জীবন যে রকম

5th September 2020 8:32 am রাফিয়া সুলতানা
জীবন যে রকম


* জীবন যেরকম *
---- রাফিয়া সুলতানা 
13.06.20

কোনো সুখী দম্পতিকে দেখলেই ঈর্ষা হয় - লোভ হয় - আবার সন্দেহও হয় সুভদ্রার । ঘোর সন্দেহ! সত্যিই তারা সুখিতো? নাকি অভিনয়  সব ?

কেন এমনটা হয়?--মনে মনে প্রশ্ন করে সে নিজেকে? 
আসলে এটা হয়তো বা হয়েছে  তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।  

বাড়ির পছন্দ করা পাত্রের সাথেই শেষমেষ যখন বিয়েটা হয়ে গেলো সুভদ্রার, তখন পুরনো অতীতকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে গিয়ে মনেপ্রাণে ভালোবেসেছিলো সে সুরঞ্জনকে। নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলো তাকে। 
কিন্তু একে একে বিভিন্ন ঘটনায়, দুবছর পর সব ভুল ভেঙ্গে গেলো তার। 
ক্রমে বুঝতে পারলো সুভদ্রা --সুরঞ্জন আদৌ প্রকৃত ভাবে ভালোবাসে না তাকে। সে শুধু সুরঞ্জনের প্রয়োজন, প্রিয়জন নয়। প্রথমে সে আহত হয় কিছুটা। তারপর সামলে নেয় নিজেকে। ক্রমে সে আবার ফিরে যেতে চেষ্টা করে নিজের অতীতে। চেষ্টা করে পুনরুদ্ধারের একান্ত আপন নিজস্ব ভাবধারার সাজানো গোছানো জগৎটাকে । 

ইতিমধ্যে তার সন্তানও বড় হয়ে উঠছে। মনপ্রাণ ঢেলে দেয় তারমধ্যেই। তার সেবায়,পরম মমতা ও যত্নে, স্নেহে,তাকে বড় ক'রে তোলার মধ্যে। 

বিয়ের আগে, কয়েক বছর একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করেছিলো সুভদ্রা । স্কুলের সময়টুকু মন দিয়ে কাজ ক'রে বাড়ি ফিরতো সে। কলিগদের সঙ্গে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই মিশতো। পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গেও তথৈবচ। খুব বেশি, গালগল্প, হাসিতামাসা কোনকালেই আসতো না তার। সেই সব সময়ের এবং বাল্যকালের গুটি কতক বন্ধু আছে তার, যারা তার অন্তরঙ্গ। প্রয়োজনে তাদের সঙ্গেই মনের কথা শেয়ার করে ফোনে। 

সংসারের কাজকর্ম সেরে বাকি সময়টা নিজের সঙ্গেই কাটায় সুভদ্রা নিজস্ব ভুবনে। কখনো বা লেখালেখি করে- বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়।
ছোট থেকেই ভাবজগতের বাসিন্দা সুভদ্রা । তাই সংসারের কাজে পরিলক্ষিত হয় তার নিদারুণ হিসাব নিকাশ ও পটুত্বের অভাব। এই নিয়ে খুটখাট লেগেই থাকে গৃহকর্তার সঙ্গে।মাঝে মাঝে তা তীব্র হতে হতে এতো অসহ্য হয়ে ওঠে যে ইচ্ছা করে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে যেতে। উপরন্তু কাল হয়েছে তার এই ভাবুকতা ও লেখালেখি। একবার তার এই লেখার উপর মনোযোগের জন্য চরম অশান্তি বাধলো দুজনে। সুরঞ্জন তো বলেই ফেললো ডিভোর্স দিয়ে দেবে তাকে। সুভদ্রাও যেন আর কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। সেও তাই জানিয়ে দিলো তার সম্মতির কথা। মনে মনে মনস্থির করেই ফেললো সুভদ্রা। 

পনেরো বছরের ছেলে দেবাঞ্জনকে  ডেকে বললো সে
-----  আর পারছিনা দেবু। আমি ঘরভাড়া নিয়ে অন্যত্র থাকবো। সেখানে কোনমতে কষ্টেসিষ্টে নিজের খরচটুকু চালিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু তোকে নিয়ে যেতে পারবো না বাবা।কারণ তোর স্কুলের খরচ এবং লেখাপড়া চালানোর মত সামর্থ্য আমার নেই। তাছাড়া তোকে ছাড়া তোর বাবাও খুব একা হয়ে যাবে। তুই তোর বাবার কাছেই থাকিস। আমি যেখানেই থাকি না কেন  যোগাযোগ রাখবো তোর সঙ্গে। বাবাকে কিন্তু বলা যাবে না সে কথা। ভালোভাবে থাকিস বাবা। নিজের খেয়াল রাখিস। জীবনটা খুব কঠিন জায়গা। এখানে সংগ্রাম ক'রে বড়ো হতে হয়। আমিও খুব কষ্ট করে মাকে ছাড়াই মানুষ হয়েছি। তোকেও শক্ত হতে হবে ।মানুষ হতে হবে প্রতিকূলতার সঙ্গে সংঘর্ষ ক'রে। 
সব শুনে মাথা হেঁট ক'রে থাকে দেবু। ছোট থেকেই দেখে আসছে সে বাবা-মায়ের অশান্তি। বুঝতে পারে সে মায়ের কষ্ট। বাবার সঙ্গে অনেকবার তর্কও করেছে এই নিয়ে। তাই অনেকক্ষণ চুপ ক'রে থাকে সে। তারপর চোখ ছলছল ক'রে মুখ তুলে খানিকক্ষণ একদৃষ্টে তাকায় মায়ের দিকে। তার অব্যক্ত চোখের ভাষা যেন অনেক কিছু ব'লে দেয় মাকে। বলে দেয় তার যন্ত্রণার কথা। মাকে ছাড়া তার অসহায়ত্বের কথা। 
সুভদ্রার বুক মুচড়ে ওঠে। খানিকক্ষণ চুপচাপ হয়ে ভাবে সে। মনে পড়ে তার মাকে ছাড়া নিজের বড়ো হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। কত কষ্ট, কত একাকিত্ব, কত ব্যথাভরা সে জীবন! 
আবার ভাবতে বসে তাই । তারপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
---- নাঃ! এভাবে ছেলেকে একা করে, অসহায় ভাবে ফেলে যাওয়া যাবে না! সেই তো তার ছেলের পরম বন্ধু, একান্ত আশ্রয়। তাকে এভাবে অনাথ ক'রে কিছুতেই যাওয়া যাবে না,তাতে তার নিজের যত কষ্টই হোক না কেন ! কষ্টই তো জীবন। মানুষ তো নিজের জন্য বাঁচে না। অন্যের জন্যই বাঁচে। সেও তার ছেলের জন্য বাঁচবে। এখানেই থাকবে সে, সবকিছু সহ্য ক'রে। বুঝে গেছে সে--- সংসার একটা সমরাঙ্গন বই আর কিছুই নয়। সেখানে সংগ্রাম ক'রেই টিকে থাকতে হয়। পদে পদে চলবে এই স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স। যদি তা পারো তবেই টিকবে, কারণ পৃথিবীর নীতিই যে হলো তা -- সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। এখানে যে নিজেকে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, সেই টিকবে। নইলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে হবে, ইতিহাসের পাতা থেকে। 

পরে যখন নিজস্ব একটি ফ্ল্যাট কিনলো সুরঞ্জন, সুভদ্রাও তার সব গয়নাগাটি বেচে ইনভেস্ট করলো তাতে। এভাবে সে নতুন বসতিতে নিজের অর্ধেক অংশীদারিত্ব পাকা করে নিলো। এবার খানিকটা নিশ্চিন্ত । সুরঞ্জন আর যখন তখন বলতে পারবে না তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার কথা। নিজের ব্যবস্থা করে নেবার কথা। অন্ততঃ মাথার উপর ছাদটাতো হলো। নিজস্ব খরচের না হয় যাহোক একটা ব্যবস্থা হবে , প্রয়োজন হলে। 

অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে কেটে যায় আরো অনেকগুলো বছর । এখনও স্বামীর সঙ্গে অশান্তি হয় তার। খুটখাট লেগেই থাকে খুটিনাটি নানা বিষয়ে। তবে এখন আর তর্ক ক'রে না সে। এ সব এখন আর মন খারাপ করায় না তাকে। সয়ে গেছে সব। নিজেকে অনেক শক্ত করে নিয়েছে সুভদ্রা। এখন আর কোন কিছুই  টলাতে পারে না তাকে। চায় না সে কখনো কারো কাছে কিছু। জানে, চাইতে গেলেই, তার অপ্রাপ্তিতে মিলবে দুঃখ। তাই যতটা পারে, নিজের কর্তব্য ক'রে চলে। করে না কোন প্রত্যাশা। স্বামী, ছেলে বাইরে কাজে যায়। সেও তৈরি করে নিয়েছে নিজের কর্মজগৎ এই লেখালেখির মাধ্যমে। 

ছেলে যখন ছোট ছিলো, তাকে টিউটরের কাছে পড়াতে নিয়ে গিয়ে, পড়ানোর সময়টুকু নিকটবর্তী  রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কাটিয়ে দিতো সে। তার মতো অনেক অভিভাবক,অভিভাবিকা এবং অবসর প্রাপ্ত বৃদ্ধ ,বৃদ্ধাগণ ভিড় জমিয়ে আড্ডা বসাতো সেখানে। এমনই একজন বয়স্কা মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়েছিলো তখন। তিনি বলেছিলেন,
----খবরদার বসে থেকো না সুভদ্রা । এখন তো ছেলেদের নিয়ে ব্যস্ত আছো। কিন্তু তারা যখন বড় হয়ে মানুষ হয়ে যাবে, তখন কি করবে? কিভাবে কাটাবে সময়? এখন থেকে নিজের জন্য কিছু একটা করো। নিজেকে নিয়োজিত করার জন্য। নইলে শেষ বয়সে খুব কষ্ট পাবে। 
কথাটা খুব মনে পড়ে আজ তার। নিজের মা, জেঠিমাকে দেখেছে সুভদ্রা অসহায় একাকিত্বের দুর্বিষহ বার্ধক্য জীবন কাটাতে। সে নিজের জীবনে তা হতে দিতে চায় না। সেও কিছু করতে চায়। প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। চাই দুনিয়ার কাছে স্বীকৃতি। নিজস্ব পরিচিতি, মানুষ হিসাবে একটা আইডেন্টিটি! 

স্বামী ছেলে ব্যস্ত নিজের নিজের কর্মীজীবনে।গৃহকর্ত্রী হিসেবে প্রায়শঃই তাদের জন্য  অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তাকে়।জলাঞ্জলি দিতে হয় নিজের ইচ্ছা,আনন্দ,অবসর ।  পদে পদে সম্মুখীন হতে হয় অনেক বাধার, অনেক প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতার।তারমধ্যেই পথ চলতে হয়। আগে দুঃখ হতো । তবে এখন সেগুলোকে পাত্তা দেয় না আর। জীবনটাকে অন্যরকম ভাবে ভাবতে শিখেছে সে।এই প্রতিকূলতা গুলোর মধ্যেই খুঁজে পেতে চায় সে জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং চার্ম।এগুলো আরো অ্যাগ্রেসিভ করে তোলে তাকে সবকিছু অতিক্রম করে এগিয়ে যাবার জন্য। ভাবতে থাকে, সহজ সরলপথে যে সাফল্য, তাতে কোনোই বাহাদুরি নেই। বরং শতসহস্র বাধাবিপত্তির মধ্যে যখন তা আসে, তাতেই আছে চরম প্রাপ্তি , প্রাপ্তিসুখের আনন্দ।তাই ছুটতে থাকে ক্রমাগত রেসের ঘোড়ার মতই! পেরিয়ে যেতে থাকে হার্ডলস, একটার পর একটা! এভাবেই চলতে চলতে  সত্যিই হয়তো সাফল্য আসবে জীবনে--একদিন তার।   à¦†à¦¶à¦¾à¦Ÿà¦¾à¦•ে জিইয়েই রাখে সুভদ্রা।





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 à¦—ীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 à¦à¦‡ বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ!