অন্যায়- অত্যাচার
লেখা-- তারিফ আলম
ফোন টা বেজে উঠতেই রহিম এর ঘুম টা ভেঙ্গে গেল । এমনিতেই ট্রেনে ঘুম খুব কমই আসে রহিমের । ফোন টা কানে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে রহিমের ছোট মেয়ে সালমার গলা ।
“আব্বা , কখন আসবে ? তোমার ট্রেন আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন”?
রহিম শান্ত গলায় বলল – “ এই তো পৌঁছে গেলাম , আর মাত্র এক ঘণ্টা”।
“ আমার জন্য বড় একটা পুতুল আনবে বলছিলে , সেটা নিয়ে আসছো তো”?
“ হ্যাঁ রে মা , তোর জন্য পুতুল আর তোর দিদির জন্য স্কুল ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছি “
“ আর আম্মুর জন্য কি নিয়েছ “?
“ আরে কালকে ঈদ , তাই তোদের সবাই জন্য জামা কাপড় নিয়ে যাচ্ছি । আর একটু অপেক্ষা কর , পৌঁছে যাবো “।
“আচ্ছা” বলে সালমা ফোন টা এবারে তার আম্মু হাপেজাকে দিল ।
“খাওয়া দাওয়া ঠিক করছেন তো , সেই মুম্বাই থেকে দু দিন আগে ট্রেনে উঠেছেন , জার্নিতে কষ্ট হচ্ছে জানি “।
রহিম বলল –‘ রোজা আছে , বাড়ীতে গিয়ে খুলবো , শেষ রোজাটা রাখতে হবে তো । আর একঘণ্টার মধ্যেই খড়গপুর স্টেশনে পৌঁছে যাবে ট্রেন “।
বউ হাপেজার কান্নার আওয়াজ পায় রহিম । আসলে রহিমের বাড়ী মেদিনীপুর , কিন্তু সে কাজ করে মুম্বাইতে । বছরে এই ঈদের সময় একবারে বাড়ী আসে । গত তিন বছরে মাত্রে তিনবার বাড়ী এসেছে । এবারে একদম একমাস ছুটি নিয়ে এসেছে সে । বউ হাপেজা আর দুই মেয়ে সালমা আর সাজেদাকে নিয়ে দিঘা যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে সে ।
এবারে রহিম নরম সুরে বউকে বলল – “ আরে বোকা মেয়ে , কাঁদছ কেন । এই তো চলে এলাম । আমি জানি তুমি আমকে খুব মিস করো , আমিও তো করি । আসলে সংসার চালানর জন্য মুম্বাইতে গিয়ে পড়ে থাকি । আমারও কি ইচ্ছে হয় তোমাদের ছেড়ে দূরে থাকতে । আসলে উপায় নেই । তবে এবারে ভাবছি এখানেই থেকে কিছু একটা ব্যবসা করবো । মেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করতে হবে । ওদেরও তো ভবিষ্যৎ আছে “।
হাপেজার কান্না কিন্তু বন্ধ হল না । রহিম বলল –“ এবারে ফোন টা রেখে দাও “ আর একটু পরে তো নেমে যাবো ট্রেন থেকে “।
রহিম তার বউ এর সাথে ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল । এমন সময় ১০ – ১২ জন গেরুয়া পোশাক পরা ছেলে ‘ জয় শ্রী রাম” স্লোগান দিতে দিতে তাদের কামরার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো ।
একজন রহিমকে দেখে বলতে লাগলো – “ ঐ বল জয় শ্রী রাম “।
রহিমের দাড়ি আর মাথায় টুপি দেখে তারা বুঝে নিয়েছে যে রহিম মুসলিম ।
রহিম খুব শান্ত স্বরে বলল – “ আমি বার (রোজা ) রেখেছি , এখন আমি বলব না ভাই । তোমারা নিজেরা তো বলছ , তাতেই তোমাদের ভগবান খুশী হবেন । অন্য ধর্মের মানুষকে জোর করে বলালে কি তোমাদের ভগাবান খুশী হবেন “?
রহিমের কথা শুনে গেরুয়া পোশাক পরা ছেলে গুলো এবারে খুব রেগে গেল । রহিম কিছু বুঝার আগেই তার উপরে গেরুয়া বাহিনীর ছেলে গুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মারতে শুরু করলো । রহিমের উপরে লাথি , ঘুসি প্রচণ্ড ভাবে এসে পড়তে লাগলো । একজনকে দশজন মিলে মারছিল । রহিম সাহায্যের জন্য ট্রেন সহযাত্রীদের বলতে লাগলো । কিন্তু কেউ এগিয়ে এল না রহিমকে বাঁচাতে । তার পরিবর্তে কয়েকজন যাত্রী আবার মোবাইল বের করে ভিডিও করতে লাগলো ।
মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে যখন ট্রেন এর মেঝেতে রহিম পড়ে গেল তখন তারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল নীচে ।
------------ সেই দিন রাতেই খড়্গপুর হাসপাতাল থেকে খবর গেল হাপেজার কাছে “ তার স্বামী ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছে “।
এই দুঃসংবাদ পেয়েই হাপেজা তার দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মারুতি ভাড়া করে দ্রুত গিয়ে পৌছায় হাসপাতালে । সেখানে গিয়ে জানতে পারে তার স্বামীকে আই সি ইউ তে রাখা হয়েছে । অবস্থা গুরুতর । এখনও জ্ঞান ফিরে নি ।
হাপেজা বাইরে ৫ বছর আর ৭ বছর বয়সী দুই মেয়েকে নিয়ে বসে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহতালার কাছে দুয়া করতে লাগলো যাতে তার স্বামীর প্রান বেঁচে যায় । মায়ের কান্না দেখে দুই মেয়েও কাঁদতে লাগলো ।
কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চা দুজন কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই হাপেজার । ভোরের বেলা একটা নার্স এসে খবর দিল – “ আপনার স্বামীর জ্ঞান ফিরেছে , আপনাদের দেখতে চাইছে , আপনারা দেখা করতে যেতে পারেন “।
হাপেজা দুই মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে তাদের সঙ্গে নিয়ে রুম এর মধ্যে ঢুকে দেখে রহিম বেডে শুয়ে আছে । পুরো গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা । একটা পা আর একটা হাত ভেঙ্গে গিয়েছে । মাথার অনেকটা ফেটেছে । নাক মুখ আর গায়ে আঘাত এর চিহ্ন পষ্ট ।
ছোট মেয়ে দুটো বাবাকে এই অবস্থায় দেখে কাঁদতে শুরু করে দিল আবার । হাপেজাও কাঁদছিল ।
রহিম খুব কষ্টে তাদের বলল – “ কেঁদো না তোমরা , আল্লার দুয়াতে সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি ভালো হয়ে তোমাদের সঙ্গে গিয়ে থাকবো , আর কোথাও যাবো না ।
ছোট মেয়ে সালমার ভালো ডান হাত টা দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলল – “ মা তোর জন্য পুতুল আনতে পারলাম না রে , কাপড় জামাও না, সব ট্রেনে ব্যগের মধ্যে রয়ে গিয়েছে “।
ছোট মেয়ে সালমা বাবার হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে লাগলো – “ আব্বা , আমি শুধু তোমাকে চাই , পুতুল জামা – কাপড় – এসব কিছুই চাই না , তুমি শুধু ভালো হয়ে যাও “।
মেয়ের কথা শুনে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলো । এই কান্না আরও কত এই রকম নিরপরাধ রহিমের পরিবারকে কাঁদতে হবে তা কেই বা জানে ।