গল্প - অপরাধী , লেখা - তারিফ আলম

13th June 2021 8:20 pm তারিফ আলম
গল্প - অপরাধী , লেখা - তারিফ আলম


"আমি খুন করি নি জজ সাহেব , আমি তো তাপসিকে খুব ভালবাসতাম , আমি কেন নিজের বিবাহিত বউ কে খুন করবো " ?- আদালতে দাঁড়িয়েই কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলতে লাগলো বছর ২৫ এর যুবক বাদল মণ্ডল ।

সেই করুন কান্নার আওয়াজ জজ সাহেবের কানে কতটা গেল জানা নেই , কিন্তু আদালতে উপস্থিত বাদল এর মা রিনা দেবীর হৃদয়ে প্রবেশ করে হৃদয়কে ছিন্ন – বিচ্ছিন্ন করে দিল । তিনি থাকতে না পেরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন ," আমার ছেলে খুব সরল সাদাসিধে , কোন দিন একটা কুকুরকেও আঘাত করে নি , মানুষ কি করে মারবে বলুন । আমার ছেলে খুন করতে পারে না জজ সাহেব" ।

যা বলার কাঠগড়ায় এসে বলুন । রিনা দেবী কাঠগড়ায় উঠে বলতে লাগলেন – "আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি অনেক কষ্টে লোকের বাড়ীতে ঝি এর কাজ করে ছেলেকে মানুষ করি । পয়সার অভাবে বেশী দূর পড়া লেখা করাতে পারি নি । ছেলে আমার খুব সরল , সে রাজমিস্ত্রির কাজ করে । গ্রামের সকল মানুষকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন" ।

একটু থেমে চোখের জল মুছে নিয়ে রিনা দেবী আবার বলতে লাগলেন - "তিন মাস আগে পাশের গ্রামের অলক বাবুর মেয়ে তাপসি এর সাথে আমার ছেলের বিয়ে দি । দুজনের খুব মিল ছিল । এই তিন মাসে একবারও তাদের ঝগড়া করতে দেখি নি । আমারও বউমা খুব সেবা করতো । কিন্তু ৫ দিন পূর্বে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বউমা বাড়ীতে নেই । ছেলে আর আমি অনেক খোঁজা – খুঁজি করলাম । তার বাপের বাড়ীতে ফোন করে জানলাম , কিন্তু সে ওখানেও যায় নি । তারপর থানায় রিপোর্ট করেছিলাম বউমা নিখোঁজ বলে "।

এবার উকিল , হেসে বললেন - " জজ সাহেব , মা আর ছেলে নাটক কিন্তু ভালো করতে পারে । এরা আসলে পন এর লোভে তাপসিকে খুন করে দেহ কোথাও লুকিয়ে দিয়েছে । যে দিন তাপসি নিখোঁজ হয় তার ঠিক তিন দিন আগে বাপের বাড়ীতে একা আসে তাপসি এবং সে বলে যে তার ৩০ হাজার টাকার খুব প্রয়োজন । অলক বাবু জানতে চেয়েছিলেন এত টাকা কি হবে ? তখন তাপসি বলেছিল যে , টাকা না নিয়ে গেলে তার স্বামী তাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না , আর অত্যাচার করবে । তাই শুনে ভয়ে অলক বাবু টাকা টা দিয়ে দিয়েছিলেন "।

জজ সাহেব সব শুনে ১৪ দিনের জন্য বাদল মণ্ডলকে পুলিশ হেপাজতে রাখার নির্দেশ দিলেন উপযুক্ত প্রমান ও স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ।

এর চার দিন পর পাশের গ্রামের মাঠের ধারে একটা পরিতক্ত কুয়ো থেকে এক যুবতীর পচা লাশ পাওয়া যায় । চেহারা এমন ভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তাকে চেনার উপায় ছিল না । পুলিশ লাশ টা উদ্ধার করে তাপসির বাব – মা কে দেখায় । তারা সনাক্ত করে যে এটাই তাদের মেয়ে তাপসি । পনের লোভে খুন করেছে তার জামাই ।

বাদলকে যখন লাশ টা দেখান হল , বাদল খুব আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলল , "এ আমার বউ তাপসি নয় , অন্য কেউ । আর আমি বিয়েতে পনও নেই নি এবং ৩০ হাজার টাকা আনার জন্য তাপসিকে কোন দিনও বলিনি । তাছাড়া তাপসি যখন যা চাইতো আমি রাজমিস্ত্রি কাজ করে টাকা ইনকাম করে তাকে এনে দিয়েছি । এক মাস আগে একটা সোনার হার বানানোর জন্য বায়না ধরে । আমি অভার টাইম কাজ করে অনেক কষ্টে ২০ হাজার টাকা রোজগার করে এনে যে দিন নিখোঁজ হয় তার ঠিক ২ দিন আগে তার হতে দিয়েছিলাম । আমি তো আমার বউ কে খুব ভালবাসতাম । তার গায়ে কোন দিন হাত তুলি নি , খুন কি করে করবো ? আমি খুন করি নি" ।

কিন্তু পুলিশের অফিসাররা মূর্খ সহজ সরল ছেলের কথায় কান দিলেন না । স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য চলল টর্চার । বরফের উপরে বাদল কে শুইয়ে , আবার কখনও উল্টা লোটকে লাঠি দিয়ে করা হতে লাগলো প্রচণ্ড প্রহার । যাকে বলে থার্ড ডিগ্রি । বাদল যন্ত্রণায় কষ্টে চিৎকার করতে লাগলো – আর মেরো না গো ,আমি কোন দোষ করি নি গো, মা গো এরা আমাকে মেরে ফেলল গো ।

কিন্তু তার এই বুকফাটা কান্নার আওয়াজ জেলের চার দেওয়ালে বার বার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছিল । কেউ শুনতে পেল না ।

১৪ দিন পর আদালতে পুলিশ জানাল যে , বাদল মণ্ডল তার দোষ সব স্বীকার করে নিয়েছে । সেই তার স্ত্রী তাপসি কে হত্যা করে গ্রামের বাইরে পরিতক্ত কুয়োতে লাশ টা ফেলে দিয়ে এসেছিল ।

সব প্রমান দেখে জজ সাহেব বাদল মণ্ডলের যাবজ্জীবন সাজা শোনাল । যখন পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে বাদলকে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন বাদল দেখল যে এক পাশে তার বুড়ি মা বসে তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে । বাদল পাশে গিয়ে বলল , "মা তুমি জানো , আমি নিরপরাধী । কিন্তু পুলিশ আমাকে অনেক মেরেছে , আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না তাদের অত্যাচার । তাই স্বীকার করে নিয়েছি" ।

রিনা দেবী কোন কথা বলছিলেন না , মনে হয় কান্নার চেষ্টা করছিলেন , কিন্তু কাঁদতে পারছিলেন না । চোখ দুটো যেন পাথর হয়ে গিয়েছে ।

বাদল মা এর এই অবস্থা এর আগে দেখে নি কোন দিনও । খুব ভয় পেয়ে গেল সে ।

বাদল নিজে কাঁদতে কাঁদতে মা এর গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে বলে ......মা তুমি কাঁদছ না কেন মা । কাঁদো মা । জোরে জোরে কাঁদো । তোমার ছেলে খুনি মা । মা কাঁদো ...

সেই সময় দু জন পুলিশ বাদলকে ধরে ন টেনে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো । বাদল পুলিশদের পা ধরতে লাগলো । আমার মা দুঃখে কষ্টে কাঁদতে পারছে না । একটু কাঁদলেই আমি চলে যাবো । মা মা মা......তুমি কাঁদো , কাঁদো মা ......

কিন্তু পুলিশ বাদলের কোন কথা শুনল না । টেনে – হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলল । গাড়ি ছেড়ে দিল ।

**************** পাঁচ বছর পর *******************

ঈদের বাজারটা সব সময় করিম চাচা কলকাতার বড়বাজার থেকেই করেন । আর মাত্র তিন দিন পর ঈদ । কেনাকাটা শেষ করে গলিপথ ধরে দ্রুত হাঁটা দিলেন । বার মাস চলছে । তাই সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি ।

একটা গলির কাছে এসেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন । একটি বউ তার কোলে বাচ্চা আছে , সঙ্গে এক পুরুষ এর সাথে তাঁর পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল । বউটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে । একটু ভালো করে লক্ষ্য করতেই অবাক হয়ে গেলেন – আরে এত তাদেরই গ্রামের ছেলে বাদল মণ্ডলের বউ তাপসি । কিন্তু বাদল তো এই তাপসি কে খুন করার দায়ে জেল খাটছে । হায় রে কপাল ...

করিম চাচা পিছু নিলেন ওদের । একটু পরেই তারা একটা বাড়ীতে প্রবেশ করল । করিম চাচা জায়গাটা ভালো করে দেখে নিয়ে হাঁটা দিলেন হাওড়া স্টেশন এর দিকে । নিরপরাধ সরল ছেলেটাকে আর জেলে পচতে দেওয়া যাবে না ...কিছু একটা করতেই হবে ।

গ্রামে পৌঁছে সোজা থানাতে গেলেন । পুলিশ এর কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন , আর তাপসির বাড়ী দেখে এসেছেন এবং তিনি সেটা পুলিশ কে দেখিয়ে দেবেন বললেন ।

সব শুনে একজন পুলিশ বলল , চাচা আপনার বয়স হয়েছে । চোখে কম দেখছেন । মরা মানুষ কোনদিন জিন্দা হয় নাকি । যান আগে নিজের চোখ কোন ডাক্তারকে দেখান ।

করিম চাচা হাত জড় করে বলতে লাগলেন , আমি মিথ্যা বলছিনা বাবু । আর আমার বয়স ৬২ হলেও চোখ ভালই আছে আল্লাহতালাহর রহমতে ।

থানার বড়বাবু একটু দূরে বসে সব শুনছিলেন । তিনি করিম চাচা কে পাশে ডেকে বললেন ," আদালতে সে অপরাধী প্রমানিত হয়েছে । এখন তো ৫ বছর সাজা হয়েই গেল । আর চাচা আপনার বাদল মণ্ডল কে হয় শুনি । সে তো আপনার আত্মীয়ও নয় বা জাতির লোকও নয় । তাহলে আপনি এত ঝামেলায় পড়ছেন কেন" ?

করিম চাচা খুব নম্র ভাবে বললেন ," আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার । বাদল আমার কোন আত্মীয় বা জাতির লোক নয় , কিন্তু আমিও মানুষ আর সেও মানুষ , আমাদের মানবতার সম্পর্ক আছে , সেও দরিদ্র আর আমিও দরিদ্র – আমাদের মধ্যে দারিদ্রতার সম্পর্ক আছে । তাই ঐ সরল ছেলেটাকে জেলে পচতে দিতে মন সায় দেয় না । তাই আপনাদের কাছে ছুটে এসেছি" ।

মূর্খ করিম চাচার কথা শুনে থানার বড়বাবু একদম চুপ হয়ে গেলেন । আর দেরি না করে খোঁজ খবর শুরু কর দিলেন তাপসির ।

******* সকালে জেলার সাহেব এসেই এক পুলিশ কর্মীকে বললেন , দ্রুত গিয়ে ৩২৭ নাম্বার কয়দিকে ডেকে আনতে । পুলিশ কর্মী গিয়ে ডেকে আনল । মুখ দাড়ি মাথায় বড় বড় চুল , খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোন রকমে জেলার সাহেব এর রুমে এসে নমস্কার করে দাঁড়ালো । পুলিশ মেরে তার পা টা এমন ভেঙ্গে দিল যে , এখন আর ঠিক ভাবে চলতে পারে না সে ।

জেলার পাশে এসে কয়দি বাদল মণ্ডলের কাঁধে হাত রেখে বললেন , "তুমি ছাড়া পেয়ে গিয়েছ "।

বাদল এর বিশ্বাস হল না , শরীর টা কয়েক দিন থেকে খুব খারাপ । তবুও সারাদিন জেলে পাথর ভাঙতে হয় । একটু বসলেই পুলিশের লাঠি খেতে হয় ।

জেলার অসিম বাবু বুজতে পেরে বললেন , সত্যি বলছি , এই দেখ কোর্ট এর নির্দেশ । তুমি তোমার বউ তাপসিকে খুন করো নি । সে নিজেই তার পুরনো প্রমিক এর সাথে পালিয়ে যায় কলকাতা । সেখানেই বিয়ে করে সংসার করছে সুখে । তুমি নিরপরাধ , তোমাকে সাজা দেওয়ার জন্য আদালত দুঃখিত ।

কথা গুলো শুনে এবার কেঁদে ফেলে বাদল । তাপসি এমন কেন করল , সে একবার যদি বলত যে সে তার আগের প্রেমিকের কাছে যেতে চায় – তাহলে বাধা দিত না । বিনা দোষে দীর্ঘ ৫ বছর তাকে নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হল । তার সুখের সংসার টা পুরো নষ্ট হয়ে গেল ।

মা এখন কি করছে , কেমন আছে , এই পাঁচ বছরে একবারও দেখা করতে আসে নি । হাত দিয়ে চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে জেল থেকে বেরিয়ে এল । বাইরে মেঘ করেছে । বৃষ্টিও হচ্ছে ঝিরঝির করে । বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ । ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর । কোন বাধাই আজ বাদলকে আটকাতে পারবে না । সে গ্রামে তার মায়ের কাছে যাবে । মা হয়ত তাকে খুনি ভেবে আর তার মুখ দেখতে চায় না । তাই জেলে পাঁচ বছরে একদিনও দেখা করতে আসে নি । আজ সে মাকে গিয়ে মায়ের পা ধরে চিৎকার করে বলবে ... মা ...তোমার ছেলে খুনি নয় ......কাউকে খুন করেনি সে ...মা তোমার ছেলে নিরপরাধ ......এবার তুমি কাঁদো মা ...মন ভরে কাঁদো ...।

********* দু দিন ধরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে । আসন্দা গ্রামের দরিদ্র মানুষ দের মাথায় চিন্তার ভাঁজ । রেডিও তে বার বার আবহাওয়া দপ্তর থেকে ঝড়ের সতর্ক বানী শোনাচ্ছে । সামিনা ছাতা নিয়ে এসে খবর দিল যে , একটা পাগলের মত লোক গ্রামের উত্তর দিকে ভাঙ্গা ঘরটায় ঘুরা ঘুরি করছে ।

করিম চাচা বললেন , সেটা তো বাদল মণ্ডল এর বাড়ী ছিল । বাদল ফিরে এসেছে নাকি ।

করিম চাচা আর গ্রামের কিছু মানুষ গিয়ে দেখল , বাদল ভাঙ্গা বাড়ীর চারপাশে মা মা বলে চিৎকার করছে আর তার মা রিনা দেবীকে খুঁজছে ।

করিম চাচা বাদল এর পাশে যেতেই বাদল ছুটে এসে করিম চাচার দু হাত ধরে জিজ্ঞাসা করল , ‘"আমার ঘরটা এমন ভাঙ্গা কেন ? আমার মা কোথায় আছেন করিম চাচা , আমি খুন করি নি চাচা , আমি নিরপরাধ , মা আমার উপরে রাগ করে আছেন , মাকে বলতে হবে সব । কোথায় আমার মা" ?

করিম চাচা খুব করুন সুরে বলল ," বাদল তুমি শান্ত হয়ে একটু বস । আমি সব বলছি ।

তোমাকে আদালতে সাজা শুনানোর পর তোমার মা আর গ্রামে ফিরে নি । ঐখানে একটা মন্দিরের পাশে বসে থাকতো । সবাই বলত তোমার মা নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিল । গত বছর শীতের সময়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় পথের ধারে ঘুমানো অবস্থায় মারা যান । লাওয়ারিশ লাশ ভেবে পুলিশ তোমার মায়ের দেহ তুলে নিয়ে যায় "।

কথা গুলো কানে যেতেই বাদল একদম চুপ হয়ে যায় । করিম চাচা দেখে বাদল কে নাড়া দিয়ে বলেন , তুমি নিজেকে সামলাও বাব । এই টুকু বয়সে কত ঝড় ঝাপটা সহ্য করেছ জীবনে তা আল্লাহ ই জানেন ।

বাদল এর বুকে কেমন একটা কষ্ট হচ্ছে । কাঁদতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না । বাইরে প্রবল বেগে বাতাস বইছে , সঙ্গে মুষলধারায় বৃষ্টি ।

কষ্টতে যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে বাদলের । থাকতে পারছে না সে ।

উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে অন্ধকারের মধ্যে মা মা বলে চিৎকার করতে করতে ছুটতে লাগলো ।

করিম চাচা চিৎকার করে পিছন থেকে ডাকলেন , কোথায় যাচ্ছ বাদল , ঐ ঝড় আসছে । ফিরে এসো ।

কিন্তু বাদল এর কানে গেল না কোন কথা , অন্ধকার পথে ঝড় – বৃষ্টির মধ্যে দিয়েই ছুটতে লাগলো সে । ছুটে পালিয়ে যেতে চায় এই মায়াবী সংসার ছেড়ে , এই সমাজ এই সভ্যতা ছেড়ে বহু দূরে ......

****** সে দিন এর পর থেকে বাদল এর আর কোন খোঁজ মেলে নি । সে দিন ঝড় বৃষ্টির রাতে ছুটতে ছুটতে কোথায় যে চলে গেল তা কেউই জানে না । এই রকম অভাগা যদি কারো খোঁজ পান বা পথের ধারে কোথাও পড়ে থাকতে দেখেন তাহলে ......

...............সমাপ্ত ................





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?