গল্প --- অন্যায় অত্যাচার

3rd December 2020 7:15 pm তারিফ আলম
গল্প --- অন্যায় অত্যাচার


 অন্যায়- অত্যাচার

লেখা-- তারিফ আলম

ফোন টা বেজে উঠতেই রহিম এর ঘুম টা ভেঙ্গে গেল । এমনিতেই ট্রেনে ঘুম খুব কমই আসে রহিমের । ফোন টা কানে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে রহিমের ছোট মেয়ে সালমার গলা ।

“আব্বা , কখন আসবে ? তোমার ট্রেন আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন”?

রহিম শান্ত গলায় বলল – “ এই তো পৌঁছে গেলাম , আর মাত্র এক ঘণ্টা”।

“ আমার জন্য বড় একটা পুতুল আনবে বলছিলে , সেটা নিয়ে আসছো তো”?

“ হ্যাঁ রে মা , তোর জন্য পুতুল আর তোর দিদির জন্য স্কুল ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছি “

“ আর আম্মুর জন্য কি নিয়েছ “?

“ আরে কালকে ঈদ , তাই তোদের সবাই জন্য জামা কাপড় নিয়ে যাচ্ছি । আর একটু অপেক্ষা কর , পৌঁছে যাবো “।

“আচ্ছা” বলে সালমা ফোন টা এবারে তার আম্মু হাপেজাকে দিল ।

“খাওয়া দাওয়া ঠিক করছেন তো , সেই মুম্বাই থেকে দু দিন আগে ট্রেনে উঠেছেন , জার্নিতে কষ্ট হচ্ছে জানি “।

রহিম বলল –‘ রোজা আছে , বাড়ীতে গিয়ে খুলবো , শেষ রোজাটা রাখতে হবে তো । আর একঘণ্টার মধ্যেই খড়গপুর স্টেশনে পৌঁছে যাবে ট্রেন “।

বউ হাপেজার কান্নার আওয়াজ পায় রহিম । আসলে রহিমের বাড়ী মেদিনীপুর , কিন্তু সে কাজ করে মুম্বাইতে । বছরে এই ঈদের সময় একবারে বাড়ী আসে । গত তিন বছরে মাত্রে তিনবার বাড়ী এসেছে । এবারে একদম একমাস ছুটি নিয়ে এসেছে সে । বউ হাপেজা আর দুই মেয়ে সালমা আর সাজেদাকে নিয়ে দিঘা যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে সে ।

এবারে রহিম নরম সুরে বউকে বলল – “ আরে বোকা মেয়ে , কাঁদছ কেন । এই তো চলে এলাম । আমি জানি তুমি আমকে খুব মিস করো , আমিও তো করি । আসলে সংসার চালানর জন্য মুম্বাইতে গিয়ে পড়ে থাকি । আমারও কি ইচ্ছে হয় তোমাদের ছেড়ে দূরে থাকতে । আসলে উপায় নেই । তবে এবারে ভাবছি এখানেই থেকে কিছু একটা ব্যবসা করবো । মেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করতে হবে । ওদেরও তো ভবিষ্যৎ আছে “।

হাপেজার কান্না কিন্তু বন্ধ হল না । রহিম বলল –“ এবারে ফোন টা রেখে দাও “ আর একটু পরে তো নেমে যাবো ট্রেন থেকে “।

রহিম তার বউ এর সাথে ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল । এমন সময় ১০ – ১২ জন গেরুয়া পোশাক পরা ছেলে ‘ জয় শ্রী রাম” স্লোগান দিতে দিতে তাদের কামরার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো ।

একজন রহিমকে দেখে বলতে লাগলো – “ ঐ বল জয় শ্রী রাম “।

রহিমের দাড়ি আর মাথায় টুপি দেখে তারা বুঝে নিয়েছে যে রহিম মুসলিম ।

রহিম খুব শান্ত স্বরে বলল – “ আমি বার (রোজা ) রেখেছি , এখন আমি বলব না ভাই । তোমারা নিজেরা তো বলছ , তাতেই তোমাদের ভগবান খুশী হবেন । অন্য ধর্মের মানুষকে জোর করে বলালে কি তোমাদের ভগাবান খুশী হবেন “?

রহিমের কথা শুনে গেরুয়া পোশাক পরা ছেলে গুলো এবারে খুব রেগে গেল । রহিম কিছু বুঝার আগেই তার উপরে গেরুয়া বাহিনীর ছেলে গুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মারতে শুরু করলো । রহিমের উপরে লাথি , ঘুসি প্রচণ্ড ভাবে এসে পড়তে লাগলো । একজনকে দশজন মিলে মারছিল । রহিম সাহায্যের জন্য ট্রেন সহযাত্রীদের বলতে লাগলো । কিন্তু কেউ এগিয়ে এল না রহিমকে বাঁচাতে । তার পরিবর্তে কয়েকজন যাত্রী আবার মোবাইল বের করে ভিডিও করতে লাগলো ।

মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে যখন ট্রেন এর মেঝেতে রহিম পড়ে গেল তখন তারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল নীচে ।

------------ সেই দিন রাতেই খড়্গপুর হাসপাতাল থেকে খবর গেল হাপেজার কাছে “ তার স্বামী ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছে “।

এই দুঃসংবাদ পেয়েই হাপেজা তার দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মারুতি ভাড়া করে দ্রুত গিয়ে পৌছায় হাসপাতালে । সেখানে গিয়ে জানতে পারে তার স্বামীকে আই সি ইউ তে রাখা হয়েছে । অবস্থা গুরুতর । এখনও জ্ঞান ফিরে নি ।

হাপেজা বাইরে ৫ বছর আর ৭ বছর বয়সী দুই মেয়েকে নিয়ে বসে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহতালার কাছে দুয়া করতে লাগলো যাতে তার স্বামীর প্রান বেঁচে যায় । মায়ের কান্না দেখে দুই মেয়েও কাঁদতে লাগলো ।

কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চা দুজন কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই হাপেজার । ভোরের বেলা একটা নার্স এসে খবর দিল – “ আপনার স্বামীর জ্ঞান ফিরেছে , আপনাদের দেখতে চাইছে , আপনারা দেখা করতে যেতে পারেন “।

হাপেজা দুই মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে তাদের সঙ্গে নিয়ে রুম এর মধ্যে ঢুকে দেখে রহিম বেডে শুয়ে আছে । পুরো গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা । একটা পা আর একটা হাত ভেঙ্গে গিয়েছে । মাথার অনেকটা ফেটেছে । নাক মুখ আর গায়ে আঘাত এর চিহ্ন পষ্ট ।

ছোট মেয়ে দুটো বাবাকে এই অবস্থায় দেখে কাঁদতে শুরু করে দিল আবার । হাপেজাও কাঁদছিল ।

রহিম খুব কষ্টে তাদের বলল – “ কেঁদো না তোমরা , আল্লার দুয়াতে সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি ভালো হয়ে তোমাদের সঙ্গে গিয়ে থাকবো , আর কোথাও যাবো না ।

ছোট মেয়ে সালমার ভালো ডান হাত টা দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলল – “ মা তোর জন্য পুতুল আনতে পারলাম না রে , কাপড় জামাও না, সব ট্রেনে ব্যগের মধ্যে রয়ে গিয়েছে “।

ছোট মেয়ে সালমা বাবার হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে লাগলো – “ আব্বা , আমি শুধু তোমাকে চাই , পুতুল জামা – কাপড় – এসব কিছুই চাই না , তুমি শুধু ভালো হয়ে যাও “।

মেয়ের কথা শুনে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলো । এই কান্না আরও কত এই রকম নিরপরাধ রহিমের পরিবারকে কাঁদতে হবে তা কেই বা জানে ।





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?