ছুটির ঘণ্টা
লেখা – তারিফ আলম
মাকে প্রণাম করে কুন্তল ব্যাগ টা নিয়ে বাবার খোঁজ করতে বোন রিমা এসে বলল যে, বাবা বাজারে গিয়েছেন , এখুনি চলে আসবেন ।
কুন্তল একটু বিরক্ত হয়ে বলল , বাবা অসুস্থ শরীর নিয়ে বাজারে কেন গেলেন আবার । আমার স্কুলে আজ প্রথম দিন , দেরি হয়ে যাবে যে ।
এমন সময় অজিত বাবু প্রবেশ করলেন রুমে , হাতে একটা ব্যাগ । বাজার থেকে একটা হালকা নীল রঙ এর নতুন জামা কিনে এনেছেন । ছেলের আজ স্কুলে চাকরিতে যোগদানের প্রথম দিন , তাই এই নতুন জামা টা ছেলেকে পরে নিতে বললেন ।
কুন্তল একটু মৃদু হেসে জামাটা পরে নিয়ে ইন করে নিতে খুব স্মাট লাগছিল । বাবাকে প্রণাম করে দ্রুত বাড়ী থেকে বিদায় নিয়ে বাস স্ট্যান্ড এ এসে উপস্থিত হল । সেখানে অনুপ বাবুর সাথে দেখা , কুন্তলের এলাকাতেই বাড়ী , কুন্তল তার ছেলেকে টিউশনও পড়িয়েছে কয়েক বছর আগে । তিনি এসে বলতে লাগলেন আপনার লেখা কবিতার বই টা আমি পড়েছি । খুব সুন্দর আপনি লেখেন । আমাদের ক্লাবের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে আপনাকে বিশেষ অতিথি হিসাবে আমন্ত্রন জানাচ্ছি । আপনি দয়াকরে আমাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলে খুব আনন্দিত হব ।
কুন্তল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো । ৩২ বছর বয়সী কুন্তল রায় এলাকায় খুব সম্মানীয় ব্যাক্তি । কবিতা লেখা ও সমাজ সেবা করার জন্য সকলে তাকে খুব ভালোবাসে আর সম্মান করে । সেই সঙ্গে গরীব ছেলে মেয়েদের বিনা পয়সায় টিউশনও পড়ায় ।
এমন সময় বাস চলে এলে কুন্তল বাসে উঠে পড়ে । বাখরাবাদ পৌঁছে মেন রোড ধরে একটু এগিয়ে যেতেই বিশাল স্যামচরন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল । কুন্তল একটি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে প্রধান শিক্ষক এর রুম কোনটা । ছেলেটি সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দেয় । কুন্তল অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে প্রধান শিক্ষক চেয়ারে বসতে বলেন । তারপর কুন্তলের সার্টিফিকেট গুলো দেখতে চাইলে কুন্তল ফাইল টা বাড়িয়ে দেয় । হেড স্যার সার্টিফিকেট দেখে বললেন, আপনি তো ইংরেজিতে এম এ , বি এড , সব এ ফাস্ট ক্লাস । এস এস সি এর নবম – দশম বা একাদশ – দ্বাদশ এ পাস করেন নি ।
কুন্তল খুব দুঃখের এর সাথে বলল যে, পরীক্ষার কয়েক দিন আগেই বাবার হাট অ্যাটাক হয় । বাবাকে নিয়ে ভেলর গিয়েছিলাম । তাই পরীক্ষা দিতে পারি নি । তবে নেট পাস করেছি ।
প্রধান শিক্ষক কুন্তল কে নিয়ে স্টাফ রুমে গেলেন । সেখানে সকল শিক্ষক শিক্ষিকা গল্প করছিলেন । প্রধান শিক্ষক সকল কে উদ্দেশ্য করে বললেন যে , ইনি কুন্তল রায় , আমাদের স্কুলের গ্রুপ ডি কর্মী হিসাবে আজই যোগদান করেছেন ।
এমন সময় একজন লোক ডাকতে প্রধান শিক্ষক সেখান থেকে চলে গেলেন । একজন শিক্ষক কুন্তল কে দেখে বললেন, যা ড্রেস , আমি মনে করলাম কোন নতুন শিক্ষক এলেন হয়তো , কিন্তু এ তো এইট পাস কর্মী ......এই বলে তাচ্ছিলের হাসি হাসতে লাগলেন । তার সঙ্গে অন্যরাও যোগ দিলেন । কুন্তল লজ্জায় নিজের জামার ইন টা খূলে ফেললো ।
এমন সময় একজন শিক্ষক বললেন , যাও কাজে লেগে পড় । স্কুল শুরুর ঘণ্টা টা দিয়ে দাও । কুন্তল হাতুড়ি নিয়ে জোরে জোরে আঘাত করে ঘণ্টা দিয়ে দিল । একজন শিক্ষিকা কুন্তল কে ডেকে অফিস রুম এর মধ্যে ধুলো দেখিয়ে বললেন , এখানে ঐ ঝাঁটা টা দিয়ে ঝাঁট দিয়ে দাও , অনেক নোংরা আর ধুলো ।
কুন্তল কোনোদিন ঝাঁট দেয় নি , তাই সে ঝাঁটা নিয়ে ঝাঁট দেওয়ার সময় ধুলো উড়তে লাগলো । শিক্ষকদের নাকে মুখে একটু ধুলো লাগতেই চিৎকার করে উঠলেন , এত বোকা কোথাকার , সরকার যাকে তাকে চাকরি দিয়ে দিচ্ছে । জল দিয়ে ঝাঁট দিতে হয় জানো না । ঐ বালতি নিয়ে জল নিয়ে এসো যাও । কুন্তল নিজের কাজের জন্য সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে বালতিতে করে জল নিয়ে এসে চারিদিকে ছিটিয়ে দিয়ে ঝাঁট দিতে লাগলো । এমন সময় এক দিদিমনি দ্রুত রুমে ঢুকতে গিয়ে জলের কারনে পিচ্ছিল হওয়ায় পা পিছলে দড়াম করে পড়ে গেলেন ।
উ মা গো ... বাবা রে আমর কোমর গেল গো ...
অন্য সকল শিক্ষক শিক্ষিকারা এসে তাঁকে তুললেন , তিনি তার পা পিছলে পড়ার জন্য কুন্তল কে দোষী করে বলতে লাগলেন , কেন যে এই সব অকর্মণ্য ছেলে গুলোকে চাকরি দেয় কে জানে ? মূর্খ সব , বুদ্ধিহীন । এই বলে কুন্তলকে তিরস্কার করতে থাকে । তার সঙ্গে সঙ্গে অনান্য শিক্ষকরাও বকাবকি করতে থাকে কুন্তল কে । কুন্তল শুধু হাত জড় করে তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে । এত অপমান আগে কোন দিনও সহ্য করতে হয় নি তাকে , কষ্টে দু চোখ দিয়ে অশ্রু বেরিয়ে আসে ।
এমন সময় একজন কুন্তলের হাতে একটা নোটিশ ধরিয়ে দিয়ে বলে সব ক্লাস গুলোতে নিয়ে যেতে । কুন্তল নোটিশ নিয়ে সব ক্লাস গুলোতে গিয়ে শিক্ষকদের হাতে দেয় । ইংরেজিতে নোটিশটা অনেক শিক্ষক পড়ার সময় ভুল উচ্চারন করে পড়ে । কিন্ত কুন্তল গ্রুপ ডি কর্মী , তাই শিক্ষকদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তার নাই ।
টিফিনের সময় একজন শিক্ষক কুন্তল কে ডেকে বলেণ যে , স্কুলের বাইরের চা দোকান থেকে ১৫ টা চা আনতে । কুন্তল স্কুলের বাইরে দোকানে যেতে চা দোকানী তার হাতে একটা চা এর কেটলি আর কিছু প্লাস্টিকের কাপ ধরিয়ে দেয় । কুন্তল সে গুলো নিয়ে স্টাফ রুমে প্রবেশ করতেই একজন শিক্ষক সবাইকে চা দিতে বলেন । কুন্তল তখন সবাইকে কাপে চা ঢেলে ঢেলে দিতে লাগল , নিজেকে মনে হচ্ছিল কোন চা দোকানের টি বয় এর মতো , নিজের মান - সম্মান সব ধুলায় মিশে যাচ্ছিল । মনে হচ্ছিল কখন ছুটির ঘণ্টা বাজাবে সে । তার ছুটির ঘণ্টা , অপমানের , তাচ্ছিলের , তিরস্কারের ছুটির ঘণ্টা ।
যায় হোক , ছুটির ঘণ্টা টা বাজাতেই আর থাকতে পারছিল না সে স্কুলে । বাড়ী ফিরতেই বাবা মা বোন সকলে এসে জিজ্ঞাসা করে কেমন কাটল স্কুলে চাকরির প্রথম দিন ?
কুন্তল কাউকে কিছু না বলে নিজের রুমে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো । এত অপমান জীবনে সে কোন দিন হয় নি । সমাজে সকলের কাছে এত সম্মান পাওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এই অপমান সে সহ্য করতে পারছিল না । কষ্টে প্রান বেরিয়ে যাচ্ছিল প্রায় । দীর্ঘ দিন ধরে এস এস সি ও অন্যন্য চাকরির পরীক্ষা বন্ধ থাকার কারনে বাধ্য হয়ে গ্রুপ ডি পরীক্ষাতে বসেছিল সে । কিন্তু সে আজ বুঝল যে , মানুষ কেবল চাকরি কেই গুরুত্ব ও সম্মান দেয় । যোগ্য মানুষ কে নয় ।
..........................................সমাপ্ত ..............................।