বেদনা
লেখা – তারিফ আলম
আজকে সুনিতা বাড়ী আসতে পারবে না তা ফোন করে মৃণালকে জানিয়ে দিয়েছে । হাসপাতালে এমনিতে ডাক্তার এর অভাব , তাই নার্স হয়েও সুনিতাকে অনেক সময় ডক্টরদের কাজ করতে হয় । রোগী এত বেশি আর নার্স এত কম যে সুনিতাকে বেশির ভাগ সময় নাইট এও ডিউটি করতে হয় । ৬ বছরের ছেলে বুবাই কে একদম টাইম দিতে পারে না , মা হিসাবে ঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করে নি বলে মনে খুব কষ্ট হয় । কিন্তু হাসপাতালে আসা দুঃস্থ রোগীদের সেবা করে নিজের আপনজন ভেবে । মৃণাল এর সাথে কলেজ থেকে প্রেম । সুনিতা নার্স এর চাকরিটা পেয়ে যাওয়ার পর মৃণালকে বিয়ে করে । তখন মৃণাল অবশ্য বেকার ছিল । কিন্তু মৃণাল ২০১৬ তে এ শিক্ষক এর চাকরি পেয়ে যায় । তারপর থেকেই মৃণাল চাপ দিতে থাকে সুনিতাকে নার্স এর চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু সুনিতা মানুষের সেবা করার এই কাজটা কিছুতেই ছাড়তে চাই নি । হাসপাতালে আসা অসুস্থ মানুষ জন যখন কষ্টে থাকেন তখন তাদের সেবা করে সুস্থ করে তাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিয়ে এক অজানা আনন্দে মন ভরে যায় সুনিতার । অবশ্য স্বামী আর ছেলেকে টাইম দিতে পারে না বলে মনে কষ্টও হয় তার ।
হাসপাতাল এর চেয়ারম্যান কে বলে রেখেছে সুনিতা ৭ দিনের ছুটির জন্য । ছেলের চার দিন পর বার্থ ডে । তাই কিছুদিন পরিবারের সাথে সময় কাঁটাতে চায় ।
কিন্তু কয়েকদিন থেকে একটি নতুন মারন ভাইরাস এর প্রকোপ দেখা দিয়েছে । মানুষের মধ্যে জ্বর হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে তার দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে । ফলে রোগী মারা যাচ্ছে । একে নিপা ভাইরাস বলে । এটি খুবই ছোঁয়াচ্ছে অর্থাৎ এক জনের দেহ থেকে অন্য জনের দেহে ছড়িয়ে যায় খুব সহজে । তাই ডক্টর রা সকলে পুরো শরীর ঢেকে রোগীর চিকিৎসা করে ।
একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে । ডক্টর রা অনুমান করছেন যে সে নিপা ভাইরাস এ আক্রান্ত হয়েছে । ১৭ বছরের একটি ছেলে । নাম দিনু । পরিবারের লোক জন সবাই হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে । কেউ আর আসে নি । দিনু কে একটি ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে সব জানালা দরজা বন্ধ করে ।
গভীর রাতে সুনিতা শুনতে পেল পাশের ঘর থেকে কেউ চিৎকার করছে । ওখানেই দিনুকে রাখা হয়েছে । বেচারা কষ্টে চিৎকার করছে । জানালা টা একটু খুলার চেষ্টা করে সুনিতা । কিন্তু পারলো না । খুব শক্ত করে লাগানো । অগ্যতা চাবি নিয়ে দরজার তালা খুলে জিজ্ঞাসা করে কি কষ্ট হচ্ছে ।
দিনু কাঁদতে কাঁদতে বলে-“ একটু জল দেবেন দিদি , আর পারছি না। গলা শুকিয়ে গিয়েছে ।“
সুনিতার খুব মায়া হল । সে নিজের রুম এ গিয়ে ভালো করে সারা শরীর ঢেকে পোশাক পরে একটা বোতলে জল নিয়ে দিনুর রুম এর মধ্যে প্রবেশ করলো । দিনু ব্যাডে শুয়ে কাঁদছিল ।
সুনিতা খুব যত্ন করে তাকে জল খাওয়াতে লাগল । এমন সময় হটাত দিনু দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সুনিতাকে , আর বলতে থাকে – “ দিদি আমাকে এখন থেকে বের করুন । এখানে থাকলে আমি মরে যাবো “।
সুনিতা দিনুর কাছে ছাড়া পেতে চেষ্টা করতেই টানা – টানিতে মুখের মাক্স খুলে গেল । কোন রকমে সুনিতা নিজেকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল ।
সুনিতা জানে দিনু কে বাঁচান সম্ভব নয় , সকালেই ডক্টর সরকার বলে দিয়েছেন । এখন শুধু তার মরার অপেক্ষা করা ছাড়া ঊপায় নেই । কারন কোন অসুধ এখনও আবিস্কার হয় নি এই রোগের ।
পরদিন সকালে সুনিতা খবর পেল যে দিনু মারা গিয়েছে । মন টা কষ্টে ভরে গেল । স্নান সেরে খাওয়া দাওয়ার পর আবার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পূর্বে স্বামী মৃণালকে ফোন করলো । কিন্তু ফোন তুলল না কেউ । সুনিতা জানে মৃণাল এর একটু দেরি তে ঘুম থেকে উঠার স্বভাব । হাসপাতাল থেকে পরে ফোন করে নেবে ভাবল ।
হাসপাতালে পৌঁছে দ্রুত নিজের কাজে লেগে পড়ল সুনিতা । তার পাশের রুম টা এখন ফাঁকা । দিনুর শরীর এখন অন্য কোথাও রাখা হয়েছে । আজ সুনিতারও শরীর ভালো নেই । জ্বর এসেছে । তাই ওষুধ খেয়ে কাজে লেগে পড়েছে রোগীদের সেবায় ।
ডক্টর সরকার সুনিতাকে ডেকে বললেন , “ তোমার জ্বর এসেছে শুনলাম । রুপালী বলল”।
সুনিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো ।
ডক্টর সরকার সুনিতাকে পরীক্ষা করলেন । তারপর বললেন, “ তোমার ব্লাড টা টেস্ট করা খুব দরকার । যাও ব্লাড টা দিয়ে এসো “।
সুনিতা বলল , “ কেন স্যার , মেডিসিন নিয়েছি । ভালো হয়ে যাবে “।
ডক্টর সরকার কি একটা ভেবে নিয়ে বললেন – “ রক্ত টা পরীক্ষা করে নাও একবার । কিছু হয় নি , তবুও সাবধানতার জন্য “।
যথারীতি ব্লাড পরীক্ষা করা হল সুনিতার । রিপোর্ট দেখে ডক্টর সরকার এর মুখটা শুকিয়ে গেল । অন্য নার্সদের আদেশ দিলেন সুনিতাকে যেন দ্রুত দিনু যে রুমে ছিল তাকে নিয়ে যাওয়া হয় । নার্স রা তাই করলো । সুনিতা খুব অবাক হয়ে ডক্টর কে জিজ্ঞাসা করলো – তাকে এই রুমে এনে রাখা হল কেন ?
ডক্টর সরকার খুব দুঃখের সঙ্গে জানালেন যে সুনিতার দেহে নিপা ভাইরাস ধরা পড়েছে ।
সুনিতা কথা গুলো শুনে চিৎকার করে কেঁদে উঠল – “ না , এ হতে পারে না স্যার , ভালো করে রিপোর্ট দেখুন “।
ডক্টর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন । অন্য এক নার্স রুমে তালা লাগিয়ে দিল ।
এই রোগের পরিনতি যে মৃত্যু তা তার ভালো করেই জানা সুনিতার । ব্যাড এ শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল ।
এমন সময় মোবাইল টা বেজে উঠলো । মৃণাল এর ফোন । সুনিতা অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে ফোন টা রিসিভ করলো ।
মৃণালঃ এই কোথায় আছো , ফোন রিসিভ করতে এত দেরি ।
সুনিতঃ ( ধীর গলায় ) হাসপাতালে । কাজ করছিলাম ।বুবাই কি স্কুল এ চলে গিয়েছে ?
মৃণালঃ না যায় নি , এই নাও বুবাই এর সাথে কথা বল।
বুবাইঃ মা কেমন আছো ?
সুনিতা ছেলের গলার আওয়াজ পেয়ে নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না । কান্না বেরিয়ে এল । অনেক কষ্টে বলল – “ ভালো আছি “।
বুবাইঃ মা , আমার জন্মদিনে আসছ তো । তুমি ছুটি নিয়ে আসবে বলেছিলে । আসছ না কেন ? তোমাকে ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না । তুই চলে আসো না মা ।
ছেলেকে কি উত্তর দেবে তা বুঝতে পারছে না । ছেলের জন্মদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে । এই রোগ যাদের হয়েছিল তারা খুব তাড়াতাড়ি মারা গিয়েছে তাদেরই হাসপাতালে । নিজে নার্স , তাই রোগীদের সেবা করার কারনে তার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে ।
কাঁদতে কাঁদতে সুনিতা বলল –“ বুবাই , আমার বুবাই রে , আমি যদি না আসতে পারি তোর জন্মদিনে , তুই দুঃখ করিস না , তোর বাবাকে নিয়ে আর বন্ধুদের নিয়ে জন্মদিন পালন করিস “।
বুবাই মায়ের কান্নার আওয়াজ পেয়ে নিজেও কেঁদে ফেলে । তারপর বলে , “ তুমি কেঁদো না মা , আমি জানি তুমি হাসপাতালে সব অসুস্থ মানুষদের সেবা করে তাদের ভালো করে তুলছ । গতবারের জন্মদিনে তুমি আসতে পারো নি বলে আমি খুব কেঁদেছিলাম সে দিন । এবারে আর কাঁদবো না । মা তুমি কেঁদো না প্লিজ । আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি “।
সুনিতা আর কথা বলতে পারছে না , গলা শুকিয়ে আসছে । ফোন কাটার পূর্বে শুধু বলল – “ বুবাই , আমিও তোকে অনেক ভালোবাসিরে । তুই তোর বাবার সব কথা শুনবি । ভালো করে পড়াশুনা করবি যাতে একদিন তুই অনেক বড় ডাক্তার হতে পারিস “।
বুবাই কান্না জড়ানো গলায় বলে , “ হ্যাঁ মা, আমি ডাক্তার হবো , তোমার মত সকলের সেবা করবো “।
সুনিতা ফোন টা কেটে দিল । গলা শুকিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু রুমে একটুও জল নেই । এদিকে মোবাইলে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় মোবাইল টাও সুইচ অফ হয়ে গেল । চিৎকার করে জল চাইলেও যে কেউ জল দিতে আসবে না তা বুঝতে পারলো । তাই সুনিতা ব্যাডে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগলো ।
******************
................. ডক্টর সরকার ফোন করলেন মৃণালকে এবং দ্রুত হাসপাতালে আসতে বললেন । মৃণাল সুনিতাকে ফোন করলে সুনিতার মোবাইল সুইচ অফ বলল । বুবাইকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে এসে ডক্টর সরকারের সঙ্গে দেখা করে জানতে পারলো যে সুনিতার দেহে নিপা ভাইরাস প্রবেশ করেছে । তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয় ।
ডক্টর সরকারের কথা গুলো শুনে মৃণাল এর মাথায় যেন বাজ এসে পড়ল । সে মাটিতে সেইখানে বসে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ।
বাবার কান্না দেখে বুবাই কিছু বুঝতে না পেরেও সেও কাঁদতে লাগলো ।
ডক্টর সরকার মৃণাল এর কাছে এসে বলল ,” নিজেকে আপনি সামলান , আপনার ছেলের কথা ভেবে । আর আসুন শেষ বারের মত সুনিতার সাথে দেখা করে নেন “।
কোন রকমে নিজেকে সামলে বুবাইকে কোলে নিয়ে ডক্টর সরকারের পিছন পিছন এসে থামল একটা বদ্ধ ঘরের কাঁচের জানালার সামনে । রুমের মধ্যে প্রবেশ করা যাবে না । ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে অন্য জনের দেহে ।
মৃণাল দেখল রুমের মধ্যে সুনিতা শুয়ে শুয়ে কাঁদছে । জানালার সামনে মৃণালকে দেখে অনেক কষ্টে বিছানা থেকে উঠে এসে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো , শরীরের সব শক্তি যেন শেষ হয়ে এসেছে সুনিতার , নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ।
মৃণাল আর বুবাই কে দেখে কাঁদতে লাগলো সুনিতা জোরে জোরে । কিন্তু আওয়াজ আসছিল না । ছয় বছরের ছেলে বুবাইও মাকে দেখে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে লাগলো । মৃণালও নিজের চোখের জল আটকাতে পারছিল ণা ।
ওইখানে উপস্থিত সকল নার্স আর ডাক্তারদের চোখেও জল চলে এল । কিন্তু কোন উপায় যে নেই । সবই বিধাতার লেখা । এই মারন রোগের কোন ওষুধই যে নেই ।
মৃণাল দেখল সুনিতা রুমের মধ্যেই পড়ে গেল । মৃণাল ছুটে এসে ডক্টর সকারের পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল , “ ডক্টর আমার সুনিতা কে বাঁচান । যত টাকা লাগবে আমি দেব । প্লীজ ডক্টর “।
ডঃ সরকার কিছু না বলে নার্সদের বললেন মৃণাল আর বুবাই কে বাইরে নিয়ে যেতে । তারা তাই করলো ।
বাইরে মৃণাল বুবাই কে নিয়ে বসেছিল অধীর অপেক্ষায় ।
ডক্টর সরকার কিছুক্ষন পর গম্ভীর মুখ নিয়ে এসে বললেন “ sorry “
মৃণাল বুবাইকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগলো ।
বিধাতার কাছে মানুষ যে কত অসহায় – তা আর একবার প্রমান হয়ে গেল ।
.............................. সমাপ্ত ..................