অন্তরের টান

24th August 2020 8:36 pm রাফিয়া সুলতানা
 অন্তরের টান


" অন্তরের টান "                                      22.06.18
* রাফিয়া সুলতানা *

     কলেজ থেকে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলো নীলিমা। দময়ন্তীর পরশু বিয়ে। রাস্তার ওপারের দত্ত বাড়ির মেয়ে দময়ন্তী, নীলিমার বাল্য বন্ধু। খুব ভাব দুজনের। শুধু তাই নয়, দময়ন্তীর দাদা জগন্নাথের প্রতিও যথেষ্ঠ দুর্বলতা আছে নীলিমার। কাল অনেক রাতে পুণে থেকে এসেছে জগন্নাথ । সকালে কলেজ বেরোনোর তাড়া থাকায় আর দেখা করা হয়ে ওঠেনি তার সঙ্গে । তাই পড়ি মরি করে বাড়ি ফিরেছে সে। কোনরকমে দুটো নাকে মুখে গুঁজেই রওনা হবে বন্ধুর বাড়ি। দেখা হবে মানসপ্রতিমের সঙ্গে। কতদিন যে দেখা হয়নি তাদের। সেই যে সফ্টওয়্যার কোম্পানির চাকরি টা পেয়ে পুণের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলো জগন্নাথ , সে প্রায় আট মাস ন মাস হয়ে গেছে,তারপর কাজের চাপে আর আসতেই পারেনি সে। জগন্নাথও যথেষ্ট ভালোবাসে নীলিমাকে। তবে তাদের ভালোবাসা মনে মনেই থেকে গেছে। প্রকাশ করার অবকাশ পায়নি আজ পর্যন্ত কেউ কাউকে। নীলিমা ঠিকই করে নিয়েছে, এবারে ঠিক জানিয়ে দেবে সে জগন্নাথ কে তার মনের কথা। কতদিন আর চাপা থাকবে এই অন্তরের টান ? এদিকে মাসি ,পিসী, প্রতিবেশী সবাইতো পিছনে পড়েই রয়েছে তার বিয়ে দেবার জন্য। রোজ নিত্য নতুন একটা করে সম্বন্ধ আনছে। পিতৃহীন মেয়ে। তাই মাও আর চায়ছেন না দেরী করতে। ভালো সম্বন্ধ পেলেই বিদেয় করবেন, এইরকমই মনোভাব। ছোট ভাই আছে একটা। ফ্যামিলি পেনশনের টাকায় দুজনের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছেন না মা। তাই এই তাড়া হুড়ো। বি. এ টা কোনমতে পাশ করলেই কেল্লাফতে। দময়ন্তীর ও ঐ এক অবস্থা। পড়তে পড়তেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে তাকে। ভালো পাত্র পেলে নাকি হাতছাড়া করা উচিত নয়। যতসব মধ্যবিত্ত মানসিকতা! খুব রাগ হয় নীলিমার। কিন্তু অপরিচিত কোন পুরুষের সম্পত্তি হতে চায় না সে। যাকে চিনিই না,যার সম্বন্ধে কিছু জানিই না, তার কাছে সারাজীবনের জন্য আত্মসমর্পণ করবো কিভাবে? মনে মনে ভাবে নীলিমা। তাই সে বদ্ধপরিকর। বিয়ে যদি করতেই হয়, তবে জগন্নাথ কেই করবে সে। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে তাকে।নম্র, ভদ্র,বিনয়ী। বড় অমায়িক ছেলে। দেখতে শুনতেও ভালো। সুদর্শন বললেও অত্যুক্তি হয় না। 

      ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকতেই চমক ভাঙলো মায়ের কন্ঠস্বরে। আজ দময়ন্তী দের খুব বিপদ রে! জাল নোট পাচার কারবারের অভিযোগে, জগার পিছু ধাওয়া করে পুলিশ এসেছে ও বাড়িতে। সকাল থেকেই চলছে তাদের আনাগোনা। ও বাড়িতে ,তুই আর যাসনে আজ।মায়ের মুখে, কথাটা শুনে, যেন আকাশ থেকে পড়লো নীলিমা। খাবারটা না খেয়েই,ব্যাগটা রেখে, "আমি একটু আসছি," এই বলে হঠাৎ বেরিয়ে গেলো সে, দময়ন্তী দের বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু ততক্ষণে, জগন্নাথকে গাড়িতে উঠিয়ে,পুলিশ রওনা হয়ে গেছে থানার উদ্দেশ্যে। শোক সন্তপ্ত  দময়ন্তীর পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো নীলিমা। কিন্তু এতো সহজে দমবার পাত্রী নয়  সে । জগন্নাথ এমন কাজ করতে পারে না বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। ছোট থেকেই যে চেনে তাকে। অতি সৎ ও ধর্মভীরু ছেলে । তাই, "চিন্তা করেন না জেঠিমা, আমি দেখছি কি করা যায়", বলে দময়ন্তীর মাকে আশ্বস্ত করে বেড়িয়ে পড়লো সে সেখান থেকে। সোজা গিয়ে হাজির হলো দীপালির বাড়ি। তার কলেজের ক্লাসমেট্ দীপালি।তার বাবা বিভূতি ভূষণ বাবু এলাকায় জাঁদরেল অ্যাডভোকেট বলে পরিচিত।নীলিমাকে খুব স্নেহ করেন তিনি। তাঁর কাছে গিয়ে সবকিছু খুলে বললো সে। সব শুনে এই কেস টা হাতে নিতে রাজি হলেন তিনি। জামিন পেলো জগন্নাথ। 

         অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে, অনেক তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে,অনেক টাকা পয়সার শ্রাদ্ধ করে, বেশ কয়েকবার বাড়ী আর কোর্ট চক্কর কেটে জুতোর সুখ তলা খইয়ে,  অবশেষে, আদালতে জগন্নাথ কে নির্দোষ প্রমাণিত করা গেলো। পুণেতে যে মেসে  থাকতো জগন্নাথ , সেখান থেকে মাসখানেক আগে, তার একটা মোবাইল চুরি যায়।অসতর্কতা বশতঃ, সঙ্গে  সঙ্গে এ ব্যাপারে থানায় ডায়েরী করা হয়নি তার। সেটাই মারাত্মক ভুল হয়ে গিয়েছিলো । সেই সিম হাতে গিয়ে পড়ে কিছু দুষ্কৃতির।পরবর্তী কালে জাল নোটের কারবারী রা সেই সিম ব্যবহারের মাধ্যমে  নিজেদের মধ্যে ফোনে যোগাযোগ রাখতো। তাদের একজন পুলিশের জালে ধরা পড়ে এবং তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় জগন্নাথের সেই হারানো সিম টা। তারই সূত্র ধরে জগন্নাথের নাম উঠে আসে তার আধার আই ডি থেকে। জগন্নাথ কে বলির পাঁঠা করে সে যাত্রা বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ষড়যন্ত্র করে অপরাধীরা। তাই , তাকে ধাওয়া করে ,এখানে এসে হাজির হয় পুলিশ। জগন্নাথের সামান্য একটা ভুলের জন্য এতো বড় একটা বিপত্তি! যাক্, যার শেষ ভালো, তার সব ভালো! এখন বেকসুর খালাস পেয়েছে জগন্নাথ । আর একটু হলেই তার নতুন পাওয়া চাকরি টা যেতে বসেছিলো। বিড়াট একটা বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সবাই এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। 

          দময়ন্তীর বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হয়েছিলো নির্দিষ্ট দিনেই। তার হবু শ্বশুর, দময়ন্তীর বাবার কলেজ লাইফের বন্ধু ছিলেন। তাই শুধুমাত্র ম্যারেজ রেজিস্ট্রি করেই, অনুষ্ঠান তখনকার মতো সাঙ্গ করা হয়। পরবর্তী কালে, বড় করে অনুষ্ঠান করে সকলকে খাওয়ানো হয় আবার।এই ঘটনার পর জগন্নাথ ও নীলিমার ভালোবাসা আরো গভীর হয়। নীলিমাকে আর মুখ ফুটে বলতে হয়নি জগন্নাথ কে তার ভালোবাসার কথা। তাকে আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে যে তৎপরতা দেখিয়েছে সে, তাতেই জগন্নাথের হৃদয় বিক্রি হয়ে গেছে তার কাছে। তার পরিবারের সকলে তাকে নিজেদের একজন অতি কাছের মানুষ হিসাবে মেনে নিয়েছে। জগন্নাথের মা তো সেদিন নীলিমার মাকে বলেই বসলেন, নীলুর মতো লক্ষ্মী মেয়েকে পুত্র বধু হিসাবে পেলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো। তবে দময়ন্তীর মতো বি.এ পাশ করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়নি তাকে। তার ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে এম. এ টা কমপ্লিট করার পর ধুমধাম করে বিয়ে হয় তার আর জগন্নাথের। এখন তারা নতুন ফ্ল্যাট নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে পুণের এক সম্ভ্রান্ত পল্লীতে। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা