সুন্দর ( ছোট গল্প ) / তারিফ আলম

3rd September 2023 10:56 am তারিফ আলম
সুন্দর ( ছোট গল্প ) / তারিফ আলম


গল্প  - * সুন্দর * 

লেখা - তারিফ আলম 

 

সোনালী হন্তদন্ত হয়ে এসে ক্লাস রুমে খুঁজতে লাগলো সুন্দর কে । সম্পা , রুমা বসে গল্প করছিল পিছনের ব্রেঞ্চে । তাদের কাছে গিয়ে সুন্দর কোথায় তা জানতে চাইল । রুমা বলল , ‘একটু আগে ক্লাসে ছিল সুন্দর , এখন মনে হয় ল্যাব এ গিয়েছে হয়তো ‘।

কি জন্য এত সুন্দর কে খুঁজছে সোনালী তা বুঝতে না পেরে রুমা জিজ্ঞাসা করলো , কি হয়েছে রে সোনালী । তাছাড়া তুই তো বিয়ে বাড়ীতে গিয়েছিলি , কেমম মজা করলি একটু বল । সুন্দর তো একটু পরেই ক্লাসে এসে যাবে । আয় আমাদের পাশে বস ।

একটু আসছি – বলে সোনালী দ্রুত ল্যাবরেটরি এর দিকে এগিয়ে গেল । ক্লাস টুয়েলভ এর সায়েন্স এর ছাত্র সুন্দর প্রধান । ল্যাব এ একমনে কাজ করে যাচ্ছে । পড়াশুনায় খুব ভালো । নাম সুন্দর , কিন্তু নামের সাথে চেহারার বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য নেই , গায়ের রং কালো , দেখতে ভালো তো বলাই যাবে না । বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন সুন্দর । অতি সরল ও নম্র স্বভাবের সুন্দর ছোট বেলাতেই বাবাকে হারিয়েছে, বিধবা মা লোকের বাড়ীতে ঝি এর কাজ করে খুব কষ্ট করে তাকে বড় করে তুলেছেন । পড়াশুনায় ভালো বলে গ্রাম এর মানুষরা কেউ কেউ আর্থিক সাহায্য করেন । তাছাড়া টিউশন করে কিছু টাকা পায় । এতে তার পড়াশুনার খরচ টা চলে যায় কোনরকমে ।

সোনালীকে তার দিকে আসতে দেখে সুন্দর এগিয়ে গেল । সোনালী কাঁদো কাঁদো ভাব দেখিয়ে বলল, আমার প্রাক্টিক্যাল একটুও করা হয় নি, তিন দিন পর জমা না দিলে পরীক্ষায় ফেল করবো , প্লীজ একটু করে দেবে ?

সোনালীর অনুরোধ সুন্দর উপেক্ষা করতে পারে না , দীর্ঘ ২ বছর ধরে এমনি সোনালীর সব অনুরোধ রক্ষা করে এসেছে । মন কিছুতেই সোনালীকে কোন ভাবে দুঃখ দিতে চায় না । সোনালী শুধু বন্ধু নয় , তার কাছে অন্য কিছু । ফর্সা , সুন্দরী , স্মাট মেয়ে সোনালী খুব হাসিখুশি স্বভাবের । ক্লাসের সব ছেলেই তাকে পছন্দ করে । সুন্দর একটু বেশী । মনে মনে সব সময় সোনালীর চিন্তা । তার কাজ গুলো যখন করে দেয় , আর সোনালী আনন্দে হেসে তাকে Thank You বলে , তখন খুব ভালো লাগে সুন্দরের ।

সুন্দর মাথা নেড়ে সম্মতি জানানোর সাথে সাথে সোনালী ব্যাগ থেকে তিনটে প্রাক্টিক্যাল খাতা বের করে সুন্দর কে দিয়ে থাঙ্ক ইউ বলে চলে যায় । সুন্দর নিজের পড়া ছেড়ে রাত জেগে সোনালীর খাতা তৈরি করে দেয় । তিনদিন পর যখন সোনালী এর হাতে খাতা গুলো তুলে দিল তখন সোনালী আনন্দে সুন্দরকে জড়িয়ে ধরে বলে তুমি আমার সব থেকে প্রিয় । Thank your dear .

সুন্দর লজ্জায় মাথা নত করে নেয় । ক্লাস এর সকলের সামনে সোনালী জড়িয়ে ধরেছিল তাকে – এটা ভাবতেই কেমন লাগছে তার ।

*******************

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ । আজ স্কুলে সকলে এসেছে এক স্যার এর অবসর গ্রহন অনুষ্ঠানে । সুন্দর অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে আগে থেকে এসে গিয়েছে , আজ সে সোনালীকে তার মনের কথা টা বলে দেবে , ক্লাস রুমেই সকলে এসে বসেছে । সোনালী রুমা , সম্পা , সীমাদের সঙ্গে গল্প করছিল । সুন্দর ধীরে গিয়ে সোনালীকে ডেকে বলল , একটু বাইরে আসবে , কথা আছে ।

সোনালী বাইরে আসতে সুন্দর সোনালীকে বলে, আমি তোমাকে অনেক দিন থেকে একটা কথা বলব ভাবছি , কিন্তু কি ভাবে বলব বুঝতে পাচ্ছি না । তোমাকে আমার প্রথম দিন থেকেই খুব ভালো লাগত । ধীরে ধীরে যে কখন তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি তা জানিনা । আজ শেষ দিন তোমাকে মনের কথা টা বলে দিলাম । তুমি ভুল বুঝো না প্লীজ ।

সোনালী কথা গুলো শুনে মনে মনে কি একটা ভেবে নিয়ে সুন্দর এর হাত ধরে ক্লাসে নিয়ে আসে । ক্লাসের সকলকে উদ্দেশ্য করে সোনালী বলতে শুরু করে , ‘ সবাই শুনো , এই যে সুন্দর বাবু আছেন , তিনি আমাকে বলছেন , তিনি আমাকে নাকি ভালোবাসেন , বিয়ে করতে চান , আরে আয়নায় নিজের মুখটা কখনও দেখেছিস , কালো , কুৎসিত কোথাকার , নাম সুন্দর রেখে দিলেই কেউ সুন্দর হয়ে যায় না । তোর মত দেখতে ছেলের সাথে প্রেম করবো আমি ... ভাবলি কি করে ? এর পরে এমন বললে জুত মেরে গাল লাল করে দেব ।

ক্লাস এর সবাই হেসে ওঠে । সুন্দরের দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কষ্টে অপমানে । সোনালী এমন অপমান করবে সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি । গায়ের রং টা কালো , দেখতে ভালো না - সেটা কি তার দোষ ।গায়ের রং টা সকলে দেখল - মনের রং টা কেউ দেখল না । নিজের হাত দিয়ে চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে সে বাড়ীর দিকে রওনা দিল ।

----------

***********দশ বছর পর **********

আচমকাই খবর টা পেল সোনালী , গৌরাঙ্গ এর এক বন্ধু এসে খবর টা দিল । জুয়া খেলার সময় টাকা পয়সা নিয়ে গণ্ডগোল এর দরুন মারপিট হয় । তাতে গৌরাঙ্গ কে একজন মাথায় মদ এর বোতল দিয়ে আঘাত করেছে , তার মাথা ফেটে গিয়েছে , অবস্থা সাংঘাতিক । কয়েকজন বন্ধু তাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছে ।

খবর টা শুনে যেন মাথায় বাজ পড়ে সোনালীর । অনেক বড় বিজনেস ম্যান এর ছেলে স্মাট, ফর্সা ,হ্যান্ডসাম গৌরাঙ্গ রায় এর সাথে ৫ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল তার । কিন্তু স্বামী গৌরাঙ্গ যে জুয়াড়ি আর মাতাল – তা বিয়ের আগে জানতো না । শ্বশুর মশাই এর মৃত্যুর পর গৌরাঙ্গ বাবার বিজনেস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলে । বর্তমানে নুন আনতে পান্তা ফুরায় এর মত অবস্থা । এদিকে সোনালীর একটি মেয়ে হয়েছে । সোনালী কয়েকটা বাড়ীতে বাচ্ছাদের টিউশন পড়িয়ে সংসার এর ভার বহন করে চলেছে ।

সোনালী দ্রুত ব্যাগ খুলে দেখে মাত্র ৯০০ টাকা মত আছে । তাই নিয়ে স্বামীর বন্ধুর সাথে হসপিটালে এসে পৌছায় । ডাক্তাররা জানিয়ে দেয় যে , মাথায় গুরুতর আঘাত । পেসেন্ট প্রায় কোমায় চলে গিয়েছে । বাঁচানো সম্ভব নয় ।

সোনালী ডক্টরের কথা শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে । সকল ডক্টরদের পা ধরে অনুরধ করতে থাকে তার স্বামীর অপারেশন করে সুস্থ করে তুলার জন্য । এক ডক্টর বললেন যে , এই অপারেশন করা আমাদের সাধ্যের বাইরে । মদের বোতলের কাচ ভেঙ্গে ঢুকে গিয়েছে । তবে একজন ডক্টর পারেন । ডক্টর এস প্রধান , তবে তিনি তো আজ আসতে পারবেন না ।

সোনালী জিজ্ঞাসা করে , কেন আসতে পারবেন না ।

ডক্টর বলেন , তাঁর বাড়ীতে অনেক বড় বিপদ ঘটে গিয়েছে , তিনি মানসিক ভাবে সুস্থও নন । তাই আসতে পারবেন না ডঃ এস প্রধান ।

তবে আপনাকে তার ফোন নাম্বার দিতে পারি , অনুরধ করে দেখতে পারেন ।

সোনালী ফোন নাম্বার টা নিয়ে দ্রুত ফোন লাগায় ,

হ্যাল ,

হ্যাল , ডক্টর এস প্রধান , আমার স্বামী খুব অসুস্থ , মাথায় গুরুতর আঘাত , কোন ডক্টর অপারেশন করার সাহস করছে না , দয়া করে আপনি এসে অপারেশন করে আমার স্বামী কে বাঁচিয়ে দেন । আমি খুব অসহায় ... কথা গুলো বলতে বলতে সোনালী কাঁদছিল ।

ওপাশ থেকে ফোনে ডঃ এস প্রধান কোন কথা না বলে ফোন টা কেটে দিলেন ।

সোনালী বুঝল যে ডক্টর আসবেন না । সোনালীর কাছেও টাকা নেই যে কলকাতার বড় নারসিং হোম এ স্বামীকে নিয়ে যাবে । সেখানেই বসে কাঁদতে লাগলো ।

এমন সময় একজন নার্স এসে খবর দিল যে , ডক্টর এস প্রধান চলে এসেছেন, পেসেন্ট কে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । সোনালী শুনে ছুটে গেল । ডঃ এস প্রধান প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন । হাতে গ্লাফস মুখে কাপড় বাঁধা ছিল , শুধু চোখ দুটো খোলা ছিল ।

সোনালী ছুটে গিয়ে ডঃ এস প্রধান এর পায়ে পড়ে যায় আর কাঁদতে কাঁদতে বলে .....ডাক্তার বাবু আমার স্বামী কে বাঁচান , আমার আর কেউ নেই । আমার কাছে আপনাকে দেওয়ার মত কিছুই নাই , এই ৯০০ টাকা আর আমার গলার মগলসুত্র টা ছাড়া ।

ডক্টর এস প্রধান স্থির সৃষ্টি তে সোনালীকে একবার দেখে নিয়ে দ্রুত অপারেশন রুমে প্রবেশ করলেন ।

সোনালী হাজার উৎকণ্ঠা নিয়ে বাইরে বসে অপেক্ষা করতে থাকলো । অপারেশন কখন শেষ হবে , কখন ডক্টর বাবু বেরিয়ে এসে বলবেন , আর চিন্তার কোন বিষয় নেই , অপারেশন সাকসেসফুল । মনে মনে ভগবানকে স্মরণ করতে থাকলো ।

দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার পর অপারেশন শেষ করে দরজা খুলে ডক্টর এস প্রধান বেরিয়ে এলেন । সোনালী অধীর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , অপারেশন কি হল ?

কিন্তু ডক্টর কিছু না বলে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেলেন । এতে সোনালীর মনে ভয় বেড়ে গেল , অপারেশন কি সাকসেসফুল হয় নি , স্বামী কি মারা গিয়েছে তার ...... এমন ভেবে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলো আর ডক্টরকে গালাগাল করতে লাগলো আর অভিশাপ দিতে লাগলো ।

সেখানে অনেক লোক জমা হয়ে গেল সোনালীর কান্নাকাটির শুনে । সেই সময় এক ডক্টর এসে বললেন, কাকে অভিশাপ দিচ্ছেন , ডক্টর এস প্রধান এর জন্য আপনার স্বামী আজ বেঁচে গেল । অপারেশন সাকসেসফুল , আপনার স্বামী দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন । আর ডক্টর এস প্রধান এর মা আজ মারা গিয়েছেন । তিনি তবুও এসে আপনার স্বামীর অপারেশন করেছেন । এখন গিয়ে মাকে এর শেষকৃত্য করবেন । আর অপারেশনের জন্য এক টাঁকাও নেন নি এবং সমস্ত খরচ তিনি দেবেন বলে জানিয়ে গিয়েছেন ।

সোনালী শুনে কান্না থামিয়ে ডক্টর রুপি স্বয়ং ভগবান এর কাছে ধন্যবাদ জানানোর জন্য ডক্টর এর রুমের দিকে ছুটে গেল । কিন্তু এক নার্স জানাল যে ডক্টর বাবু এখুনি বেরিয়ে গিয়েছেন । সোনালী ছুটে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এল ,দেখল ডঃ এস প্রধান তাঁর কার এ উঠতে যাচ্ছেন । পিছন থেকে সোনালী ডাক দিল ...... ডাক্তার বাবু একটু দাঁড়ান ।

ডক্টর এস প্রধান ডাক শুনে ফিরে তাকালেন সোনালীর দিকে । এখন তাঁর মুখ আর ঢাকা ছিল না । সোনালী দেখে অবাক হয়ে গেল ......এ ত সুন্দর । তার স্কুল এর বন্ধু । সব সময় যে তার বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত । আজও আগের মত করেই সে সাহায্যের হাত টা তার বাড়িয়ে দিয়েছে । আর সোনালী তার অপমান করেছিল , তার শুধু মাত্র দোষ ছিল সে কালো হয়ে তার মত সুন্দরী মেয়েকে ভালোবেসেছিল ।

সোনালী কি বলবে ভেবে পেল না , শুধু হাত জোর করে কাঁদতে কাঁদতে বলল , আমাকে ক্ষমা করে দাও সুন্দর ।

সুন্দর কিছু না বলে তার গাড়িতে উঠে পড়লো । তার ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল । সোনালী চেয়ে ছিল , দেখতে দখতে সুন্দর তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল । সুন্দর তার রুপ নয় , সুন্দর মন দিয়ে জয় করে নিয়েছে আজ সব কিছুই ।

---------------- সমাপ্ত ..............................





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?