অসহনীয়

23rd August 2020 12:22 pm রাফিয়া সুলতানা
অসহনীয়


3ছোট গল্প -  * অসহনীয় *
---------- রাফিয়া সুলতানা 
12.09.18

          বিজয়বাবু শহরের একজন নাম করা হাড়ের ডাক্তার।জনদরদী বলে এলাকায় তাঁর সুখ্যাতিও আছে বেশ । বিনামূল্যে চিকিৎসা করেন গরীবদের। সকাল সন্ধ্যা তাঁর বাড়ির চেম্বারে, রোগীর ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। রোগীর চাপে সারাদিন বিজয়বাবুর
নাওয়া খাওয়া,এমন কি নিঃশ্বাসটুকু  ফেলারও  জো থাকে না । দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা সব আসে এখানে চিকিৎসা করাতে ।ডাক্তারবাবুও অনেক যত্ন সহকারে চিকিৎসা করেন তাদের।
টাকাপয়সা, ধন দৌলতের কোন অভাব নেই তাঁর । কিন্তু হলে কি হবে? মনে তাঁর  কোন শান্তি নেই । 
বিবাহের দীর্ঘ দশবছর পর স্ত্রী অনিমা, সন্তানের মুখ দেখেছিলেন। পুত্রসন্তান হয়েছিলো তাঁদের। অনেক খুশি হয়েছিলেন তাঁরা । আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলেন নন্দদুলাল। কিন্তু  ছেলের বয়স যখন প্রায় আড়াই বছর, তখন জানতে পারা গেলো, তাঁদের নন্দদুলাল আসলে একটা মেন্টালি রিটার্ডেড চাইল্ড অর্থাৎ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু। অনেক দেশবিদেশ ঘুরে অনেক চিকিৎসা করালেন তার , ঠাকুর দেবতার থানে গিয়ে ধর্ণা দিয়ে মানষিক, তাবিজ করালেন অনেক। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না।স্বাভাবিক হলো না নন্দদুলাল। ছেলে, হাঁটতে, চলতে,কথা বলতে সবই পারে  । কিন্তু বোধ বুদ্ধি তার নেহাতই কম, বয়সের তুলনায়। ফলে তার লেখাপড়াও হলো না  । অনেকে পরামর্শ দিলেন, তাকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য তৈরি, কোন আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মায়ের মন, কিছুতেই কাছ ছাড়া করতে চায় না,একমাত্র আদরের ছেলেকে। 

             দেখতে দেখতে বাইশটা বছর কেটে গেলো। বাবার স্নেহে, মায়ের আদরে,দুলালের কিন্তু পরমানন্দে দিন কাটে । তার জীবনে নাই কোন উচ্চাকাঙখার তাগিদ, চাওয়া না পাওয়ার কষ্ট,প্রতিযোগিতার দৌড়। তাই মনে নেই কোন ভাবনা চিন্তার লেশ, দুঃখ দুর্ভাবনার চিহ্ন । খায়, দায় আর বিন্দাস ঘুরে বেড়ায় সে। স্নান, খাওয়ানো দাওয়ানো , সবই মা, অনিমাই করিয়ে দেন পরম যত্ন সহকারে। কিন্তু, চিরদিন তো আর একরকম যায় না। একদিন হলো কি- বাড়ির পাশ দিয়ে একটা ঠাকুর বিসর্জনের প্রসেশন যাওয়ার সময়, লোকজনের দলে ভিড়ে দুলালও হাঁটা দিলো সোৎসাহে, মহাউল্লাসে,অন্যদের দেখাদেখি নাচতে নাচতে, বাজনার সঙ্গে তালে তালে। এদিকে মায়ের নজরই পড়লো না, ছেলে কখন বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। সময়টা  ছিলো রাত্তির , তাই পাড়াপড়শির কারো নজরে পড়লো না ব্যাপারটা। যখন মায়ের টনক নড়লো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি, থানা পুলিশ করেও কোন সন্ধান পাওয়া গেলো না দুলালের। কেঁদে কেটে অনিমাতো খাওয়া দাওয়া ছেড়েই দিলো প্রায়। বিজয়বাবুরও মন থেকে সব শান্তি সুখ উধাও হয়ে গেলো। প্রায় একমাস কেটে গেছে,এইভাবে। সবাই দুলালের বেঁচে থাকার আশা ছেড়েই দিয়েছে একরকম । যে ছেলে, জীবনের সবকিছু কাজকর্মের জন্য তার মায়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, সে কি করে বেঁচে থাকবে, মাকে ছাড়া এতদিন? সবার মনে এক প্রশ্ন। 

                পাশের গ্রামের সবজিবিক্রেতা বংশীলাল, প্রায় আসতো বিজয়বাবুর চেম্বারে তার বৃদ্ধা মাকে দেখাতে। তার মায়ের আবার বারোমেসে বাতের ব্যামো ছিলো। তাই মাঝে মধ্যেই আসতে হতো তাকে মাকে সঙ্গে নিয়ে, শহরের ডাক্তারবাবুর কাছে চিকিৎসা করাতে। একদিন বংশী তার পণ্য বেচে, হাট থেকে ফেরার পথে দেখলো, একজায়গায় বেশ লোকজনের ভিড়। কৌতূহল বশতঃ এগিয়ে গিয়ে দেখলো,সেখানে একটা জোয়ান ছেলেকে কোমরে গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে, সবাই মিলে খুব পেটাচ্ছে।খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো, একটা চায়ের দোকান থেকে, সামনে রাখা সার সার সাজানো বিস্কুটের কৌটো খুলে বিস্কুট চুরি করার সময় হাতে নাতে ধরা পড়ে সে । দোকানদারের  চিৎকার চেঁচামেচিতে , লোক জড়ো হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। একটা অচেনা,ভিন অঞ্চলের ছেলে হয়ে এখানে কেন ঘুরাঘুরি করছিলো , তার কাছ থেকে এই প্রশ্নের কোন সদুত্তর না পেয়ে, সন্দেহ হয় লোকের।তাকে ছিঁচকে চোর ভেবে শুরু হয় বেধড়ক মার। আর আজকাল তো যখন তখন, কারণে-অকারণে কাউকে গণধোলাই দেয়ার জন্য জনতা মুখিয়েই থাকে। হাতের সুখ,মনের আক্রোশ আর নিজের বীরত্ব ফলানোর এটাই হলো মহা সুযোগ! একসঙ্গে, এতগুলো সখ মেটাতে, এই সব অভাগা ভবঘুরেরাই হয় সফ্ট টার্গেট !


                  সব কথা শুনে কেমন যেন মায়া হলো বংশীর,ছেলেটার জন্য । হয়তো ছেলেটার ক্ষিদে পেয়েছিলো খুব।কোন কারণে, বাস্তুচ্যুত হয়ে, বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে, সঙ্গে টাকা পয়সা না থাকায় এই পথ বেছে নিয়েছিলো সে। এককালে তারও খুব আর্থিক অনটন ও দুরবস্থা ছিলো। ক্ষিদের জ্বালা কাকে বলে,সে কথা সে জানতো । তাই, এগিয়ে গেলো ছেলেটার কাছে। ছেলেটার অবস্থা ততক্ষণে প্রায় মরো মরো। নাক মুখ ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে দরদর করে। মুখে, হাতে পায়ে মারের চোটে কালসিটে পড়ে গেছে। প্রায় জ্ঞান হারানোর মত অবস্থা। বংশী ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে সাধ্যমত বাধা দিতে লাগলো লোকগুলোকে ,মারধোর করা থেকে বিরত করতে। ছেলেটার দফা রফা হতে দেখে ততক্ষণে আশ মিটেছে মারমুখী জনতার।
একে একে সরে পড়লো সবাই,সেখান থেকে । বংশী কাছে গিয়ে,ভালো করে দেখে, চিনতে পারলো, এই ছেলে আর কেউ নয়, সেই শহরের ডাক্তার বাবুর হারিয়ে যাওয়া সন্তান, নন্দদুলাল। সঙ্গে সঙ্গে বাঁধন খুলে দিলো তার।অতঃপর, নিজের ভ্যানরিক্সায়  চাপিয়ে নিয়ে, তাকে পৌঁছে দিলো ডাক্তার বিজয়বাবুর বাড়ি,তার বাবা মা'র কাছে। বিজয়বাবু ও পত্নী অনিমা ছেলের এহেন সঙ্গীন অবস্থা দেখে,এতদিন পর হারানো নিধিকে ফিরে পেয়েও যেন খুশি হতে পারলো না কিছুতেই । পরম দুঃখে ডুকরে কেঁদে উঠলো অনিমা, বেদনায় জর্জরিত হয়ে গেলো বিজয়বাবুর হৃদয়।একেই বেচারা প্রতিবন্ধী ছেলে! তার ওপর দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকায় তার করুণ অবস্থা! না জানি কত ক্ষুধার তাড়না হলে এক অবোধ মানুষের খাবার চুরি করার তাগিদ জন্মায়! আর সে বেচারা চুরিচামারীর বোঝেটাই বা কি! দুনিয়াদারির কোন জ্ঞান আছে কি তার ? আর তার উপর কিনা তথাকথিত বুদ্ধিধারী লোকেদের এই অকথ্য অত্যাচার ?

        পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা গেলো, মারের চোটে নাকের বাঁশিটা ভেঙ্গে গেছে দুলালের । চোয়ালের হাড়ে ও দুইহাতের বাহুতে,দুইপায়ে হয়েছে একাধিক ফ্র্যাকচার! বাবা মা হয়ে,নিজের নিরীহ , নির্বোধ  ছেলের এহেন পরিণতি দেখার যন্ত্রণা কি সহ্য করা যায়? এ যে অসহনীয়! দুজনে মিলে বারবার অভিযোগ জানাতে লাগলেন ঈশ্বরকে আর অভিসম্পাত করতে লাগলেন, নিজেদের বিড়ম্বিত ভাগ্যকে। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা