সঙ্গদোষ

17th August 2020 1:09 pm রাফিয়া সুলতানা
সঙ্গদোষ


* সঙ্গদোষ *
(সত্যঘটনা অবলম্বনে) 
----- রাফিয়া সুলতানা 
27.12.18

শহরে, বাবুর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতো মনোয়ারা,ওরফে মনু। আজ মাস খানেক হলো,তার পরিচয় হয়েছে রাজমিস্ত্রী লাল্টুর সঙ্গে। বাবুর বাড়ির দোতলার নির্মাণকাজে যোগ  দিয়েছে সে। মনু যখন চা নিয়ে যায় মিস্ত্রীদের জন্য, নানারকম বাহানায় কিছুক্ষন আঁটকে রেখে, তাকে এটা ওটা জিজ্ঞাসা করতে থাকে লাল্টু । তার বাড়ির কথা, বাবা মা'র কথা,তার গাঁয়ের কথা। মনুর প্রথম প্রথম একটু সংকোচ হতো। তবে, এখন বেশ ভালোই লাগে তার, লাল্টুর সঙ্গে গল্পগুজব করে কিছুটা সময় কাটাতে। যতই হোক, উঠতি বয়স এখন। লাল্টুও বছর বিশের প্রাণবন্ত যুবক। তাই, তাদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ হওয়াটা স্বাভাবিক। 

মনু খুব গরিব ঘরের মেয়ে। বাবা কাঠের মিস্ত্রী। বাজারে, স্টীল আর ফাইবারের আসবাবপত্র আমদানী হওয়ায়, কাঠমিস্ত্রীর রোজগারে ক্রমাগত মন্দা দেখা দিচ্ছে । তাই কোনমতে টেনেটুনে সংসার চালায় তার বাবা। মনুর ছোট দুই ভাই আছে, আনোয়ার আর সানোয়ার । তারা দুজনেই স্কুলে পড়ে। কিন্তু অর্থাভাবে ক্লাস থ্রি'র পরে আর পড়া হয়নি মনুর। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য দশ বছর বয়সেই তাকে শহরে এসে, নাসিম সাহেবের বাড়িতে পরিচারিকার কাজে যোগ দিতে হয়। লাগাতার চারবছর ধরে কাজ করছে , এ বাড়িতে। ক্রমে যেন ঘরের আরেক সদস্য হয়ে গেছে সে । গৃহিণীও খুব স্নেহ করেন তাকে। রোগা, ফর্সা, ছিপছিপে গড়ন মনুর । সুন্দর মুখশ্রী। একনজরে চোখে ধরার মত । দেখামাত্রই পছন্দ হওয়ার কথা । হলোও তাই। মনে ধরলো লাল্টুর। বছর খানেক পরেই, লাল্টু মনুর বাবার কাছে তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করলো।মনুর বাবার আর্থিক অক্ষমতার কথা জানতো সে। পণ দিতে পারবে না জেনে ,তেমন কিছুই দাবি করেনি । শুধু তার নিজের মায়ের মন রাখতে, কনেকে যেন একজোড়া কানের দুল আর হাতে একজোড়া পলা বাঁধিয়ে দেয়া হয়, একথা আগেভাগেই জানিয়ে দেয় লাল্টু ।তবে, তার বাবাকে আর কষ্ট করে জোগাড় করতে হয়নি সে খরচা। নাসিম বাবুর গৃহকত্রীই গড়িয়ে দিয়েছিলেন, সে দুল ও পলাজোড়া। ফলে নির্বিঘ্নেই হয়েছিলো তাদের বিয়েটা। কিন্তু লাল্টুর মা ছিলো খান্ডান্নি গোছের মহিলা। এত অল্পে সন্তুষ্ট হবার পাত্রী ছিলো না সে। ফলে এ  বিয়ে ভালো মনে মেনে নিতে পারেনি তার মন। প্রায়ই সে তার বাবার কাছ থেকে আরো টাকাপয়সা আনার জন্য  চাপ দিতে থাকে নববধূকে। মনু বাপের বাড়িতে জানাতো না সে কথা। কারণ সে জানতো,তার বাবার পক্ষে তার শাশুড়ির দাবি মেটানো সম্ভব নয়। শুধু শুধু মনে কষ্ট পাবে তারা। তাই মুখ বুঁজে নীরবেই সহ্য করতো যত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর উৎপীড়ন। বছর ঘুরতেই একটা পুত্রসন্তান হলো তার । কিন্তু রেহাই মিললো না তাতেও। অত্যাচার চরমসীমায় পৌঁছালে, অবশেষে একদিন রেলে মাথা দিয়ে আত্মঘাতী হলো মনোয়ারা । তার আগে, কৌশলে কোলের ছেলেকে বাপের বাড়ি  রেখে এসেছিলো সে । লাল্টু ভিনদেশে কাজে যাওয়ায়, কিছুই টের পায়নি  এসবের। যখন জানতে পারলো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। খবর পেয়ে অনেক কান্নাকাটি করলো । ছেলেকে মানুষ করার জন্য আরেকটা বিয়েও করলো।
কিন্তু ছেলেকে আর ফিরে পেলো না সে । 

এদিকে নানা নানীর কাছেই মানুষ হতে থাকে মনোয়ারার ছেলে রণি। দেখতে দেখতে চোদ্দটা বছর কেটে গেলো। রণি এখন পনেরো বছরের তরতাজা তরুণ । বেশ মেধাবী এবং সুদর্শন  । কিন্তু খুব খোলা মেলা স্বভাবের ছেলে রণি। ভালো খারাপ সব ধরণের ছেলেদের সঙ্গেই সদ্ভাব তার। সবার সঙ্গেই মেলামেশা। কোন বাছবিচার নেই। গ্রামেরই এক ছেলে, কিছুটা ধূর্ত স্বভাবের এবং জুয়াড়ে নইমের সঙ্গে ক'দিন ধরে তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখে, তার মামা আনোয়ার, সাবধান করে দেয়,রণিকে। কিন্তু মামার কথায় বিশেষ আমল দেয়নি রণি। 

একদিন মুম্বাইয়ে রাজমিস্ত্রীর কাজে কর্মরত লাল্টু একটা ফোন পেয়ে বেশ অবাক হলো। ছেলে রণি,দীর্ঘ একযুগ পর,নিজের পরিচয় দিয়ে, ফোন করেছে তাকে। কোনভাবে লোক মারফত আব্বার ফোন নম্বর জোগাড় করেছে সে। ফোন করে জানিয়েছে তার সব দুঃখকষ্টের কথা। তার পড়াশোনার খরচ চালানো নাকি ইদানীং খুব দুরূহ হয়ে উঠেছে। সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা।ভালো রেজাল্টের জন্য তার কয়েকটা বিষয়ে টিউশনের দরকার। কিন্তু হতদরিদ্র কাঠমিস্ত্রী নানা সে খরচা দিতে পারছে না। তাই আব্বার কাছে অর্থ সাহায্য চায় সে। 
বিগত চোদ্দ বছর যাবৎ ছেলের সঙ্গে কোনই যোগাযোগ নেই লাল্টুর। মনোয়ারার মৃত্যুর পর তার বাপের বাড়ির লোকজন আর দেখতে দেয়নি তাকে,তার ছেলের মুখ। কোনরকম সম্পর্কও রাখতে চায়নি তারা আর ,তার সঙ্গে।  মনুর আত্মঘাতী হওয়ার পিছনে তার কোন হাত না থাকলেও মনুর বাপের বাড়ির লোক মনেমনে তাকেই দোষী সাব্যস্ত করেছিলো। কারণ সে-ই যেঁচে বিয়ে করে ঘরে তুলেছিলো তাকে, অথচ তার ভালোমন্দ দেখার বা নিরাপত্তা বিধানের কোন ব্যবস্থাপনা করেনি সে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির প্রতিবেশীদের কাছে, তার ওপর করা শাশুড়ির অকথ্য অত্যাচারের কথা জানতে পারে মনুর বাপের বাড়ির লোকজন। তবে মেয়ের লাশের খারাবি হবে এই ভেবে থানায় কোন অভিযোগও দায়ের করেনি তার বাড়ির লোক । ছেলে রণির সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে দিয়ে, এভাবেই লাল্টুকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলো তারা। সত্যি-- শাস্তি পেয়েও ছিলো লাল্টু ,একই সঙ্গে স্ত্রী-পুত্র দুজনকে হারিয়ে । স্ত্রী মনোয়ারা ও সন্তান রণিকে সে অত্যধিক ভালোবাসতো। কিন্তু মায়ের বিরুদ্ধেও কিছু উচ্চবাচ্য করতে পারতো না । কারণ অল্প বয়সে বিধবা হয়ে, খুব কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছিলো তার মা। তাই মায়ের মনে ব্যথা দিতে কোনদিন সাহস করতো না লাল্টু। বউকে বলতো," একটু সহ্য করো। আমি একটু ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হই, তারপর তোমাকে নিয়ে আসবো আমার কাছে"। কিন্তু মনু জানতো, নিজের মাকে একলা ফেলে, কোনদিনই সে তাকে নিয়ে যাবে না নিজের কাছে। কারণ, মাকেও খুব ভালোবাসতো লাল্টু। তাই কোনদিনই মুক্তি পাবে না মনু এই নরকযন্ত্রণার হাত থেকে। অগত্যা শাশুড়ির অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেতে আত্মহননের পথই বেছে নেয় সে। 

এতদিন পর ছেলের খোঁজ পেয়ে ও তার কণ্ঠস্বর শুনে বিগলিত হয়ে গেলো দুর্বল পিতার অন্তর। তাই সঙ্গে সঙ্গে  তাকে অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেললো লাল্টু। বেশ কয়েকবার টাকাও পাঠালো তাকে। কিন্তু দিনদিন রণির চাহিদা যেন বেড়েই চললো। শেষ পর্যন্ত একদিন একটা বাইক কেনার আব্দার করে বসলো সে। লাল্টুর মনে কেমন যেন সন্দেহ হলো। ছেলের সঙ্গে দেখা করতে চাইলো সে। লাল্টু বললো,সে তাকে সঙ্গে নিয়ে, নিজে গিয়ে বাইক কিনে দেবে । সেইমতো দিনক্ষণও ঠিক করে ফেললো। 

কিছুদিন পর-----

রণির বাড়িতে আচমকা একদিন সর্বনাশের করাল ছায়া নেমে এলো। কে বা কারা তাকে খুন করে গ্রামের বাইরে, জলার ধারে ফেলে রেখে গেছে। শোকে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে গেলো রণির গোটা পরিবার। পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করলো। পুলিশকে প্রাথমিক ভাবে রহস্য সমাধান করতে বেশ বেগ পেতে হলো। কারণ রণির সঙ্গে কারও কোনরকম শত্রুতাই ছিলো না। গ্রামের সব রকম মানুষের সঙ্গেই ছিলো তার সুসম্পর্ক। 
ইতিমধ্যে লাল্টু একদিন তার শ্বশুরবাড়ি এসে হাজির হলো। তার কাছে সব শুনে তো পুলিশ আরো ধন্ধে পড়ে গেলো। কারণ, তার পরিবারের কাছে জানা গিয়েছিলো, রণি ছিলো খুব আলাভোলা,  সাদাসিধে ধরণের ছেলে । পড়াশোনার ব্যাপারে তার কোন সমস্যাও ছিলো না। সে যে বাবার কাছে টাকা নিয়ে,ফুর্তি করবে বা মোটরবাইক কিনতে চাইবে, এ ধরনের কোন মানসিকতাও ছিলো না তার। ফলে রহস্য আরো দানা বাঁধলো। 
লাল্টুর ফোনের কললিস্ট থেকে জানা গেলো যে তার সঙ্গে, ছেলের পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করেছিলো যে, সে আদপেই রণি ছিলো না। পুলিশ তখন, কাদের সঙ্গে রণি বেশি মেলামেশা করতো,তাদের ধরে,ধরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো।অবশেষে আসল কালপ্রিট ধরা পড়লো।পুলিশ জানতে পারলো,রণির বন্ধু নইম-ই, লাল্টুর ফোন নম্বর জোগাড় করে, তার কাছ থেকে রণির নাম করে এতদিন যত টাকাপয়সা আত্মস্যাৎ করেছে। ক্রমে তার লোভ আরো বাড়তে থাকে। কিন্তু লাল্টু নিজে তার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ায়, ঘটে যায় যত  বিপত্তি!
তার সব ফন্দিফিকির ফাঁস হয়ে যাবার আশঙ্কায়, সে শেষে রণিকে মাথায় পাথরের আঘাত মেরে খুন করে, ফেলে যায় । ভেবেছিলো, রণি মারা যাওয়ার খবর পেলে, লাল্টু আর কোন খোঁজখবরই নেবে না । আর, সেও ধরা পড়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু অবশেষে, অপরাধীকে একদিন ধরা পড়তেই হয়, সে যতই চালাকচতুর হোক না কেন। ধরাও পড়লো। মাঝ থেকে নিরপরাধ রণিকে অকালে প্রাণ দিতে হলো। শান্ত, শিষ্ট , মিশুকে ছেলেটার এভাবে অপমৃত্যু ঘটাতে, শুধু তার পরিবারেই নয়, সারা গ্রামে ঘনিয়ে এলো এক অভূতপূর্ব শোকের বাতাবরণ । সঙ্গদোষ যে কিভাবে মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে, এটা তারই একটা জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা