প্রতিবন্ধক

17th August 2020 12:57 pm রাফিয়া সুলতানা
প্রতিবন্ধক



* প্রতিবন্ধক *
------ রাফিয়া সুলতানা 
14.05.19

বারে বারে আজ চোখের কোনে জল টলমল করে- উঠছে মৃত্তিকার। কোন ভোরে উঠেছে আজ। রাত্তিরে ভালো ঘুমও হয়নি কাল। কাজেও যেন মন লাগছে না কিছুতেই। কী যেন একটা ব্যাথায় বুকটা টনটন করে উঠছে শুধু ! আজ রবীন্দ্রজয়ন্তী। পাড়ার ফাঙ্কসনে প্রতিবারের মত গাইবে না সে। কিছুতেই না। যে যতই পীড়াপীড়ি করুকনা কেন। 

মনে পড়ে গেলো বছর তিনেক আগের কথা। সেদিন সে বসেছিলো দর্শকের আসনে। হঠাৎ এক গীটারের সুরে তোলপাড় করে উঠলো তার বুক!

 "আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্ক ভাগী....।"

 গানটা আগেও একবার শুনেছে সে। কিন্তু গীটারের সুরে তা এতো রমনীয় ভাবে ফুটে উঠেছে আজ, যে পরম বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে গেছে মৃত্তিকা। কে ছেলেটা? এত সুন্দর বাজায়! হাতে কি যাদু আছে?এত দরদ দিয়ে কিভাবে বাজায়? ওর নামটা যেমন করেই হোক জানতেই হবে তাকে। 

পরে জেনেছিলো অবশ্য। পরের বার ঘোষাল বৌদির জোরাজুরিতে ওদের বাড়ি গেছিলো বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষ্যে পাড়ার ক্লাবে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো তারই রিহার্সালে। ছোটবেলায় গান শিখতো মৃত্তিকা। ভারী সুন্দর গানের গলা। প্রায় স্কুলের সব অনুষ্ঠানেই গাইতে হতো। অনেক গুলো প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছে। অনেক স্বপ্ন ছিলো জীবনে। বড় গায়িকা হবে সে। দিকে দিকে সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু বিয়ের পর কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে গেলো। স্বামী তার রাশভারী মানুষ। গান বাজনা এসব তার কাছে ছেলেমানুষী। ঘরের বৌ, বৌয়ের মত থাকবে। মন দিয়ে ঘরসংসার করবে,ছেলে মানুষ করবে, স্বামীর সেবাযত্ন করবে। তা না করে দিনরাত গলা সাধবে? এ আবার কি! 
তাই বড় শখ করে বাপের বাড়ি থেকে আনা হারমোনিয়ামটা বাক্সবন্দী হয়েই পড়েছিলো  এতদিন অযত্নে ,অবহেলায় । মৃত্তিকার বোন সায়ন্তিকা সেবার যখন এসেছিলো তার কাছে বেড়াতে, তখনই কথা প্রসঙ্গে তার মুখে জানতে পারে পাশের বাড়ির ঘোষাল বৌদি, মৃত্তিকার গান গাইতে জানার ব্যাপারটা। জানার পরই ব্যাস! পিছনে লেগে পড়ে, এবারে ক্লাবের অনুষ্ঠানে গাইতেই হবে তাকে। সেই থেকে শুরু।

সেখানেই মৃন্ময়ের সঙ্গে আলাপ। এত সুন্দর গীটার বাজায় ছেলেটা! যে কোন গানই যেন মোহময় হয়ে ওঠে ওর হাতের ছোঁয়ায়! সবাই এত সুখ্যাতি করে তার। অথচ কোন অহংকার নেই । এত ভদ্র আর অমায়িক সে।সৌম্যকান্তি চেহারা। মৃত্তিকার ক্রমশঃ খুব ভালো লাগতে থাকে তাকে। মৃত্তিকার গানের গলারও খুব প্রশংসা করে মৃন্ময়। একটার পর একটা গান শোনানোর জন্য অনুরোধ করতে থাকে তাকে। মৃত্তিকারও বিরক্তি লাগে না। বরং ভালোই লাগে, তার আবদার রাখতে। ক্রমে দুজন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে উঠলো। 

মৃত্তিকার জীবনে যেন কোথায় একটা ছন্দ ফিরে এলো। ফিরে পেলো সে তার হারানো স্বপ্নের জগতটাকে। একটা সৃজনশীল মন সব সময় মনে মনে তার একটা নিজস্ব জগত তৈরি করে নেয়। বিয়ের পর সংসারের চাপে, সেই জগতটা হারিয়েই গিয়েছিলো মৃত্তিকার। মৃন্ময়ের সংস্পর্শে আবার যেন রূপ নিলো সেটা। সুজনবাবু অবশ্য এখনও এ ব্যাপারে ঘোর বিরোধী। তাই তার সামনে সে চর্চা করে না এসবের। তিনি অফিসে বেরিয়ে গেলে, ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে নিয়মিত হারমোনিয়াম নিয়ে বসে মৃত্তিকা।মৃন্ময় রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের গানের স্বরলিপির বই জোগাড় করে দেয়। সেটা থেকে নতুন নতুন গান তোলে মৃত্তিকা। ঠিক ঠাকই  চলছিলো সব। কিন্তু বিধি বাম! 

 প্রতিবেশীদের মুখে তার গানের প্রশংসা শুনে গতবার পাড়ার অনুষ্ঠানে মৃত্তিকার গান শুনতে গেছিলেন সুজনবাবু। সেখানে সবাই মৃত্তিকাকে ঘিরে ধরে এত হৈচৈ করছিলো, যে সেটা মোটেও ভালো লাগেনি গৃহকর্তা সুজন পালের। বিশেষ করে মৃন্ময় নামে ঐ ছোঁড়াটাকে মোটেও ভালো ঠেকেনি তাঁর। মৃত্তিকার পাশে বসে তার এত গীটার বাজাবার কী ছিলো? মৃত্তিকা তো একাই পারতো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে। যত সব আদিখ্যেতা! আর গানের মাঝে মাঝে দুজনার এত আলাপ আলোচনারই বা কী ছিলো? যত্তসব ন্যাকামো! 

বাড়ি ফিরে মৃত্তিকার স্বরলিপির বইটা নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে তো আরোই মাথা খারাপ! সেখানে বড়বড় সুন্দর হস্তাক্ষরে মৃন্ময়ের নাম লেখা - কেন? হুঁঃ! আবার লেখা প্রীতি উপহার! নিকুচি করেছে প্রীতি পীরিতির! দাঁড়াও, বাড়ি আসুক, দেখাচ্চি মজা! কত রঙতামাসা আর কত পীরিত! তাই ঘর এত অগোছালো হয়ে থাকে আজকাল! সংসারের কাজকর্ম ফেলে গানবাজনা! বলি, এটা কি ক্লাবঘর নাকি? মেয়ে মানুষ, মেয়ে মানুষের মত থাকবে! দাঁড়াও, আজই একটা হেস্তনেস্ত না করলেই নয়!

মৃত্তিকা বাড়ি ফিরতেই শুরু হলো তুলকালাম কাণ্ড! মাস খানেক চললো তার রেশ! একদিন মৃন্ময় বেচারা কী একটা জিজ্ঞাসা করতে আর একটা গানের বই দিতে বাড়ি এসেছিলো মৃত্তিকার। সুজনবাবু বাড়িতেই ছিলেন। ব্যাস ! আর যায় কোথা! যারপরনাই অপমান করলেন মৃন্ময়কে। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেলো মৃত্তিকার। এত অপমান, শুধুমাত্র গান গাওয়ার জন্য! সংসারে কেবল দাসী বাঁদী হয়েই বেঁচে থাকতে হবে চিরটাকাল ! তার নিজস্ব জীবন, ভালোলাগা - বলে কিছু থাকতে নেই? এমনভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে তো মরে যাওয়াই ভালো! কিন্তু কী হবে ছেলেমেয়ে দুটোর? ওদের মুখ চেয়ে তো বাঁচতেই হবে তাকে। সেই থেকে গানবাজনা বন্ধ। মৃন্ময়ের সঙ্গে দেখা হলেও, আর কথা বলে না সে। মাথা নীচু করে চলে যায় মৃন্ময়।

 বাইশে শ্রাবণ জোর করে ধরে নিয়ে গেলো তাকে মিত্র আর ঘোষাল বৌদি। কিন্তু গান গাইতে স্টেজে উঠতেই, সেখান থেকে উঠে চলে গেলো মৃন্ময়। বুকে কেন একটা শেল এসে বিঁধলো  মৃত্তিকার! কোনমতে চোখের জল আঁটকে গাইলো সেদিন। বাড়ি ফিরে প্রতিজ্ঞা করলো, আর কোনদিন গাইবে না সে। মৃন্ময়ের প্রতি অভিমানে গুমরে কেঁদে উঠলো বুক ! তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া! কী অপরাধ করেছিলো মৃত্তিকা, যে মৃন্ময় এরকম করলো তার সঙ্গে? কত ভালোবাসতো সে তাকে! তার এই প্রতিদান? আর ওমুখো হবে না কোনদিন! হারমোনিয়ামটা তুলে রাখলো, উঁচুতে বাঙ্কের উপরে।আর হাত দেবে না ওটাতে কোনদিন! কিন্তু বাঁচবে কি করে মৃত্তিকা? গান যে তার প্রাণ! এত প্রতিবন্ধক থাকে কেন কারো কারো জীবনে? 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা