আজও কাঁদে নিরুপায় মাতা

21st August 2020 8:33 pm রাফিয়া সুলতানা
আজও কাঁদে নিরুপায় মাতা



 * আজও কাঁদে নিরুপায় মাতা *
------ রাফিয়া সুলতানা 
21.12.18

সমাজ কি নির্মম, তারই এক গল্প শোনাবো আজ। 

অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিয়ে করেছিলো রেবেকা তার ভালোবাসার মানুষ , রফিককে। সেই ভালোবাসার মানুষটি পেশায় ছিলো চিত্রশিল্পী। আত্মীয়তার সম্বন্ধ থাকায় এ বিয়েতে খুব একটা আপত্তি করেনি বাড়ির কেউ।বছর ঘুরলে, একটি কন্যসন্তানও হয় তাদের। রফিকের যৎসামান্য আয়ে, সুখেই কাটছিলো তাদের দিন। তবে কন্যা সাবেরার কিছু শারীরিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিলো পরে । যৌবনে পদার্পণ করলেও, বয়স অনুপাতে ঠিকমতো বিকাশ হয়নি তার শরীরের স্বাভাবিক গড়নের ।অনেক চিকিৎসার পর কিছুটা ফল মিলতে শুরু করে,অবশেষে। তবে লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলো সে।  এখন সে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। 

ভালোই চলছিলো সবকিছু। কিন্ত এরই মধ্যে ঘটে গেলো এক অঘটন। অ্যাক্সিডেন্টালি, নিজের অজান্তে আবার গর্ভবতী হয়ে পড়লো রেবেকা। সন্তানবতী হওয়ার স্বাভাবিক লক্ষণ গুলো প্রকাশিত না হওয়ায়, ব্যাপারটা জানতে  গর্ভসঞ্চারের প্রায় তিনমাস অতিবাহিত হয়ে গেলো । খবর জানাজানির সঙ্গে সঙ্গে পরিবারে দেখা দিলো চরম অশান্তি। রফিক সহ তার পরিবারের সকলে চায় রেবেকাকে অ্যাবরসন করাতে। এতো বছর বয়সে সন্তান হলে নাকি তার অ্যাবনরম্যাল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি । যেহেতু রফিকের দুই বোন ছিলো প্রতিবন্ধী, তাই সবার মনে এই ধারণা মাথা চাড়া দেয়।  কিন্তু রফিকের আরও দুই দাদা সহ সে নিজেও যে নরমাল বা স্বাভাবিক ছিলো, তাই এই বাচ্চাটি কেন স্বাভাবিকও হতে পারবে না, এ প্রশ্ন একবারও কারো মনে এলো না! 

এদিকে সাবেরার তো মনে আনন্দ আর ধরে না। ভাই-বোনহীন একাকী জীবন তার মোটেও ভালো লাগতো না। বন্ধুদের সবারই ভাই বোন আছে। তারা একসঙ্গে কত রকম মজা করে। রোজ রোজ এসব গল্প তাকে শুনতে হয় আর ভুগতে হয় নিদারুণ মনোকষ্টে। কি ভালো হতো, যদি তারও একটা ছোট্ট ভাই কিংবা বোন থাকতো। কত মজা করতো তারা দুজনে মিলে! মায়ের গর্ভসঞ্চারের খবরে, তাই দিদি ডাক শোনার জন্য সে অধীর হয়ে উঠলো। রেবেকাও মনে মনে খুব খুশি। কিন্ত বাধ সাধলো পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। অন্যান্য সদস্য বলতে তার দুই জা। তারা এককাট্টা হয়ে ক্রমাগত রফিককে উত্তেজিত করতে লাগলো নানারকম কথা বলে। গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নেয়া সত্বেও কেন গর্ভবতী হলো রেবেকা ?  নিশ্চয় - দাল মে কুছ কালা হ্যায়!  কিন্তু একথা কারও বিবেচনায় এলো না যে , মানুষের হাজার রকম ব্যবস্থা নেয়ার মাঝেও ভুলত্রুটি, অসাবধানতাবশতঃ মাঝে মাঝে - এই রকম হতে পারে!

 পরিবারে যখন দোষ আছে, তখন এও নিশ্চিত প্রতিবন্ধী হবে- কেবলমাত্র সেই একটা সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে, সেই চিত্রশিল্পী রফিকও কিনা অবশেষে জল্লাদের মূর্তি ধারণ করলো! ফলে দিন কে দিন রেবেকার উপর রফিকের মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চললো।
অগত্যা রেবেকা বাধ্য হয়ে গোপনে পালিয়ে গেলো তার মাসীর বাড়ি। কিন্তু তাতেও নিস্তার পেলো না সে। তার খবর জানতে চেয়ে তার মেয়ের উপর চললো অকথ্য অত্যাচার । বাধ্য হয়ে আবার শ্বশুর বাড়ি ফিরে আসতে হলো রেবেকাকে । তখন তার উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে গেলো।  প্রায়শঃই তাকে অনাহারে, অর্ধাহারে রাখা হতো। কারও সঙ্গে যাতে যোগাযোগ রাখতে না পারে, তারও ব্যবস্থা করা হলো, তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে। শুধু রেবেকা নয়, তাকে সমর্থন করায়, কন্যা সাবেরার উপরও চললো অকথ্য নির্যাতন।  বৌদিদের প্ররোচনায়, গর্ভের সন্তানটি নাকি তার নয়,  এই বলেও রটনা করতে লাগলো রফিক ।একদা প্রিয় মানুষটিও যে এভাবে রাতারাতি চরমশত্রুতে রূপান্তরিত হতে পারে , একথা  স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি রেবেকা ।

 গ্রামের লোকজন ডেকে সালিস বসানো হলো একদিন। রেবেকার এটি অবৈধ সন্তান, এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে একবাক্যে তারা সকলে রায় দিয়ে বললো, গর্ভপাত করতে রাজি না হলে, রেবেকাকে নেড়া করে তার মাথায় ঘোল ঢেলে সারা গ্রামে ঘোরানো হবে। রেবেকার কিছুতেই মাথায় এলো না,অসময়ে গর্ভবতী হলেই কেন সে সন্তানকে অবৈধ অ্যাখ্যা দেয়া হবে!
শেষ পর্যন্ত  ডিভোর্সের হুমকি দিয়ে কন্যাসহ বাপের বাড়িতে রেখে আসা হলো রেবেকাকে । কিন্ত বাপের বাড়িতেও একমাত্র বড়দিদি ছাড়া আর কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না। মা বললেন - তিনি বিধবা, নিজেই নিজের ভরণপোষণের জন্য একমাত্র ছেলের মুখাপেক্ষী, তিনি কি করে ভার নেবেন রেবেকার। দাদা বললো - দুটো পরিবারের খরচ বহন করতে সে অপারগ। অন্য দুই দিদি নিজের নিজের সংসার নিয়ে ব্যাতিব্যাস্ত! একমাত্র স্বল্প আয়ের বিধবা বড়দিদি তার ভাবি নবজাতক সন্তানের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হলো। কিন্তু রফিক তাতেও রাজি হলো না। 

ততদিনে গর্ভধারণের পাঁচমাস অতিবাহিত হয়ে গেছে।এই সময়ে গর্ভপাতে জীবনের ঝুঁকি থাকায়, ডাক্তারের তাতে বারণ ছিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও অবশেষে হার মানতে হলো তাকে। বাধ্য হয়ে পাঁচ মাসের সন্তানের গর্ভপাত ঘটাতে মত দিতে হলো রেবেকাকে । রেবেকা অনেক কাঁদলো তার আগে। কি করে সে নিজের সন্তানকে হত্যা করবে,পাঁচ পাঁচটা মাস ধরে বয়ে বেড়িয়েছে যাকে! দিনরাত সে অনুভব করে যার ছোট্ট প্রাণের হৃদস্পন্দন! এই দীর্ঘ সময় ধরে যাকে নিয়ে অনেক স্বপ্নের জাল বুনেছিলো সে। কত সাধ! কত কল্পনা! কত আশা! 

তার কান্নাকাটি দেখে, বিচলিত হয়ে, হসপিটালের নার্স বললো, একটা লিখিত অভিযোগ দিতে, তাহলে তার অত্যাচারী স্বামীর বিরুদ্ধে সে আইনানুগ ব্যাবস্থা নিতে পারবে। কিন্ত আমাদের সমাজে 
বে-রোজগেরে,পরনির্ভরশীল,পরাধীন অসহায় গৃহবধুর কি সেই সামর্থ্য আছে , নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে,কতৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়ে তাকে শাস্তি দেবার? তাহলে সে যে, হাতে মরার সঙ্গে সঙ্গে ভাতেও মারা পড়বে!!! তাই তাকে মুখ বুঁজে সহ্য করতে হয় সব অন্যায় অত্যাচার! 

শেষ বারের মত দেখা, নিহত সন্তানের কচি কচি আঙ্গুল, ছোট্ট ছোট্ট হাত পা, নিষ্পাপ মুখাবয়ব আজও ভুলতে পারে নি রেবেকা ! যেন সে সর্বদা শুনতে পায় তার সকরুণ মুখের হৃদয়ভেদী প্রশ্নবাণ ------ কি অপরাধে হত্যা করা হলো তাকে ? তাই যদি হবে তবে তাকে এই পৃথিবীতে আনা হয়েছিলো কেন?আর যদি আনাই হলো তবে কেন দেখতে দেয়া হলো না পৃথিবীর আলো? মানুষ কি শুধু মাত্র নিজের ভোগবিলাসের জন্যই তাদের পৃথিবীতে আনবে আর প্রয়োজন মিটে গেলে নির্বিচারে নিধনযজ্ঞ চালাবে এই নিষ্পাপ প্রাণগুলোর উপর ? তাদের কি বিন্দুমাত্র দায়িত্ব ,কর্তব্যবোধ,নীতিজ্ঞান বলে কিছইু নেই? নেই কোন স্নেহ, দয়ামায়া ,মমতা? 
-----সে উত্তর তো নেই রেবেকার কাছে ! তাই দিনেরাতে এক করতে পারে না সে তার দু-চোখের পাতা! সারাটাদিন একই নরক যন্ত্রণা পীড়া দেয় তাকে! তিল তিল করে শেষ করে তাকে এই নিদারুণ আত্মদহন! শেষ করে ফেলতে ইচ্ছা হয় এই অসহায়, নিরুপায়, নিষ্ফল জীবনের অস্তিত্ব! মনে হয়, এমনি ভাবে কবে বুঝি পাগলই হয়ে যাবে সে !

রেবেকার ঘটনা সামনে এলেও, নাজানি আরও কত অসহায় রেবেকারা চক্ষুর অন্তরালে, হয়ে চলেছে এই নরকযন্ত্রণার শিকার! নীরবে সহ্য করে চলেছে এই অসহ্য দহন যন্ত্রণা! কেন মায়েদের থাকবে না তার নিজের সন্তানের প্রাণরক্ষার অধিকার? ধর্মে আছে সন্তান হত্যা মহাপাপ! কিন্তু চোরা কি শোনে ধর্মের কাহিনী? আদৌ কি শেষ হবে - কোনদিন আমাদের এই নিষ্ঠুর সমাজে, এই নিরুপায় মায়েদের অসহায় কান্না?





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা