অচেনা

17th August 2020 12:43 pm রাফিয়া সুলতানা
অচেনা



* অচেনা *
-----  রাফিয়া সুলতানা 
09.07.19

স্বামী সরকারী চাকুরে। তাই কয়েকবছর অন্তর অন্তর তাকে বিভিন্ন জেলায় ট্র্যান্সফার হতে হয়। বারে বারে এই স্থানবদলের ঝক্কি পোহাতে আর ভালোলাগে না পূর্বাশার।ছেলেমেয়ে গুলোও বড় হয়ে গেছে। তাদের পড়াশোনার খুব ক্ষতি হয় এতে। সামনেই বড়টা মাধ্যমিক দেবে। তাই শহরতলীতেই নিজের একটা বাড়ি করেছে সুমন্ত। 

শ্বশুরের পুরনো ভিটেয় যে আদিবাড়িটা ছিলো, সেটা এখন আর বাসযোগ্য নেই। তাই সেটা বিক্রি করে তারা চলে যাচ্ছে নতুন বাড়িতে। টুকিটাকি অনেক জিনিস রয়ে গেছে এ বাড়িতে। কিছু কিছু ফেলে দিতে হচ্ছে। সব নিয়ে যেতে গেলে নতুনবাড়ি একেবারে জঙ্গল হয়ে যাবে। তাই পুরনো আলমারি, বাক্সপ্যাঁটরা ঘেঁটে বাছাইপর্ব চলছে  পূর্বাশার। 

স্বামীর সার্টিফিকেটের ফাইলটা ঘাঁটাঘাটি করতেই স্মৃতির পর্দায় কত কিযে ভেসে উঠছে পূর্বাশার, তার আর ইয়ত্তা নেই। হাতে পড়ছে কত কি, যা এতদিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিলো! তাদের বিয়ের কার্ড, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ইত্যাদি ইত্যাদি ।এগুলো চোখে পড়তেই যেন ফিরে গেলো সে, চোদ্দবছর আগের সেই সোনালী দিনগুলোতে। নতুন জীবনসঙ্গীর হাত ধরে, সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা নতুন একজগতে প্রবেশ করা!নিজের বাড়ি, আত্মীয় স্বজন, কাছের লোক, বন্ধুবান্ধবদের ফেলে আসার দুঃখ, বেদনা! কেমন যেন এক আতঙ্ক, রহস্য, রোমাঞ্চ --- সবকিছু মেশানো একটা ঘোরের বাতাবরণ ! কোথায় গেলো সে সব দিন? ভাবতে ভাবতে, বুকের গভীর থেকে -- দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো একটা! 
এমন সময় হাতে পড়লো একটা পুরনো নীল খামের চিঠি, যাকে বলে ইনল্যান্ড লেটার। 
খামটা খুলতেই তাজ্জ্বব হয়ে গেলো পূর্বাশা । খামের ভেতর লেখাটা খুব চেনা চেনা! আরে! এতো তার বাবারই হস্তাক্ষর! তাড়াতাড়ি কাগজের ভাঁজটা খুলে পড়তে শুরু করলো সে। তাতে  লেখা --

বাবাজীবন, 

যেটা তোমায় জানাবো বলে, আজ এই চিটি লেখা --- আমার অতি আদরের মেয়ে পূর্বাশা সেতো তুমি জানোই। নিজের মেয়ে না হওয়া সত্ত্বেও তার প্রতি কেন যে এত টান, ভাবলে একেক সময় অবাক লাগে! তাকে অনেক স্নেহ-আদর-ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করে তুলেছিলাম। এখন তাকে তোমার হাতে সঁপে দিয়েছি । কিন্তু দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। তার কারণ, হতভাগিনী মা আমার , আসলে এক পিতৃমাতৃহীনা অনাথিনী কন্যা ।তাকে একবছর বয়সে, একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছিলাম।সেদিন মধ্যরাতে শর্টসার্কিট হয়ে একটি বহুতল বাড়িতে আগুন লেগে যায় । সেই আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায় বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাট। বহুলোক ঘুমের মধ্যে পুড়ে মারা যায়। কিন্তু অলৌকিক ভাবে একটি বাচ্চা মেয়ে বেঁচে যায় সেবার । আমি দমকল বাহিনীতে কর্মরত থাকায় সেই উদ্ধার কাজে, আমিও উপস্থিত ছিলাম সেখানে । প্রথমে তাকে নিয়ে কি করা যায়, সে নিয়ে অনেক দ্বন্দ্বে পড়ি সবাই। অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও তার তিনকুলে  কারোর খোঁজ পাওয়া যায় নি। সেখান থেকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিই। তারা একটি অনাথ আশ্রমে নিয়ে যায় তাকে। কিন্তু ততক্ষণে বড় মায়া পড়ে যায় আমার, তার উপর। কেন না ভীষণ ভয় পেয়ে সে আমাকে সে রাতে ড্যাডি ড্যাডি বলে ডাকছিলো আর কান্না করছিলো। তার সেই আকুল ডাক বড়ই যেন ব্যাকুল করেছিলো আমায়। কিছুতেই তাকে ছাড়তে মন চায়নি। তাই আমার নিঃসন্তান স্ত্রী ও আমি বাচ্চাটিকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। শখ করে তার নাম দিই পূর্বাশা। তারপর থেকে অনেক আদরযত্ন ও পরম মমতায় তাকে বড়ো করে তুলি।বিন্দুমাত্র দুঃখকষ্টের কোন আঁচ লাগতে দিইনি তার জীবনে। ভয় হতো কখনো না সে হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু মেয়ে বড় হলে তো তাকে বিয়ে দিতেই হয়। বড় কষ্ট হয়েছিলো আমার তাকে কাছছাড়া করতে। বড্ড ন্যাওটা ছিলো ও আমার, কারণ আমার পত্নী মনোরমা ওকে পাওয়ার কয়েকবছর পরই হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। পূর্বাশা তখন চার বছরের। অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেলেও, পাছে সৎ মা কষ্ট দেয়, এই ভেবে আর বিয়েও করিনি আমি । একাই যুগপৎ পিতৃ ও মাতৃস্নেহে মানুষ করেছি তাকে। যথাযোগ্য শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে বড়ো করে তুলেছি তিল তিল করে । আমি বর্তমানে মারণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। হয়তো আর বেশিদিন বাঁচবো না। তাই সময় থাকতে তোমায় সব জানিয়ে গেলাম। পূর্বাশাকে এ ব্যাপারে কিছু বলো না। ও তাহলে  হয়তো কষ্ট পাবে। আমার শেষ অনুরোধ, ওর একটু খেয়াল রেখো। বড় অভিমানী মা আমার। ও কোনরকম কষ্ট পেলে ওপারে আমি শান্তিতে থাকতে পারবো না। আশীর্বাদ করি, তোমরা খুব ভালো থেকো। 

                                         ইতি
                                               তোমার শ্বশুরমশাই। 

চিঠিটা পড়া শেষ হলে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পূর্বাশা । তাহলে এতদিন এত যত্নে তাকে যিনি বড় করে তুলেছিলেন, তিনি আদৌ তার আসল বাবা ছিলেন না? কেমন যেন অদ্ভুত বোধ হচ্ছিলো পূর্বাশার! কিছুতেই যেন বিশ্বাস হতে চাইছিলো না!

 তার বিয়ের বছর খানেকের মধ্যেই বাবা মারা যান। ফলে এ হেন ঈশ্বরতুল্য বাবার শেষ বয়সে সেবাযত্ন করে তাঁর এই ঋণ পরিশোধের সুযোগও পায়নি পূর্বাশা ।সেটা ভেবে, মনে মনে একটা তীব্র কষ্ট হতে লাগলো পূর্বাশার । 

আরো কষ্ট হতে লাগলো যখন তার আসল বাবা-মায়ের কথা মনে হলো। কারা ছিলেন তারা?তার বংশ পরিচয়ই বা কি ?কোনভাবেই তো তা আর জানার  সম্ভাবনা নেই। আর কিনা এতই অভাগী সে , যে অল্প বয়সে বাবা মা দুজনকেই একসঙ্গে খেয়ে নিলো! আর সুমন্তই বা কেমন? দীর্ঘ চোদ্দ বছর হলো--- তাদের বিয়ে হয়েছে। তিনটি সন্তানের জননী সে। মেয়ে দুটোও বড়ো হয়ে গেছে। ছেলেটা এখনো ছোট। কারণ মেয়েদের জন্মের অনেক ক'বছর পরে জন্ম হয় তার । এতবছর একসঙ্গে ঘরকন্না করার পরও তার কাছে এতদিন এই সত্যটা গোপন রেখেছে সে ! তারও ইচ্ছা হয়নি জীবন সঙ্গিনী যে, তার আসল পরিচয় জানতে? নাকি ইচ্ছাটাকে জোর করেই চেপে রেখেছে সে! খামটা হঠাৎ হাতে না পড়লে তো, এতসব কিছুই জানা হত না তার! তবে না জানলেই বোধহয় ভালো হতো। কারণ, এখন থেকে যে ,তার অতীতের ভুত তাকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে! আর কি স্বস্তিতে বাঁচতে পারবে সে? এসব ভেবেই হয়তো কিছু বলেনি সুমন্ত! সত্যি, কত চাপা সে! যার সঙ্গে এতদিন ঘর করলো, তাকে ঠিক মত চেনাই হয়নি পূর্বাশার! তাকেও তো চেনে না সুমন্ত! জানে না তার পরিচয়!সুমন্ত কি, সে তো নিজেও জানলো না তা ! আজীবন রইতে হবে তাকে অচেনা ! সুমন্ত এবং নিজের কাছেও! কি অদৃষ্ট! এই সব ভাবতে ভাবতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো পূর্বাশা ! ভাবতে লাগলো, বোধহয় একেই বলে ভবিতব্য! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা