গল্প -- বন্যা
লেখা -- তারিফ আলম
মা মা মা ......গো
রবির আর্তনাদে বাড়ীর সকলে ছুটে গেল ছাদের কোনে যেখানে রবি পড়ে চিৎকার করছিল , বাবা রতন দৌড়ে গিয়ে ৯ বছরের তার একমাত্র ছেলেকে কোলে তুলে নিল । ছেলের নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল । পাশে চোখ পড়তে ভয়ে সেও আর্তনাদ করে উঠলো ......সাপ , চন্দ্রবোড়া সাপ । ছেলের পায়ে সাপের ছোবলের দাগ । সাপটা দ্রুত ছাদ বেয়ে বন্যার জলে লাফ দিয়ে চলে গেল ।
চার দিন থেকে সমানে বৃষ্টি হয়ে চলেছে । কিন্তু গতকাল রাতে নদীর বাঁধ টা যে ভেঙে যাবে তা কেউই ভাবতে পারে নি । হু হু করে কাঁসাই নদীর জল গ্রামে ঢুকে পড়েছে । জলের প্রবল স্রোতে ঘর – বাড়ী সব প্রায় ভেঙে গিয়েছে । গরু ছাগল সহ কত যে জীবজন্তু বানের জলে ভেসে গিয়েছে কে জানে । গ্রামের গরীব মানুষ গুলো দুটো উঁচু ঢিপির উপর অবস্থিত শিব মন্দির আর মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ।
রতনের স্ত্রী সীমা ছেলে রবিকে বিষাক্ত সাপে ছোবল দিয়েছে জেনে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিলেন । বান্যায় চারিদিক ডুবে গিয়েছে তার উপরে সমানে বৃষ্টি হয়ে চলেছে । কাঁসাই নদী পেরালে হাসপাতাল আছে । কিন্তু এই বন্যার সময় কি ভাবে নিয়ে যাওয়া যাবে ছেলেকে । রতন আর মন্দিরে উপস্থিত সকলে নিতাই মাঝির কাছে গিয়ে সাহায্য চাইল যাতে সে তার নৌকাতে রবিকে নিয়ে কাঁসাই নদী পার করে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দেয় । নিতাই মাঝি কিছুতেই যাবে না । সে বলল , নদীতে স্রোত প্রবল , তার উপরে ঝড় বৃষ্টি , তাছাড়া নদীর স্রোতে ঘর – বাড়ীর ভাঙ্গা ছাদ , গাছা – পালা ভেসে আসছে । নৌকোতে ধাক্কা লাগলেই উল্টে যাবে । তখন আমরাও মরবো ‘।
রবির মা এসে নিতাই এর পা ধরে কাঁদতে লাগলেন যাতে তার ছেলে কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । কিন্তু কোন লাভ হল না । নিতাই মাঝি কিছুতেই রাজী হল না ।
কোন একজন বলল , গ্রামে আর এক জনের নৌকা আছে , সে করিম আলি । সে কি যাবে ? ...........করিম এর কথা মনে পড়তেই . রতন এর মন বিষাদে ভরে গেল । সে তো যাবে না ।
******* **** ******* ********* ************* *******
প্রতাপপুর গ্রামে দীর্ঘ সময় ধরে হিন্দু- মুসলিম একসাথে বসবাস করে আসছে । তাদের মধ্যে কোন দিন ধর্ম নিয়ে বিবাদ দেখা দেয় নি । বিভিন্ন পালা পার্বণে একে অপরের সঙ্গে সুখ- দুঃখ ভাগ করে নেয় । মুদী দোকানী রতন দাস আর জেলে করিম আলির যেমন বন্ধুত্ব , তাদের ছেলে – মেয়ের মধ্যেও তেমনি বন্ধুত্ব । করিম আলির ছেলে নজরুল আর রতন দাস এর মেয়ে সোনালী দু জনেই ক্লাস টেন এ পড়ে । এক সাথে টিউশন যায় । নজরুল ক্লাস এর ফাস্ট বয় , সোনালীও পড়াশুনায় খুব ভালো ।
সবকিছুই ঠিক চলছিল । কিন্তু কিছুদিন হল কিছু গেরুয়া পোশাক ধারী লোকজন কোথা থেকে গ্রামে এসে গ্রামের মন্দিরে ঘাটি গেড়েছে আর গ্রামের বেকার যুবক হিন্দু ছেলেদের জড় করে হিন্দুত্বের পাঠ পড়াচ্ছে । তাদের খারাপ দশার জন্য নাকি দায়ী গ্রামের মুসলিমরা । তার উপর গতকাল রাতে নাকি মন্দিরে একটা মাংসের টুকরো কেউ ফেলে গিয়েছে । গেরুয়া বাহিনী প্রচার করছে ......ওটা নাকি গো মাংসের টুকরো । মুসলিমরা নাকি এটা করেছে । চারিদিকে একটা থমথমে ভাব । গ্রামের হিন্দু – মুসলিম রা এখন একে অপরকে এড়িয়ে চলছে ।
জেলে করিম আলির ছেলে নজরুল কাঁধে বই ব্যাগ টা নিয়ে মা কে টিউশন যাচ্ছি বলে সাইকেল টা নিয়ে বের হল । পথে সোনালী এর সাথে দেখা । সেও টিউশন যাচ্ছে । তার সাইকেলটা খারাপ হয়ে গিয়েছে বলে আজ হেঁটে যাচ্ছিল । পথে নজরুল কে দেখে বলল , আমাকে একটু তোর সাইকেলে নিয়ে যাবি ? হেঁটে পৌছতে টিউশনে দেরি হয়ে যাবে । স্যার বকবেন ।
নজরুল প্রথমে দ্বিধাবোধ করলেও পরে বান্ধবীকে সাইকেলে বসিয়ে টিউশন স্যার এর বাড়ীর দিকে রওনা দিল । মোড় এর কাছে কিছু গেরুয়া পোশাকধারী ছেলেরা বসেছিল । তারা নজরুল আর সোনালীকে সাইকেল আসতে দেখে পথ রুখে দাঁড়াল ।
হিন্দু বাড়ীর মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস রে শয়তান । লাভ জেহাদ করতে চাস । নজরুল কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তারা তাকে ধরে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগলো । সোনালী নজরুল কে বাঁচাতে চেয়েও পারলো না । তার কথা কেউ শুনছিল না । মুসলমান ছেলের সাইকেলে বসার জন্য তাকেও অনেক গালাগাল করছিল তারা ।
করিম আলি মাছ ধরে নদী থেকে ফিরে এসে শুনলেন তার ছেলে গুরুতর জখম হয়ে শহরে হাসপাতালে ভর্তি আছে । একটা হাত আর একটা পা ভেঙে গিয়েছে ।
গ্রামে কোথা থেকে কিছু বহিরাগত টুপি বালা লোকের অগমন ঘটেছে । তারা নজরুল এর উপর আক্রমনের জন্য হিন্দুদের দায়ী করে প্রতিশোধ নিতে চায় । তাই তারা মিছিল করে গিয়ে রাতে রতন দাস এর মুদী দোকান এ আগুন লাগিয়ে দেয়। আর এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামে হিন্দু – মুসলিম দের মধ্যে দাঙ্গা লাগে যায় । বহিরাগত গৈরিক বাহিনী বেঁছে বেঁছে মুসলিমদের দোকান আর ঘরে আগুন লাগায় আর বহিরাগত টুপি বাহিনী বেঁছে বেঁছে হিন্দুদের বাড়ী আর দোকানে লুঠ করে আর আগুন লাগায় । গ্রামের সব কিছু কয়েক দিনে যেন লন্ড ভণ্ড করে দিল ধর্মের কারবারিরা ।
পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় গ্রামে পুলিশ টহল দিতে শুরু করেছে । কিছু রাজনৈতিক নেতা – নেত্রী নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা তুলার জন্য গ্রামে এসে সভা করে যাচ্ছে ।
কিন্তু যেই নদীর বাঁধ ভেঙে বন্যায় গ্রামের ঘর বাড়ী সব ডুবে গিয়েছে , মানুষ হাহাকার করছে একটু পানীয় জল আর খাবার এর জন্য তখন এই সব নেতা মন্ত্রী আর বহিরাগত গেরুয়া বাহিনী আর টুপি বাহিনী এর চিহ্নও খুঁজে পাওয়া গেল না । বিপদ এর গন্ধ পেয়ে তারা আগেই কখন চলে গিয়েছে গ্রাম ছেড়ে তা কেউ টেরও পায় নি ।
----------------------------------
রতন দাস মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে । ছেলে রবির অবস্থা খুব খারাপ । দ্রুত চিকিৎসা না হলে মারা যাবে । বউ আর বড় মেয়ে সোনালী অঝোরে কেঁদে চলেছে । আশেপাশে লোকগুলো অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পুরো গ্রাম বন্যার জলে মগ্ন । নৌকা ছাড়া আসা – যাওয়ার কোন উপায় নাই ।
এমন সময় উপস্থিত একজন চিৎকার করে বলল , ঐ দেখ করিম আলি তার নৌকা নিয়ে এদিকেই আসছে । সকলে উৎসুক হয়ে দেখল । সত্যি তো ।
করিম আলি তার নৌকা মন্দিরের পাশে লাগিয়ে দ্রুত রতন কে বলল ছেলেকে নিয়ে আসতে তার নৌকায় । রতন করিম কে দেখে অবাক হল । করিমকে কেউ ফোনে করে জানিয়েছিল সাপে কাটার কথা । খবর টা শুনেই দেরি না করে নিজের নৌকা নিয়ে চলে এসেছে ।
যাই হোক, আর দেরি না করে রতন রবি কে কোলে তুলে নিয়ে করিম আলির নৌকাতে গিয়ে উঠলো । ঝড় বৃষ্টির কে উপেক্ষা করেই খুব সাবধানে অথচ দ্রুত নৌকা বাইতে লাগলো করিম আলি । অনেক কষ্টে নদী পেরিয়ে শহরে এসে হাসপাতালে পৌঁছল তারা । হাসপাতালে ডাক্তার বাবুরা দ্রুত চিকিৎসা করা শুরু করে দিলেন । সকালে রবির জ্ঞান ফিরল । রতন ডাক্তার বাবুর কাছে গিয়ে হাত জড় করে বলল , আপনি দেবতা , আমার একমাত্রে ছেলেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন । শুনে ডাক্তার বাবু বললেন , আমি নিজের কাজ টুকু করেছি মাত্র । কিন্তু রোগীকে যদি আনতে আর একটু দেরি হয়ে যেত তাহলে তাকে বাঁচানো যেত না ।
রতন শুনে বাইরে বেরিয়ে দেখল অধীর আগ্রহে করিম দাঁড়িয়ে আছে । রতন কে দেখে করিম জিজ্ঞাসা করলো , রবি ভালো আছে তো ?
রতন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল । তারপর দু হাতে করিম কে জড়িয়ে ধরল কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো , তুই ছিলি বলে আজ আমার ছেলে বেঁচে গেল রে করিম । করিম এর চোখেও জল এসে গেল । দুজন দুজন কে ধরে সুখের কান্না কাঁদতে লাগলো । তাদের মধ্যে এখন আর কোন বিভেদ নেই । সব ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে মনুষ্যত্ব ধর্মের গলায় গলায় মিলন হল ।