হারানিধি

23rd August 2020 11:49 am রাফিয়া সুলতানা
হারানিধি


* হারানিধি *
---------- রাফিয়া সুলতানা 
20.10.18

সেবার নিজাম সাহেব পরিবারকে নিয়ে সিমলা বেড়াতে গিয়েছিলেন। আসলে তাঁর একটা অফিসিয়াল কাজ ছিলো  সিমলার 'পটেটো রিসার্চ ইনস্টিউটে'। একই সঙ্গে বেড়ানোটাও হয়ে যাবে, এই উদ্দেশ্যে সেখানে সবাই মিলে যাওয়া।সঙ্গে স্ত্রী রুক্সানা, দুই পুত্র,দশ বছরের শুভ্র,আর পাঁচ বছরের আবির ও ছোট ভাই সেলিম।শুভ্র একটি স্পেশাল চাইল্ড(অটিস্টিক)। একধরণের মানসিক প্রতিবন্ধী। তাই তাকে রুক্সানা প্রতিটা সময় খুব চোখে চোখে রাখে। ওনারা সিমলা আসার পথে, আগ্রাটাও ঘুরে নিয়েছেন, তাজমহল দেখার উদ্দেশ্যে। সেই সঙ্গে রাজধানী দিল্লীর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানও ।কলকাতা থেকে দিল্লী এসেছিলেন ফ্লাইটে। শুভ্র, আবির ও সেলিমের এটা প্রথম প্লেনে চড়া। তাই, খুব এনজয় করেছে সবাই মিলে। তারপর, তাজমহলের অপরূপ দৃশ্য। মনোহর কারুকার্য! বার বার দেখলেও যেন পুরনো হয়না না। দিল্লীর লালকেল্লা, চাঁদনীচক, জামা মসজিদ, গান্ধীজীর সমাধি, গান্ধীপরিবারের স্মৃতিবিজরিত মিউজিয়াম, একে একে সব দেখে, ট্রেনে চড়ে কালকা। তারপর টয়ট্রেনে সিমলা । নিজাম সাহেব বেশিদিন বাড়ির বাইরে থাকতে পছন্দ করেন না। তাই তাঁর প্রতিটি ট্যুরই হয় সংক্ষিপ্ত এবং কমপ্যাক্ট। সিমলায় এসে, সরকারী একটি গেস্ট হাউসে উঠলেন সপরিবারে। পাহাড়ী রাস্তা। গেস্ট হাউসে পৌঁছাতে, অনেকটা পথ ভাড়া করা কারে আসতে হয়। পাহাড়ী পথে সচরাচর অনেক টার্নিং থাকে।নানারকম মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে, চরকির মতো ঘুরপাক খেতে খেতে পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে উপরে ওঠা ।পাহাড়ের একপাশে থাকে, পাইন, ফার ,দেবদারু ইত্যাদি নানারকম  উঁচু উঁচু গাছের জঙ্গল, আর অন্যদিকে থাকে সুগভীর খাদ। যদিও কারো কারো কাছে, এটা বেশ উপভোগ্য, কিন্তু তাতে আবার কারও কারও গা গুলায়।রাস্তায় এটা সেটা আবোল তাবোল খাওয়াও হয়েছে কিছু। তাই সেলিম এবং শুভ্র খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সেলিম তো পথেই অনেকবার বমি করেছে। আর শুভ্র গেস্টহাউসে ঢোকার মুখে হঠাৎ বমি করে বসলো। জুন মাস। সমতলে এখন ভ্যাপসা গরম। বর্ষা এখনো ঢোকেনি। অথচ এখানে এখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। সবাই তাই স্যুটকেস থেকে সোয়েটার বের করে পরে নিলো। এখন বেলা দশটা। সারাদিন গেস্ট হাউসে বিশ্রাম করে, বিকেলে সবাই একসঙ্গে বেরোলো ঘুরতে। ঘোরার জায়গায় যেতে গেলে খানিকটা দূরে যেতে হয়। গেস্টহাউস থেকে বেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে, বাস ধরে যেতে হয়, বাজার এলাকায়। ফলে সকলে মিলে বাসে উঠলো। এক জায়গায় সিট না পাওয়ায়, সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো। রুক্সানা ছোট ছেলে আবিরকে নিয়ে, আর নিজাম সাহেব বড়ছেলে ও ভাইয়ের সাথে। রুক্সানা শুভ্রকে একবার তাকিয়ে দেখে নিলো, ঠিক ঠাক বসেছে কিনা। গন্তব্যে পৌঁছে নামার সময়, সেলিম, নিজাম সাহেব, শুভ্র আগে আগে নামলো। রুক্সানা ছোট ছেলেকে নিয়ে নামলো পরে। তাদের সাথে আরও অনেকে নামলো। এখানে এসে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে। কেউ ডানদিকের রাস্তাটা ধরলো। নিজামের পরিবার বাম দিকে বাঁক নিলো, ম্যালেতে যাবেন বলে। কিছু দূরে গিয়ে একটা ট্যাক্সিস্ট্যান্ড আছে।তার অনেক উপরে ম্যালে। সেখানে লিফ্টে করে উঠতে হয়। তারজন্য টিকিট কাটতে হয়। নিজাম সাহেব টিকিট কেটে বেরোতে, হঠাৎ সেলিম সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে উঠলো, " শুভ্র কই!"
 সবাই চমকে গিয়ে তাকিয়ে দেখলো, তাদের মধ্যে শুভ্র নেই। কোথায় গেলো সে?বাস থেকে তো একই সঙ্গে নেমেছিলো। রুক্সানা সচরাচর সব সময়ই তার হাতটা ধরে থাকে, কিন্তু সে অন্য সিটে বাবার কাছে বসায়,এবং রুক্সানার আগেই বাস থেকে নেমে পড়ায়, তার হাতটা আজ ধরা হয়নি। কিন্তু বাস থেকে নামার সময় তার প্রতি লক্ষ্য ছিলো রুক্সানার। কিন্তু তার পরেই সে অন্যমনষ্ক হয়ে ছোট ছেলেকে নিয়েই চলতে শুরু করে। আসলে ভেবেছিলো, বাবা কাকা সবাই সঙ্গে আছে তো। চিন্তার কোন কারণ নেই। কিন্তু এই ভাবনাটাই তার কাল হলো। পাহাড়ী এলাকায় তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে। আবছা আলোয় সে বোধহয় ভুল করে অন্য লোকের সঙ্গ নিয়ে নিয়েছে। নাকি, ট্যাক্সিওয়ালারাই কেউ তাকে কিডন্যাপ করে গাড়ির ভিতর লুকিয়ে রেখেছে? অনেক ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে সেখানে। রুক্সানা পাগলের মত "শুভ্র !শুভ্র !"করে ডাকতে ডাকতে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছোটাছুটি করতে লাগলো। ছোট ছেলে আবির ভয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। নিজাম সাহেব ও সেলিমও ব্যাকুল হয়ে, এদিক ওদিক তাকে খুঁজতে লাগলো।আশেপাশের লোকজন সবাই ছুটে এসে ব্যাপার কি জানতে চাইলো। দেখতে দেখতে তাদের ঘিরে বেশ ভিড় জমে গেলো। সবাই যখন জানতে পারলো, হারিয়ে যাওয়া শুভ্র একটি প্রতিবন্ধী শিশু এবং সে, জিজ্ঞেস করলে তার নাম ঠিকানা কিছুই বলতে পারবে না,সকলেই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো। তবে তারা সান্ত্বনাও দিলো এই বলে, যে, চিন্তার কিছু নেই। চারিদিকে ট্রাফিক পুলিশ আছে। ভিনরাজ্যর একটি বাচ্চা ছেলে একা ঘুরলে, নিশ্চয় কারো চোখে পড়বে, এবং অবশ্যই তাকে ফিরে পাওয়া যাবে। এখানে বেড়াতে এসে অনেকেই এমন হারিয়ে যায়, এবং তাদের সবাইকেই খুঁজে পাওয়া যায়। হিমাচল প্রদেশের লোকেরা সাধারণতঃ খুব সৎ প্রকৃতির, তারা বাচ্চার কোন ক্ষতি করবে না,এই বলে তাদের আশ্বাস দিতে লাগলো। স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশ আশে পাশের সব ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়ে দিলো। সকলের পরামর্শে, রুক্সানা আর আবিরকে গেস্টহাউসে পাঠিয়ে, নিজাম সাহেব আর সেলিম গেলো থানায় রিপোর্ট করতে। ছেলে পাহাড় থেকে খাদে পড়ে মারা গেছে, এই আশঙ্কায় নিজাম সাহেব সারা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গেলেন। গেস্টহাউসে ফিরে রুক্সানা আল্লাহর দরবারে আছড়ে পড়লো। 

------------হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে রক্ষা করো। ও তো মা ছাড়া কিছুই বোঝে না!ক্ষিদে পেয়েছে, টয়লেট যাবো, কিছুই তো বলতে পারে না। সবইতেই সে মায়ের উপর নির্ভরশীল!এই ছেলে মাকে ছেড়ে একদন্ডও বাঁচবে কি করে? সে তো বাবার নাম ঠিকানা কিছুই বলতে পারবে না। তাকে তুমি ছাড়া আর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ওকে ছাড়া আমরা বাঁচবো না। দয়া করো, তুমি দয়া করো! তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু! 

রাত অনেক হয়েছে। সেলিম তাদের জন্য খাবার কিনে দিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সেই খাবার তাদের মুখে রুচলো না।আবির শুধু কাঁদে আর রুক্সানা একমনে উপরওয়ালাকে ডাকে! 
ঘণ্টা দুয়েক পর, কলিংবেলের শব্দ শুনে রুক্সানা ছুটে দরজা খুলে দেখে, শুভ্র নির্বিকার মুখে, সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে তার বাবা আর কাকা। রুক্সানা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো, 
"বাবা কোথায় গেছিলি আমাকে ছেড়ে!"
 শুভ্র কিছুই বলে না,সে তো নিজের মনের ভাবটুকু প্রকাশ করতেই জানে না। এটাই তো তার প্রতিবন্ধকতা, একজন অটিস্টিক চাইল্ডের লক্ষণ! 
পরে জানা গেলো, শুভ্র দলছুট হয়ে উল্টো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পাশের থানা এলাকায় চলে গেছিলো। এত রাতে তাকে রাস্তা দিয়ে একা  এভাবে হাঁটতে দেখে,ঐ রাস্তা দিয়ে যাওয়া এক ট্যাক্সি চালকের সন্দেহ হয়। সে ট্যাক্সি থামিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে ।কিন্ত ,বলাইবাহুল্য তার কাছ থেকে কোন সদুত্তর না পেয়ে, সে তাকে থানায় নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে সব থানায় তার হারানোর খবর পৌঁছে গিয়েছিলো। তার চেহারা, বয়স এবং পোষাকের বর্ণনা হুবহু মিলে যাওয়ায়, সেই থানা থেকে নিজাম সাহেবকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁর হাতে শুভ্রকে তুলে দেওয়া হয়। 
যাইহোক ছেলেকে ফিরে পেয়ে রুক্সানা মহান আল্লাহকে লাখ লাখ শুকরিয়া জানাতে ভুললো না।
অবশেষে, শূন্য মায়ের বুকে ফিরে এলো তার হারানিধি! 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা