরের সঙ্গী। 

আজ থেকে প্রায় বছর আঠেরো আগের কথা। তাঁর বয়স তখন বছর বিয়াল্লিশ ।একটি হাইস্কুলের জনপ্রিয় ও স্বনামধন্য  গণিত শিক্ষক তিনি। সাত বছরের ছেলে প্রতীকও বাবার মতোই মেধাবী। দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র সে। বরাবরই ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে আসছে। বিয়ের পর দশ বৎসর যাবৎ কোন সন্তান সন্ততির মুখই দেখেননি দিলীপবাবু ও স্ত্রী দামিনী। অনেক চিকিৎসা চলেছে দামিনী দেবীর। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নি। দুটো ফেলোপিয়ান টিউবই ব্লক ছিলো তাঁর। তাই অগত্যা টেস্টটিউব বেবীরই জন্ম দেন তিনি। হ্যাঁ, তাঁদের ছেলে, প্রতীক একটি টেস্টটিউব বেবী।তাই আর কোন ভাই বোন নেই তার। বাবা মায়ের অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতীক সে। তাই এরকম নাম করণ। শুধুমাত্র পড়াশোনাতেই নয়, খেলাধুলাতেও সমান তুখোড় সে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পাওয়া প্রাইজ আর ট্রফিতে মায়ের শো-কেস ইতিমধ্যে প্রায় ভরে গেছে একেবারে। প্রাণচঞ্চল ও সপ্রতিভ এই ছাত্রটি খুবই প্রিয়পাত্র স্কুলের সমস্ত শিক্ষক সমাজে। প্রতীক বলতে সকলেই অজ্ঞান।ক্লাসের অপর এক ছাত্র আতিক।তারও নাম প্রায় সমোচ্চারে উচ্চারিত হয় প্রতীকের সঙ্গে। স্কুলের আর এক রত্ন সে। যদিও তার স্বভাব একটু আলাদা। শান্ত, শিষ্ট, নিরীহ ধরনের ছাত্র সে। প্রতীক আর আতিক যেন মানিক জোড়। দুই ভিন্ন বাবা মায়ের সন্তান হলেও চেহারায় তাদের অদ্ভুত সাদৃশ্য। সেই যে প্রথম যেদিন স্কুলে ভর্তির দিনে, ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রতীক কে  একা রেখে চলে যান দিলীপ বাবু, প্রতীকের সেদিন সেকি কান্না! যেন পৃথিবীর কোন এক জন অরণ্যে হারিয়ে গেছে সে। এই রকমই মনের অবস্থা হয়েছিলো তার। সে, বছর চারেকের শিশু তখন। এ পর্যন্ত কোনদিনই কোথাও সে মাকে ছেড়ে থাকে নি। আর এখানে তার বাবাও নেই, মাও নেই। তাই তার এই অবস্থা। অনেক বাচ্চারই  তার মতো অবস্থা হয়েছিলো সেদিন। তারাও কাঁদছিলো হাপুস নয়নে ।সেদিন পাড়ার ছেলে, ছোট্ট আতিকই হাত ধরে নিয়ে এসে তার পাশে বসিয়ে ছিলো প্রতীক কে। সান্ত্বনা দিয়েছিলো তাকে। সেই থেকে, যে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো তাদের, আজও তা সমান  ভাবেই চলে আসছে।

 রাস্তার ওপারে টিনের চালাঘরে বসতি আতিকের। দুস্থ পরিবারে জন্ম হলেও, তার মেধাশক্তি ,প্রতীকের থেকে কোন অংশেই কম নয়। তাকে পড়া দেখিয়ে দেবার কেউ নেই। তা সত্বেও নিজের চেষ্টাতেই সে ক্লাসে দিব্যি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আসছে।তার বাবা আনিসুর রহমান পেশায় রাজমিস্ত্রী । জীবিকার খোঁজে প্রায় তাকে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হয়। আতিকের আরো দুটো ছোট ভাই বোন আছে। মা ফতেমা একা হাতেই সামলায় তার ঘরসংসার। মাঝে মধ্যেই টাকা পয়সার জন্য দিলীপবাবুর দ্বারস্থ হয় সে।দিলীপবাবু কখনো ফেরান না তাকে। একমাত্র সন্তানের প্রিয় সাথীর মা সে। স্বামী টাকা পাঠালে, যথারীতি আবার ধার পরিশোধ করে দেয় ফতেমা।

সব ঠিক ঠাক ই চলছিলো এ পর্যন্ত । কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! "চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়.. "! হঠাৎ এক অজানা জ্বরে আক্রান্ত হলো প্রতীক। কিছুতেই জ্বর আর ছাড়ে না তার।চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। সেখানে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো, মারণ ব্যাধি লিউকোমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত সে। বিনামেঘে যেন বজ্রপাত হলো দিলীপবাবুর মাথায়। দামিনী শুনেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। তবুও মন শক্ত করে তাঁরা চালিয়ে গেলেন এক অসম-সংগ্রাম, নিয়তির বিরুদ্ধে। চললো চিকিৎসা। জলের স্রোতের মত বেরিয়ে গেলো টাকা পয়সা, গয়নাগাটি। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খণ্ডাবে কে?ধীরে ধীরে প্রদীপ  নিবু নিবু প্রায়।দিলীপবাবু আর দামিনীর জীবনে নেমে আসছে এক নিশ্চিত শূন্যতার তমসাচ্ছন্ন অন্ধকার।ছেলেই পথ দেখালো তাঁদের, এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার। বুদ্ধিমান ছেলে প্রতীক। তার বুঝতে বাকি রইলো না যে, সে আর বেশীদিন বাঁচবে না। একদিন বাবা মাকে ডেকে নিয়ে সে বললো, 

"আমি মরে গেলে, তোমরা দুঃখ কোরো না। আতিক বলেছে, শৈশবে কেউ মারা গেলে, সে বিনা বিচারে বেহেস্ত বা স্বর্গে যায়। কাজেই আমিও স্বর্গে যাবো। আমার জায়গায় তোমরা আতিক কে ছেলের মতো দেখো। ও খুব ভালো ছেলে। ওকে আমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। ওকে পড়া দেখানোর কেউ নেই। আমিই ওকে অঙ্ক দেখিয়ে দিতাম। আমি চলে গেলে ওর খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। বাবা তুমি ওকে অঙ্ক দেখিয়ে দিও। তাহলে স্বর্গে থেকেও আমি তা দেখে খুব খুশি হবো। "

এই বলে সে দুচোখ বন্ধ করে নিলো। বাবা মা হাউমাউ করে কেঁদে আছড়ে পড়লেন তার ছোট্ট শরীরের উপর। 

কিছু দিন পর খবর এলো, রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে গিয়ে ,বহুতল বাড়ির দেওয়াল থেকে মাচা ভেঙ্গে পড়ে আনিসুর রহমান অকালে প্রয়াত হয়েছে। ফলে,অভাবে পড়ে তার ঘরসংসার ভেসে যাবার উপক্রম হলো। আনিসের বিধবা বৌ ফতেমা সব গুটিয়ে গাটিয়ে বাপের দেশে যাওয়া মনস্থ করলো। দিলীপবাবু ও দামিনী গিয়ে তার হাতে পায়ে ধরে তাকে সেখানে থেকে যেতে মিনতি করলেন। কিন্তু কিছুতেই রাজি হলো না সে। অগত্যা আতিক কে তাঁরা দত্তক হিসাবে ভিক্ষা চাইলেন। আতিকের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অবশেষে রাজি হলো ফতেমা। দিলীপবাবু তাকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কিছু মাসোহারা পাঠিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। 

সেই থেকে অতি যত্নে আদরে পুত্র স্নেহে লালন করে আসছেন তাঁরা আতিক কে। আজ সে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। দুদিন আগে একটা ইন্টারভিউ দিতে সে গেছিলো মুম্বাই এ। সেখানে একটি বহুজাতিক সংস্থায় সফ্টওয়ের ইঞ্জিনিয়র এর চাকরি পেয়েছে আতিক। মেসেঞ্জারে সেই খবরটাই দিয়েছিলো আজ বাবাকে । আনন্দে আত্মহারা হয়ে দিলীপবাবু পড়িমড়ি করে ছুটে গেলেন রান্নাঘরে ,স্ত্রী কে সুখবরটা দিতে। খবরটা পেয়ে আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন দামিনী ,স্বামীকে। এতদিনের সাধনা তাঁদের সার্থক হয়েছে আজ। প্রয়াত ছেলের কথা রাখতে পেরেছেন তাঁরা। যেন তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন স্বর্গ থেকে প্রতীকের প্রসন্ন হাসিমুখ! তাই, হারিয়ে পেলেন তাঁরা আজ আবার ছেলেকে  ! 

 

 

 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা