রাকা--- বিকাশকলি পোল্যে

19th October 2020 12:41 pm ছোটগল্প
রাকা---  বিকাশকলি পোল্যে


রাকা

বিকাশকলি পোল্যে 

অফিসে ঢোকার মুখেই চোখে পড়ল ঘড়িটা হাতে নেই ।

অমনি বুকের মধ্যে দামামা বেজে উঠল যেন ।না,বাড়িতে তো ফেলে আসেনি। ঘড়িটা হাতে পরেই বেরিয়েছিল সে ।হ্যাঁ, পরিস্কার মনে পড়ছে তার। শাড়িটা পরল তারপর চুল আঁচড়াল ।লিপস্টিক ঠোঁট দিয়ে ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই ঘড়িটা হাতে পরেছিল সে ।এখন আর হাতে নেই সেটি ।রাস্তাতেই পড়ে গিয়েছে নিশ্চিত। চোখ ফেটে জল এল রাকার।

বুকের গহীন গভীরে কি যেন একটা হচ্ছে। চোখের সামনে বাবার মুখটা ভেসে উঠছে যতবার, ততবারই বুকের ভিতরটা কেমন জানি করে উঠছে। কখনো মনে হচ্ছে বুকটা একেবারে ফাঁকা। শূন্যে ভাসলে যেরকম হয় ।আবার কখনো মনে হচ্ছে বুকটা বেশ ভারি ।যেন পাথর চাপানো রয়েছে বুকে ।শ্বাস নিতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। বেশ জোরে জোরে শ্বাস নিতে হচ্ছে তাকে। ছাড়তেও হচ্ছে জোরে।দীর্ঘশ্বাস !মন বসছে না অফিসের কাজে। তার অস্থিরতা দেখে পাশের চেয়ারে বসা পারমিতা বলল,'কি রে,কি হয়েছে তোর?অমন করছিস কেন?এনি প্রবলেম?

ভেজা চোখে পারমিতার দিকে তাকাল রাকা ।অবাক হল পারমিতা। বলল,'কি রে তুই কাঁদছিস!কি হয়েছে তোর?আমায় বল ।'

রাকা বলল,'আর বলিস না।আমার ঘড়িটা বোধহয় হাত থেকে খুলে রাস্তায় পড়ে গেছে।'

-'সে কি রে!রাস্তায় পড়ে গেছে?'

-'আর কোথায়ই বা পড়বে বল ।'

-'তুই হাতে পরে বেরিয়েছিলি তো?'

-'হ্যাঁ রে,আমার স্পষ্ট মনে আছে। '

-'এই তো সেদিনই কিনলি !'

-'হ্যাঁ রে। কোথায় কিভাবে পড়ল,কিছুই বুঝতে পারছি না।'রাকার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। পারমিতা কিছু বলল না আর ।মানুষের শোকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই তার ।

এই তো পরশু দিন বাবার সঙ্গে টাইটানের শোরুমে গিয়েছিল রাকা একটা ঘড়ি কেনার জন্যে। ঘড়িটা দেখে খুব পছন্দ হল তার ।টাইটানের রাগা ।হাতে নিয়ে ঘড়িটা উল্টে পাল্টে দেখেছিল ।কিন্তু দামের জন্যে বাবাকে কিছু বলতে পারছিল না ।বাবা ঠিক বুঝতে পেরেছিল তার মনের কথা। বলেছিল,'এই ঘড়িটাই নে।'

-'না বাবা, এটার প্রচুর দাম ।'

-'দাম তো কি হয়েছে। আমি তো দেব ।ঘড়িটা কি সুন্দর মানিয়েছে তোর হাতে ।'

-' মানাক,তুমি অন্য ঘড়ি দেখ তো ।'

-'না রে,এটাই নে না ।তোর নামের সঙ্গেও বেশ মিল আছে ঘড়িটার ।রাগা ।হা হা হা ।'যেন খুব মজা পেয়েছে বাবা ।সেই ঘড়িটাই তাকে শেষপর্যন্ত কিনে দিয়েছিল বাবা। খুব খুশি হয়েছিল রাকা ।

ঘড়িটা হাত থেকে খুলে কোথায় কখন পড়ে গিয়েছে বুঝতে পারেনি রাকা ।দুদিনও হয়নি এখনো। বাবার কাছে সে মুখ দেখাবে কি করে ।কত কষ্টের পয়সা বাবার ।মাথার ঘাম পায়ে ফেলা রোজগার ।কিভাবে নষ্ট করে ফেলল সে ।ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার ।মনে হচ্ছে হাত পা ছড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদে ।যদি বুকের কষ্টটা একটু কমে ।

রাকা সুন্দরী ।শুধু সুন্দরী বললে কম বলা হবে। বেশ সুন্দরী ।দুধে আলতা রঙ ।পুতুল পুতুল গড়ন ।একটা অফিসে রিশেপসনিষ্ট এর চাকরি করে ।নতুন চাকরি ।মেয়ে অফিসে যাবে ।হাতে ঘড়ি পরবে না তা কখনো হয়!তাই ঘড়িটা জোর করেই কিনে দিয়েছিল বাবা ।অথচ বাবা নিজেই কখনো হাতে ঘড়ি পরে না ।

কাজে একদম মন বসছে না রাকার ।বাবার জন্যে সত্যিইখুব কষ্ট হচ্ছে তার ।কত পরিশ্রম করে মানুষটা ।তার মুখে হাসি দেখার জন্যে মানুষটার চেষ্টার অন্ত নেই ।সেই মানুষটার মুখের হাসি কেমন করে কেড়ে নেবে সে ।ঘড়িটা হারানোর কথা সে বলবে কি করে বাবাকে ।ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। এত কষ্ট হচ্ছে কেন তার ? ঘড়িটার প্রতি মায়া নাকি বাবাকে কষ্ট দেওয়ার যন্ত্রণা। চোখ দুটো আবারও ভিজে উঠল রাকার। তার ভীষণ কান্না পেল ।ঠিক সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ।ঢেউয়ের জলের মতোই নোনা জল উপছে পড়ল তার চোখে।

ছোটবেলায় তার চোখে জল দেখলেই বাবা খুব রেগে যেত ।আসলে বাবা রেগে যেত হতাশায় ।এত করি তবুও মেয়ের কান্না।এখন আর তার উপর রাগ করে না বাবা ।কারণ সে এখন বড় হয়ে গিয়েছে। বড় মেয়েদের উপর নাকি রাগ করতে নেই ।বাবা যদি শোনে ঘড়িটা সে হারিয়ে ফেলেছে, তাহলে কি বাবা রাগ করবে !বোধহয় না ।বাবা ভীষণ কষ্ট পাবে ।কোন বিষয়ে কষ্ট পেলে বাবা চুপচাপ থাকে ।তার দুঃখ কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারে না বা শেয়ার করতে চায় না বাবা ।মা বলে,তোর বাবা এরকমই,বিয়ের পর থেকেই দেখছি। ভীষণ চাপা ।অন্তর্মুখী বাবার মুখটা মনে পড়লেই তার বুকটা ভরে উঠছে নিদারুণ কষ্টে ।মনের মধ্যে আছড়ে পড়ছে অস্থিরতার ঢেউ ।বাবা যদি তাকে বকত মারত তাহলে বোধহয় তার কষ্ট কিছুটা লাঘব হত ।

মন ভালো নেই ।তাই মুখে আলো নেই। রাকার মুখখানা তে আজ কালো মেঘের ঘনঘটা। ছায়া এসে পড়েছে মুখে ।আঁধারের ছায়া। সেই আঁধারের বুক চিরে এক ঝলক আলো আসার মতোই রাকার মাথায় ঝিলিক মারল আইডিয়াটা ।লাঞ্চ আওয়ারে পারমিতাকে শোনাল আইডিয়াটা ।পারমিতা বলল,'এক্সেলেন্ট,ভেবে দ্যাখ কি করবি ।'ম্যানেজারের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল রাকা ।

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের 'কাছের মানুষ ' রাকার প্রিয় উপন্যাস। এটা তার ব্যাঙ্ক ও বটে ।অফিস থেকে ঘরে ফিরেই ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। বইটার পাতা উল্টে পাল্টে বেশ কিছু জমানো টাকা খুঁজে বের করল সে ।টাকা গুলো সঙ্গে নিয়ে বেরনোর জন্যে প্রস্তুত হল ।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে নিল একবার। মা এসে বলল,'কি রে ,এখন কি কোথাও বেরবি ?'

-'হ্যাঁ মা,কোয়েলদের বাড়ি যাব একটু ।'

-'মুখে একটু কিছু দিয়ে যা ।তোর জন্যে আজ একটু পাস্তা বানিয়েছি ।'

-'এসে খাব মা ।কোয়েলর সঙ্গে খুব জরুরী একটা দরকার আছে ।উ ম্ ম্ ম্ মু।আমার সোনা মা ।'

মা'র চিবুকটা ধরে একটু আদর করে একপ্রকার দৌড়েই বেরিয়ে গেল সে ।মা হেসে বলল,'পাগলি মেয়ে আমার। '

কোয়েলদের বাড়ি একটা বাহানা ।বাবা বাড়ি ফেরার আগেই তাকে ফিরে আসতে হবে ।রাকা অটো ধরে চলে এল যাদবপুর এইট বি ।ঢুকে পড়ল টাইটানের শোরুমে ।

বাড়ি ফিরে রাকা দেখল বাবা চেয়ারে বসে আছে। চা খাচ্ছে। তার হাতের দিকে তাকাল বাবা ।বলল,'তোর হাতে ঘড়িটা বেশ মানিয়েছে বুঝলি ।'মা'র দিকে তাকিয়ে বলল,'জানো, ঘড়িটা আমার খুব পছন্দের ।'মিটিমিটি হাসছে মা ।গর্বে যেন বাবার বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে। মনে হচ্ছে জীবনে এই একটা মাত্র সাফল্যই বাবা অর্জন করেছে ।রাকার চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠল ।এ অশ্রু আনন্দের ।

_________





Others News

ফাঁদ --- রোজ বেগম

ফাঁদ --- রোজ বেগম


ফাঁদ

রোজ বেগম 

তাড়াতাড়ি ব্যাগ টা নিয়ে রুপালী বেরিয়ে পড়লো । আজ কে এক ফ্রেন্ড এর বাড়ীতে নেমন্তন্ন । বেস্ট ফ্রেন্ড রুমার বিয়ে তে যেতে পারি নি কিন্তু আজ বউ ভাতে সঠিক সময়ে না পৌঁছালে খুব রাগ করবে সে । ফোন করে কি বকান না বকেছে না যাওয়ার জন্য । খুব অভিমানি মেয়ে । খুব দুঃখও পেয়েছে বোধহয় ।

হাই হোক , ব্যাগ টা আর একবার খুলে পরীক্ষা করে নিল , বান্ধবীকে দেওয়ার জন্য একটা সোনার কানের দুল বানিয়ে রেখেছিল আগে থেকেই । স্কুলে প্যারা টিচার এর কাজ করে রুপালী । স্কুলের শিক্ষিকাদের থেকে বেশি পরিশ্রম করলেও বেতন পায় অনেক কম । তাও আবার সময় মতো পায় না । তাই আগে থেকে জমানো টাকা থেকে বান্ধবীর জন্য সোনার কানের দুল টা কিনে রেখেছিল । ঠিক ঠাক রাখা আছে দেখে নিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল ।

বাস স্ট্যান্ডে এসে একটা ফাঁকা বাস পেয়ে জানলার পাশে সিট ধরে বসে পড়লো । আজ রবিবার থাকার জন্য বাসে ভিড় টা কম ।

বাস টা à§§ ঘণ্টা লাগাল খড়গপুর এর কৌশল্যা মোড় আসতে । বাস থেকে নেমে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই নাকি মধুর মিলন লজ । ওখানেই খাওয়া – দাওয়া হবে । বান্ধবীর দেওয়া পথ নির্দেশ মতো রুপালী উত্তর দিকের পথ ধরে হাঁটা দিল । দুপুর বেলা পথে লোক নাই বললেই চলে । ফাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল রুপালী কোন অটো বা রিস্কা আছে কিনা । কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না । অগ্যতা একাই এগিয়ে চলতে লাগলো ।

কিছুক্ষন চলার পর রুপালী দেখতে পেলে একটা সুন্দর ছোটো বাচ্ছা , আনুমানিক বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে । গায়ে কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ড্রেস । দেখে মনে হল কোন ভালো বাড়ীর বাচ্চা । সেই বাচ্চা টা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে । রুপালী পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কাঁদছ কেন ?

বাচ্চা টা কোণো উত্তর না দিয়ে শুধু মা মা বলে আবার কাঁদতে লাগলো ।

রুপালী চারিদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল ভালকরে , বাচ্চাটার বাবা মা বা অন্য কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না ।

রুপালী বাচ্চাটাকে তার বাড়ী কোথায় জিজ্ঞাসা করলে সে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলির দিকে দেখিয়ে দিল ।

রুপালীর ঐ ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে পথে এ ভাবে ফেলে চলে যেতে মন চাইল না । সে বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চাটার দেখানো গলি পথ ধরে তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য এগিয়ে গেল । গলির মধ্যে কিছুটা যাওয়ার পরই হটাত দুটো লোক কোথা থেকে এসে ঘিরে ধরল রুপালিকে । তাদের হাতে ছুরি ছিল । রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই একটা লোক গলার কাছে ছুরি চেপে ধরে বলল যে , একদম চিৎকার করবেন না , যা টাকা পয়সা আর গহনা আছে তাড়াতাড়ি বের করুন ।

আর একজন রুপালীর হাত থেকে ব্যাগ টা ছিনিয়ে নিল । গলায় মায়ের দেওয়া সোনার হার টা ছিল । সেটা ধরে জোরে টান মারতে যাচ্ছিল , কিন্তু রুপালী নিজেই খুলে দিয়ে দিল । অন্য লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাইকে উঠলো । রুপালী এখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটা ওদেরই । এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল । যাতে সে পা রেখে দিয়েছে ।

ছিনতাইবাজ দু জন রুপালীর কাছ থেকে ব্যাগ আর হার নিয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত পালিয়ে গেল ।

রুপালী নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো । যাই হোক , গলি থেকে বেরিয়ে আর একটু হাঁটতেই মধুর মিলন লজ । সেখানেই বান্ধবীর বউভাত এর খাওয়া – দাওয়া চলছে । রুপালী বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল । তারপর পথে ঘটা সমস্ত ঘটনা জানালো । তার অন্য গিফট না আনতে পারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল রুপালীর । কিন্তু রুমা রুপালিকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তুই যে সুস্থ শরীরে ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস --- এটাই আমার সব চেয়ে বড় গিফট । টাকার চেয়ে বন্ধুর জীবন অনেক বেশি মুল্যবান “।