সংঘ জননী-- মা সারদা দেবী

23rd July 2023 11:40 am প্রবন্ধ
সংঘ জননী-- মা সারদা দেবী


প্ৰবন্ধ :-  " সংঘ জননী " মা সারদা দেবী "
লেখক :-   ডঃ গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
                        ***
 (ব্রহ্মলীন দিবস ২০শে জুলাই ,উপলক্ষ্যে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম এবং  শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ)
                         💐💐💐
            " আমি মা থাকতে কিসের ভয় ..."
  সাংগঠনিক শক্তি এবং দার্শণিক বিচার ধারা কেবল মাত্র উচ্চ শিক্ষার দ্বারাই অর্জন করা যায়, এটা যে একটা ভ্রান্ত ধারণা তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়  ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের এবং শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর জীবনী অধ্য​য়নে। স্রেফ অন্তরাত্মাকে যদি জাগিয়ে অন্যের সুখ - দুঃখের অনুভুতিকে একাত্ম হ​য়ে বিশুদ্ধ চিত্তে অনুভব করা যায়, তবে, আত্মদর্শণের সঙ্গে সঙ্গে দর্শণশাস্ত্রের অতি নিগুঢ় তথ্য অতি সহজে একাএক অন্তরে উদিত হতে পারে। এর জন্যে কোন পন্ডিতের অথবা বিদ্যালয়ের থেকে অধ্য​য়ন করে জ্ঞান উপার্জিত করার আবশ্যকতা নেই। সমদর্শণ এবং সমানুভুতির অনুভব মিলে জন্ম দেয় চিত্তে সর্বজীবে একই ব্রহ্মস্বরূপ আত্মদর্শন, জানা যায় অন্যের অন্তরের ভাব। অনুভব করা যায় অন্যের অন্তরের ব্যথা, ব্যথিত হ​য়ে কেঁদে ওঠে মন, আবার নেচে ওঠে মন আনন্দে ! হৃদ​য়ে জাগে দূরদৃষ্টী এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা। জগৎ উদ্ধারে, জনকল্যাণে অদম্য নীরলস সক্রিয়তা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সহধর্মিনী বা লীলাসঙ্গিনী মা সারদা দেবীও তার ব্যাতিক্রম ছিলেন না। মাতৃস্নেহের সুধাধারায় বহিয়ে দিলেন সংসার। জগতে পূজীতা হলেন সবার "মা" রূপে। সত্যিকারের মা। অভয়দায়িনী,স্নেহময়ী মা। যিনি একাধারে জগত জননী রক্ষাকর্তী মা দূর্গা আবার অন্যরূপে লোকশিক্ষা প্রদায়নী জ্ঞানদায়িনী মা সরস্বতী। মাতৃস্নেহে যে আছে অপরিসীম সাংগঠনিক শক্তি, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মা সারদা দেবী।
   সাক্ষাত চণ্ডীর অংশ রূপাদেবী মা সারদা, মানব শরীর ধারন করে এসেছিলেন মর্তে মানব কল্যাণ সাধনে। জগৎ সংসারের অর্ধচেতন সমাজে মানবিক বোধকে জাগিয়ে তুলে জন উন্ন​য়নের কাজ এবং জীবে দ​য়া প্রেমবোধকে ভাতৃত্বের বন্ধনে সংগঠিত করে বিশ্বের কল্যাণের সাথে সাথে স্থায়ী শান্তি সংস্থাপনের জন্যে । শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের বিচার এবং ভাবধারায় সমভাবে অনুপ্রানিত - সমর্পিত মা সারদা দেবী। সন্তানদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করলেন সংঘ। শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অনুপ্রানিত করে শিক্ষা দিয়ে উৎসাহিত করলেন মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে। সেই কারনেই আজ বিশ্ব পেয়েছে স্বামী বিবেকানন্দকে। শক্তিশালী স্তম্ভের মতো সংগঠিত হ​য়ে সৃজিত হতে পেরেছে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের ভাবধারায় বিশ্ব প্রসিদ্ধ রামকৃষ্ণ মিশন এবং মঠের মত বিশাল এক সংগঠন। মায়ের কৃপায়  চলছে জগৎ জুড়ে মানবকল্যাণে এবং সার্বিক উন্ন​য়ের জন্য ঠাকুর এবং মায়ের সন্তানদের নিঃস্বার্থ সেবা প্রদান। জনকল্যাণে মায়ের সর্বদা চিন্তা, সর্ব জীবকে সন্তানরূপে দর্শণ মায়ের বিশাল হৃদয় এবং মানসিকতার পরিচ​য় পরিলক্ষিত হয় মায়ের বাল্যকালের সহ পরবর্তীকালের অনেকানেক ঘটনা থেকে। স্নেহম​য়ী মা যে সত্যিকারের মা, জগৎ রক্ষাকর্তী  জননী, মা দূর্গা। জ্ঞানদায়িনী,বাগদেবী ব্রহ্মাণী মা সরস্বতী। যার প্রমাণ পেয়েছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। বিশ্বাস করেছিলেন মায়ের শক্তিকে। শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের অপূর্ণ কার্যকে পূর্ণরূপ প্রদান করলেন শক্তিময়ী মা সারদা দেবী, প্রতিষ্ঠিত করলেন বিশ্বে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবধারার। কী অপরিসীম মায়ের স্নেহময় সাংগঠনিক শক্তি !  জগৎ জননী দেবী ও ব্যাতিক্রমিত হননি সৃষ্টীর সৃষ্ট বিধান থেকে। 
২০শে জুলাই নশ্বর দেহত্যাগ করে রামকৃষ্ণলোকে যাত্রা করলেন। সন্তানদের অভয় দিয়ে বলে গেলেন "আমি সত্যিকারের মা, শুধু গুরুপত্নী নই, পাতানো মা নই, মুখের কথার মা নই - সত্যিকারের মা"! 
 " কিসের ভ​য় বেটা, সর্বদা জানবে ঠাকুর তোমার পেছনেই আছেন। আমি আছি, আমি মা থাকতে তোমার কীসের ভ​য় ?"
 " যেমন আমি সচ্চরিত্রবানের মা, তেমনই পাপী - তাপীর ও মা। যদি কখনো কোন ভীষন বিপদে প​ড় , ভ​য় নেই জানবে তোমার একজন মা আছেন।" 
 স্বামী অভেদানন্দ মহারাজ কৃত মায়ের স্তবে কী সুন্দর বর্ণনা -
" প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং , নররূপধরাং জনতাপহরাং।
শরণাগত - সেবকতোষকরীং , প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম॥"
                           অর্থাত - 
পরমাপ্রকৃতি যিনি অভয়া ও বরদা নরদেহে অবতীর্ণা, যিনি জীবদুঃখহারিণী এবং শরণাগত সেবকের যিনি আনন্দ - বিধায়িনী  সেই সর্বারাধ্যা জগজ্জননীকে প্রণাম করি॥
  " জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম।
 পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ॥"
        জগজ্জননী দয়াম​য়ী , অভয়দাত্রী, স্নেহময়ী মা সারদা দেবীর শ্রীচরনে জানাই অমার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম।
         জয় মা, জয় ঠাকুর, জয় স্বামীজী।





Others News

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক


প্রবন্ধ :-  "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" 
লেখক :-  ডঃ .গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
                         ***
     "জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ "
                             * 
   " স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার, যেটা আমি নিয়েই ছাড়ব।"  পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সিংহের রাজত্বকালে সর্বপ্রথম গর্জে উঠেছিলেন এক নির্ভিক ভারতীয় সিংহ,যিনি একাধারে বিদ্বান, অর্থলোভমুক্ত, ত্যাগী, সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী, হিন্দু রাষ্ট্রবাদের জনক, লোকসেবক শক্তিমান পুরুষ, যাঁকে সর্বলোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" বলে সম্বোধন করে, তিনি হলেন বাল গঙ্গাধর তিলক (আসল নাম কেশব গঙ্গাধর তিলক, বিবাহের পরে ওনার স্ত্রীর বংশানুসারে " কেশব গঙ্গাধর "  নামের পরিবর্তিত হয়ে "বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে পরিচিত হলেন)। মহারাষ্ট্রের  চিক্কন গ্রামে ২৩/০৭/১৮৫৬  সালে ওনার জন্ম হয় এবং ০১/০৮/১৯২০ সালে বোম্বাই এ বর্তমানে ( মুম্বাই) ওনার দেহত্যাগ হয়।  
        ডীকান কলেজ থেকে বি.এ.পাস করার পরে উনি গভর্নমেন্ট " ল " কলেজ ( ইউনিভার্সিটী অফ বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে  "ল" পাস করেন, কিন্তু, অর্থ লোভমুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি , নিজেকে সমাজ  কল্যাণে সমর্পিত করেছেন, তিনি " ল " পাস করেও আদালতে ওকালতি না করে শিক্ষার প্ৰসারের জন্য স্কুলে শিক্ষকের চাকুরীতে যোগ দিলেন এবং ১৮৮০ সালে স্থাপনা করলেন " ন্যু ইংলীশ স্কুলের" । কিছু বছর পরে স্থাপনা করলেন    " ফারগুইজন " কলেজের। বিদ্বান, ত্যাগী,  সরল,  নিঃস্বার্থ পরোপকারে এবং সমাজের কল্যাণ সাধনে সমর্পিত নিরলস নির্ভিক স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়কে মহারাষ্টের লোকে সম্মানের সঙ্গে  "লোকমান্য" নামে সম্বোধন করতে আরম্ভ করল। সেই থেকে উনি "লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক" নামে ভারতে তথা  বিশ্বে পরিচিত হলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা ছিল লোকমান্যের! স্বাধীনতার জন্য চলছে আন্দোলন কে তীব্র করার জন্য জনমত এবং  জনচেতনাকে জাগিয়ে তুলে সংবাদ আদান প্রদানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচলিত করেছিলেন " গনেশ উৎসব" এর । 
  ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র জনান্দোলন এবং আলোচনা করার জন্য ইংরেজ সরকার ওনার উপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ লাগিয়ে ৬ বছরের জন্য দেশের বাইরে করার আদেশ দিয়ে বর্মার মান্ডালে জেলে পাঠিয়ে দিল,  কিন্তু, কর্মতৎপর লোকমান্য তিলক মহাশয় জেলে বন্দী অবস্থায় রচনা করেছিলেন " গীতা রহস্য " এর। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে যখন উনি "গীতা রহস্য" এর প্রকাশণ করেছিলেন তখন ভীষণ জন আলোরণ তৈরী হয় সম্পূর্ণ দেশে। 
     নির্ভিক সাংবাদিক লোকমান্য তিলক দুটি সংবাদ পত্রের প্রকাশণ করেছিলেন - একটি ইংরাজীতে       " মারাঠা"  নামে এবং অপরটি মারাঠী ভাষায় "দৈনিক কেশরী" নামে। প্রকাশিত সংবাদপত্র গুলির মাধ্যমে লোকমান্য তীব্রভাবে ইংরেজ শাসনের নিন্দা এবং সমালোচনা শুরু করেছিলেন, যার জন্য ওনাকে প্রায়ই জেলে যেতে হত। স্বায়ত্ব বা সুশাসনের দাবী তুলে আন্দোলন চালিয়ে ১৯১৬ - ১৮ সালে  গঠণ করলেন "অল ইন্ডিয়া রূল লীগের"। ক্রান্তিকারী আন্দোলনের সমর্থক তিলক সম্পূর্ণভাবে গান্ধীজীর অসহযোগ অন্দোলনকে মেনে নিতে পারেননি। লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, এনী বসন্ত, মহম্মদ আলী জীন্নাহ  ইত্যাদি মহান ব্যাক্তিত্বের সংযুক্ত আন্দোলনে বিচলিত হয়েছিল ইংরেজ প্রশাসন। সম্পূর্ণ ভারতে তখনকার দিনের একটা বহুল প্রচলিত শ্লোগান ছিল "লাল বাল পাল "। বিখ্যাত তিন মহান ব্যাক্তিত্ব !
  ভারত মায়ের মহান সন্তান লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক। ওনার নাম আজ ও স্বাধীন ভারতবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে । 
  লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মহাশয়ের শ্রীচরনে জানাই আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ।