আরেক জগৎ

4th September 2020 10:53 am রাফিয়া সুলতানা
আরেক জগৎ


" আরেক জগৎ "            
* রাফিয়া সুলতানা *

     রুক্সানার পরিবারে পুত্র সন্তানের বড়ই আকাল। তারা নিজেরা দুই বোন, মা'রাও তিন বোন, এমন কি বোনেরও হয়েছে পরপর দুটি কন্যাসন্তান! তাই লেবার বেডে, অর্ধচেতন অবস্থায় যখন নার্সদের কথোপকথনে বুঝতে পারলো, তার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে, তখন আনন্দে দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তার। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ঘটা করে দেখতে এলো, তাদের বাড়ির প্রথম বংশধরকে। ছেলের কালো গায়ের রং দেখে,  কেউ কেউ একটু বিমর্ষ হলো বটে, কিন্তু রুক্সানার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই তাতে, তার একটা সুস্থ বাচ্চা হলেই হচ্ছে। হৃদয়ের সব ভালোবাসা নিংড়ে, পরম মমতায়,মহানন্দে, বড় করে তোলে তাকে। দিবা রাত্রি, শয়নে স্বপনে, ছেলেই হচ্ছে তার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান, সাধনা। ছমাস পরে, চামড়া ফুঁড়ে টকটকে ফরসা রঙ বেরিয়ে এলো তার, দেখতে যেন দেবদুতের মতো সুন্দর, যেই দেখে, সেই তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ হয়ে। আদর করে নাম রাখা হলো - শুভ্র। মা, বাবা, বাড়ির সকলের অপার স্নেহে চন্দ্রকলার মতো বেড়ে উঠলো শুভ্র। কিন্তু সময় মতো কথা ফুটলো না তার।তাতে অবশ্য আমল দিলো না রুক্সানা, কত ছেলেরই তো দেরি করে কথা ফোটে। আরও কিছু ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হলো তার মধ্যে। আর পাঁচটা বাচ্চার মতো সাধারণ খেলনার প্রতি তার কোন আসক্তি নেই, বরং সাবানের বাক্স, মলমের প্যাকেট, পাটকাঠি, এইসব নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসে শুভ্র।কারো ডাকে সাড়াও দেয়না সে , নিজের জগতেই বিভোর থাকে খালি। কয়েক বছর পর আরেকটা সন্তান কোলে এলো মায়ের। ছোট ভাইয়ের প্রতি খুব টান তার। ভাইকে সঙ্গে না নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে চায়না সে। ভাই, আবিরের সঙ্গে  সঙ্গে তারও কথা ফুটতে লাগলো, দুই একটা করে। কিন্তু কেউ প্রশ্ন না করলে, নিজে থেকে কোন কথা বলেনা সে। 

         শেষে তাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। নিজামের কোম্পানির মালিকের সহধর্মিণী নিজেই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি দেখে বললেন, স্বাভাবিক শিশু নয় শুভ্র। এধরনের বাচ্চাদের মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে অটিস্টিক চাইল্ড। এরা সর্বদা নিজের জগতে মগ্ন থাকে, অন্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে এরা অক্ষম। তাই কখন কি বলতে হবে, এরা বুঝতে পারেনা, সেইজন্য সহজে কথা বলতে চায়না। এটা এক ধরনের অক্ষমতা, বা, মানসিক প্রতিবন্ধকতা।যেহেতু এটা কোন রোগ নয়, তাই কোন ওষুধে,এটা সারানো যায়না, বিশেষ প্রশিক্ষণের সাহায্যে কিছুটা উন্নতি করা যায় মাত্র। এইসব বাচ্চাদের কারো কারো বিশেষ ধরনের প্রতিভা থাকে। তবে, সারা জীবন এরা পরনির্ভরশীল হয়েই থাকবে। শুনে রুক্সানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। বিমর্ষ হয়ে বাড়ি ফিরলো সে। মনে মনে ঠিক করলো তবু হার মানবেনা , প্রচেষ্টার কোন ত্রুটি করবেনা সে। সেইমতো স্কুলে ভর্তি করলো তাকে। কোলের মধ্যে বসিয়ে,অনেক ভালোবেসে, পড়ায় তাকে রুক্সানা। খুবই বুদ্ধিমান শুভ্র। স্মরণ শক্তিও ভালো, তাই চট্ করে শিখে নেয় সবকিছু। কিন্তু স্কুলে মন বসেনা তার। অনুসরণ করতে পারেনা শিক্ষিকার কোন নির্দেশ, ফলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে সে। শিক্ষিকা অভিযোগ করে মায়ের কাছে। সহপাঠীরা হাসি তামাসা করে তাকে নিয়ে। ক্লাসে একটুও ভালো লাগেনা শুভ্রর, কানে আঙ্গুল দিয়ে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে, বসে থাকে সারাক্ষণ । এটা খুব খারাপ লাগে মায়ের। তাই বাধ্য হয়ে সেই স্কুল থেকে ছাড়িতে নেয় তাকে। এভাবে, দুতিনটে স্কুল পরিবর্তন করা হয়ে গেলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। ভালো ছবি আঁকে শুভ্র, তবে ফল ফুল, লতা, পাতার নয়। বাস, ট্রাক, সাইকেল, স্কুটার, এসবের। খেলতে খেলতে দুএক কলি গান গেয়ে ওঠে, মা যেগুলো গেয়ে ঘুম পাড়ায় তাকে। ইতিমধ্যে বেশকিছুটা বড় হয়ে ওঠে শুভ্র। দেখা যায় তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন। হঠাৎ করে কেঁদে ওঠে সে। বায়না করতে থাকে অকারণ, কিযে চায় কিছু বোঝা যায়না। মাঝে মাঝে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়তে চায়। বেড়াতে নিয়ে গেলে, আর বাড়ি ফিরতে চায়না। মাঝে মাঝে খুবই লাফঝাঁপ করে। বাধ্য হয়ে শাসন করতে হয় তাকে। রাত্রে না ঘুমিয়ে,রান্নাঘরে খুঁজে বেড়ায় বিস্কুট হরলিক্স ,এটা ওটা।কিন্ত ,এভাবে আর কতদিন? একদিন তো বাবা মা থাকবেনা পৃথিবীতে,তখন কে নেবে এই ছেলের দায়িত্ব? ভাইয়ের তো ভবিষ্যতে পড়াশোনা, চাকরিবাকরির ব্যাপার আছে, আছে নিজস্ব সংসার। কোথায় যে সে থাকবে, তারও নেই কোন ঠিক ঠিকানা। তাই মনোবিদের পরামর্শে ঠিক হলো, তাকে দেওয়া হবে, এইসব বিশেষ শিশু দের জন্য তৈরি, বিশেষ আবাসিক স্কুলে, যেখানে প্রশিক্ষণের সঙ্গে নেওয়া হবে ,তার আজীবন দেখাশোনার ভার। প্রথমে কিছুতেই সায় ছিলোনা রুক্সানার, যে ছেলে তার নয়নের মণি, কলজের টুকরো, যাকে এক মুহুর্ত চোখের আড়াল করতে পারেনা সে, তাকে কিনা রাখা হবে, কোন এক আবাসনে। মা ছাড়া তো কেউ বোঝেনা তার মনের কথা! সে কি ভাবে ওখানে থাকবে?ভাবতেই দুমড়েমুচরে ওঠে মায়ের মন, বাধ মানেনা অশ্রুধারা! কিন্তু পরিস্থিতির চাপে শেষ পর্যন্ত সেটাই ঠিক হলো। 

        বিয়ের পর স্বামী নিজামউদ্দিন একদিন রুক্সানা কে নিয়ে গিয়েছিলো, তার ফার্ম দেখাতে। অনেকটা এলাকায় বিস্তৃত একটা নামী বেসরকারী কোম্পানির ফার্ম। কৃষি সংক্রান্ত গবেষণা ছাড়াও সেখানে হয় নানান রকম ফুলের চাষ। ঘুরতে ঘুরতে তারা চলে এসেছিলো নদীর ধারে, একটা সুন্দর বাগান বাড়ির কাছে। খুব সুন্দর জায়গা ছিলো সেটা। হঠাৎ সংলগ্ন বাড়িটা থেকে কতগুলো প্রাণচঞ্চল কিশোর কিশোরী খুশিতে লাফাতে লাফাতে এদিকেই আসতে লাগলো। নিজাম রুক্সানার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, জানো, ঐ বাচ্চা গুলো পাগল। হকচকিয়ে পিছিয়ে এসে রুক্সানা, নিজামের হাত ধরে টেনে দ্রুত সরে গেলো সেখান থেকে। কেন জানিনা, আর কিছু প্রশ্ন করলোনা এ বিষয়ে। কিন্তু, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এটাই ছিলো সেই আবাসন, আজ যেখানে তার আদরের দুলাল কে রাখার ভাবনা চিন্তা করা হচ্ছে।তার কোম্পানির তত্ত্বাবধানে, মালিকের স্ত্রী গড়ে তোলেন এটা। 

          আসলে আমরা যারা তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষ বলে পরিচিত, তারা অনেকেই খোঁজই রাখিনা, পৃথিবীতে আরেকটা জগৎ আছে। যেখানে, এমন এক ধরনের মানুষ আছে, যারা আমাদের মতো ভাগ্যবান নয়। কত কিছু থেকে তারা বঞ্চিত, যা আমাদের আছে। অথচ সব থেকেও, আমরা নেই নেই করে মাথা ঠুকে মরি! কত জন চোখে দেখেনা, কানে শোনেনা, নেই আরো কত রকমের সক্ষমতা। এইসব অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষ গুলো কত কষ্টেই না দিন অতিবাহিত করে, আমরা তার খবরও রাখিনা। তাদের দুরে সরিয়ে রাখি, পাগল বলে, প্রতিবন্ধী বলে। অথচ একটু সহানুভূতি, একটু দরদ ,পাল্টে দিতে পারে তাদের দুঃখের জীবনটাকে! তবে সেরকম মানুষ কি একদমই নেই? আছে বৈকি। যারা তাদের সহমর্মীতা দিয়ে তৈরি করে এইসব আবাসন কেন্দ্র, যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিষেবা দেয় এইসব কেন্দ্রে। আছে এমন অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যাদের সদিচ্ছায় রুক্সানার মতো দিশাহীন মায়েরা পায়, তাদের অসহায় ছেলে মেয়েদের একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়, নিরাপদ ঠিকানা। হ্যাঁ, শুভ্র এখন এই স্কুলেরই আবাসিক। আজ পাঁচ বছর হলো সে এখানে আছে, খেলাধুলা,নাচ গান, ছবি আঁকা, শারীর শিক্ষা, এইসব যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে পরমানন্দে। এখানকার সমস্ত আবাসিক ছেলেমেয়ে,প্রশিক্ষক,প্রশিক্ষিকা,অশিক্ষক কর্মচারী সকলেই তাকে খুব ভালোবাসে। আছে খেলাধুলার মাঠ, ফুলের বাগান, উন্মুক্ত প্রকৃতি। দুমাস পরপর বাড়িতে বাবা,মা ,ভাই এর সঙ্গে কাটানো জন্য পনেরো দিনের ছুটি পায় শুভ্র ও তার সহপাঠীরা। প্রতি বছর স্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের, দীঘা, পুরীর মতো জায়গায়। এছাড়াও সব বাচ্চাদের জন্মদিন পালন করা হয়,রীতিমতো,কেক কেটে, ধুমধাম করে, ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়ার মধ্য দিয়ে। পালন করা হয় নানা সাংস্কৃতিক ও জাতীয় অনুষ্ঠান,সরস্বতীপুজা। রুক্সানা আর নিজামের মনে আর কোন সংশয় নেই তাদের ছেলেকে নিয়ে। উপর ওয়ালার উপর ভরসা করে,এখানে ছেলেকে রেখে, পরম নিশ্চিন্তে আছে তারা,এখন।তারা এখন হাড়ে হাড়ে টের পেলেও, আমাদের মধ্যে এখনো অনেকে অপরিচিত ,এই 'আরেক জগৎ'টার সঙ্গে। 

 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা