প্রথম সে অপরাধ

17th August 2020 1:01 pm রাফিয়া সুলতানা
প্রথম সে অপরাধ


* প্রথম সে অপরাধ *
----- রাফিয়া সুলতানা 
23.11.18

ছ'সাত বছরের রোজি তখন ক্লাস টুয়ের ছাত্রী। দাদু, দাদি, ছোটচাচা, চাচী, আব্বা, মা আর তিন বছরের ছোট বোন ডেইজীকে নিয়ে তাদের যৌথ পরিবার। শহুরে পরিবেশে চার দেওয়ালের বদ্ধ ঘরে তার বড়ো হয়ে ওঠা। ছোটবেলায়, বড়ো একটা খেলার তেমন সাথী  ছিলো না তার। মুখচোরা আর ভীতু স্বভাবের রোজির, স্কুলেও তেমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি কারও সঙ্গে। তাই স্কুলে যেতে তার একটুও ভালো লাগতো না। যদিও এই স্কুলে ভর্তি হবার জন্য একদিন সে অনেক কান্নাকাটি করেছিলো।তার জীবনেও রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যদ্বাণী ------" আজ বিদ্যালয়ে যাবার জন্য যে রূপ কান্নাকাটি করিতেছো, একদিন না যাওয়ার জন্যও সে রূপ করিবে.,,, "  সঠিক প্রমাণিত হয়েছিলো।

 তার নিরীহ ও গোবেচারা স্বভাবের জন্য প্রায়শঃই তাকে সহপাঠীদের নানা উৎপীড়নের শিকার হতে হতো। স্কুলে পৌঁছাতে একটু দেরি হলেই , সবাই মিলে তাকে টেনে হিঁচড়ে অফিসে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতো, হেডস্যারের কাছে অভিযোগ দায়ের করার জন্য। সেও প্রাণপণে তাদের হাত থেকে সর্বশক্তি প্রয়োগে ও কান্নাকাটি করে মুক্তি পাবার চেষ্টা করতো। একদিন এরকম টানাহিঁচড়ার পর্ব চলাকালীন তা একজন দরদী শিক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি সকলকে এক ধমক দিয়ে ভাগিয়ে ক্রন্দনরতা রোজিকে কাছে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপার কি। রোজি কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে সব ঘটনা খুলে বলে। তখন তিনি তার মাথায় হাত বুলিয়ে,তাকে অভয় দিয়ে আবার ক্লাসে ফেরৎ পাঠান। 

কখনো কখনো খেলার মাঝে হঠাৎ করে সকলে তার সঙ্গে আড়ি করে, তাকে খেলা থেকে বাদ দিয়ে দিতো। নিত্যনৈমিত্তিক চলতো তাদের এরকম নানাপ্রকার অত্যাচার। শিশুদের মাঝেও যে জন্মগতভাবে দুর্বলকে পীড়নের যে সুপ্ত দুষ্টগুণাবলী তা নিভৃতে বয়ে চলে, এটা তারই প্রমাণ। 

সেদিন, স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলতে খেলতে কেমন করে তার হাতের টান লেগে, সহপাঠী একজনের ফ্রকটা একটু ছিঁড়ে যায়। মানে কোমরের ঘেরের কাছে কুঁচিটার একটু সেলাই খুলে যায় আর কি! ব্যাস! আর যায় কোথা! সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরে আর তার ভীতু স্বভাবের সুযোগ নিয়ে তাকে ভয় দেখাতে থাকে এই বলে, 

-- ইঁহ----! তুই ওর জামাটা ছিঁড়ে দিলি! এখন কি হবে? ওটা সেলাই করতে দর্জিকে পয়সা লাগবে তো? তুই কালকে অবশ্যই এনে দিবি সেলাই করার খরচা, চার আনা পয়সা।নইলে একদম ভালো হবে না,বলে দিচ্ছি। 

চার আনা মানে পঁচিশ পয়সা। রোজির তো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এখনকার ছেলেমেয়েদের মত করে মানুষ হয়নি সে । জীবনে আজ পর্যন্ত কোনদিন হাতে একটা পয়সাও নাড়ে নি । পঁচিশটা পয়সা এখন পাবে কোথায়? বাড়িতে যদি বলে, পয়সাতো পাবেই না, উল্টে বকা খেতে হতে পারে। বলা যায় না,আব্বা হয়তো স্কুলে এসে মেয়েগুলোর নামে কমপ্লেন করবে হেডমাস্টার এর কাছে! আর তার ফল ভোগ করতে হবে তাকে! এর পর না জানি কত হেনস্থায় না করবে তাকে সবাই মিলে! তখন কে সামলাবে? 
না। কোনমতেই বলা যাবে না বাড়িতে। তাকেই একটা বিহিত করতে হবে এর। 

পরেরদিন ঘুম থেকে উঠেই দাদুর পিছনে পড়ে গেলো রোজি। 

---- দাদু ,আজ বাজার যাবে না?দেরি হয়ে যাচ্ছে, পয়সা বের করবে চলো। চলো না! 

আসলে রোজ বাজার যাবার আগে দাদু তাকে দায়িত্ব দিতো ,চাবি দিয়ে টেবিলের ড্রয়ারটা টেনে খোলার। তারপর তাকে মানি ব্যাগ বার করে দাদুর হাতে দিতে হতো। দাদু সেটা নিয়ে বাজার যেতেন। 
তাই, রোজি আজ তারই প্রতীক্ষায়। এই সুযোগে সে তার কাজ হাসিল করতে চায়। 
অনেক পীড়াপীড়ি করার পর দাদু অগত্যা তাকে ড্রয়ারের চাবিটা ধরিয়ে দিলেন।
রোজি খুব তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরিয়ে, ড্রয়ারটা টেনে বের করে, লুকিয়ে মানি ব্যাগটা সরিয়ে নিলো,।তারপর খুঁজতে লাগলো তাতে চার আনা পয়সা। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাতে কোন সিকি বা চার আনাই ছিলো না। ছিলো একটা আধুলি বা আট আনা, মানে পঞ্চাশ পয়সা। বাধ্য হয়ে তাকে সেটাই নিতে হলো। কিন্তু পয়সাটা নিতে, অনুশোচনায় তার প্রাণটা যেন বেরিয়ে যেতে চাইছিলো। বার বার সে মনে মনে ক্ষমা চাইতে লাগলো, সর্বদ্রষ্টা আল্লাহর কাছে। কারণ এইটুকু বয়সেই সে জানতো, দাদুর চোখকে ফাঁকি দিলেও, যিনি অন্তর্যামী, তাঁর চোখকে কোনমতেই ফাঁকি দেয়া যায় না। 
পরিস্থিতির চাপে পড়ে, একটা নিষ্পাপ শিশুর এই ভাবে প্রথম একটা অপরাধের চক্করে পা দেয়া ! 
মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করলো, বাকি ফেরত পয়সা  আবার ঠিক জায়গায় এনে রেখে দেবে। 

সেদিন, যথারীতি স্কুলে গিয়ে,খুশি মনে সেই গচ্ছার পয়সাটা সে বন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছিলো। বন্ধুও সেটা গ্রহণ করেছিলো সানন্দে এবং পরেরদিন বাকি পঁচিশ পয়সা ফেরতও দিয়েছিলো তাকে। কিন্তু প্রতিজ্ঞা মত সে ফেরত পয়সাটা আর ঠিক জায়গায় রেখে দেয়া হয়নি। কারণ ফেরত বাকি সব পয়সাই  ছিলো অনেকগুলো খুচরো দুপয়সা আর তিন পয়সার সমষ্টি। এত গুলো খুচরো পয়সা, সে যদি আবার দাদুর মানিব্যাগের ভিতর রেখে দেয়, তাহলে দাদুর মনে প্রশ্ন জাগবে, সেগুলো কোথা থেকে এলো। অার তখনই সে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাবে! তাই শেষমেষ সেই প্রতিজ্ঞা আর রাখা হয়নি তার। কিন্তু স্কুল থেকে ফেরার পথে সে পান দোকান থেকে ছোটবোনের জন্য কিনে এনেছিলো টিকটিকির ডিমের মত ছোট ছোট মৌরী লজেন্স এবং মনে মনে আশ্বস্ত হয়েছিলো এই ভেবে যে, চুরির কিছু অংশ অন্তত সে ভালো কাজে ব্যায় করতে পেরেছে, বোনের জন্য কিছু কিনে এনে। 

দেখতে দেখতে কেটে গেছে  অনেক গুলো বছর। জীবনের সূর্য এখন মধ্যগগনে। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক কিউসেক জল। কিন্তু আজও স্মরণে তার জ্বলজ্বল করে, প্রথম করা সেই অপরাধ! হয়তো এভাবেই পরিস্থিতির চাপে, মানুষের মধ্যে শৈশবেই অপরাধ প্রবণতার বীজ রোপিত হয়। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা