লজ্জা

19th August 2020 1:42 pm রাফিয়া সুলতানা
লজ্জা


*  লজ্জা *
------     রাফিয়া সুলতানা 
11.07.18

        গার্লস স্কুলে ক্লাস এইট থেকে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান পেয়ে, নাইনে  উঠেছে রুক্সানা। নতুন ক্লাসে নতুন ভাবে সেক্সান বিন্যাস হাওয়ায়, সব পুরনো বন্ধুদের হারিয়ে, নতুন সেক্সানে একদম একা হয়ে গেছে সে। বরাবর শান্ত আর মুখচোরা স্বভাবের মেয়ে রুক্সানা,তাই নতুন কোনো বন্ধু হয়নি এখনো। লাস্ট বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে থাকে মন মরা হয়ে। পাশের বেঞ্চের সারিতে বসা সুলগ্না নামের মেয়েটি বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমন মিষ্টি গলা। স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে "দ্য বিশপস্ ক্যান্ডেল স্টিক্স" নাটকে, বিশপের ভুমিকায় তার অভিনয় মন কেড়ে নিয়েছিলো রুক্সানার। যেমন ইংলিশ প্রোনান্সিয়েশন, তেমনি সপ্রতিভ অভিনয়। সেই থেকেই যেন একটা আকর্ষণ গড়ে উঠেছে রুক্সানার, সুলগ্নার প্রতি। সেদিন হঠাৎ,কি মনে করে, সুলগ্নাই কাছে ডেকে এনে নিজের পাশে জায়গা করে বসালো রুক্সানা কে। রুক্সানা যেন হাতে চাঁদ পেলো। সেই থেকেই সূচনা দুজনের বন্ধুত্বের। ক্রমে প্রগাঢ় হলো তা। দুজনে যেন হরিহর আত্মা। সব সময় একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায় সারা স্কুলে। তাদের বন্ধুত্ব এখন স্কুলে বেশ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ঈর্ষাও হয় কারো কারো, বিশেষ করে তাদের পুরনো বন্ধুদের! 

        সুলগ্না ভালো গান গায়। রুক্সানার মত মুখচোরা স্বভাব নয় তার। বরং একটু উচ্ছল প্রকৃতির সে। যখন তখন হৈ হুল্লোড় করে গল্পের আসর জমাতে পারে। জমিয়ে বসায় গানের আড্ডা। ক্লাসে বেশ জনপ্রিয়তা তার। রুক্সানাও গান গাইতে পারে। তবে সবার সামনে গান গাওয়ার সাহস নেই তার। তাই বরাবর শ্রোতার ভূমিকাই নেয় সে। স্কুলের বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠান উপলক্ষে নাচের অনুষ্ঠানে নাম দিয়েছে দুজনেই। নাচের মহড়ায়, সুলগ্নাই প্রশিক্ষণ দেয় বন্ধু রুক্সানা কে। এবারের অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষায়,রুক্সানা ও সুলগ্না, দুজনে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। তাহলেও হিংসা করেনা কখনো, কেউ কাউকে। বরং রুক্সানাই একটু ফাঁকিবাজ স্বভাবের।অনেকটা সুলগ্নার তাগাদাতেই তাকে, ক্লাসে নিয়মিত পড়া করে আসতে হয়। সুলগ্না মনে মনে টপকাতে চায় বন্ধুকে। কিন্তু পারে না, যদিও সে পড়াশোনার ব্যাপারে, রুক্সানার চেয়ে অনেক বেশী সিরিয়াস। প্রতিটা বিষয়ে অনেকটা তফাতে ভালো নম্বর পেয়ে এগিয়ে যায় রুক্সানা। রচনা, ভাবসম্প্রসারন, সামারি রাইটিং সবিতেই হারিয়ে দেয় সুলগ্নাকে। শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে সব সময় বাড়তি প্রশংসা কুড়িয়ে নেয় রুক্সানা।ঈর্ষা হয় সুলগ্নার।কিন্তু তবু বন্ধুর প্রতি ভালোবাসার ঘাটতি পড়ে না একটুও। 

           পরপর দুটো ক্লাসে রেজাল্টের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে গেলো দুজনে। এবার সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা। দুজনেই পরীক্ষার্থী। দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পরীক্ষার দিন এগিয়ে এলো। পরীক্ষা দিলো দুজনে। তিনমাস পর ফল ও বেরোলো। কিন্তু দেখা গেলো, এগ্রিগ্রেডে দশ নম্বর বেশী পেয়ে রুক্সানা কে পিছনে ফেলে, এবার স্কুলের মধ্যে প্রথম হয়েছে সুলগ্নাই।  প্রথম হতে না পেরে খুব মুষড়ে পড়লো রুক্সানা। কিন্তু প্রিয়বন্ধুর কাছে হেরে গিয়ে মোটেও বিমর্ষ হয়নি সে। প্রতীক্ষা করতে লাগলো, বন্ধুর ফোনের। কিন্তু তার কোনো ফোন না পেয়ে,অবশেষে নিজেই তাকে কংগ্র্যাচুলেশন জানিয়ে, ফোনের মারফত জানতে চাইলো,সুলগ্নার কাছে, এই সুখবরটা কেন সে নিজেই দিলোনা। সুলগ্নার উত্তরে সে আশ্চর্য হলো রীতিমতো।রুক্সানাকে পিছনে ফেলে, সে যারপরনাই লজ্জিত হয়েছে, বন্ধু কি মনে করবে, এই ভেবে। হয়তো দুঃখে, হাউহাউ করে কেঁদেই ফেলবে রুক্সানা,এই ভয়ে সে আগে ফোন করেনি তাকে। রুক্সানা সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি। 
এই ভাবে সাফল্যের অহমিকা,  হার মানলো,দুজনের অন্তরঙ্গতা,  হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বের কাছে। বরং বদলে দিলো লজ্জা! প্রিয়বন্ধুকে হারাতে পেরে অহংকারের চেয়ে সংকোচই বেশী পেলো সুলগ্না,এমনই ছিলো তাদের বন্ধুত্ব! কিন্তু এটাই শেষ নয়। আবারও একবার লজ্জার সম্মুখীন হতে হয় সুলগ্না কে। 

       রুক্সানার বাবা কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। তার বাবার  ছাত্র সৌরভ কে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে যায় রুক্সানার।কিন্তু সৌরভ টুয়েল্ভ পাশ করে যাওয়ায় আর দেখা হয়নি তাদের। সে বছর দুই আগের কথা।তখন রুক্সানা ক্লাস এইটের ছাত্রী। 

   মাধ্যমিক পাশ করে, কলেজে ভর্তি হওয়ায় আবার সৌরভের দেখা পায় রুক্সানা।সে তখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র। সুদর্শন, সৌম্যকান্তি, তার উপর কলেজের জি. এস। দেখামাত্রই সব মেয়েরা প্রেমে পড়ে যায় তার। সুলগ্নারও সেই দশা হলো। কিন্তু রুক্সানার কাছে জানতে পারলো সৌরভকে তার পছন্দের কথা। দুবছর আগে তার বাবার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসতো সে। তখন থেকেই রুক্সানার ভালো লাগে সৌরভকে। কিন্তু সে ভালো লাগা মনে মনেই থেকে গেছে রুক্সানার । সৌরভ তাকে চিনতে না পারলেও রুক্সানা ঠিক চিনেছে তাকে।আগেই বলেছি, লাজুক স্বভাবের মেয়ে সে। তাই বন্ধুকে লজ্জা জড়ানো গলায় বলেছিলো তার মনের কথা। এরমধ্যে দুএক বার বিশেষ প্রয়োজনে দেখা করতে হয়েছে তাদের সৌরভের সঙ্গে। কিন্তু লাজুক রুক্সানা নিজে তার সামনে না গিয়ে বন্ধু সুললগ্নাকে এগিয়ে দিয়েছে । সপ্রতিভ মেয়ে সুলগ্না। দেখতেও সুশ্রী। কিছুদিনের মধ্যেই কলেজের সবাই চিনে গেলো দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু রুক্সানা ও সুলগ্নাকে। সৌরভের প্রতি রুক্সানার আকর্ষণ মনে মনে ভাবায় তাকে। চিন্তা করে, কিভাবে এই পরিস্থিতির একটা সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। সৌরভের কানে কথাটা যেমন করেই হোক তুলতেই হবে তাকে।তাই যেঁচে আলাপ করে সে সৌরভের সঙ্গে।দেখা হলেই মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করে। মতলব, কোন এক ফাঁক বুঝে বন্ধুর হয়ে ঘটকালি করা। যাকে বলে ঝোপ বুঝে কোপ মারা। কিন্তু বিধি বাম! একদিন হঠাৎ কলেজের ক্যান্টিনে একটা ছেলে এসে সুলগ্নাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো তাকে। খুব অবাক হয়ে কলেজের কমনরুমে গিয়ে সন্তর্পণে খুলে দেখলো চিঠি টা সুলগ্না। চিঠিটা পড়ে সে দরদর করে ঘামতে লাগলো।তাতে  সৌরভ তাকে প্রেমের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ভাগ্যিস সেদিন রুক্সানা অ্যাবসেন্ট ছিলো। নইলে কি করে যে সে এই লজ্জা ঢাকতো তার কাছে ! প্রিয় বন্ধুর স্বপ্নপুরুষ কিনা প্রেমপত্র পাঠিয়েছে তাকে! যদিও তারও একটা দুর্বলতা আছে সৌরভের প্রতি। তাই বলে তার সঙ্গে প্রেম? অসম্ভব! প্রাণ থাকতে সে এই কাজ করতে পারবেনা। রুক্সানা কে এ ব্যাপারে জানাবেও না কিছু। পরক্ষণেই মনস্থির করে নিলো সুলগ্না। জানিয়ে দিলো সৌরভ কে যে, সে বাগদত্তা। তার প্রস্তাবে রাজি হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। হ্যাঁ, মিথ্যা কথাই বলেছিলো সে, প্রিয় বান্ধবীর কাছে নিজেকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে !





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা