মায়া
লেখা -- তারিফ আলম
খুব খিদে পাচ্ছে ভাই, একটু কিছু খাবার দে, দু দিন না খেয়ে খিদের জ্বালায় মরে যাব’ – কথা গুলো বলতে বলতে অমৃত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
ইয়াকুব বোতলের জল গলায় ঢেলে নিয়ে বন্ধু অমৃতের কাছে এসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল – ‘কাঁদিস না বন্ধু , আমি দেখছি কোথাও কোন খাবার পাই কি না”। এই বলে ইয়াকুব দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল ।
ইয়াকুব রাস্তায় বেরিয়ে দেখল পুলিশ আছে কিনা । খুব ভালই চলছিল , গুজরাটে একটা কাপড়ের কারখানায় ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছিল তারা । তাদের বাড়ি মধ্য প্রদেশে । ইয়াকুব আর অমৃত এর পরিচয় হয় এই কারখানাতে কাজ করতে গিয়ে । একি জেলায় বাড়ি তাদের । দুজনে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকে । কাজ করে যা টাকা ইনকাম করে তা তারা বাড়ীতে নিজেদের পরিবারের কাছে পাঠায় । সব ঠিকই চলছিল , কিন্তু করোনা রোগের কারনে সরকার হটাত করে লকডাউন ঘোষণা করে দেয় সারা ভারতে । ফলে তারা আটকে পড়ে । টাকা পয়সা যা ছিল সব শেষ হয়ে যায় । একদিন খাবার পায় তো অন্য দিন না খেয়ে থাকতে হয় তাদের । বাইরে বেরালেই পুলিশ লাঠি নিয়ে খুব পেটায় । এত বড় বিপদে পড়ে যাবে তা কোনদিন ভাবে নি তারা ।
ইয়াকুব হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে এসেছে । হটাত দেখল কয়েকজন এন জি ও এর লোক পথে বসে থাকা ভিখারিদের খাবারের প্যাকেট দিচ্ছে । ইয়াকুবও সেই ভিখারিদের পাশে গিয়ে বসে পড়ল । কোনদিন যা করে নি তা বন্ধুর জন্য করলো – ভিক্ষা । তার হাতে যখন খাবারের প্যাকেট তুলে দিল তখন ইয়াকুব খাবার নিয়ে দ্রুত রুমের দিকে রওনা দিল । কিন্তু পথে হটাত পুলিশ গাড়ি এসে পড়ল । একজন পুলিশ ইয়াকুবকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো সে রুম থেকে বেরিয়েছে কেন ?
ইয়াকুব বলল খাবারের জন্য । তারপর তার নাম ইয়াকুব জানার পরই পুলিশ বলে উঠল- শালা মুসলমান , এখানে করোনা ছাড়াতে এসেছিস – এই বলে লাঠি দিয়ে জোরে জোরে পিটতে লাগলো । মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় দিল ইয়াকুব । তাদের রুমে এসে পৌঁছে দরজা লাগিয়ে দিয়ে হাতে ধরে থাকা রুটি তুলে দিল বন্ধু অমৃত এর হাতে । অমৃত রুটি গুলো নিয়ে দ্রুত খেতে লাগলো । দু দিন না খেয়ে আছে । ইয়াকুব পাশে বসে বন্ধুর খাওয়া দেখছিল ।
রাতে খোঁজ পেল অমৃত - একটা ট্রাক মধ্য প্রদেশ তাদের জেলাতে যাবে । তবে ৪০০০ টাকা করে ভাড়া নেবে । কিন্তু তাদের কাছে তো কোন টাকা নেই । যা ছিল সবই তো শেষ হয়ে গিয়েছে । অমৃত ইয়াকুবকে বলে “বন্ধু আমি বাড়ি যাব , তুই যে কোন একটা ব্যবস্থা কর”।
ইয়াকুব বোনের বিয়ের জন্য সোনার কানের দুল বানিয়েছিল । সেটাই সে ট্রাক মালিককে দিয়ে বলল যে তাদের দুজনকে যেন নিয়ে গিয়ে তাদের বাড়ীতে ছেড়ে দেয় । ট্রাক মালিক রাজি হয়ে গেল । সেই ট্রাকে ৫০ এর মত পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে ট্রাক ছেড়ে দিল । ইয়াকুব ও অমৃত সেই ভিড়ে কোন রকম গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিল । দু দিন ধরে ট্রাক চলছে । ট্রাকের মধ্যেই কয়েকটা রুটি খেয়ে আছে তারা । রাতের দিকে হটাত ইয়াকুব বন্ধু অমৃতের গায়ে হাত দিয়ে দেখল অনেক জ্বর । সকালের দিকে জ্বর আরও বেড়ে গেল । অমৃত বমি করতে লাগলো ।
ট্রাকের অন্য শ্রমিকরা ট্রাক মালিককে বলল যে – এর মনে হয় করোনা হয়েছে । একে ট্রাক থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক ।
তাদের কথা শুনে ইয়াকুব মিনতি করতে লাগলো যাতে তার বন্ধুকে কোন একটা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেয় । মাঝ রাস্তায় যেন না নামায় ।
কিন্তু তার কোন কথা না শুনে জোর করে অমৃতকে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিল । অসুস্থ বন্ধুকে একা ফেলে কি ভাবে সে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরে যাবে । অমৃতের দিকে চেয়ে খুব মায়া হল ইয়াকুবের । সেও লাফ দিয়ে নেমে পড়লো ট্রাক থেকে ।
ট্রাক চলে গেল । বন্ধু অমৃতের হাত ধরে প্রখর রোদে ইয়াকুব হাই রোড দিয়ে হাঁটতে লাগলো । কিন্তু অসুস্থ অমৃত বেশি দূর হাঁটতে পারলো না । পড়ে গেল মাটিতে । সঙ্গে সঙ্গে ইয়াকুব বন্ধু অমৃতের মাথা নিজের কোলে তুলে নিল । অমৃতের গা জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে । ইয়াকুব ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে নিজের রুমাল সেই জলে ভিজিয়ে অমিতের কপালে জলের পট্টি দিতে লাগলো যাতে জ্বর কমে যায় ।
' অমিত খুব কষ্টে দু চোখ মেলে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো - ' বন্ধু আমি মরতে চাই না রে । বাড়ীতে মা আমার জন্য ভাত তরকারি রান্না করে নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন । আমাকে ঘর যেতেই হবে । কতদিন পেট পুরে ভাত খাই নি । আমি বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে ভাত খেতে চাই , আমি মরতে চাই না বন্ধু ...মরতে চাই না ......" ।
ইয়াকুব বন্ধু অমৃতকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে --- " মরতে দেব না তোকে বন্ধু , বাড়ি ফিরবো আমরা "।
ইয়াকুব রাস্তায় পথ চলতি মানুষের কাছে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে লাগলো যাতে করে তার বন্ধুকে কেউ হাসপাতাল পৌঁছে দেয় । কিন্তু কেউ সাহায্য করলো না । অমৃত তার প্রিয় বন্ধু ইয়াকুবের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো চিরদিনের মত । ইয়াকুব নিজের বন্ধুর নিথর দেহ কোলে নিয়ে রাস্তার পাশে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো । তার কান্নার আওয়াজ এ সি রুমে বসে নীতি নির্ধারণকারি নেতা মন্ত্রীরা যারা হিন্দু - মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দাঙ্গা লাগাতে ব্যস্ত - তাদের কানে পৌঁছাবে কি ?