প্রতিশোধ

17th August 2020 12:31 pm রাফিয়া সুলতানা
প্রতিশোধ



* প্রতিশোধ *
----- রাফিয়া সুলতানা 
10.07.19

তখন ব্রিটিশ আমল। কিছু সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়েরা শিক্ষার আলো দেখার সুযোগ পেতো। বেশির ভাগই বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখে পড়াশোনা শিখতো। তখন চাকরি বাকরি বলতে পুলিশ ,দারোগা, জেলার, ম্যাজিস্ট্রেট, অ্যাডভোকেট ইত্যাদি পদে পুরুষরা নিযুক্ত থাকতো। সবই তখন যৌথ পরিবার। একসঙ্গে অনেকগুলো ভাইবোন মানুষ হতো। 
তেমনি এক- পরিবার ছিলো রোকেয়ার পরিবার । চাচাতো, ফুপুতো ভাইবোন মিলে প্রায় দশবারো জন হেসে খেলে, বড় আদরে মানুষ হয়েছিলো তারা। সবাই মিলে গল্পগুজব করতে ও কবিতা ,গল্পের বই পড়তে খুব ভালোবাসতো। তারা হাতের কাজেও ছিলো পারদর্শী। তবে গৃহস্থালি কাজে তেমন নিপুণা ছিলো না। শহরে মানুষ। তাই গ্রাম্য আচার ব্যবহার তেমন জানা ছিলো না তাদের। 

তখনকার দিনে, নানানরকম অসুখ, বিসুখে অনেক পুরুষনারীই অল্প বয়সে মারা যেতো। কারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা   তেমন উন্নত ছিলো না। সামান্য ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, ম্যানিনজাইটিস, বসন্ত, কার্বাঙ্কল এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে হামেশাই অনেক পুত্রকন্যা অকালে পিতৃমাতৃহীন হয়ে পড়তো। তবে যৌথ পরিবার হওয়ায়,চাচী,ফুপু, খালা, মামীদের কোলেপিঠে,তারা কোনভাবে মানুষ হয়ে যেতো। রোকেয়াও ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে ছিলো। 
যৌবন প্রাপ্ত হলে, বাবা ভালো চাকুরে পাত্র দেখে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন। ছেলে দারোগা। শহরে পোস্টিং। কিন্তু তার দেশের বাড়ি গ্রামে। 

বিয়ের রাতেই স্বামী মইদুল জানিয়ে দিলো রোকেয়াকে, তাকে আজথেকে গ্রামেই থাকতে হবে।তার বৃদ্ধা মাকে সেবা ও দেখাশোনা করার জন্য সে এই বিয়ে করেছে। কাজেই তার সঙ্গে শহরে যেতে সে যেন কখনো বায়না না করে। তাকে আজীবন শাশুড়ির দাসী হয়েই দিন কাটাতে হবে। 
এ কথা শুনে নববধুর মাথায় যেন বাজ ভেঙ্গে পড়লো! কল্পনায় দেখা, নতুন জীবনের রঙিন স্বপ্নময় জগৎটার সব আলো যেন হঠাৎ ঝপ করে একসঙ্গে নিভে গিয়ে, চারিদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেলো!  দুচোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো রোকেয়ার । কিন্তু ঘোমটার আড়ালে , কারো তা নজরে পড়লো না। 
গ্রামের বৌ-ঝিরা দল বেঁধে নতুন বৌকে দেখতে এলো। ঘোমটা খুলে ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখে, নাক সিঁটকালো। না,বৌয়ের সৌন্দর্য্য নিয়ে তাদের কোন অভিযোগ ছিলো না,কারণ রোকেয়া ছিলো পরমা সুন্দরী। অভিযোগ, নতুন বৌয়ের নাকে ,কানে কোন ফুটো ছিলো না। আগেকার দিনের মেয়েরা কান আর নাকভর্তি গয়না পরতো। রোকেয়ার সে সব ছিলো না। শুধু রোকেয়া কেন ,তার আর সব চাচাতো ,ফুপুতো বোন - হাবিবা, রাবিয়া, মালেকা, দিলারা কারোরই ছিলো না। সাহেবী কায়দায় মানুষ হয়েছিলো তারা। 
শাশুড়ি তো সব শুনে চোখ কপালে তুললো। ওমা, সেকি অলক্ষুণে কথা! সঙ্গে সঙ্গে হুকুম হলো--- এখুনি নাক, কান সব ফুঁড়িয়ে দাও। অমনি সুঁচ হাতে ছুটে এসে একজন পটপট করে নতুন বৌয়ের কানে ,নাকে দুদশটা ফুটো করে দিলো। তারপর তাতে ডজনখানেক দুল, মাকড়ি ভর্তি করে পরিয়ে দেয়া হলো। টপটপ করে কত রক্ত পড়লো! ঝরঝর করে কত চোখের জল ঝরে পড়লো, কিন্তু মুখে টুঁ শব্দটিও করলো না রোকেয়া। সেই শুরু। তারপর থেকে কতকি যে সহ্য করতে হলো তাকে দিনের পর দিন, তার আর লেখাজোখা রইলো না! 
গৃহস্থালির সমস্ত কাজ, উঠোন ঝাঁট দেওয়া, গোয়াল নিকানো, গাভীর দুধ দোওয়া, গরুর বিচালি কাটা, কিষাণের রান্না করা, ধান সিদ্ধ করে শুকানো, কাঠ, কুটোর ধোঁয়ায় বসে রান্না করা, সব! শাশুড়ির পদসেবা, তার সঙ্গে উপরি পাওনা ছিলো তেনার কাছ থেকে দিনরাত খোঁটা ও গঞ্জনা শোনা। কারণ, আগেই বলেছি, গৃহকাজে সে তেমন পটু ছিলো না। মা মরা মেয়ে হওয়ায় সবার আদরে ,আহ্লাদে মানুষ হয়েছিলো।  কুটো নেড়ে দুটো করতে হয়নি কখনো। তাই, কাজকর্মের তেমন কোন অভ্যেসই গড়ে ওঠেনি। 

স্বামী থাকতো দূরান্তরে। বছরে দুএকবার আসতো। খোঁজখবরও তেমন রাখতো না। অবহেলায়, অনাদরে, মনোকষ্টে ক্রমে দুরারোগ্য যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে পড়লো রোকেয়া । তখন তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হলো।

 সেখানে তাদের সেই আদরের নন্দিনীর দুর্গতি দেখে সবার তো মাথায় হাত। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির আর সব মেয়েদের কান, নাক ফোঁড়ানোর ব্যবস্থা হলো, পাছে তাদেরও তদনুরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।সক্কলকে গৃহস্থালির সকল কাজে পাঠ দেয়ার ধুম পড়ে গেলো! সে একেবারে হুলুস্থুল কান্ড!

এদিকে, অনেক ডাক্তার ,বদ্যি দেখিয়েও রোকেয়ার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলো না। কারণ, ব্যাধি শুধু তার শরীরেই বাসা বাঁধে নি, তার মনটাকেও কুরে কুরে খাচ্ছিলো। তাকে মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হলো। রোকেয়ার মিষ্টি মধুর ব্যবহার, সুমিষ্ট হাসি আর লোককে হাসানোর নিদারুণ ক্ষমতা ছিলো। বিয়ের পর যেগুলো সব হারিয়ে গেছিলো, বাপের বাড়ি এসে ক্রমে সেগুলো আবার ফিরে এলো। ডাক্তার ছাত্ররা অবিলম্বে সবাই তার গুণগ্রাহী হয়ে উঠলো। সবাই তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু রোকেয়ার সে এক কথা -- " যতই চেষ্টা করো তোমরা, আমাকে কিছুতেই বাঁচাতে পারবে না।"
 ডাক্তাররা তাদের দিদি তুল্য রোকেয়াকে হাসিখুসি রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। তারা বুঝতে পেরেছিলো মানসিকভাবে সে খুব বিপর্যস্ত ছিলো। 

ইতিমধ্যে মইদুল একদিন রোকেয়াকে দেখতে এলো হাসপাতালে। সে খবর পেয়েছিলো, রোকেয়া গুরুতর অসুস্থ। হয়তো আর বাঁচবে না।

এসে দেখলো ,ছাত্র ডাক্তারদের কি একটা কথা শুনে রোকেয়া বেশ হাসছে। পরপুরুষদের সঙ্গে হাসাহাসি করতে দেখে মইদুলের গা জ্বলে গেলো! তাকে এগিয়ে আসতে দেখে সবাই একে একে সেখান থেকে সরে গেলো। এতদিন পর দেখতে পেয়ে রোকেয়া হাসিমুখে স্বামীর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো!
মইদুল তাকে ব্যাঙ্গের সুরে বললো," দিব্যি তো হাসছিলে দেখলাম! তবে যে শুনেছিলাম, তুমি নাকি মরতে বসেছো! "
রোকেয়ার বুকে যেন খুব জোরে একটা ধাক্কা লাগলো! সে ধীরে ধীরে বললো- "ও! আমি হাসি খুশি থাকি, তা তুমি চাও না!তাই না? "
তারপর সেই যে তার হাসি বন্ধ হলো, আর কোনদিন কেউ তার আর হাসি দেখতে পেলো না। চরম মানসিক যন্ত্রণার কালোমেঘে ভরে গেলো রোকেয়ার প্রাণমন,অন্তর! মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলো সে, মরেই এর জবাব দেবে । দ্রুত তার অবস্থার অবনতি হতে থাকলো। ডাক্তারদের সব প্রচেষ্টা পণ্ড হতে লাগলো। শেষকালে, রোকেয়া তার আত্মীয়দের বললো, তার স্বামী যেন কোনভাবেই তার মরা মুখ না দেখে। এদিকে তার শরীরে চরম রক্ত শূন্যতা দেখা দিলো। সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে এগিয়ে এলো রক্ত দেবার জন্য। কিন্তু কারো সঙ্গেই তার রক্তের গ্রুপ মিললো না। ডাক্তার একরকম জবাব দিয়েই দিলো। বাড়িতে কান্নার রোল উঠলো। মইদুলের কানে কিভাবে যেন সে খবর গিয়ে পৌঁছালো। সে ততদিনে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলো। ছুটে এসে রোকেয়ার হাতে পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
 "আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে এবারের মত মাফ করে দাও। "
রোকেয়া কোন উত্তর দিলো না,মুখ ফিরিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। দুগাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকা শোকে মুহ্যমান বাবা ডুকরে কেঁদে উঠলেন, " রাগ করে এভাবে চলে গেলি মা,বুড়ো বাবাটার কথা একবারো ভাবলি না? আমি কিভাবে বাঁচবো এবার ! " 
পাশে সার বেঁধে দাঁড়ানো ডাক্তার ভাইগুলো সবাই চোখের জলে ভেসে গেলো! 
এভাবেই সে নিঃশব্দে, তার অভিমানের প্রতিশোধ নিয়ে ,অকালে, পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলো! অবহেলায়, অনাদরে, অপমানে,মনস্তাপে এভাবে কত না সম্ভাবনা ময় নারীজীবন অকালে ঝরে যায়, কে তার খবর রাখে! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা