গল্প - " দিন বদলায় - মানুষ বদলায় "
লেখা - তারিফ আলম
ইস , পকেটে তো মাত্র ১২০ টাকা আছে । এদিকে ২২৫ টাকার মত মায়ের জন্য ওষুধ কেনা হয়ে গিয়েছে । সরিস ওষুধ দোকানি অজিত বাবুকে ধীর কণ্ঠে বলল ,” আমার কাছে এখন এত টাকা নেই । এই ওষুধ গুলো এখন রাখুন , আমি বাড়ী থেকে টাকা নিয়ে এসে কাল কে নিয়ে যাব “।
অজিত বাবু এক গাল হেসে নিয়ে বললেন , “সে কি কথা , টাকার চিন্তা করতে হবে না , ওষুধ গুলো নিয়ে যাও , টাকা যখন ইচ্ছা দেবে “।
সরিস এই কথা গুলো অজিত বাবুর কাছ থেকে শুনে একটু অবাক হল । অবাক হওয়ার কারন আছে । তার বাবার যখন শরীর খারাপ তখন এই দোকানে থেকেই ওষুধ নিতে এসে মাত্র ২০ টাকা কম থাকার জন্য আবার বাড়ী গিয়ে টাকা নিয়ে এসে দিয়ে তারপর বাবার জন্য ওষুধ নিয়ে গিয়েছিল । তবে সে দিন তার বাবা অবশ্য বাঁচে নি । আর আজ তেমন জরুরীও নয় । কয়েক দিনের ওষুধ এখনো বাড়ীতে আছে মায়ের জন্য ।
“ আপনি ওষুধ গুলো রাখুন , আমি পরে এসে নিয়ে যাব” – এই বলে সরিস দোকান থেকে বেরিয়ে সাইকেল টা নিয়ে দ্রুত রওনা হল । আজ আবার টিউশন পড়াতে যেতে দেরি হয়ে গেল । গ্রামের দুটো বাড়ীতে টিউশন পড়ায় । গত দু দিন কামাই হয়ে গিয়েছে । মেদিনীপুর এ এক বন্ধুর মেসে ছিল এই দু দিন একটা বিশেষ কাজে । দুপুরের ট্রেনে বেলদা স্টেশনে পৌঁছে স্ট্যান্ডে রাখা সাইকেল টা নিয়ে সোজা তার আকন্দা গ্রামে । গ্রামে ঢুকতেই অজিত বাবুর ওষুধ দোকান । তারপর গ্রামের মধ্যে দু টো বাড়ীতে গিয়ে টিউশন পড়িয়ে একদম বাড়ী ফিরবে ।
আজ সরিসের কেমন যেন অন্য দিন গুলোর চেয়ে একটু আলাদা লাগছে সব কিছু । টিউশন পড়াতে বাড়ীতে ঢুকতেই মিনু বউদি হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানালো , কিন্তু অন্য দিন গুলতে দেরি করে আসার জন্য অপমান জনক কথা শুনতে হত মিনু বউদির কাছ থেকে । কোন দিন যে এক কাপ চাও দেয় নি আর আজ পায়েস এনে খেতে দিল ।
আর আজিম বাবুর বাড়ীতে টিউশন পড়াতে গিয়ে তো আরও অবাক হল যখন দেখল – তিন মাস এর টিউশন এর বাকি টাকা গুলো একসাথে সব দিয়ে দিল এবং বাজার থেকে মিষ্টি শিঙ্গাড়া নিয়ে এসে খাওয়াল ।
বাড়ী ফেরার পথের মোড়ে চা দোকান বসে আড্ডা দেওয়া গ্রামের গন্য - মান্য মানুষ গুলো আজ কে সরিস কে দেখে কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলো , চা খাওয়ার জন্য আমন্ত্রনও জানালো । অথচ অন্য দিন গুলোতে প্রতিদিন এই চা দোকানের পাশ দিয়ে যায় , কেউ ডেকে কিছু বলে না কথা , চা খাওয়ার আমন্ত্রন তো দূরের কথা ।
খুব অবাক লাগছে আজকে তার আশে- পাশের চেনা- জানা মানুষ গুলোকে দেখে । সবাই কেমন যেন বদলে গিয়েছে ।
বাড়ীতে পৌঁছে সরিস সাইকেল টা রেখে মাকে গিয়ে প্রণাম করে । মা ছেলের কপালে চুমুখান । মা অনিলা দেবী ছেলেকে বলেন , “তুই হাত মুখ ধুয়ে আয় । বিপিন বাবু মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন , একটু মিষ্টি আর মুড়ি খেয়ে নে “।
সরিস অবাক হয়ে গেল । বিপিন বাবু তাদের গ্রামের সব চেয়ে ধনী মানুষ । তিনি কেন হটাত এই গরীব এর বাড়ীতে এলেন , আবার মিষ্টি নিয়ে !
মা কে জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল , বিপিন বাবু তার একমাত্র সুন্দরী মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসেছিলেন সরিস এর জন্য । বিয়েতে একটা মারুতিও দেবেন বলেছে্ন ।
সরিস কলে হাত - মুখ ধুতে গিয়ে দেখল শিউলি দাঁড়িয়ে আছে । সরিস কে দেখেই ছুটে পালিয়ে গেল । শিউলির বাড়ী তাদের বাড়ীর পাশেই । ছোট বেলাতেই মা হারিয়েছিল । বাড়ীর সব কাজ সে ছোট থেকেই করে । পড়াশুনা বেশি করে নি । খুব গরীব । তার বাবা খেতমজুরের কাজ করে ।
সরিস বাড়ীতে ঢুকতেই মা মিষ্টি নিয়ে এলেন । সরিস আজ টিউশনে অনেক কিছু খেয়েছে । তার খিদে নেই । সে মায়ের গলা জড়িয়ে আদুরে গলায় বলল “ মা , তুমি কি কথা টা সবাই কে বলে দিয়েছ ?
অনিলা দেবী একটু চুপ থেকে তারপর বললেন , “তুই কথা টা কাউকে এখন বলতে মানা করেছিলি , তাই কাউকে বলি নি , শুধু পাশের বাড়ীর কুসুম দিদি জিজ্ঞাসা করতে তাকে বলে ফেলেছিলাম যে , আমার ছেলে সরিস এস এস সি এর একাদশ – দ্বাদশ পাশ করে চাকরি পেয়ে গিয়েছে । সে যে পুরো গ্রাম কে বলে দেবে তা ভাবতে পারি নি” ।
সরিস মাকে মৃদু কণ্ঠে বলে , “ মা , আজকে গ্রামে প্রবেশের পর থেকে সবাই যেন কেমন বদলে গিয়েছে , গরীব আর বেকার বলে যারা আমাকে দূর ছিঃ করত , তারা আজ কত সম্মান দিচ্ছে । যারা কোন দিন খোঁজও নেই নি , তারা আজ কেমন আছি ডেকে জিজ্ঞাসা করছে । আর বিপিন বাবুর কথা বলছ , যে একসময় বাবার দেনার কারনে আমাদের চাষ জমি দখল করে নিয়েছিলেন , যারা তাদের কোন অনুষ্ঠানে আমাদের নিমন্ত্রনও করতেন না , আমাকে দেখলে নাক সিটকে দূর দিয়ে চলে যেতেন , আজ তিনি তাঁর একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য ছুটে এসেছেন । এ সবই আমার চাকরি পাওয়ার কারনে হচ্ছে । তা না হলে এই বিপিন বাবু কোন দিনই তাঁর মেয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসতেন না আমার জন্য । এরা আমাকে ভালোবাসে না মা , এরা আমার চাকরিকে ভালোবাসে । এখন আমি হাইস্কুল এর মাস্টার হয়ে গিয়েছি , তাই তারা এত খাতির করছে ।
কিন্তু একটু চিন্তা করো মা , যখন আমি বেকার ছিলাম তখন সবাই অবহেলা করতো , পথে –ঘাটে গ্রামের মানুষজন দের কাছ থেকে অপদার্থ , আরও কত কটু কথা শুনতে হয়েছে । সেই সময় আমি যখন খুব কষ্ট পেতাম মনে মনে তখন শিউলিই আমাকে সাহস যোগাত । সেই বলত , “তুমি একদিন চাকরি পাবেই । মন দিয়ে পড়াশুনা করে যাও “ ।
মা আমার যখন এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরায় আর যখন ইন্টারভিউ দিতে যাই , সেই দিন গুলতে শিউলি উপোষ থেকে আমার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিল । ভালো সময়ে তো সকলে ছুটে আসে ,কিন্তু খারাপ সময়ে যে পাশে থাকে সেই তো আসল মানুষ যে আমাকে ভালোবাসে । বিপিন বাবুর সুন্দরী মেয়ে কে আমি কি করে বিয়ে করবো মা শিউলিকে ছেড়ে , যখন আমি কিছুই ছিলাম না তখন সে আমাকে ভালবেসেছে । এখন আমার সব কিছু আছে বলে কি তাকে ভুলে যাব “?
অনিলা দেবী ছেলের কথা শুনে ,” মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন – তুই সেই কাজ কর যেটা তোর মন চায় “।
মায়ের কথা শুনে সরিস বাড়ী থেকে বেরিয়ে শিউলির বাড়ীতে গিয়ে দেখে সে ওখানে নেই । কোথায় যেতে পারে তা সরিস এর জানা । মাঠের ধরে মন্দিরের পাশে যেতেই দেখে শিউলি বট গাছের নীচে মাথা নিচু করে বসে আছে । পিছন থেকে গিয়ে আওয়াজ করে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করে সরিস । কিন্তু অন্য দিনের মত আজ চমকাল না সে । শুধু একবার মুখ তুলে চাইল । শিউলির চোখে জল ছিল । সে কাঁদছিল ।
সরিস অবাক হয়ে জিজ্ঞসা করে , কেন কাঁদছিস রে তুই ?
শিউলি কান্না ভেজা শ্বরে বলে ,” তুমি তো চাকরি পেয়ে গিয়েছ , এবার বিপিন বাবুর সুন্দরী মেয়ে কে বিয়ে করে নেবে যাও “।
সরিস বুঝতে পারে এবার শিউলির কান্নার আসল কারন । সরিস শিউলিকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলে , আমি যখন বেকার ছিলাম তখন আমাকে কেউ পছন্দ করতো না , শুধু তুই পছন্দ করতিস । যখন কেউ ভালোবাসতো না , শুধু তুই ভালবাসতিস । তুমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতিস যাতে আমার চাকরি টা হয় । আর আজ যখন আমি চাকরি পেয়েছি তখন কি করে তোকে ভুলে যাব বল । আমি কি বেইমান ?
শিউলি কথা গুলো শুনে সরিসের বুকে মাথা রেখে আবার জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে দেয় । তবে এই বারের কান্না টা যে আনন্দের তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ।
..............................সমাপ্ত ...........................।