মায়া

3rd April 2021 8:58 pm তারিফ আলম
মায়া


মায়া

লেখা -- তারিফ আলম

খুব খিদে পাচ্ছে ভাই, একটু কিছু খাবার দে, দু দিন না খেয়ে খিদের জ্বালায় মরে যাব’ – কথা গুলো বলতে বলতে অমৃত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

ইয়াকুব বোতলের জল গলায় ঢেলে নিয়ে বন্ধু অমৃতের কাছে এসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল – ‘কাঁদিস না বন্ধু , আমি দেখছি কোথাও কোন খাবার পাই কি না”। এই বলে ইয়াকুব দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল ।

ইয়াকুব রাস্তায় বেরিয়ে দেখল পুলিশ আছে কিনা । খুব ভালই চলছিল , গুজরাটে একটা কাপড়ের কারখানায় ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছিল তারা । তাদের বাড়ি মধ্য প্রদেশে । ইয়াকুব আর অমৃত এর পরিচয় হয় এই কারখানাতে কাজ করতে গিয়ে । একি জেলায় বাড়ি তাদের । দুজনে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকে । কাজ করে যা টাকা ইনকাম করে তা তারা বাড়ীতে নিজেদের পরিবারের কাছে পাঠায় । সব ঠিকই চলছিল , কিন্তু করোনা রোগের কারনে সরকার হটাত করে লকডাউন ঘোষণা করে দেয় সারা ভারতে । ফলে তারা আটকে পড়ে । টাকা পয়সা যা ছিল সব শেষ হয়ে যায় । একদিন খাবার পায় তো অন্য দিন না খেয়ে থাকতে হয় তাদের । বাইরে বেরালেই পুলিশ লাঠি নিয়ে খুব পেটায় । এত বড় বিপদে পড়ে যাবে তা কোনদিন ভাবে নি তারা ।

ইয়াকুব হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে এসেছে । হটাত দেখল কয়েকজন এন জি ও এর লোক পথে বসে থাকা ভিখারিদের খাবারের প্যাকেট দিচ্ছে । ইয়াকুবও সেই ভিখারিদের পাশে গিয়ে বসে পড়ল । কোনদিন যা করে নি তা বন্ধুর জন্য করলো – ভিক্ষা । তার হাতে যখন খাবারের প্যাকেট তুলে দিল তখন ইয়াকুব খাবার নিয়ে দ্রুত রুমের দিকে রওনা দিল । কিন্তু পথে হটাত পুলিশ গাড়ি এসে পড়ল । একজন পুলিশ ইয়াকুবকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো সে রুম থেকে বেরিয়েছে কেন ?

ইয়াকুব বলল খাবারের জন্য । তারপর তার নাম ইয়াকুব জানার পরই পুলিশ বলে উঠল- শালা মুসলমান , এখানে করোনা ছাড়াতে এসেছিস – এই বলে লাঠি দিয়ে জোরে জোরে পিটতে লাগলো । মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় দিল ইয়াকুব । তাদের রুমে এসে পৌঁছে দরজা লাগিয়ে দিয়ে হাতে ধরে থাকা রুটি তুলে দিল বন্ধু অমৃত এর হাতে । অমৃত রুটি গুলো নিয়ে দ্রুত খেতে লাগলো । দু দিন না খেয়ে আছে । ইয়াকুব পাশে বসে বন্ধুর খাওয়া দেখছিল ।

রাতে খোঁজ পেল অমৃত - একটা ট্রাক মধ্য প্রদেশ তাদের জেলাতে যাবে । তবে ৪০০০ টাকা করে ভাড়া নেবে । কিন্তু তাদের কাছে তো কোন টাকা নেই । যা ছিল সবই তো শেষ হয়ে গিয়েছে । অমৃত ইয়াকুবকে বলে “বন্ধু আমি বাড়ি যাব , তুই যে কোন একটা ব্যবস্থা কর”।

ইয়াকুব বোনের বিয়ের জন্য সোনার কানের দুল বানিয়েছিল । সেটাই সে ট্রাক মালিককে দিয়ে বলল যে তাদের দুজনকে যেন নিয়ে গিয়ে তাদের বাড়ীতে ছেড়ে দেয় । ট্রাক মালিক রাজি হয়ে গেল । সেই ট্রাকে ৫০ এর মত পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে ট্রাক ছেড়ে দিল । ইয়াকুব ও অমৃত সেই ভিড়ে কোন রকম গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিল । দু দিন ধরে ট্রাক চলছে । ট্রাকের মধ্যেই কয়েকটা রুটি খেয়ে আছে তারা । রাতের দিকে হটাত ইয়াকুব বন্ধু অমৃতের গায়ে হাত দিয়ে দেখল অনেক জ্বর । সকালের দিকে জ্বর আরও বেড়ে গেল । অমৃত বমি করতে লাগলো ।

ট্রাকের অন্য শ্রমিকরা ট্রাক মালিককে বলল যে – এর মনে হয় করোনা হয়েছে । একে ট্রাক থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক ।

তাদের কথা শুনে ইয়াকুব মিনতি করতে লাগলো যাতে তার বন্ধুকে কোন একটা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেয় । মাঝ রাস্তায় যেন না নামায় ।

কিন্তু তার কোন কথা না শুনে জোর করে অমৃতকে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিল । অসুস্থ বন্ধুকে একা ফেলে কি ভাবে সে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরে যাবে । অমৃতের দিকে চেয়ে খুব মায়া হল ইয়াকুবের । সেও লাফ দিয়ে নেমে পড়লো ট্রাক থেকে ।

ট্রাক চলে গেল । বন্ধু অমৃতের হাত ধরে প্রখর রোদে ইয়াকুব হাই রোড দিয়ে হাঁটতে লাগলো । কিন্তু অসুস্থ অমৃত বেশি দূর হাঁটতে পারলো না । পড়ে গেল মাটিতে । সঙ্গে সঙ্গে ইয়াকুব বন্ধু অমৃতের মাথা নিজের কোলে তুলে নিল । অমৃতের গা জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে । ইয়াকুব ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে নিজের রুমাল সেই জলে ভিজিয়ে অমিতের কপালে জলের পট্টি দিতে লাগলো যাতে জ্বর কমে যায় ।

' অমিত খুব কষ্টে দু চোখ মেলে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো - ' বন্ধু আমি মরতে চাই না রে । বাড়ীতে মা আমার জন্য ভাত তরকারি রান্না করে নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন । আমাকে ঘর যেতেই হবে । কতদিন পেট পুরে ভাত খাই নি । আমি বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে ভাত খেতে চাই , আমি মরতে চাই না বন্ধু ...মরতে চাই না ......"

ইয়াকুব বন্ধু অমৃতকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে --- " মরতে দেব না তোকে বন্ধু , বাড়ি ফিরবো আমরা "

ইয়াকুব রাস্তায় পথ চলতি মানুষের কাছে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে লাগলো যাতে করে তার বন্ধুকে কেউ হাসপাতাল পৌঁছে দেয় । কিন্তু কেউ সাহায্য করলো না । অমৃত তার প্রিয় বন্ধু ইয়াকুবের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো চিরদিনের মত । ইয়াকুব নিজের বন্ধুর নিথর দেহ কোলে নিয়ে রাস্তার পাশে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো । তার কান্নার আওয়াজ এ সি রুমে বসে নীতি নির্ধারণকারি নেতা মন্ত্রীরা যারা হিন্দু - মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দাঙ্গা লাগাতে ব্যস্ত - তাদের কানে পৌঁছাবে কি ?

 





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?