পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব

14th August 2020 12:57 pm রাফিয়া সুলতানা
পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব


* পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব *
----- রাফিয়া সুলতানা 
31.03.20

একদিন আমার ছোট ছেলে টিভিতে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলো। সেটাতে পৃথিবীর রিমোট কিছু অঞ্চলে বহু প্রাচীন এমন কিছু স্ট্রাকচারের অস্তিত্ব দেখাচ্ছিলো, যে গুলো কিনা নির্মাণ করা মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। কেবলমাত্র বহির্জগতের কোন প্রাণী বা এলিয়েনের পক্ষেই তা নির্মাণ করা সম্ভব ।অর্থাৎ প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছিলো, পৃথিবীর বাইরে অন্য কোন গ্রহে অন্য কোন প্রাণী বা এলিয়েনের অস্তিত্ব  আছে এবং কোনদিন পৃথিবীতে তাদের আগমন ঘটেছিলো। 

আবার একদিন আরেকটা প্রোগ্রামে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছিলো,   এলিয়েনরাই পৃথিবীতে এসে মানুষের বংশ বিস্তার করেছে। অর্থাৎ মানুষ আসলে অন্য গ্রহ থেকে আসা প্রাণীকুলের বংশধর ।ছেলে  এ ব্যাপারে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলে, আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম, ঠিকই তো! বাইবেল এবং কোরান অনুযায়ী মানুষের আদি পিতা ও মাতা যদি আদম ও ইভ ,ওরফে বিবি হাওয়াকে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে তো মানুষ এলিয়েনের বংশধরই হলো। মানে সে- পৃথিবীর বাইরে থেকেই এসেছে! 
আমি জানি,এটা শুনে, যারা অতি বিজ্ঞান মনস্ক বা ডারউইনের বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী, অর্থাৎ যারা বিশ্বাস করেন মানুষ বানর থেকে এসেছে, তাঁরা সকলেই সমস্বরে হৈ হৈ করে উঠবেন! 
তা উঠুন, আমার বিশেষ আপত্তি নেই! আমি মনে করি,সকলেরই তার নিজের নিজের মতো করে ভাববার বা মত প্রকাশের অধিকার আছে । আর তা করি বলেই, আমার নিজস্ব মত প্রকাশের এই সাহস টুকু দেখালাম! 

এক কথায়, সাপ থেকে ব্যাঙ, ব্যাঙ থেকে পাখি, বানর থেকে মানুষ, ডারউইনের এই তত্ত্ব আমার না পসন্দ! কোন রকম জটিল বিশ্লেষণে না গিয়েই আমি বলছি, ডারউইনের এই তত্ত্ব নিয়েও অনেক বিতর্ক ও অসংগতি আছে! আসলে কি বলুন তো? বিতর্ক করাই মানুষের স্বভাব ! স্বভাব অন্যের মত অমান্য করা! সেই জন্যই তো বলছি, মানুষ এ স্বভাব আদম ও ইভের কাছ থেকেই পেয়েছে! কেন? 
ঐ যে  বারণ করা সত্ত্বেও তারা নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলো! তাই তো ঈশ্বর বা আল্লাহ্ বা গড্ তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পৃথিবীতে নামিয়ে দিলেন! সেই সঙ্গে তাদের কুমন্ত্রণা দাতা শয়তানকেও! তার মানে পৃথিবীতে শয়তানেরও গুষ্টি আছে! 
থাক। সেই প্রসঙ্গে নয় আরেকদিন বলবো। 

হ্যাঁ যা বলছিলাম। যদি বিবর্তনবাদ অনুযায়ী ধরেও নেওয়া যায়, প্রাণের অস্তিত্ব এক কোষী প্রাণী অর্থাৎ অ্যামিবা থেকে,এবং তারও অাবির্ভাব একটা মাত্র ডি এন এ বা প্রোটিন থেকে, এবং প্রোটিনের উদ্ভব হঠাৎ এক অঘটন থেকে! যাতে কিনা কোন এক- দুর্যোগের রাতে কোন এক- বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গের প্রভাবে বাতাসের নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন হঠাৎ জুড়ে গিয়ে সৃষ্টি করলো অ্যামাইনো অ্যাসিডের, যা নাকি পরবর্তীতে প্রোটিনের উৎস! তারপর তা থেকে পর পর বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, মানুষের সৃষ্টি! তা যদি হয়, তাহলে উদ্ভিদ ও প্রাণী দুটিরই সৃষ্টি এক জায়গা থেকে, কারণ উদ্ভিদ ও প্রাণীর ডি এন এ অর্থাৎ মূল জৈবিক এককের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।কি সাংঘাতিক, তাই না? 
কিন্তু উদ্ভিদের ক্লোরোফিল বা সবুজকণা আছে, যা দিয়ে সে সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে খাবার তৈরী করে। তাহলে সেটা আবার এলো কোথা থেকে ? ভীষণ ধন্দ! তাই নয় কি? 

তাই এই তত্ত্ব আমার না পসন্দ!আমার মতে, মানুষ পৃথিবীর বাইরে থেকেই এসেছে। বিজ্ঞান এখন গবেষণায় ব্যস্ত পৃথিবীর বাইরে আর কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা। আর কোন গ্রহে থাক বা না থাক, স্বর্গে আছে। হ্যাঁ আমরা যারা পরকালে বিশ্বাস করি, তারা মানি যে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে, স্বর্গ বলে একটা স্থান আছে। সেখানে খোদ সৃষ্টি কর্তা থাকেন। আর পৃথিবীতে যারা ভালো কাজ করবে, সেই সব মানুষদেরও মৃত্যুর পর সেখানে স্থান হবে। 
স্বর্গে ঈশ্বর বা আল্লাহ্ বা গড্ যেমন আছেন, তেমন আছে সৃষ্টি জগত পরিচালনার জন্য তাঁর সাহায্য কারী অজস্র দেবদূত বা ফেরেস্তা বা অ্যাঞ্জেল।অর্থাৎ, আবার সেই এলিয়েন! 

এবার প্রশ্ন হলো, সব মানুষ যদি  এক পিতা মাতা থেকে এসে থাকে তবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের চেহারার মধ্যে এতো পার্থক্য কেন? আফ্রিকার নিগ্রোরা একরকম, আবার ইউরোপীয়, এশিয়োরা আরেক রকম! 
দেখুন, আমরা যদি একটি এলাকায়  কিছুটা জায়গার একদলা ঘাসের উপর কিছু ইট চাপা দিয়ে দিই, তাহলে কিছুদিন পর দেখবো ইটচাপা ঘাস গুলি হলুদ হয়ে গেছে। আবার আমরা যদি লক্ষ্য করি তো দেখবো, আমাদের শরীরের যে অংশটা কাপড় চোপড়ে ঢাকা থাকে, সেটা শরীরের উন্মুক্ত অংশের চেয়ে বেশ অনেকটা ফর্সা ! অর্থাৎ বাহ্যিক পরিবেশ অনুযায়ী ঘাস বা আমাদের শরীরে পরিবর্তন ঘটে। ঠিক এমনি ভাবেই যুগ যুগান্তর ধরে পৃথিবীতে বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের  চেহারার  মধ্যে বৈসাদৃশ্য এনে দিয়েছে। বৈসাদৃশ্য এনে দিয়েছে তার আচার ব্যবহারে, ভাষায়, খাদ্যাভ্যাসে, পোষাকে পরিচ্ছদে। তাই এতো বিভিন্নতা! বিশ্বাস করার উপায় নেই, তারা সবাই এক মানব মানবী থেকে এসেছে! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা