বাঁকা পথ --- তারিফ আলম

3rd April 2021 9:05 pm তারিফ আলম
বাঁকা পথ --- তারিফ আলম


বাঁকা পথ

লেখা – তারিফ আলম

রঘু হন্তদন্ত হয় ছুটে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলো = “ সর্দার পুলিশ এর লোক আসছে , সবাই সাবধান “।
সর্দার রঞ্জিত সিং একটু ঘাবড়ে গিয়ে নিজের নিজের বন্দুক টা নিয়ে সবাইকে রেডি থাকতে বলল । নিজেও একটা বন্দুক নিয়ে লুকিয়ে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে গাছের আড়ালে ।
রঘু খুব ধীর গলায় সর্দারকে ডেকে আঙুল দেখিয়ে বলতে লাগলো , “ ঐ যে ছেলেটা পিঠে ব্যাগ নিয়ে এ দিকেই আসছে “।
রঞ্জিত দেখল একটা ৩০ -৩২ বয়সী ছেলে জঙ্গলের মধ্যে সরু পথ দিয়ে এগিয়ে আসছে । সামনে আসতেই রঞ্জিত আর তার দলবল সবাই বন্দুক নিয়ে ঘিরে ধরল ।
সর্দার রঞ্জিত গলা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ তুই পুলিশের লোক , আমাদের ধরাতে এসেছিস । জানিস এর সাজা কি” ?
ছেলেটি সর্দার এর কথায় একদম ভয় না পেয়ে বলতে লাগলো , “ আমি পুলিশের লোক না । আর আপনাদের সাথেও আমার কোন শত্রুতা নেই “।
“ তাহলে তুই এই জঙ্গলের মধ্যে কি করতে এসেছিস “?
এবার ছেলেটি মুখে হাত ঢেকে কাঁদতে লাগলো আর বলল , “ আমি মরতে এসেছি । প্লীজ আমাকে গুলি করে মেরে দেন । আমি আর বাঁচতে চাই না “।
এমন কথা শুনে সকলে তো অবাক । সর্দার আদেশ দিলেন একজন কে ছেলেটির ব্যাগ এ কি আছে খুলে দেখতে বন্দুক বা বোমা আছে কি না ।
একজন ব্যাগ খুলে দেখে বলতে লাগলো , ‘ সর্দার , ব্যাগে এ কিছু বই আর অনেক ডিগ্রির সার্টিফিকেট ছাড়া আর তো কিছুই নেই “।
এবার সর্দার ছেলেটিকে কান্না থামাতে বলল আর জিজ্ঞাসা করলো সে কেন মরতে চায় ?
ছেলেটি কান্না থামিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলো , “ আমার নাম সুজয় । আমি খুব সাধারন বাড়ীর ছেলে । অনেক কষ্ট করে এম এ , তারপর বি এড পাশ করি । ইচ্ছা ছিল স্কুল এর শিক্ষক হওয়ার । কিন্তু ৬ বছর ধরে একটা এস এস সি পরীক্ষা হল মাত্র , বয়স ২৬ থেকে একদম ৩৩ হয়ে গেল । শুনেছি আগে প্রতি বছর এস এস সি হত । একবার পরীক্ষা ভালো না হলে তার পরের বছর দ্বিতীয় বার দিয়ে চাকরি পাওয়া যেত । কিন্তু এই আমদের এই মুল্যবান সময়ের মুল্য সরকার বুঝল না । তাই আমার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই । আমি মরতে চাই । কিন্তু শুনেছি আত্মহত্যা মহা পাপা । মরার পর স্বর্গে কোনদিনও স্থান পাওয়া যাবে না । তাই আমি এই জঙ্গলে এসেছি , আপনারা আমাকে গুলি করে মেরে দেন দয়া করে “।
সুজয় এর কথা গুলো শুনে সর্দার এর মন গলে গেল । সুজয় এর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল ,” ভাই কাঁদিস না , আমরা জঙ্গি হতে পারি , কিন্তু বিনা দোষে কাউকে মারি না , আমাদের লড়াই সরকার এর বিরুদ্ধে আর তার পুলিশ এর বিরুদ্ধে , সাধারন জনগনের বিরুদ্ধে নয় । তুই চল আমাদের সঙ্গে থাকবি “।
সুজয় সর্দার এর কথা মতো ওদের সঙ্গে থাকতে লাগলো । সুজয় মুলত রান্নার কাজে করতে লাগলো । আর অবসর সময় বই নিয়ে পড়ত । একবার জঙ্গিরা ল্যান্ডমাইন্ড বিস্ফোরণ ঘটাল । ফলে পুলিশ তাদের খুঁজতে লাগলো । সর্দার রঞ্জিত ভিডিও এর মাধ্যমে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিত সংবাদ মাধ্যম গুলোর অফিসে । সুজয়ও তাদের সাথে মুখ খুলে ভিডিও তুলে সংবাদ মাধ্যমের অফিসে পাঠিয়ে দিল । প্রচার হয়ে গেল জঙ্গি হিসাবে সুজয় এর নাম ।
কয়েকদিন পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রঘু দেখে যে , সুজয় নেই , আর তার ব্যাগও নেই । সর্দার কে এসে জানায় । সর্দার বনের মধ্যে সকলকে খুঁজে দেখতে বলে । কিন্তু তন্ন তন্ন করে কোথাও খুঁজে তাকে পাওয়া গেল না । তখন সর্দার বললেন , দ্রুত ডেরা পরিবর্তন করে অন্য স্থানে চলে যেতে ।

কয়েকদিন পর রঘু মোবাইল এর ফেসবুক নিউজ এ দেখতে পায় সুজয় এর ছবি । দ্রুত সর্দারকে এসে দেখায় সে । সর্দার জোরে জোরে নিউজ পড়তে থাকে ...”জঙ্গি সুজয় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করায় সরকার থেকে থাকে চাকরি দেওয়া হল” ।
রঘু শুনে বলে , “ এই জন্য শিক্ষিত ছেলেদের বিশ্বাস করতে নেই , শালা চাকরি আদায় করার জন্য আমাদের আর সরকারকে ভালোই বোকা বানাল “।
সর্দার একটু চিন্তা করে নিয়ে বলতে লাগলো , “ তাহলে আমরাই বা এই জঙ্গলে পড়ে পড়ে আর মরবো কেন ? চল আমরাও তাহলে চাকরি করবো যাই “।

..............................সমাপ্ত ..............................





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?