সমুচিত জবাব

17th August 2020 1:06 pm রাফিয়া সুলতানা
সমুচিত জবাব


* সমুচিত জবাব *
------   রাফিয়া সুলতানা 
07.08.18

                 বাবা নবিন প্রামানিক, পেশায় ছিলেন নাপিত।চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে চার ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছিলেন তিনি। বড়ো ছেলে রবিনবাবু অনেক কষ্টে, লেখা পড়া শিখে ,চাকরি বাকরি করে আজ সংগতি সম্পন্ন হয়ে উঠেছেন। তাঁর একমাত্র ছেলে সুনীল ,সেও হায়দ্রাবাদে একটি ভালো সংস্থায় কর্মরত।মেয়ে রুম্পার বিয়েও হয়েছে এক স্বচ্ছল পরিবারে। তাই তিনি এবং স্ত্রী বিভাদেবী একরকম নিশ্চিন্ত। রবিন বাবুর এখনও একবছর চাকরি আছে। রিটায়ার্ড লাইফ কি করে যে কাটাবেন তা ভেবে এখন থেকেই তিনি শঙ্কিত। ছেলে তো বছরান্তে এক আধবার আসে কিনা সন্দেহ। কাজের চাপে সর্বদাই ব্যস্ত সে।  নিজের ছেলে মেয়ের স্কুলের পড়াশুনা, টিউশনি, একজাম,সে সব তো আছেই । তার উপর, সেখানেই নিজের জন্য একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনে নিয়েছে সে। তাই পিতৃগৃহে  ফিরে এসে, বসবাসের তেমন কোন সম্ভাবনাও নেই তার। মেয়ে রুম্পারও অবস্থা তথৈবচ। বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ী কে রেখে, স্বামীর সংসার ফেলে বাবা মায়ের খোঁজ খবর নিতে তার আর আসা হয়ে ওঠে না। তাই রবিনবাবু ,বাড়ির ছাদে প্লাস্টিক বিছিয়ে, তাতে মাটি ফেলে একটি বাগান তৈরি করেছেন। অবসর কালে, ঐ বাগান পরিচর্যা করেই সময় কাটাবেন বলে। তাছাড়া সম্প্রতি রামকৃষ্ণ মিশনেও যাতায়াত শুরু করেছেন তিনি ও তাঁর সহধর্মিণী । সেখানকার দুটি অনাথ মেয়েকে দত্তক নিয়েছেন তাঁরা। কি করবেন? নিজের ছেলে মেয়েরা তো আর তেমন পাত্তা দেয় না। তাই, দুধের সাধ ঘোলে মেটানো। মেয়েদুটোর সমস্ত খরচপত্র উনারায় বহন করেন।মাসে একবার খাবার, দাবার, বিভিন্ন উপঢৌকন নিয়ে দেখা করতে যান। মেয়ে দুটিও পথ চেয়ে বসে থাকে,তাদের এই নতুন পাওয়া বাবা-মায়ের জন্য। ওনারা এলে হাসি মুখে ছুটে আসে তারা, তাঁদের জন্য সাধ্য মতো উপহার সাথে নিয়ে। কখনো দুটো কমলা লেবু, কখনো কেক, কখনো ডিম সিদ্ধ ।ওরা টিফিনে যা পায়, তার থেকে বাঁচিয়ে। রবিনবাবু আর বিভাদেবী আপ্লুত হন তাদের কাছ থেকে এই অকৃত্রিম ও নিষ্পাপ ভালোবাসা পেয়ে। এভাবেই দিন কেটে যায় তাঁদের। 

              হাইপ্রেসারের রুগী, রবিনবাবুর ইতিমধ্যে দু-দুবার স্ট্রোক হয়ে গেছে।ডাক্তার বলেছেন, তৃতীয়বার হলে আর রক্ষা নেই। বিভাদেবীর তাই বড়ো চিন্তা হয়। স্বামী গত হলে তাঁর কি অবস্থা হবে? রবিনবাবুর হার্টে ম্যাসিভ ব্লকেজ আছে। বাইপাস সার্জারী করতে হবে। যা অনেক খরচাসাপেক্ষ। অত ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স নেই তাঁদের। যা ছিলো তা, বছর খানেক আগে, মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে সব খরচা হয়ে গেছে। ছেলেকে বলেছিলেন সে কথা। সে আমল দেয় নি তাঁর কথায়। অগত্যা ঈশ্বরের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে হাল ছেড়েছেন তিনি। 

          দুপুর বেলাটায় ,সময় যেন কাটতেই চায় না বিভাদেবীর।ঘুমও আসেনা আজকাল। খবরের কাগজ আর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করেন তিনি । আজ কাজের মেয়েটি সকাল সকাল বাড়ি চলে গেছে। কে নাকি কুটুম এসেছে তার বাড়িতে। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেছে সে। আলসেমি করে আর খিল দেয়া হয়নি তাতে। এখানে চোর ডাকাতের তেমন উপদ্রব নেই। তাই একটু নিশ্চিন্তি। 

              হঠাৎ খুলে যাওয়া দরজার বাইরে,  চোখ পড়তেই, সেখানে, ফুটফুটে বছর চারেকের একটি বাচ্চা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, বিভাদেবী যারপরনাই আশ্চর্য হলেন। তারপর উপরে চোখ তুলতেই দেখতে পেলেন, সস্ত্রীক সুনীল,ছেলে বিট্টুর হাত ধরে স্মিতহাস্য মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিভাদেবী তাঁর এই আচমকা সৌভাগ্যে, ভীষণ ভাবে বিহ্বল ও অভিভূত হয়ে পড়লেন।আনন্দে আত্মহারা হয়ে,দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নিলেন  তাঁর ছোট্ট নাতনি দোলন কে।

 "তোমাদের কোন খবর না দিয়ে হঠাৎ ই চলে এলাম মা। কেমন আছো তোমরা সবাই? "সুনীলের আচম্বিত কন্ঠস্বরে সম্বিত ফিরলো বিভাদেবীর।

"ঈশ্বরের কৃপায় ভালোই আছি বাবা।এতোদিনে, তোদের সময় হলো আসার? "

এই বলে তিনি সাদরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে সযত্নে আপ্যায়ন করলেন বৌমা অনিনিন্দিতা ও ছেলে সুনীলকে । 

        বিভাদেবী আবারও আশ্চর্য হলেন ঘণ্টা খানেক পরে মেয়ে রুম্পা কে জামাই অসিত সহ এসে উপস্থিত হতে দেখে। তাই, তাঁর আজ আনন্দের আর সীমা পরিসীমা রইলোনা। 
বিকেলে রবিনবাবুও যথারীতি ফিরে এলেন অফিস থেকে। রাত্রে সেদিন যেন চাঁদের হাট বসলো তাঁদের ডাইনিং হলে । সবাই মিলে জমিয়ে আড্ডা চললো অনেকক্ষণ।
অনেক গল্প গুজব, হাসি তামাসা চললো আসরে। নাতনী দোলন আর নাতি বিট্টু মাতিয়ে রাখলো সেখানকার পরিবেশ। অনেকদিন পর নাতি নাতনি কে পেয়ে আহ্লাদে আটখানা, দাদু  আর দিদা। 

          একসময় হঠাৎ সুনীল বলে উঠলো,"মা, বাবা!তোমাদের সঙ্গে আমার একটা দরকারী কথা আলোচনা করার আছে। আমাকে একটা বিশেষ কাজে দুদিনের জন্য এখানে আসতে হয়েছে। পরশুর সকালের ফ্লাইটেই আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে। অফিসে খুব কাজের চাপ। যাক সে কথা, যে জন্য এসেছি, সেটা এবার বলি।সম্প্রতি, আমি একটা বড়ো প্রোজেক্টে হাত দিতে চলেছি। তারজন্য একসঙ্গে অনেকগুলো টাকার দরকার, যেটা আমার এই মুহুর্তে নেই। এখানে আমার এক বন্ধু আছে, সে একজন নামজাদা প্রোমোটার। তার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছে । তাকে আমাদের বাড়িটা দিয়ে দেবো বলেছি। এই পুরনো বসতবাড়িটা ভেঙ্গে সে অনেকগুলো ফ্ল্যাট নিয়ে একটা বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট বানাবে।তার থেকে দুটো ফ্ল্যাট আমাদেরকে দেবে, যেটার মালিকানা, বাবার আর রুম্পার থাকবে। আর বাকি যে টাকাটা নগদ দেবে, তাতে আমার প্রয়োজন আপাততঃ অনেকটাই মিটবে। বোনের সঙ্গে আগেই আমার কথা হয়ে গেছে। ফাইনাল করার জন্য আমিই আজ রুম্পা ও  অসিত কে এখানে ডেকেছি। কাল আমার বন্ধু টি আসবে।যেহেতু বাড়িটা মায়ের নামে আছে, তাই শুধু মায়ের একটা সই হলেই চলবে। এবারে বলো, তোমরা কে কি বলছো।" এক নিঃশ্বাসে এই কথাগুলো বলে সুনীল এবারে একটু থামলো। 

     কথাটা শুনে রবিনবাবুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। অনেক কষ্টে, রোজগারের একটু একটু করে টাকা জমিয়ে, তিলে তিলে তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। তখনকার বাজারে, বেতন অনেক কম ছিলো তাঁর। খেয়ে না খেয়ে টাকা জমিয়ে, বাড়িতে ঢেলেছিলেন সেটা । তারপর স্ত্রী বিভাদেবীকে উপহার দিয়েছিলেন,বাড়িটা, এই বলে, "দেখো,আমি তো আর সম্রাট শাজাহান নই, যে তোমাকে তাজমহল গড়ে দেবো। তাই এটাই তোমাকে তৈরি করে দিলাম। এটাই তোমার তাজ মহল"।
সখ করে তাঁরা বাড়িটার নাম দিয়েছিলেন," স্বপ্ননীড় "। সেই বাড়ি কিনা ছেলে মেয়ে আজ টাকার বিনিময়ে প্রোমোটারের হাতে তুলে দিতে চায়! বড়ো আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকলেন রবিনবাবু । পরিস্থিতি কিছুক্ষণের জন্য বেশ থমথমে হয়ে উঠলো। এতক্ষণের হৈ হুল্লোড় হাসি তামাসা সব কেমন যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। সব নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে, অবশেষে, 

 "তোরা তো সব নিজে নিজেই ঠিক করে নিয়েছিস, আমার আর বলার কিছু বাকি আছে? "

 ----এই বলে রবিনবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে শোবার ঘরে চলে গেলেন। বিভাদেবীও আস্তে আস্তে স্বামীর পশ্চাদ অনুসরণ করলেন। তখনকার মত যে যার নিজের নিজের ঘরে চলে গেলো। সেদিন রাতে রবিনবাবু বিশেষ কিছু না খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন।তাঁর যে কিছুতেই ঘুম আসছিলো না, একথা রবিনবাবুর ঘনঘন পার্শপরিবর্তন করা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। অথচ স্ত্রীর কোন কথার উত্তর বা আলোচনাতেও কোন সাড়া দিচ্ছিলেন না। বিভাদেবীরও রাতে ভালো ঘুম হলো না। শুধু, ভোরের দিকে চোখটা একটু লেগে এসেছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, রবিনবাবু রোজকার মতো আজ প্রাতঃভ্রমণে যান নি। তাই তিনি একটু আশ্চর্য হয়ে স্বামীকে ঠেলা মারলেন। কিন্তু তাঁর বরফের মতো ঠাণ্ডা দেহের স্পর্শে তিনি চমকে উঠলেন। তাকিয়ে দেখলেন, বিস্ফারিত চোখে, অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে, তিনি চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। বিভাদেবীর আর্তচিৎকারে পাশের ঘর থেকে সবাই দৌড়ে এলো। সবার বুঝতে আর বাকি রইলো না, ঘুমের মধ্যে আরেকবার একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে তাঁর। বিভাদেবী সেটা টেরও পান নি। ফলে মুহুর্তের মধ্যে বিভাদেবীর জীবনে যেন অমাবস্যার ঘন অন্ধকার নেমে এলো। তাঁর বেদনার্ত হাহাকারে সারা বাড়ি যেন কেঁদে উঠলো একেবারে! 

         বাবার মুখাগ্নি করে পরের দিনই পূর্ব নির্ধারণ মতো, সুনীল ফিরে গেলো নিজের কর্মস্থলে।শ্বশুরবাড়ির সংসারের দায়িত্ব থাকায়, রুম্পাও বেশীদিন থাকলো না সেখানে । স্বামীর বাকি পারলৌকিক ক্রিয়া কর্ম বাধ্য হয়ে বিভাদেবীকে, প্রতিবেশীদের সাহায্যে ছেলেমেয়েদের ছাড়াই সম্পন্ন করতে হলো। 

       সেবার কার মতো সুনীলের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়াই, সে আবার পরের মাসে আসবে বলে কথা দিয়ে চলে গিয়েছিলো। স্বামী তৈরি করার পর, দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে, মনের মাধুরী মিশিয়ে তিল তিল করে নিজের হাতে সাজিয়ে তুলেছিলেন বিভাদেবী এই বাড়ি।বাড়ির প্রতিটি আনাতে কানাচে রয়েছে তাঁর সযত্ন হাতের মরমী ছোঁয়া। কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি,কত মায়া ছড়িয়ে আছে বাড়িটিকে ঘিরে। দুই ছেলে মেয়ে হেসে খেলে চন্দ্র কলার মতো বেড়ে উঠেছে, এই বাড়ি টিতেই। সেসব কিছু ভুলে,শুধু কিছু টাকার বিনিময়ে, আজ তারা এই বাড়ি বিকিয়ে দিতে চায়?তার সঙ্গে স্নেহ, মায়া, মমতা ভরা এই স্মৃতিটুকুর সব? ভাবতেই দুর্বিষহ ব্যথায় কুঁকড়ে যায় তাঁর বুক।তোড়পাড় করে ওঠে তাঁর হৃদয়ের ভিতর। ভেবে ভেবে ,মনে মনে,কিছুতেই স্থির থাকতে পারেন না তিনি । তাই, ইতিমধ্যেই ঠিক করে নিয়েছিলেন বিভাদেবী, ----- যে আঘাতে তাঁর স্বামীকে ইহলোক ত্যাগ করতে হলো, সেই আঘাতের এবার তিনি যথাযথ বদলা নেবেন। তাই, বিভাদেবী একদিন স্বামীর উকিল বন্ধু , বিজয়বাবুকে ডেকে, নিজের সাধের বসত বাড়িটি রামকৃষ্ণ মিশন কে দানপত্র করে লিখে দিলেন।তারপর , নিজে গিয়ে উঠলেন একটি বৃদ্ধাশ্রমে ।স্বামীর পেনশনেই তার যাবতীয় খরচাপাতি চালিয়ে নেবেন বলে মনস্থির করলেন তিনি । এইভাবে বিভাদেবী  তাঁর স্বার্থান্বেষী সন্তানদের তাদের কৃতকর্মের সমুচিত জবাব দিলেন। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা