ত্যাগ

10th August 2020 8:29 pm রাফিয়া সুলতানা
ত্যাগ


* ত্যাগ *
---রাফিয়া সুলতানা 
06.05.20

বড্ড ব্যস্ত আজ সুজাতা। দিদির বিয়ের সব আয়োজন তাকেই তদারকি করতে হচ্ছে কিনা! দুই বোনের মধ্যে, ছোট থেকেই সংসারের সব ব্যাপারে দিদির চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীলা সে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।এতদিন ধরে বিয়ের সব বাজারহাট, কেনাকাটা বাবার সাথে, তাকেই করতে হয়েছে। আজ বরকে বরণ করার দায়িত্বও ছিলো তার। বরযাত্রী ও অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়ন সবকিছুই সামলাতে হচ্ছে একা হাতে । 

গাঢ় নীলরঙের বেনারসী ও মুক্তালঙ্কারে সেজেছে সে। মাথায় গুঁজেছে বেলফুলের মালা। একেই সুন্দরী। তার উপর আজ যেন আরো মোহময়ী দেখাচ্ছে তাকে! কিছুতেই যেন চোখ ফেরানো যাচ্ছে না তার থেকে! 
আসলে এমন মনোহারী সেজেছে সে ঠিক দিদির বিয়ের জন্য যতটা না, ততটা --সেই মানুষটার জন্য। সে যে প্রথম আসবে আজ তাদের বাড়িতে। খুব লাজুক স্বভাবের কিনা! কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না। অনেক পটিয়ে পাটিয়ে শেষ অবধি রাজি করাতে পেরেছে তাকে। তারই জন্য মনের মাধুরী মিশিয়ে এত যত্ন করে সেজেছে আজ সুজাতা , তারই দেয়া মুক্তাহারটি গলায় দিয়ে। যেটি সে তাকে জন্মদিনে প্রেজেন্ট করেছে এবার, চাকরির প্রথম মাইনা পেয়ে। ঠিক করেছে সুজাতা দিদির বিদায়পর্ব সমাধা হয়ে গেলেই বাবা মায়ের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে , এবারে তুলবে সে কথাটা। অরূপের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা। আজ দুবছর হতে চললো তাদের পরিচিতি। অরূপের চাকরিটা পাওয়ার পর থেকেই তার বাবা মা খুব তাগাদা দিচ্ছেন তাকে বৌ ক'রে ঘরে নিয়ে আসার জন্য। শুধু দিদির বিয়েটার জন্যই অপেক্ষা করছিলো এতদিন  । 

বিয়ের লগ্ন হয়ে এলো। পুরুতমশাই তাড়া দিচ্ছেন। দিদিকে নিশ্চয় এতক্ষণে সাজানো হয়ে গেছে। তবু একবার সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিতে হবে শেষবারের মত। হন্তদন্ত হয়ে দিদির ঘরের দিকে পা বাড়ালো সুজাতা। হঠাৎ বাবা-মায়ের ঘর থেকে ভীষণ তর্কাতর্কির আওয়াজ ভেসে এলো কানে। উঁকি মেরে দেখে -- মা নিজের মনে গজগজ করছেন আর বাবা মাথায় হাত দিয়ে ঘাড় নীচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। 
"কী হয়েছে বাবা? " সুজাতা কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বাবা বলে উঠলেন - "তোর মাকে জিজ্ঞাসা কর! "
মা'র দিকে সুজাতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, 
" দ্যাখ না! তোর বাবাকে পইপই ক'রে বললাম, বিয়েটা ফাইনাল করার আগে মেয়েটার মতটা জেনে নাও। আজকালকার মেয়ে! মনে তার কী আছে কিছুই বলা যায় না! বিয়ে ঠিক হওয়া অবধি মেয়েটা কেমন যেন গুম্ মেরে আছে!বরাবরই চাপা স্বভাবের মেয়ে । ঠিক ক'রে কথাও বলে না কারোর সঙ্গে! আমার কেমন যেন সুবিধার ঠেকছে না! 
তা-কিছুতেই শুনলো না! বললো,  আমি এক কথার মানুষ। যেই কথা, সেই কাজ।আমি যা বলবো, সেটাই হবে! 
নাও! এখন ঠেলা সামলাও! শ্রীজাতাকে অনেক্ষন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সারা বাড়ি তন্নতন্ন ক'রে খোঁজা হয়েছে। কোথ্থাও নেই! মেয়েটা শেষ পর্যন্ত যে এমন সর্বনাশা কান্ড করবে কে জানে? পাপিষ্ঠা! এই ছিলো তোর মনে? পরিবারের  মান মর্যাদার কথা একবারও ভাবলি না! এদিকে বর কতক্ষন হলো--- এসে বসে আছে! লগ্ন বয়ে যাচ্ছে! কি হবে এখন?"
 
মা'র কথাটা শেষ হতেই বাবা হঠাৎ উঠে এসে সুজাতার হাতদুটো ধরে কাঁদতে কাঁদতে মিনতি ক'রে বলে উঠলেন, " মা! এই দুঃসময়ে একমাত্র তুইই পারিস আমাদের মান বাঁচাতে! তুইই পারিস মা!"

 সুজাতা যারপরনাই বিস্মিত হয়ে বললো," মানে? "

বাবা তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "মা! তোকেই বসতে হবে বিয়ের পিঁড়িতে! দোহাই মা আমার ! অমত করিস না! বাঁচা আমাদের এ যাত্রা! নইলে আমার মানসম্মান সব চলে যাবে! ধুলোয় মিশে যাবো আমি!"

সুজাতার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো! কি হবে তবে তার ভালোবাসার? কি হবে অরূপের?এতদিন ধরে এতো আশা! এতো স্বপ্ন! কি হবে তার! এক- লহমায় একটা দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে যাবে? সে শুনলে নির্ঘাৎ আত্মঘাতী হবে! বড্ড নরম মনের মানুষ ও! সুজাতা আর ভাবতে পারছে না! মাথাটা কেমন যেন অসার হয়ে আসছে! চোখে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার! 

এর পর ঘন্টা তিনেক গড়িয়ে গেছে। 
নিমন্ত্রিত অরূপ বিয়েবাড়িতে এসে  অবধি এ বাড়ির কাউকেও দেখতে  না পেয়ে বেশ বিব্রত বোধ করছিলো।  অবশেষে একজনের পীড়া পীড়িতে প্যান্ডেলে খেতে বসে উসখুস করছে। ।এদিকে পাতের উপর একটার পর একটা আইটেম পড়ে চলেছে। কতক্ষণ আর না খেয়ে থাকবে সে? কোনক্রমে দমবন্ধ ক'রে খাওয়াদাওয়া সেরে ছাদনাতলার দিকে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলো অরূপ । কন্যাসম্প্রদান হচ্ছে সেখানে। নাঃ! ভিড়ের মধ্যে সেখানেও তো দেখা যাচ্ছে না তাকে! দেখা যাক ফোনটা লাগিয়ে! মোবাইলটা সুইচ-অন করতেই পরপর কয়েকটা মেসেজ আছড়ে পড়লো তাতে।আর স্ক্রীনটা তুলতেই তাতে ভেসে উঠলো সুজাতার মুখখানা। চটপট খুলে দেখলো, তাতে লেখা আছে বেশ কয়েকটা লাইন

--ক্ষমা কোরো আমায়! আমি নিরুপায়! 

--বাবার মানসম্মান রক্ষা করতে আমার এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না! 

---দিদি না ব'লে কোথায় চলে গেছে! তাই তীব্র মনোকষ্ট ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েই আমায় বসতে হলো  বিয়ের পিঁড়িতে! 

----তোমার অনুমতি নেওয়ার কোনো সুযোগ , উপায় বা সাহস কোনটাই ছিলো না আমার ! 

----পারলে ক্ষমা কোরো আমায়! ক্ষমা কোরো!!

----ভালো থেকো! 

----বিদায়! 

শেষের কথাটায়  বুকটা ছ্যাঁৎ ক'রে উঠে, অরূপ কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলো ! কিছুই তার মাথায় ঢুকতে চাইছে না!  কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো খানিকক্ষণ।সুজাতার কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কানে বেজে চলেছে এক- নাগাড়ে ! এবারে ভালো ক'রে চোখ তুলে মঞ্চের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো,মাথা নীচু ক'রে বলির পাঁঠার মত বসে আছে সুজাতা সেখানে, কনের সাজে। আর পিতার হাত দিয়ে বরসাজে বসে থাকা পাত্রের হাতে তার সম্প্রদান হচ্ছে!

সে দৃশ্যে অরূপ যেন মুষড়ে পড়লো একেবারে! অব্যক্ত ও অসহ্য এক যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলো তার বুকের ভিতরটা! ঝাপসা হয়ে এলো দুচোখ! একটানা সানাইয়ের করুণ সুর যেন আর্তস্বরে কেঁদে কেঁদে উঠছে --তার ব্যথায় সমব্যথী হয়ে! 

ধীর পায়ে মাথা নীচু করে সেখান থেকে ফিরে যেতে যেতে ভাবলো অরূপ---দুর্বিষহ হলেও বৃহত্তর প্রেক্ষিতে জীবনে কখনো কখনো বিসর্জন দিতে হয় ---নিজস্ব এই স্বার্থ! 
মেনে নিতে হয় , মহৎ এই ত্যাগ! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা