প্রতিদান

17th August 2020 12:51 pm রাফিয়া সুলতানা
প্রতিদান


* প্রতিদান *
--- রাফিয়া সুলতানা 
09.01.18

শীতের সকাল। সহজে লেপ ছেড়ে কি আর উঠতে ইচ্ছা করে ? কিন্তু ছেলের আট'টায় স্কুল। তাকে আবার ঘুম থেকে তুলে ঠিক সময়ে , খাইয়ে দাইয়ে, পোষাক আশাক পরিয়ে,রেডি করে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে স্কুলের গেটে। আসার সময় আবার বাজারটাও সারতে হবে। তবেই তো বৃদ্ধা মা অফিস যাবার আগে মুখে কিছু একটা তুলে দিতে পারবে তার ।বেশ কিছুদিন থেকে স্ত্রী, পলার শরীরটা আবার ভালো যাচ্ছে না । তাই কৃষ্ণনাথ সাত-সকালবেলা তাকে না জাগিয়ে, নিজেই চার বছরের তোতনকে ঘুম থেকে তুলে একটু হরলিক্স বিস্কুট খাইয়ে,  স্কুলে দিয়ে আসে। পরে পলা উঠে ধীরে সুস্থে সংসারের টুকিটাকি কাজকর্ম গুলো সারে।যদিও রান্নাবান্নার কাজটা আজকাল আর তাকে করতে হয় না। শাশুড়িই সামলান ওদিকটা। ছেলেকে স্কুল থেকেও তিনিই নিয়ে আসেন। পলা এখন আর পারে না এত সব । 

তোতনকে স্কুলে দিয়ে বাজার সেরে টোটো করে ফেরার পথে কৃষ্ণনাথ দেখলো, রাস্তার মধ্যিখানে সেটাকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করিয়ে , একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা উঠে বসলেন তাতে   । হাতে তিন-চারটে ঢাউস জুটব্যাগ ,তাতে সম্ভবতঃ কিছু গরম পোষাক উঁকি মারছে। কাঁধে একটা বড়সড় হ্যান্ডব্যাগ। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে,কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ।
ফরসা টকটকে রং।শালের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে গা ভর্তি গয়না। বেশ ভারী শরীর। হাতের ব্যাগ, গায়ের শাল সবকিছু সামলাতে বেশ নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে তাঁকে। তাই টোটোয় চাপার আগে সব মালপত্র আগে সেটার পা-দানিতে নামিয়ে রেখে তারপর তাঁর ভারী শরীরখানা কোনরকমে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুললেন । পিছনের দুজনার পুরো সিটটাই প্রায় দখল হয়ে গেলো তাঁর বিশাল-বপু শরীরের বহরে। তারপর যেভাবে হাঁপাতে লাগলেন ভদ্রমহিলা , কৃষ্ণনাথের মনে হলো তাঁর নিশ্চিত হাঁপের ব্যামো আছে। উল্টোদিকের সিটে কোনরকমে জড়সড় হয়ে বসলো কৃষ্ণনাথ।মনে হলো ,তার ড্রাইভারের পাশে বসাই ভালো ছিলো। কিন্তু সঙ্গে বাজারের থলিটা আছে। সেটা নিয়ে সামনে বসা যাবে না। ভদ্রমহিলা বিড়বিড় করে নিজের মনে বকছিলেন। তাঁর কথা শুনে বুঝলো কৃষ্ণনাথ, ড্রাইভার ছুটি নেওয়ায় প্রাইভেট গাড়িতে আসতে পারেননি তিনি। তাই তাঁকে আজ এতো ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে। 

কিছুদুর যেতেই টোটো ওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, তাঁকে গেটবাজারের মোড়ে নামিয়ে দিতে। কিন্তু টোটো ওয়ালা যখন জানালো, সেদিক দিয়ে সে যাবে না,তখন ভদ্রমহিলা খুব পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন তাকে, সেখানে যাবার জন্য।অতিরিক্ত টাকাও দিতে চাইলেন  সেই জন্য । কিন্তু টোটোওয়ালা কিছুতেই রাজি হলো না।  বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, তার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ তাদের নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করতে হয়, বরং তিনি সামনের মোড়েই নেমে যান। ভাড়াটা দিতে হবে না। অগত্যা ভদ্রমহিলা গজগজ করতে করতে পরের মোড়েই নেমে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গন্তব্যে পৌঁছে , কৃষ্ণনাথ টোটো থেকে নামার জন্য পা বাড়াতেই, তার পায়ে ভারী  কি যেন একটা ঠেঁকলো। চেয়ে দেখলো সেই ভদ্রমহিলার কাঁধের ব্যাগটা। তিনি সেটা ভুলে ফেলে গেছেন।সেটা হাতে তুলতেই কৃষ্ণনাথ দেখে তার ওজন প্রায় তিন-চার কেজি হবে। ফলে তার আর বিস্ময়ের সীমাপরিসীমা রইলো না। হ্যান্ডব্যাগ যে এত ভারী হতে পারে সে তার কল্পনাতেও ছিলো না। কি আছে দেখার জন্য চেনটা একটু ফাঁক করতেই তার চোখ যেন ঝলসে গেলো। দেখলো, তাতে একটা পলিথিনের ভেতর থেকে বিভিন্নরকম স্বর্ণালঙ্কার ঝলমল  করছে। হঠাৎ লটারী পাওয়ার সংবাদে বা কোন গুপ্তধন হাতে পেলে যেমনটা রিয়াকসন হয়, তার মনেও ঠিক সেরকম প্রতিক্রিয়া হলো। কিন্তু যেন কিছুই হয়নি এরকম ভাব করে, টোটোওয়ালাকে বেশি কিছু না বলে ,ভাড়াটা মিটিয়ে, সে ব্যাগটা নিজের সঙ্গে নিয়েই নেমে পড়লো টোটো থেকে । বাড়ি গিয়ে ব্যাগের ভেতরটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও,তার মধ্য থেকে ভদ্রমহিলার ঠিকানার কোন খোঁজ পাওয়া গেলো না। একেকবার মনে হতে লাগলো, ভালোই হলো। আবার পরক্ষণেই অন্যরকম ভাবনা গ্রাস করতে লাগলো তাকে। ফলে খুব চিন্তায় পড়লো কৃষ্ণনাথ । পাশের ঘরে অসুস্থ পলা শুয়ে আছে। তার ইউটেরাসে টিউমার ধরা পড়েছে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। সেটা ইমিডিয়েটলি অপারেশন করতে হবে। নইলে ক্যানসার হয়ে, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। হসপিটালে বলেছে সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচলাখ টাকা খরচা হবে। কিন্তু ছাপোষা কেরানী কৃষ্ণনাথ । এতো টাকা সে কোথায় পাবে ? কুড়িয়ে বাড়িয়ে এপর্যন্ত লাখ খানেক মত টাকা জোগাড় করতে পেরেছে সে । এই গয়না গুলো পেলে তার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু কাজটা কি ঠিক হবে? ধর্মে সইবে তো? কৃষ্ণনাথ পড়লো উভয় সংকটে। একদিকে স্ত্রীর প্রাণরক্ষা অন্য দিকে নীতিবোধ! অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে এইসব নানান রকম চিন্তার মধ্যে দিয়েই কাটলো সেদিনের দিনটা। 

অবশেষে প্রবৃত্তির প্ররোচনা কে পরাজিত করে বিবেকেরই জয় হলো কৃষ্ণনাথের। কৃষ্ণনাথ বিকেলবেলা অফিস থেকে ফিরেই, সব লোভ সংবরণ করে, গেটবাজারের নিকটবর্তী থানায় সেই হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে উপস্থিত হলো। অফিসারের ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেলো সেই মহিলা হাপুস নয়নে কাঁদছেন আর কি যেন বলছেন অফিসারকে ।কৃষ্ণনাথ খুব উৎসাহিত হয়ে ব্যাগটা তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে  বললো, 
"এই যে ম্যাডাম, ব্যাগটা আপনি ফেলে গেছিলেন টোটোতে । আপনার কোন ঠিকানা না পাওয়ায়, ফেরৎ দিতে পারিনি। তাই থানায় জমা দিতে এসেছিলাম। ভালোই হলো, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়ে !" 

মহিলার দুচোখ আনন্দে জ্বল জ্বল করে উঠলো। যেন হাতে স্বর্গ পেলেন তিনি । তারপর ব্যাগ খুলে সব নেড়েচেড়ে বললেন, 
" ঠিক আছে সব । অনেক ধন্যবাদ বাবা, তোমাকে! তুমি যে আমার কি উপকার করলে! এগুলো ছিলো আমার বান্ধবীর গয়না। সে আমাকে এগুলো আমার লকারে রাখতে দিয়েছিলো। এগুলো হারালে, আমি তার বিশ্বাস চিরদিনের মত হারাতাম! জীবনে আর কোনদিন মুখ দেখাতে পারতাম না তাকে !"

 ভদ্রমহিলা কৃষ্ণনাথের ঠিকানা জেনে নিয়ে রাখলেন। এবং পরেরদিন যথারীতি তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন  । কৃষ্ণনাথের স্ত্রীর অবস্থা জেনে তিনি খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। ঘটনাক্রমে তিনি ছিলেন কলকাতার একটি নামী ক্যানসার হসপিটালের মালকিন । তাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, সেখানে বিনামূল্যে পলার যাবতীয় চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে দিলেন।সময়মতো অপারেশনও হয়ে গেলো । মাস কয়েকের মধ্যে সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত ঘোষণা করা হলো তাকে। এইভাবে সেই ভদ্রমহিলা এবারের মত কৃষ্ণনাথের কাছে তাঁর দেও পরিশোধ করলেন। কথায় বলে, সব ভালো যার শেষ ভালো।  কৃষ্ণনাথও এই জীবনেই পেয়ে গেলো তার কৃত সৎকর্মের সন্তোষজনক প্রতিদান । 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা