ওরাও যে পিছু টানে

17th August 2020 11:05 am রাফিয়া সুলতানা
ওরাও যে পিছু টানে


* ওরাও যে পিছুটানে *
----- রাফিয়া সুলতানা 
01.10.19

বেশ ক'মাস থেকেই রুমেলার শরীরটা ঠিক ভালো যাচ্ছে না। কীযে দুরারোগ্য ব্যামোয় ধরলো তাকে! সর্বাঙ্গে একটা ব্যথা যেন সর্বক্ষণ লেগেই আছে। অনেক ডাক্তার, কবিরাজ দেখিয়েও ভালো হচ্ছে না। মেজাজটা সবসময় তাই তিরিক্ষি হয়ে থাকে তার। কথায় কথায় তাই বাড়িতেও ঝামেলা বেধে যায় পরিবারের সঙ্গে । খাওয়া দাওয়াও ঠিকমতো করতে ইচ্ছা করে না। ওজনও কমে গেছে অনেক।মনটাও ভেঙে গেছে, চলে গেছে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাও! তাই সে ঠিক করেছে বেশ ক'দিন বাপের বাড়িতে থেকে আসবে। আজ বিকালে তাই  ঘুরতে এসেছে , বাচ্চাদের নিয়ে এলাকার এই পার্কটায়। শেষবারের মত বিদায় জানাতে এখানকার গাছপালা, ফুলের বাগান, বাচ্চাদের দোলনা, নাগরদোলা, সুইমিং পুল,জলের ফোয়ারা আর পরিচিত সেই বেঞ্চিগুলোকে। যেখানে সে রোজ এসে বসতো বাচ্চাদের নিয়ে। হ্যাঁ, রোজ বিকেলে আসতো সে তাদের নিয়ে এখানে, বেড়াতে। বাচ্চাদের দোলনায় দোলাতো, ঢেকিতে চড়াতো, আর পার্কের বেঞ্চিতে  বসে বসে সেখানকার ভেসে আসা বিভিন্ন ধরনের গান শুনতো সে বেশ মনযোগে সহকারে । লতা, হেমন্ত, সন্ধ্যার গলায় খুব সুন্দর সুন্দর পুরনোদিনের গান সব। হেমন্তের গলায় -আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা, আর কতকাল আমি রবো দিশাহারা, কিংবা লতার কন্ঠে - ওরে মন পাখি, কেন ডাকাডাকি, থাক না গোপনে ----কত যে সুরেলা, কত  যে মধুর সেই গানগুলো ! কাল থেকে আর আসা হবে না তার, ভাবতেই বুকটায় একটা চাপা কষ্টের ঢেউ খেলে গেলো যেন। ফেরার সময় শেষবারের মত তাকালো সারি সারি দেবদারু গাছগুলো আর ক্যান্টিনটার দিকে, যেখান থেকে সে ছেলেদের ম্যাঙ্গো জুস কিনে খাওয়াতো । বড় যেন মায়া জড়ানো মলিন চোখে তাকিয়ে আছে তারা সবাই তার দিকে! কি যেন বলতে চাইছে ওরা! রুমেলা চুপচাপ ফিরে যায় সেখান থেকে, ছেলেদের হাত ধ'রে। 

ক'দিন হলো, তার অসুখের খবর পেয়ে মা এসেছেন এখানে । তাঁর সঙ্গেই সে আজ চলে যাবে বাপেরবাড়ি । রুমেলা যেন টের পাচ্ছে, তাই আজ ঘরের পরিবেশটাও বেশ যেন একটু থমথমে।দরজা, জানালা, তাতে ঝোলানো পর্দাগুলো তার শাড়ির আঁচল ছুঁয়ে যেন বলতে চাইছে,
 " সত্যি সত্যি চলে যাবে আমাদের ছেড়ে? আমরা কী দোষ করেছিলাম? সুখদুঃখের কত না সময় কাটিয়েছো আমাদের সঙ্গে! তোমার কত হাসিকান্নার সাক্ষী হয়েছি আমরা! বিছানায় শুয়ে শুয়ে একাকী কত অলস সময় কাটিয়েছো আমাদের মাঝে! জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকেছো, দূরে নদীর বাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্বত্থ আর ইউক্যালিপটাস গাছটার দিকে। তাদের ঝিরিঝিরি পাতায় বাতাসের দোলা দেখেছো। তার তলায়  বসে থাকা  মাতালটার সেই গানটা শুনেছো ,  
" এ দুনিয়া, এ মেহফিল --- মেরে কাম কি নেহি,মেরে কাম কি নেহি----" কত উৎসুক হয়ে! 
বারান্দা বললো," আমার কাছে বসে ছেলেকে তেল মাখাতে মাখাতে বাগানের সাইকাস গাছটার দিকে কতবার চেয়ে দেখেছো! তার কচি কচি পাতার ঝাড়গুলো! সব ভুলে 
আমাদের ফেলে তাহলে চলেই যাচ্ছো! "

রুমেলার বুক চিরে বেরোয় শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস! 

-----------------
বছর দুয়েক পর 
---------------------
রুমেলা ছেড়ে যাচ্ছে বাপেরবাড়ি। শুরু হয়েছে গোছগাছ, তোড়জোড়! 
" সেকি! তুমি চলে যাবে? এরকম তো কথা ছিলো না!" বললো খাট, পালঙ্ক ,আলনা ,আলমারি চেয়ার, টেবিল। 
" তবে যে তুমি বানালে আমাকে, সাজালে যত্ন করে? " বললো রান্নাঘর,বাথরুম,টয়লেট।আলমারিতে রাখা বই। ঘরের দেওয়াল বললো, 
" তবে যে তুমি টাঙালে আমার গায়ে তোমার আঁকা ছবিগুলো, দেয়ালঘড়ি? খুলে নিচ্ছো কেন আবার? চলে যাবে তুমি? আমাদের কি হবে? বড় যে ভালবেসেছি তোমায়, তোমার ছেলেদের? কে কাটবে আমাদের গায়ে আঁকিবুকি? কে করবে দৌড়াদৌড়ি হুটোপাটি মেঝের উপর, ছাদের সিঁড়িতে? যাও তবে। তবে ভুলে যেও না যেন আমাদের। "
-----------------------------------

বছর চারেক হলো তারা এসেছিলো  কলকাতার কাছে এই শহরটার এই ভাড়াবাড়িটাতে। স্বামী কোম্পানি বদলে এসেছে এখানে। বড় বড় দুটো কামরা আর একটা ছোট ঘর। পুরনো আদলের বাড়ি। খুব একটা ছিমছাম নয়। তবুও বেশ আপন করে নিয়েছিলো রুমেলা সেই বাড়িটাকে। কিন্তু বাড়িটার একটা প্রবলেম, বর্ষায় দেওয়াল চুঁইয়ে ঘরে জল ঢুকে যেতো। ফলে খুব সমস্যায় পড়তে হতো তাদের। তাই বাড়িটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হচ্ছে ভাড়া নিয়ে। মালপত্র আগেই চলে গেছে। ফাঁকা ঘরগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নেয় রুমেলা,দেখে নিতে কিছু পড়ে থাকলো নাকি। জানালা গুলো করুনচোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। যেন বলছে, 
" চলে যাচ্ছো তাহলে আমাদের ছেড়ে? কাজের লোক না এলে, কত যত্ন করে মুছতে আমাদের। বিড়ালকে খেতে দিয়েছো আমাদের ফাঁক দিয়ে। কত অবেলায় বসে থেকেছো আমাদের পাশে! কী করে ভুলবো তোমায়, প্লিজ বলে যাও। "

রুমেলার নতুন ভাড়াবাড়ি যেতে গেলে এখনো মাঝে মাঝে পুরনোবাড়িটার পাশ দিয়ে যেতে হয়। যেতে যেতে রুমেলা চেয়ে দেখে একবার সেই বাড়িটার দিকে। তার বারান্দা, তার গ্রিল, উঠান, আমগাছ। মনে পড়ে পুরনো কথা। মনে হয়, কত যেন আপনার। এতো এখনো আমারই বাড়ি। 
"তোমারই তো, " বলে ওঠে যেন বাড়িটা।
" আমরা তো এখনো তোমারই আছি। ভুলিনি তোমাকে! চলে যাচ্ছো? দুদন্ড দাঁড়াবে না? এসো না,একটু গল্প করে যাও। কত যত্ন করে টবে গাছ লাগিয়েছিলে উঠানে। হাত বাড়িয়ে গাছ থেকে কত আম পাড়তে। জল দিয়ে ধুতে আমাদের ! দাঁড়িয়ে যাও একটু। চলে যেও না----! "
-----------------------

শহরের কিছুটা বাইরে নিজের ফ্ল্যাট কিনেছে রুমেলারা। তাই বছর চারেক বাদে আবার ছাড়তে হলো এবাড়িটাও! যথারীতি ডেকে বললো তাকে ঘরের জানালাগুলো-
"ভুলে যাবে আমাদের, নতুন বাড়ি পেয়ে? আমাদের কি হবে? কি করে ভুলবো!  শীতকালে আমার কোলে বসে কত রোদ পুইয়েছো। শুকিয়েছো ভিজে চুল!আমার গ্রিলের পিছনে আম, সুপারীর বাগানে কত তাকিয়ে থেকেছো? উপভোগ করেছো অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরা ! ভুলে যাবে সব? আমাদের ভুলে যেও না! "
যাবার সময় জড়িয়ে ধরলো তার পা, আঙিনার ধুলোবলি,
"চলে যাবে আমাদের ফেলে? কে লাগাবে আমাদের চারিধারে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁধার গাছ?"
 à¦¸à¦¾à¦° করে দাঁড়িয়ে থাকা হাস্নাহেনা,রঙ্গন,টবের ঝাউগাছ যেন কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,
 "এবার থেকে আর জল দেবে না আমাদের? সঙ্গেও নিয়ে যাবে না? লাগিয়ে ছিলো কেন তবে?"
 à¦¦à§‹à¦¤à¦²à¦¾à¦° ঝোলা বারান্দা আৎকে উঠে বললো, "সেকি! চলে যাচ্ছো নাকি? কে মেলবে উঠানে দড়িতে ভিজে কাপড়? আমি যে রোজ থাকতাম তোমাকে দেখার অপেক্ষায়! ভুলতে পারবে আমাদের? চলে যাচ্ছো তাহলে! যাও তবে। আবার এসো মাঝে মাঝে। কি, আসবে তো!বলে যাও একবার ! "

রুমেলা হাত নেড়ে টাটা করে পাড়া,বাড়ির মালিক এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সেই বাড়িটাকেও।তারপর মাথা নীচু ক'রে দ্রুত পা চালায় চোখের জল গোপন রেখে ! কি করতে পারে সে এছাড়া ! ওরাও যে বড্ড পিছুটানে তাকে ! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 à¦—ীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 à¦à¦‡ বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ!