বাঁকা পথ
লেখা – তারিফ আলম
রঘু হন্তদন্ত হয় ছুটে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলো = “ সর্দার পুলিশ এর লোক আসছে , সবাই সাবধান “।
সর্দার রঞ্জিত সিং একটু ঘাবড়ে গিয়ে নিজের নিজের বন্দুক টা নিয়ে সবাইকে রেডি থাকতে বলল । নিজেও একটা বন্দুক নিয়ে লুকিয়ে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে গাছের আড়ালে ।
রঘু খুব ধীর গলায় সর্দারকে ডেকে আঙুল দেখিয়ে বলতে লাগলো , “ ঐ যে ছেলেটা পিঠে ব্যাগ নিয়ে এ দিকেই আসছে “।
রঞ্জিত দেখল একটা ৩০ -৩২ বয়সী ছেলে জঙ্গলের মধ্যে সরু পথ দিয়ে এগিয়ে আসছে । সামনে আসতেই রঞ্জিত আর তার দলবল সবাই বন্দুক নিয়ে ঘিরে ধরল ।
সর্দার রঞ্জিত গলা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ তুই পুলিশের লোক , আমাদের ধরাতে এসেছিস । জানিস এর সাজা কি” ?
ছেলেটি সর্দার এর কথায় একদম ভয় না পেয়ে বলতে লাগলো , “ আমি পুলিশের লোক না । আর আপনাদের সাথেও আমার কোন শত্রুতা নেই “।
“ তাহলে তুই এই জঙ্গলের মধ্যে কি করতে এসেছিস “?
এবার ছেলেটি মুখে হাত ঢেকে কাঁদতে লাগলো আর বলল , “ আমি মরতে এসেছি । প্লীজ আমাকে গুলি করে মেরে দেন । আমি আর বাঁচতে চাই না “।
এমন কথা শুনে সকলে তো অবাক । সর্দার আদেশ দিলেন একজন কে ছেলেটির ব্যাগ এ কি আছে খুলে দেখতে বন্দুক বা বোমা আছে কি না ।
একজন ব্যাগ খুলে দেখে বলতে লাগলো , ‘ সর্দার , ব্যাগে এ কিছু বই আর অনেক ডিগ্রির সার্টিফিকেট ছাড়া আর তো কিছুই নেই “।
এবার সর্দার ছেলেটিকে কান্না থামাতে বলল আর জিজ্ঞাসা করলো সে কেন মরতে চায় ?
ছেলেটি কান্না থামিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলো , “ আমার নাম সুজয় । আমি খুব সাধারন বাড়ীর ছেলে । অনেক কষ্ট করে এম এ , তারপর বি এড পাশ করি । ইচ্ছা ছিল স্কুল এর শিক্ষক হওয়ার । কিন্তু ৬ বছর ধরে একটা এস এস সি পরীক্ষা হল মাত্র , বয়স ২৬ থেকে একদম ৩৩ হয়ে গেল । শুনেছি আগে প্রতি বছর এস এস সি হত । একবার পরীক্ষা ভালো না হলে তার পরের বছর দ্বিতীয় বার দিয়ে চাকরি পাওয়া যেত । কিন্তু এই আমদের এই মুল্যবান সময়ের মুল্য সরকার বুঝল না । তাই আমার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই । আমি মরতে চাই । কিন্তু শুনেছি আত্মহত্যা মহা পাপা । মরার পর স্বর্গে কোনদিনও স্থান পাওয়া যাবে না । তাই আমি এই জঙ্গলে এসেছি , আপনারা আমাকে গুলি করে মেরে দেন দয়া করে “।
সুজয় এর কথা গুলো শুনে সর্দার এর মন গলে গেল । সুজয় এর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল ,” ভাই কাঁদিস না , আমরা জঙ্গি হতে পারি , কিন্তু বিনা দোষে কাউকে মারি না , আমাদের লড়াই সরকার এর বিরুদ্ধে আর তার পুলিশ এর বিরুদ্ধে , সাধারন জনগনের বিরুদ্ধে নয় । তুই চল আমাদের সঙ্গে থাকবি “।
সুজয় সর্দার এর কথা মতো ওদের সঙ্গে থাকতে লাগলো । সুজয় মুলত রান্নার কাজে করতে লাগলো । আর অবসর সময় বই নিয়ে পড়ত । একবার জঙ্গিরা ল্যান্ডমাইন্ড বিস্ফোরণ ঘটাল । ফলে পুলিশ তাদের খুঁজতে লাগলো । সর্দার রঞ্জিত ভিডিও এর মাধ্যমে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিত সংবাদ মাধ্যম গুলোর অফিসে । সুজয়ও তাদের সাথে মুখ খুলে ভিডিও তুলে সংবাদ মাধ্যমের অফিসে পাঠিয়ে দিল । প্রচার হয়ে গেল জঙ্গি হিসাবে সুজয় এর নাম ।
কয়েকদিন পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রঘু দেখে যে , সুজয় নেই , আর তার ব্যাগও নেই । সর্দার কে এসে জানায় । সর্দার বনের মধ্যে সকলকে খুঁজে দেখতে বলে । কিন্তু তন্ন তন্ন করে কোথাও খুঁজে তাকে পাওয়া গেল না । তখন সর্দার বললেন , দ্রুত ডেরা পরিবর্তন করে অন্য স্থানে চলে যেতে ।
কয়েকদিন পর রঘু মোবাইল এর ফেসবুক নিউজ এ দেখতে পায় সুজয় এর ছবি । দ্রুত সর্দারকে এসে দেখায় সে । সর্দার জোরে জোরে নিউজ পড়তে থাকে ...”জঙ্গি সুজয় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করায় সরকার থেকে থাকে চাকরি দেওয়া হল” ।
রঘু শুনে বলে , “ এই জন্য শিক্ষিত ছেলেদের বিশ্বাস করতে নেই , শালা চাকরি আদায় করার জন্য আমাদের আর সরকারকে ভালোই বোকা বানাল “।
সর্দার একটু চিন্তা করে নিয়ে বলতে লাগলো , “ তাহলে আমরাই বা এই জঙ্গলে পড়ে পড়ে আর মরবো কেন ? চল আমরাও তাহলে চাকরি করবো যাই “।
..............................সমাপ্ত ..............................