নিষ্কাম ভালোবাসা

5th September 2020 8:52 am রাফিয়া সুলতানা
নিষ্কাম ভালোবাসা


* নিষ্কাম ভালোবাসা *
--- রাফিয়া সুলতানা 
13.01.19

মহুয়া সেদিন মোবাইল ঘাঁটতে গিয়ে কৌতূহল বশতঃ একটা শিক্ষাসংক্রান্ত গ্রুপে ঢুকে পড়লো । ফেসবুকে সে নবাগতা। কয়েকমাস হলো পরিবারের সঙ্গে সংগ্রাম করে সে একটা দামী মোবাইল কিনে তাতে একটা একাউন্ট খুলেছে।তা নইলে নিজেকে বর্তমান জগতের সঙ্গে কেমন যেন বেমানান লাগছিলো। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনরা তার পিছিয়ে পড়া মানসিকতা ও বর্তমান যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে তার অজ্ঞতার জন্য প্রায়শঃই তাকে নিয়ে পরিহাস করতো। তাই একরকম বাধ্য হয়েই তার এই পদক্ষেপ। 
তার এক বন্ধু তাকে এই শিক্ষা সংক্রান্ত গ্রুপটায় অ্যাড করে দিয়েছিলো। যদিও তার পড়াশোনার পাট কবেই শেষ হয়ে গেছে । আধুনিক মেয়েদের মত আদৌ ছিলো না তার প্রতিযোগিতার ময়দানে ঘোড়দৌড়ের লক্ষ্য । যদিও, এক সময় সে ভেবেছিলো চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাধীন ভাবেই কাটিয়ে দেবে সারাটা জীবন। কিন্তু কয়েকবছর এক বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরি করে তাকে যে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে, তাতে চাকরির প্রতি ইতিমধ্যে সে বেশ বিরক্ত ও নিরাসক্ত হয়ে পড়েছিলো। তাই তার সেসব খবরেরও খুব একটা প্রয়োজন ছিলো না। স্রেফ সময় কাটানোর জন্য আর পুরনো বন্ধুবান্ধবদের খুঁজে পাওয়ার তাগিদে তার এই ফেসবুকে আসা । কোন গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকতে তার খুব একটা ভালো লাগতো না। তবু সেদিন কৌতূহল বশতঃ ভাবলো, দেখি একবার - এই গ্রুপটায় কি আছে। সেখানে গিয়ে এক জায়গায় তার চোখ আঁটকে গেলো। চোখে পড়লো পীযুষ বোস নামে একজন লেখকের লেখা একটা ছোটগল্প রচনা। অনেকদিন গল্পের বইয়ের সঙ্গে মহুয়ার কোন সংস্রব নেই। সংসারের কাজের চাপ, পরিবারের লোকেদের দেখাশোনা এসব কাজের মধ্যে গল্প পড়ার সেই অবসর বা মানসিকতা কোনটাই তার আর নেই। অথচ ছোটবেলায় বালিসের নীচে লুকিয়ে রেখে, হাবি জাবি কত গল্পের বইই না পড়েছে সে । রূপকথার গল্প, কমিক্স, ইংরেজি, রাশিয়ান, ফরাসী নানধরনের গল্পের কত বঙ্গানুবাদ। বুঝুক না বুঝুক তবুও পড়ে গেছে এক নিঃশ্বাসে। আর এখন বাড়ির আলমারিতে রাখা বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে পাওয়া  বেশ ক'খানা বই থাকা সত্ত্বেও সেগুলো পড়ার কোন ফুরসৎ বা আগ্রহ কোনটাই জন্মায় না তার। কেমন যেন কুড়েমি লাগে একটা ! সত্যি ! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কত না পাল্টে যায়!

 কিন্তু সেদিনের সেই গল্পটায়  লেখাটার বিষয় বস্তু সংক্রান্ত একটা ছবি দেওয়া ছিলো। বলতে গেলে সেই ছবিটাই তাকে আগ্রহী করে তুললো গল্পটা পড়তে। পড়ে বেশ মনে ধরলো গল্পটা।কদিন পর ঐ লেখকেরই আরেকটা গল্প পেলো সে। সেটাও বেশ ভালো লাগলো তার। তারপরে আরো একটা। গল্পগুলো ছোটখাটো এবং অত্যন্ত সহজ, সরল ,সাবলীল ভাবে লেখা জীবনের এক এক জনের এক একটি ঘটনা। ক্রমে সে সেই লেখকের গল্পের প্রতি কেমন যেন আসক্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু একদিন তার সে নেশায় বাধ সাধলো সেই লেখক স্বয়ং নিজেই। একদিন হঠাৎ জানিয়েদিলো সে, এই গ্রুপে  আর তার লেখা পোষ্ট করবে না। তাই শুনে মহুয়ার তো মাথা খারাপ হবার জোগাড় ! 
সে কোনমতে হবে না,তাকে যে কোন উপায়ে ওনার গল্প পড়তেই হবে। তখন সে লেখকের প্রোফাইল ঘেঁটে আরেকটা গ্রুপের কথা জানতে পারলো, যেখানে তিনি সচরাচর তাঁর লেখা পোষ্ট করে থাকেন। তৎক্ষনাৎ সে  নিজেই সেই গ্রুপে জয়েন হয়ে গেলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেখানেও তাঁর গল্প আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। কিন্তু মহুয়া দেখলো সেখানে একটা ছোটগল্প লেখার প্রতিযোগিতা চলছে। সে তখন তাতে, একটা ছোট্ট দেখে গল্প লিখে জমা দিলো। এবং পরেরদিনই সে তাতে বিজয়িনী ঘোষিত হলো ।এই ভাবেই অাকস্মিক ভাবে তার ফেসবুকে লেখালেখি পর্বের সূচনা হলো । কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে এ গ্রুপে এসেছিলো, সেটা আর হলো না। তাই কিছুটা ইতস্ততঃ মনোভাব থাকা সত্ত্বেও সে শেষ পর্যন্ত লেখক পীযুষবাবুকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলো, যদি কোনভাবে আবার নিয়মিত তাঁর গল্প পড়ার সুযোগ হয় ,এই ভেবে। তিনিও তৎক্ষনাৎ সেটা গ্রহণ করে তাকে নিজের সাহিত্য গ্রুপে অ্যাড করে নিলেন। সেখানেও চলা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় , শুরু হলো মহুয়ার গল্প, কবিতা,প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখার পর্ব। এবং সেখানেও সে তার বিবিধ লেখার মাধ্যমে পাঠককুলের মনোরঞ্জন করতে সমর্থ হলো। কিন্তু দিনদিন সে পীযুষবাবুর গল্প যতই পড়ে ততই যেন চমৎকৃত ও আকৃষ্ট হতে থাকে। এভাবে দেখতে দেখতে সে পীযুষবাবুর একান্ত অনুরক্ত হয়ে পড়লো। এতটাই অনুরাগী যে তার নিজের লেখায় পীযুষবাবুর মন্তব্য শোনার জন্য সারাটাদিন উদগ্রীব হয়ে বসে থাকতো। এবং তাঁর নানান সুমন্তব্যে যারপরনাই অনুপ্রাণিত ও উৎসাহী হয়ে উঠতো।

 পীযুষ তার গল্পের মধ্যে জীবনের বিভিন্ন সুখদুঃখের ঘটনা ও তার নিজস্ব অনুভূতি এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলতো যে সেই গল্পের মধ্যে প্রবেশ করে মহুয়া যেন হারিয়ে ফেলতো নিজেকে ,গল্পের চরিত্র গুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে।ক্রমে পীযুষের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বিয়োগান্তক ঘটনা ও তাতে পীযুষের ভগ্নহৃদয়ের প্রতিক্রিয়া তার মনকে বেশ আলোড়িত করে তুললো। বন্ধু হিসাবে স্কুল-কলেজে  মহুয়া নিজের সতীর্থদের তার সহানুভূতি, সহমর্মীতা, উপদেশ ও আশ্বাসের  মধ্য দিয়ে তাদের নৈকট্য ও অন্তরঙ্গতা আদায় করে নিতো। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না।একইভাবে ক্রমে সে পীযুষেরও সুখ দুঃখের সাথী হয়ে গেলো ।এবং এই ভাবে গড়ে উঠলো তাদের মধ্যে  এক অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের  অদৃশ্য বন্ধন। কিন্তু পীযুষের প্রতি তার এই অনুরাগের মধ্যে যে গুপ্ত ছিলো তার উপর এক সুপ্ত নিবিড় ভালোবাসা, একদিন মহুয়া হঠাৎই তা আবিষ্কার করলো। ততদিনে পীযুষও সেটা টের পেয়ে গেছে,কারণ ভালোবাসা এমন একটা জিনিস যা, মুখে না জানালেও ,অন্তরের অন্তঃস্থলে অনুভব করা যায় ।

 কিন্তু তাদের নিজের নিজের জীবনের কিছু বাধ্যবাধকতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকায় সে ভালোবাসার পরিণতি পাবার কোন সুযোগ বা সম্ভাবনা কোনটাই ছিলো না। কারণ মহুয়া ছিল উচ্চ মার্গীয় ব্রাহ্মণ বংশের সন্ততি। আর পীযুষ ছিলো কায়স্থ পরিবারের সন্তান। মহুয়ার মহা প্রতাপশালী রক্ষণশীল পিতামহের উন্নাসিকতা কোনমতেই তাদের এ সম্পর্ক মেনে নিতো না। মহুয়া বংশের একমাত্র কন্যা হওয়ায় ,সে ছিলো খুব আদরের এবং তাকে নিয়ে সকলের অনেক স্বপ্ন ছিলো ।ছোট থেকেই অনেক সমঝদার ও দায়িত্বশীল বলে পরিবারে ও বন্ধুমহলে তার একটা খ্যাতি ছিলো। ফলে গুরুজনের অনুশাসন অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই তার ছিলো না। কাজেই মনের বাসনা গোপন রাখা ছাড়া তার আর কোন উপায় ছিলো না। কিন্তু পীযুষ পুরুষমানুষ। তার একটা বহির্জগৎ ছিলো। তার আরো অনেক অনুরাগী ও গুণগ্রাহী ছিলো। নানারকম পারিপার্শ্বিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে সে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারতো। ফলে হয়তো তাকে এই অধরা ভালোবাসা এতটা সংকটে ফেলতো না। অথচ মহুয়ার চারদেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবনে পীযুষের বিরহ তার পক্ষে খুব মর্মবিদারক আর পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছিলো।একটা দ্বন্দ্বমুলক মনোভাব তার মধ্যে কাজ করতো। এক একবার মহুয়ার মনে হতো সে  খুব সুখী, কারণ পীযুষ তার ভালোবাসায় স্বীকৃতি দিয়েছে।কখনো আবার তাকে না পাওয়ার বেদনায় নিজেকে নেহাৎ এক বিড়ম্বিত ভাগ্যের অধিকারিনী মনে করে  এক ভীষণ মর্মপীড়ায় ছটফট করতো।ছাইচাপা আগুনের মতো তার নিষ্ফল ভালোবাসা নিরন্তর তার অন্তরের অন্দরে তাকে দগ্ধেদগ্ধে মারতো। দিনেরাত্রে কয়বার যে তার নিভৃত অশ্রুবিসর্জন আর নিরুপায় হৃদয়ের  নিদারুণ বিলাপে আকাশ, বাতাস মুখরিত ও তার মনোকষ্টের সাক্ষী হতো তার আর লেখা জোখা ছিলো না। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছা করতো সকল সামাজিক প্রথা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়ে, সকল সংস্কারের জাল ছিন্ন করে ,সকল প্রতিবন্ধকতার বেড়া টপকে ছুটে বেরিয়ে আসতে,পীযুষের কাছে। কিন্তু পরক্ষণেই যেন অনুভব করতো-দুই পায়ে এক অদৃশ্য অক্ষমতার বজ্রকঠিন বেড়ির পরিবেষ্টনী। আবার বাড়ির অমতে পালিয়ে বিয়ে করাটা যে পীযুষের মত গুণীমানী ব্যক্তিত্বের  রুচিশীলতায় প্রচণ্ড বাধবে, মহুয়া তা ভালোভাবেই জানতো।পিতামহ ও প্রেমাস্পদের এই দুইরকম দৃঢ় মানসিকতাই ছিলো মহুয়া ও পিযুষের মিলনের পক্ষে একান্ত অন্তরায়। অথচ তাদের দুজনের ভাবনা-চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দের বিষয় গুলোয় ছিলো ভীষণ রকম মিল।তাদের লেখা রচনাগুলিও যেন তাদের দুজনের অন্তরাত্মাকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলো। ফলে কবে যেন তারা মিলেমিশে একাত্মার মাঝে একাকার হয়ে গিয়েছিলো,তা বোধকরি নিজেরাও টের পায়নি। নিজের নিজের মনের বিবিধ অনুভূতি, অতীত অভিজ্ঞতা, সুখদুঃখের কাহিনী তারা একে অপরকে শেয়ার না করে যেন শান্তি পেতো না। নানান সংকটে তারা একে অন্যকে সহানুভূতি ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতো অনবরত ভাবে  । ফলে,জন্মজন্মান্তরের জন্য তাদের সে ভালোবাসা এক অনবদ্য ,অভূতপূর্ব ,অনাবিল বন্ধুত্বের রূপ নিলো এবং বাকী জীবন এইভাবেই তারা দুজনে পরস্পরের প্রতি  নিঃস্বার্থ , নিস্কাম ভালোবাসায় অতিবাহিত করলো ।





Others News

মনের মানুষ

মনের মানুষ


* মনের মানুষ *
--------- রাফিয়া সুলতানা 
09.10.18

গ্রামের বধু গীতালী রোজকার মত আজও গিয়েছিলো নদীর  ঘাটে কলসী কাঁখে জল আনতে। নদীর হিজল তলার এই ঘাটটা তার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হলেও, এখানেই আসে সে রোজ বিকেলে জল নিতে। কারণ একটা আছে তার। সেটা হলো এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ। গ্রামের লোকেরা সচরাচর এ ঘাটে আসে না। এখানকার জলটাও বেশ পরিস্কার। আর মূল আকর্ষণ হলো এই হেলে পড়া হিজল গাছটা। তার ডালে ডালে মালার মত গোলাপীলাল রঙের ফুল গুলো ঝুলে থাকে। আর ওপারের বাঁশঝাড় থেকে পাখির ডাক  ভেসে আছে। কেমন যেন মাতাল করা মনোরম প্রকৃতি। তাই সে ,দূরে হলেও এখানে আসতেই পছন্দ করে। এসে দুদন্ড বসে থাকে গাছের নীচে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাশের অশ্বত্থ গাছটার পাতা গুলো কেমন ঝিরঝিরিয়ে বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নদীর ধারে কাশফুল গুলো যেন আমোদে মাথা দোলায়। মাছরাঙ্গা পাখিরা থেকে থেকে ঝুপ করে জলে এসে পড়ে। হাসের ঝাঁক কেমন দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দেয়। কচুরিপানার দল দূর থেকে ভেসে এসে আবার ভেসে যায় দূর দেশে।মাথার উপর দিয়ে বালিহাস কেমন সার বেঁধে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। গীতালীর ভীষণ ভালো লাগে এই সব দৃশ্য আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে---
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা..... 

সেদিন জল নিতে এসে, সে একটু অবাক হয়ে গেলো। দেখলো সেখানে,  কুড়ি একুশ বছরের একটি ছেলে গাছটার তলায় নদীতে ছিপ ফেলে, একটা পাথরের উপর বসে,  গুনগুন গান গাইছে। গীতা আগে কখনো দেখেনি তাকে। তার সুন্দর কন্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে, এগিয়ে গেলো সে তার দিকে। পায়ের চাপে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজে, ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাতেই, গীতা হেসে বলে উঠলো, 

"বেশ তো গীত গাও দেখছি। তা তোমার নাম কি গা ? বাড়ি কোথায়? "

বছর তিরিশের একটি গ্রাম্যবধুকে গ্রাম থেকে এত দূরে , একা এই নির্জন ঘাটে আসতে দেখে, ছেলেটি যেন একটু অবাক হলো। 
বললো তার নাম শ্রাবণ। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। সে দুপুর থেকে এখানে বসে মাছ ধরছে। মাছ ধরা হলে সন্ধ্যা বেলা সেই মাছ নিয়ে পাশের শহরের রেলস্টেশনে যে বাজার বসে, সেখানে বিক্রি করবে। কার কাছে শুনেছে, এই নদীতে অনেক ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়। তাই এসেছে আজ। 

------ তা তুমি এত ভালো গান শিখলে কি করে? 

-------কেন, নিজে নিজেই। 
তুমি কিকরে বুঝলে, ভালো? তুমিও কি গান জানো? 

গীতালী মাথা নেড়ে সাই দিলো। 

--------তাহলে, গাও দেখি। 

----------আজ না। অন্যদিন। আজ তোমারই গান শুনি। 
গীতালীর পীড়াপীড়িতে আরও কয়েকটা গান গায়লো শ্রাবণ। 

গীতালী মুগ্ধ হয়ে শুনলো সে গান। গলায় এত দরদ ভরা সুর, শুনতে শুনতে যেন চোখ দিয়ে জল চলে আসে। 
সেই থেকে রোজই জল নিতে এসে গীতালী, শ্রাবণের গান শোনে। গীতালীও ভালো গান গায়। তারও খুব সুরেলা কন্ঠস্বর। শ্রাবণ খুব প্রশংসা করে তার । 

যদিও তাদের বয়সের অনেকটা ফারাক ছিলো, তবুও তাদের মধ্যে ক্রমশঃ একটা নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। 
প্রায় সুখ দুঃখের গল্প হয় তাদের । গীতালী জানতে পারে গ্রামের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো শ্রাবণ । কিন্ত সমজাতের না হওয়ায়, মেয়েপক্ষ তাদের বিয়েটা দেয়নি। তারপর আরেকটি মেয়েকেও ভালোবেসেছিলো সে। কিন্ত সে তাকে ধোঁকা দিয়ে অন্যজনকে বিয়ে করে নিয়েছে ।

 গীতালীও ছেলেবেলায়,মনের মানুষের খোঁজে, ভালোবেসেছিলো দু একজন কে। কিন্ত আজ পর্যন্ত সেই মনের মানুষ তার আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, সে আর গীতালী পৃথিবীর দুইমেরুর দুই প্রান্তের বাসিন্দা । গীতালী একটু ভাবুক প্রকৃতির। গান, প্রকৃতি এইসব ভালোবাসে। কিন্ত তার স্বামী ভীষণ রকম বৈষয়িক। বর্তমানে একটি ধান কলের মালিক সে । টাকা পয়সা ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই তাদের মধ্যে ঠিক মতের মিল হয় না। তার উপর গীতালী নিঃসন্তান। তাই নিয়ে মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অশান্তি করে। গীতালীকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার কথা বলে। গীতালীর মনে তাই অনেক দুঃখ জমে আছে। শ্রাবণকে বন্ধুর মত সেসব কথা বলে ,হাল্কা হয় একটু। 

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। তাদের বন্ধুত্ব আরো গভীরতা লাভ করো। গীতালীর খুব ইচ্ছা হয়, শ্রাবণ কে কিছু দিতে। এতদিনে খুব ভালোবেসে ফেলেছে সে শ্রাবণকে। তাই নিজের হাতে সুন্দর ফুল, লতা পাতার নক্সা করা একটা কাঁথা বানিয়েছে সে তার জন্য। শীতের সময় গায়ে দেবে বলে। শ্রাবণ ও খুব খুশি সেটা পেয়ে। শীতের দিনে সেটা গায়ে জড়িয়ে যেন কোন আপনজনের কোমল ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করে সে। সেও মনে মনে পছন্দ করে গীতালীর মিষ্টি মধুর ব্যবহার, তার কথাবার্তা।তার সঙ্গে গল্প করতে আর তার গলায় গান শুনতে বেশ ভালো লাগে তারও। 
গীতালী শয়নে, স্বপনে, কাজের মাঝে, সব সময় শ্রাবণের কথাই ভাবে। তার শুধু মনে হয়, সে তো ঈশ্বরের কাছে এমনই একটা জীবনসাথী চেয়েছিলো। কিন্ত কেন দিলো না ঈশ্বর তাকে ? শুনেছে, ঈশ্বর যা করেন, তা মঙ্গলের জন্যই করেন। হবেও বা! হয়তো তাকে পেলে, তার এত সুখ সহ্য হতো না!এই সব সাত পাঁচ ভাবে আর অনর্গল চোখের জল ফেলে। 

একদিন অসুখে, শ্রাবণের মা হঠাৎ মারা গেলো। শ্রাবণের এই মা ছাড়া দুকুলে আর কেউ ছিলো না। ফলে সে যারপরনাই ভেঙে পড়লো। বেশ কয়েকদিন সে আর মাছ ধরতে এলো না। 
গীতালী রোজ তার আশায় আশায় ঘাটে আসে, আর নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 
দিন পনেরো পরে গীতালী দেখতে পেলো, শ্রাবণ আজ আবার এসেছে। সে খুব খুশি মনে তার কাছে এগিয়ে গেলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো, সে আজ নদীতে ছিপ ফেলেনি। আনমনে কি যেন ভাবছে, আর জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে। গীতালী পিছন থেকে এসে তার চোখটা চেপে ধরলো। শ্রাবণ ভয় পেয়েছে দেখে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। 
শ্রাবণ তাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। 

এরপর, শ্রাবণ কোঁচড় থেকে বের করে, কাগজে মোড়া একটা পুঁথির মালা গীতালীর হাতে দিয়ে বললো, এটা সে তার জন্য শহরের মেলা থেকে কিনে এনেছে। কাল গেছিলো সে শহরে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে,কাজের ব্যাপারে । 
গীতালী খুব খুশি হলো সেটা পেয়ে। শ্রাবণ তার জন্য উপহার এনেছে, ভাবতেই তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে তার? গীতালী চোখ মুছে হেসে বললো,

 "ও কিছু না। তুমি এতদিন আসোনি তাই। "
শুনে শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আর আসতে পারবে না সে এখানে। কাল থেকে সে শহরে নতুন একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। একটা মাছের আড়তে। আড়তদার তাকে কাজটা দিয়েছে, তাকে তার একমাত্র মেয়ের ঘরজামাই করবে বলে। চোখ নামিয়ে এই কথাগুলো বলে সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেলো। গীতালী তো তাই শুনে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো, তাকে পিছু ডাকে। বলে যেও না,শুনে যাও। আবার একদিন এসো কিন্তু । কিম্বা ছুটে গিয়ে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। কিন্ত কোনটাই সে পারলো না। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। ততক্ষণে শ্রাবণ অনেকটা চলে গেছিলো। একবার সে পিছনে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলো। গীতালীর হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেলো। কাঁখের মাটির কলসীটা আলগা হয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। তার সঙ্গে বুকের ভিতর গীতালীর হৃদয় টাও। চিৎকার করে কেঁদে সে বললো, 

"চলেই যদি যাবে, তবে এসেছিলে কেন---------? "
তার আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু শ্রাবণের কানে তা পৌঁছালো না। আর পৌঁছালেই বা কি হতো! 

দুই মাস কেটে গেছে। গীতালী জল নিতে আজও আসে, আর মনে মনে আশা করে, শ্রাবণ যদি আবার আসে আজ, শুধু একবার তার সাথে দেখা করতে। কিন্ত আসে না। গীতালী অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে বসে থাকে, সেই হিজল গাছের তলায় আর সেই পাথরটায় হাত রেখে শ্রাবণের স্পর্শ অনুভব করে, যেটাতে সে বসে মাছ ধরতো। অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। ফেরার সময় নদীর ধার থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আসে, বুকে এই আশা নিয়ে, কাল ঠিক শ্রাবণ আসবে। কিন্তু পরের দিন এসে যখন দেখে, শ্রাবণ আসেনি, তখন হাতের নুড়িটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দেয়। আবার আরেকটা নুড়ি কুড়িয়ে আনে পরেরদিন, একই আশায় বুক বেঁধে। 

এক বছর পর------
শোকে দুঃখে কঠিন ব্যামোয় আক্রান্ত হয়ে পড়লো গীতালী। ঘনঘন জ্বর আসে।বুকে ব্যথা। রক্ত বমি হয়। ডাক্তার বলেছে, এ অসুখ সারবার নয়। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেইমতো তার স্বামী তাকে হাসপাতালে চিরদিনের মত নির্বাসন দিয়ে এসে নিজে একটা নতুন সংসার বাঁধলো। 

এদিকে এই ছমাসে গীতালীর কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে। আর বোধহয় বাঁচবে না সে। বাঁচতে চায়ও  না। বিকেলবেলা হাসপাতালের টিবি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে, ফাঁকা এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কোনরকমে রুগ্ন শরীরটাকে টানতে টানতে নিয়ে এসে বসে। কি সুন্দর ফুলে লালে লাল হয়ে আছে গাছটা! গাছের শাখায় বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখর হয়ে আছে সারা এলাকাটা । পাখি গুলো হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়ফড় আওয়াজ করে উড়ে যাচ্ছে। তারপর আকাশে খানিকক্ষণ চরকির মতো ঘুরপাক খেয়ে, আবার ফিরে আসছে গাছে। সেই সবই দেখছিলো সে আর ভাবছিলো পুরনো দিনের কথা। 

সেদিন হঠাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো। কিছুটা দূরে গিয়ে ছেলেটা আবার ফিরে এলো, গাছতলায় রাখা তার সাইকেলটা নিতে। গীতালী দেখলো, ছেলেটা আর কেউ না,সে শ্রাবণ। একটু আগের থেকে মোটাসোটা হয়েছে। পরণের কাপড়ে শহুরে আঁচ লেগেছে। গীতালী বলে উঠলো, 
"কে, শ্রাবণ না? "
ছেলেটা কেমন যেন চমকে উঠে তার দিকে, অপরিচিতের মতো তাকালো। সত্যি তো! রোগে ভুগে এখন তার যা চেহারা হয়েছে, সে তো আর চেনবার মতো নয়। 
"চিনতে পারলে না তো! আমি গীতালী গো, মৌরি গাঁয়ের গীতালী। সেই যে নদীতে জল আনতে যেতাম। আর তুমি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে! "
শ্রাবণের চোখে পুরনো দৃশ্যগুলো সব সিনেমার মতো ভেসে উঠলো। 
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
" তুমি এখানে? একি চেহারা হয়েছে তোমার?" 
গীতালী ততক্ষণে হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করেছে। যাক! তার শেষ ইচ্ছার কথা, মরার আগে, একটিবার তাকে দেখার ইচ্ছা ---- ঈশ্বর শুনেছেন তাহলে!
গীতালীর মুখে সব শুনে, শ্রাবণ ভীষণ মর্মাহত হলো। 
সেও জানালো, হাসপাতালে রোগীদের জন্য নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে সে। এখন তারই টাকা নিতে এসেছিলো। 
গীতালীর কথা সেও ভোলেনি। কাজের অবসরে, মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সব পুরনো স্মৃতি। 
ভোরের বেলা শীত লাগলে আজও সেই কাঁথার আবরণে সে অনুভব করে গীতালীর দরদী হৃদয়ের স্পর্শ। বলতে বলতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। 
এই কথা শুনতে শুনতে অসহ্য বেদনায় ভরে গেলো গীতালীর শরীর। বুকে প্রচণ্ড একটা ব্যথা অনুভব করলো সে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলো খুব। সঙ্গে সঙ্গে তার লুটিয়ে পড়া মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে, ডাকতে লাগলো গীতা, গীতা করে। গীতালী একবার চোখ মেলে তাকালো। তারপর অস্ফুট স্বরে বললো---
"কাছে এসো না আমার! আমার যে কঠিন ব্যামো! বড্ড ছোঁয়াচে! "
---"হোক ছোঁয়াচে! আমিও মরতে চাই তোমার সঙ্গে! "

গীতালী নিজের দুর্বল হাতটা কোনরকমে তুলে, তার মুখ চাপা দিলো। গলগল করে তার চোখ বেয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। গীতালী আবার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, 
"পরজনমে আর ফাঁকি দিয়ো না যেন!"
 এই বলে চিরদিনের মতো শ্রাবণের কোলে ঘুমিয়ে পড়লো। 
শ্রাবণ  "গীতা! গীতা!--" ডাকতে ডাকতে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। 
ছমাস পর-------
শ্রাবণ বসে আছে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। পড়ন্ত বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে, গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো। চড়ুইয়ের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে কিচিরমিচির শব্দে! আহ! বড় শান্তি এখানে! দুদিন পরেই সেও চলে যাবে পরপারে। গীতালীর সঙ্গে দেখা হবে আবার! সেও নিশ্চয় খুব খুশি হবে! ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির সময় বলেইছিলেন তাকে, এ ব্যাধি সারবার নয়! মরণই এর শেষ পরিণতি! সেদিন সেটা শুনে শ্রাবণ খুব খুশি হয়েছিলো! গীতালীকে ছেড়ে সেও যে আর থাকতে পারছে না! সে যে ছিলো তার একান্তই মনের মানুষ! 


Similar   রাফিয়া সুলতানা