প্রায়শ্চিত্ত

4th September 2020 11:10 am রাফিয়া সুলতানা
প্রায়শ্চিত্ত


" প্রায়শ্চিত্ত "                                  10.04.18
----রাফিয়া সুলতানা 

           কলকাতায় একটি নামি কলেজের, সাহিত্যের প্রথম বর্ষের ছাত্রী পলাশ। একই কলেজে পড়ার সুবাদে ,পলাশ, দুই বছরের সিনিয়র ছাত্র, রুপমের সঙ্গে, একই সাথে কলেজে যায়।রুপম অবশ্য বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। তাই, পলাশের মা ও অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকেন মেয়ের ব্যাপারে,যা দিনকাল পড়েছে, যেকোনো মেয়ের পক্ষে এখন রাস্তা ঘাটে একা চলাফেরা করা বেশ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।তার ওপর পলাশ আবার অপরুপা সুন্দরী। পলাশের একটা বড়ো দাদাও আছে।কিন্তু সে এখন ইঞ্জিনিয়ারিং এর চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। নিজের পড়াশোনা নিয়ে এতোই ব্যস্ত ,দাদা শিমুল,যে, বোন কে সঙ্গ দেওয়া সম্ভব নয় তারপক্ষে। একই সঙ্গে যাতায়াত করতে করতে রুপমের সঙ্গে বেশ একটু ঘনিষ্ঠতাও গড়ে উঠেছে পলাশের। খুব মেধাবীছাত্র রুপম। তার বাড়ি খুব একটা দূরে নয় পলাশের থেকে। কিন্তু দিনকতক থেকে লক্ষ্য করছে পলাশ, রুপম যেন কিরকম একটা ব্যবহার করছে তার সঙ্গে। একসঙ্গে আর যেতে চায় না কলেজে। কোনো না কোনো অযুহাতে ,সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে তার সঙ্গে । কলেজে দেখা হলেও, অ্যাভোয়েড করে তাকে। পলাশ ও কিছু বলে না, কিন্তু মনে মনে খুঁজতে চায় এর কারণ,  অন্য কারো প্রেমে পড়েছে নাকি রুপম? আজকাল, ক্লাসমেট মঞ্জুর সঙ্গে খুব ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে তাকে। তবে কি....., ভাবতে বড়ো কষ্ট হয় পলাশের। তবু মনের দুঃখ মনেই চেপে রাখে  । 


       সেদিন কলেজে যাওয়ার পথে ,গলির মুখে, হঠাৎ ই  একটা মোটর সাইকেল  পলাশের পথ আঁটকে দাঁড়ালো,তাতে চেপে একটা ষণ্ডা মার্কা ছেলে। হেলমেট পরে থাকায়, তার মুখটা ভালো বোঝা যাচ্ছিলো না।রাস্তাঘাটে তেমন লোকজনও ছিলোনা তখন। প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলো পলাশ। পরে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে,  চিৎকার করে বলে উঠলো, " কে আপনি?  কি চায় আপনার? " ছেলেটি কিছু না বলে, একটি ভাঁজ করা চিঠি এগিয়ে দিলো, তার দিকে। তারপর, মোটর সাইকেল ঘুরিয়ে, দ্রুত বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। চিঠিটা নিয়ে, ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো, পলাশের হাত।কোনমতে, কলেজে পৌঁছালো সে । কিন্তু সারাক্ষণ, ভীষণ উৎকন্ঠায় ভরে থাকলো তার মন। একসময় সবার অলক্ষ্যে গার্লস কমন রুমে গিয়ে, চিঠিটা খুলে দেখলো, তাতে লেখা, "আমি তোমাকে ভালোবাসি। ঐ মালটাকে  ভুলে যাও, ওকে ভালো করে চমকে দিয়েছি,ও আর তোমার কাছে আসবে না। নিজের ভালো চাও তো, আমার প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাও, নইলে পরে পস্তাতে হবে.... " --- রাজু। চিঠি টা পড়ে পলাশের প্রাণ শুকিয়ে গেলো। এবার সে বুঝতে পারলো, রুপম এর অদ্ভুত আচরণের কারণ! এতো কাপুরুষ সে ! মনে মনে দুঃখ হলো তার। বাড়ি ফিরে এসে সব বললো দাদা কে। দাদার কাছে জানতে পারলো, রাজু ঐ কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন করে এবং সে স্থানীয় প্রভাব শালী রাজনৈতিক নেতার ছেলে । শহরে তার ভালোই দৌরাত্ম্য আছে। দাদা তাকে পরামর্শ দিলো, কলেজ পরিবর্তন করে, হোস্টেলে থেকে দূরে কোথাও পড়াশোনা করার জন্য। কিন্তু সামনেই টেস্ট পরীক্ষা। এ সময় কলেজ পরিবর্তন করতে রাজী নয় পলাশ। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, কিছুতেই রাজুর প্রস্তাবে রাজী হবে না সে। তাতে যা হয় দেখা যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে সাহসী মেয়েদের পুরস্কার খুব একটা ভালো হয়না, ইতিহাস তার সাক্ষী। 

         পরপর কয়েকদিন স্টাডি লিভ থাকায় কলেজ যেতে হয়নি পলাশকে। পরীক্ষার দিন গুলোয়, যে ট্যাক্সি করে কলেজে যেতে লাগলো। শেষ পরীক্ষার দিন, বাড়ি ফেরার পথে, মায়ের ওষুধ কেনার জন্য একটু আগেই, গাড়ি থেকে নেমে পড়ে পলাশ।গলির মোড়ে, হঠাৎ  আবার মোটরসাইকেলে আবির্ভূত হলো রাজু। "কি হলো ডার্লিং ? কিছু বললেনা? " খুব ভয় পেয়ে গেলেও, সেটা প্রকাশ হতে দিলো না পলাশ। দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলো, "আপনার প্রস্তাব মানতে পারলাম না,আমার পথ ছাড়ুন " ।যেন প্রস্তুতই ছিলো রাজু, বোতল থেকে কি একটা ছুঁড়ে দিলো, পলাশকে লক্ষ্য করে, তারপরই চম্পট দিলো সেখান থেকে। পলাশ চিৎকার করে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো। 

           জ্ঞান ফিরলে, পলাশ দেখলো সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে তার, মুখে, গলায়, ও শরীরের ডান পাশে। অ্যাসিডে পুড়ে গেছে জায়গা গুলো। মাথার কাছে মা বসে আছেন। কেঁদে কেঁদে, তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। এমন সময়ে, দরজার পর্দা সরিয়ে, ঘরে প্রবেশ করলো রূপম।মা তাই দেখে, আস্তে আস্তে উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। রুপম পলাশের কাছে এসে, হাউ হাউ করে কেঁদে বসে পড়লো তার পায়ের কাছে। সামনে আসার মুখ নেই তার। তার ধারণা, তার জন্যই পলাশের আজ এই অবস্থা। ভীষণ পরিতাপের সঙ্গে বার বার ক্ষমা চাইতে লাগলো পলাশের কাছে। পলাশের খুব কষ্ট হচ্ছে সারা শরীরে এবং মনে। কিছুই বলতে পারছে না পলাশ, শুধু গড়িয়ে পড়ছে চোখে অবিরাম অশ্রুর বারি ধারা। 

           দু'মাস পর, ব্যাঙ্গালোর থেকে প্লাস্টিক সার্জারী করে ফিরে এলো পলাশ, বাবা ও দাদার সঙ্গে। রূপম বিমানবন্দরে আনতে গিয়েছিলো তাদের। মুখের বিকৃতিটা, অনেক টা সেরে গেলেও, ডান চোখটার দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে পলাশ। বার বার বলেছে পলাশ, রূপম কে ,তাকে ভুলে যাওয়ার কথা। তার এই অভিশপ্ত জীবন একাই কাটাতে চায় সে। কিন্তু রুপম কিছুতেই রাজি নয় তাকে এভাবে একা ছেড়ে দিতে।  তার এই অবস্থার জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করে রুপম। সে যদি রাজুর কাছে আত্ম সমর্পণ করে, পলাশকে সঙ্গ দেওয়া ছেড়ে না দিতো, তাহলে, পলাশকে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না আজ। তাই, নিজের এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় রুপম। দেখতে দেখতে,চার চারটে বছর কেটে গেলো ,কোন্ দিক দিয়ে। জীবনযুদ্ধে হার মানেনি পলাশ। সমানে পড়াশোনা চালিয়ে, এম. এ পরীক্ষায় ফার্স্টক্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। চাকরির জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা দিচ্ছে এখন। ইতিমধ্যে একটি বড়ো কোম্পানি তে ভালো একটা চাকরির অফার পেয়েছে রুপম। কোম্পানির চাকরি টা পেয়েই, রুপম তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতো ,সাত পাকে বেঁধে নিলো পলাশকে। মিলন হলো চার হাতের। ভালোবাসার কুড়ি, তার সব কটি পাপড়ি মেলে, রঙে,রুপে,বিকশিত হয়ে, গন্ধ ছড়িয়ে দিলো চারিদিকে। এইভাবে পরম সুখে,শান্তিতে কাটতে লাগলো তাদের বিবাহিত জীবন। একবছর পর ফুটফুটে জমজ একটা করে পুত্র ও কন্যাসন্তান হলো তাদের। নাম রাখলো সার্থক ও সিদ্ধা।  এদিকে, অ্যাটেম্প্ট টু মার্ডার ও আরো অন্যান্য অভিযোগে,যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দণ্ডিত রাজু এখন লালদুর্গের অন্তরালে,প্রায়শ্চিত্ত করছে তার পাপের। 





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা