সমবেদনা

23rd August 2020 12:18 pm রাফিয়া সুলতানা
সমবেদনা



" সমবেদনা "                                      16.04.18      
* রাফিয়া সুলতানা *

        স্বাধীনতার এতো বছর পরেও, কোন হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ এলাকায়, কোন মুসলিম পরিবার ঘরভাড়া পায় না। তেমনি কোন মুসলিম প্রধান এলাকাতেও, কোন হিন্দু পরিবার ঘরভাড়া পায় না। এ এক নিদারুণ বাস্তবতা! পাশাপাশি দুটি সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিন বসবাস হলেও আশানুরুপ সখ্যতা গড়ে ওঠেনি এখনো দুজনের মধ্যে। কিছুলোকের সংকীর্ণ মনোভাব এর জন্য দায়ী। আবার এর ব্যতিক্রম ও আছে। অনেক এলাকাতেই তারা মিলেমিশে বসবাস করে। তবে আমার মনে হয় সেই সংখ্যা নেহাতই অল্প।ব্যারাকপুরে বদলী হয়ে এসে তাই মনের মতো ঘরভাড়া পেতে বেশ বেগ পেতে হয় নিজাম সাহেব কে। ভাগ্যিস পি.এইচ.ডি একটা ডিগ্রী ছিলো। তাই নামের আগে ডক্টর থাকার সুবাদে, এক রিটায়ার্ড পুলিশ কর্মীর বাড়িতে,সম্ভ্রান্ত হিন্দু পাড়ায় একটা বাড়ি ভাড়া পেলেন নিজাম সাহেব।নিজাম সাহেব একটি বড় বেসরকারী কোম্পানিতে গবেষণার কাজে নিযুক্ত আছেন। বাড়ি থেকে তাঁর ফার্মের দূরত্ব বেশী নয়, প্রায় আড়াই, তিন কিলোমিটার। স্ত্রী রুক্সানার সহজ ও প্রাঞ্জল ব্যবহারের দৌলতে  প্রতিবেশী দের সঙ্গে সহজেই সুসম্পর্ক গড়ে উঠলো তাদের। আসেপাশের বাড়ির বাবাই, সোনু, বাচ্চুর সঙ্গে ভালোই সখ্যতা গড়ে উঠলো নিজাম সাহেবের ছোট ছেলে আবিরের। পুজাপার্বন কিংবা ঈদ উপলক্ষ্যে তাদের মধ্যে পারস্পরিক আদান প্রদান চলতো নির্দ্বিধায়। 

         রুক্সানাদের ঠিক পাশের বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকেন, রায় পরিবার। রায় গৃহিণী, রীণার সঙ্গে  রান্নাঘরের জানালা দিয়ে রুক্সনার প্রায় সুখ দুঃখের গল্প স্বল্প, কথোপকথন চলতে থাকে। রায় বাবু এক সোনার দোকানের কারিগর।সাদাসিধে মানুষটা কোন ঝুট ঝামেলায় থাকেন না। সকালে উঠে স্নান সেরে তুলসিতলায় ইষ্ট দেবতায় প্রনাম জানান। উঠোন ঝাঁট দেওয়া, প্রাচীরের গোঁড়ায় টবে লাগানো সারি সারি গাছ গুলোয় জল দেওয়া, এছাড়াও রাস্তার ধারের সিলিন্ডার টিউব কল থেকে পানীয়জল সংগ্রহ করে স্ত্রী কে সাহায্য করা, এই ভাবে নানান কাজে ব্যস্ত থাকেন সকালটা। । তারপর কোনরকমে নাকে মুখে,খানিকটা গুঁজে, ছুটতে ছুটতে ট্রেন ধরে রওনা হন কর্মস্থলে,কোলকাতায়। অবস্থা খুব একটা আহামরি না হলেও, মোটামুটি সাবলীল ভাবে সংসার চলে যায় তাঁর। একমাত্র মেয়ে হবার সুবাদে, কন্যা রাজন্যার একছত্র  আধিপত্য সারাবাড়িতে। পান থেকে চুন খসলেই বাবা মার সঙ্গে তীব্র বিতণ্ডা শুরু করে দেয় সে। চাপা গায়ের রঙ ,মোটা আর কম উচ্চতার জন্য বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও, মনের মতো পাত্রের অভাবে, বিয়ে হয়নি এখনো। মেয়েকে এম.এ পাশ করিয়েছেন রায় বাবু। তবু চিন্তা একটা রয়েই গেছে। যতই হোক ,কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা! মেয়ে বিভিন্ন কোম্পানিতে কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করে। কারো ধার ধারে না সে, উগ্র মেজাজের জন্য প্রায় বিভিন্ন কোম্পানি চেঞ্জ করতে আঁটকায়না তার।

         সেদিন হঠাৎ সোনার দোকানের মালিক ফনীভুষণ বাবু বলে বসলেন রায়বাবুকে, "মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন না কেন? আর কতদিন মেয়ের ঘাঢ়ে বসে বসে খাবেন?" রায়বাবুর বুকে খুব জোরে বিঁধলো কথাটা।  কোন উত্তর দিলেন না তিনি। সারাদিন হাড় ভাঙ্গা খাটুনির পর, বাড়ি ফিরে যে একটু শান্তিতে ঘুমাবেন, তা আর হয়ে উঠলোনা। সারা রাত, ফনীভুষণ বাবুর সেই কথা গুলো মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো,রায় বাবুর। এভাবেই চললো দিনের পর দিন। ক্রমে ক্ষুধামান্দ্য, অজীর্ণ, অনিদ্রা, কাজে অনীহা জাঁকিয়ে বসলো তাঁর শরীরে। স্বাস্থ্য ভাঙতে শুরু করলো, ওজন তরতর করে কমতে যেতে লাগলো। হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা করেও কোন রোগ ধরা পড়েনা তাঁর। সময়মতো গয়না গড়াতে না পারার জন্য, ঠিকমতো পারিশ্রমিক ও পেলেন না হাতে। এদিকে মেয়েও চাকরীটা ছেড়ে ঘরে বসে আছে। সংসারে দেখা দিলো অভাব অনটন। ফলে বাড়িতে অশান্তি লেগেই থাকতো। অবশেষে, দুর্বলতার জন্য রায়বাবু প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। ঘরের বাইরে প্রায় তাঁকে আর দেখাই যায়না।মানসিক দুশ্চিন্তা কিভাবে যে একজন মানুষকে কুরে কুরে খায় এবং শেষে ঠেলে দেয় চরম পরিণতির দিকে, এই ঘটনা তারই একটা প্রমাণ। প্রতিদিনই স্বামীর দুশ্চিন্তায়,অভাবের তাড়নায় পাশের বাড়ি থেকে রীণাবৌদির কান্নাকাটি কানে আসতে লাগলো রুক্সানার। এসব শুনে ছটফট করে রুক্সানার মন। একরাত্রে এরকমই রীণাবৌদির কান্নার রোল শুনে, বেরিয়ে এলো রুক্সানা ঘরের বাইরে, প্রাচীরের ধারে। জানালা দিয়ে ডাক দিলো রীণাবৌদির নাম ধরে। রীণাবৌদিকে ডেকে পরামর্শ দিলো রায়বাবু কে নিজের পরিচিত এক স্বনামধন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কে দেখানোর জন্য। কিন্তু বৌদির মুখ দেখে বুঝলো, তার হাতে যথেষ্ট টাকা পয়সা নেই এখন। আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো সে। তাই রুক্সানা, বৌদির হাতে জোর করে বেশ কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বললো তাই দিয়ে রায়বাবুর চিকিৎসা করাতে। বৌদি কিছুতেই টাকা নিতে চান না। যতই অবস্থা খারাপ হোক না কেন ,কারো কাছে হাত পেতে টাকা নিতে, তার সম্মানে, রুচিতে বাধবে বৈকি! তাই দেখে রুক্সানা বললো, "বৌদি, আমি পাশে থেকে শুনতে পাবো আমার দাদা অসুস্থ,দেখতে পাবো আপনাদের কষ্ট, আর আমি চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবো? কেন, আমি আমার দাদার চিকিৎসার জন্য কিছু সাহায্য করতে পারিনা? আমি নিজের বোন হলে কি আমায় আপনি এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারতেন?"এবারে বৌদি আর না করতে পারলেন না, রুক্সানার হাত দুটো চেপে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে বললেন, "দিদি, আর জন্মে আপনি আমার নিজের দিদি ছিলেন, তাই আমার ব্যথায় আজ এগিয়ে এসেছেন এমন করে। কোন দিন আপনার এই ঋণ শোধ করতে পারবোনা আমি।" শুরু হলো চিকিৎসা। 

       এক দেড়মাস পরে, রায় বাবুকে আবার দেখা গেলো যথারীতি তুলসী তলায় পুজো দিতে। আবার শুরু করলেন গাছে জল দেওয়া, পানীয়জল সংগ্রহ করা, উঠান ঝাঁট দেওয়া।কাজে যেতে শুরু করলেন আবার। রুক্সানার কানে আসে পরিবারের সঙ্গে , রায়বাবু হাসি খুশি - খোশগল্প আর মন ভরে যায় তার, পরম এক পরিতৃপ্তিতে। এযে এক বড় প্রাপ্তি! তার একটুকরো সমবেদনায় রক্ষা পেয়ে গেলো একটা গোটা পরিবার, চরম সংকোটের হাত থোকে।এটাই সব মানুষের ধর্ম হওয়া উচিত,মানবতার ধর্ম!তাহলে পৃথিবীর সব অশান্তিই আজ শেষ হয়ে যেতো। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা