প্রনয় গোধূলি / তারিফ আলম

20th September 2023 7:23 pm তারিফ আলম
প্রনয় গোধূলি / তারিফ আলম


প্রনয় গোধূলি
লেখা – তারিফ আলম


মোবাইল টা বার বার বেজে চলেছে । ফিরোজ এর হুশ নেই । আনমনা হয়ে অন্ধকার ঘরের এক কোনে বসে সিগারেট এ টান দিয়ে চলেছে । এই পড়ন্ত বিকেল বেলায় সকল জীব জগত যখন একটু ঘুরে - বেড়িয়ে আনন্দ করছে , তখন ফিরোজ ঘরের দরজা - জানালা বন্ধ করে অন্ধকার ঘরে বসে কি করছে --- এই প্রশ্ন টা আমার আপনার মত ফিরোজের মা রোজিনা বিবিরও মনে উঁকি দিল । তিনি বাইরে থেকে দরজায় কড়া নেড়ে ফিরোজ কে ডেকে বললেন "ফোন টা রিং হয়ে যাচ্ছে যে , ফোন তুলছিস না কেন ? বাইরে বের হ , বিকালে একটু বেড়িয়ে আয় । সারাদিন কি বাড়িতে বসে থাকিস" ।
মা এর বকুনিতে কাজ হল । ফিরোজ রুম এর লাইট টা জ্বেলে দরজাটা খুললো । ফিরোজ এর দিকে চেয়ে মা রোজিনা বিবি একটা খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা করলেন । দু সপ্তাহ মেয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন রোজিনা বিবি । আজই বাড়ী ফিরেছেন ।
ফিরোজ কে দেখে খুব শুখনো লাগল । মুখে দাড়ি ভরে গিয়েছে , মাথার চুল গুলো এলোমেলো , চোখ দুটো লাল কিন্তু খুব শান্ত - অনেক বর্ষণের পর আকাশ যে রুপ শান্ত হয়ে যায় অনেকটা সেই রকম ।
রোজিনা বিবি আদরের সুরে ছেলের মাথায় হাত দিয়ে বললেন , কি হয়েছে রে তোর ? শরীর খারাপ ?
ফিরোজ মাথা নেড়ে "না' বলল ।
রোজিনা বিবি আবার জিজ্ঞাসা করলেন , ' মন খারাপ '? তানিয়া ফোন করে তো এখন ?
'তানিয়া' নাম টা শুনে ফিরোজ এর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল । মা কে চোখের জল লুকিয়ে তাড়াতাড়ি মোবাইল টা পেন্ট এর পকেটে ভরে নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল ।
একা আনমনে চলতে চলতে রেল লাইনের ধারে একটা ঢিপির পাশে এসে বসলো । এখানটা খুব নিরিবিলি । অনেক দিন পরে এল ফিরোজ এইখানে । কিন্তু আগে প্রায় প্রতিদিন এই ঢিপির উপরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তানিয়ার সাথে কথা বলেছে ফোনে । কত কথা , সুখ, দুঃখ , হাসি - কান্না , ব্যাথা বেদনার কথা । দু জনে বিয়ে করে ঘর বাঁধার কথা , ভবিষ্যতের কথা , নিজেদের হওয়া ছেলে - মেয়ে - সংসার এর কথা ।
তানিয়ার সাথে দু বছর আগে ফেসবুকে পরিচয় ফিরোজের । তারপর কথা হতে হতে বন্ধুত্ব , তারপর দু জনে কখন যে প্রেম হয়ে যায় তা বলা মুশকিল । এক ঘণ্টা দু জন একে অপরকে ফোন না করে থাকতে পারত না । তারপর তারা দু জনে ঠিক করে একে অপরের সাথে দেখা করবে । নির্দিষ্ট স্থানে প্রথম দেখা হয় তাদের । দু জনেই খুব খুশি ছিল । তানিয়া ফিরোজের হাতে হাত রেখে বলেছিল , সারা জীবন এই হাত কোন দিনও ছাড়বে না সে । সারা জীবন এক সাথে থাকবে ।
ফিরোজ হেসে বলেছিল , আমাদের এই সম্পর্ক যদি তোমাদের বাড়ীতে না মানে ?
তানিয়া বলেছিল , ‘বাড়ীর লোকদের মানানোর দায়িত্ব আমার । তুমি আমার উপরে পুরো বিশ্বাস রাখতে পারো । “ ফিরোজ বিশ্বাস রেখেছিল ।
তারপর অনেক দিন কেটে গেল , ফিরোজ আর তানিয়া দুজনে একটা চাকরির জন্য চেষ্টা করতে লাগলো । কথা ছিল , কেউ একজন চাকরি পেয়ে গেলেই তারা বিয়ে করে নেবে ।
দু জনেই এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিল । কিন্তু রেজাল্ট যখন বের হল তখন তানিয়া পাশ করে গেল । । কিন্তু ফিরোজ এস এস সি পাশ করতে পারল না । তারপর থেকেই সব কিছু কেমন যেন বদলে গেল । তানিয়া ফোন এ কথা বলা কমিয়ে দিল । বার বার কোন না কোন অজুহাত দেখিয়ে ঝগড়া করতে লাগল । তবুও ফিরোজ মুখ বুজে সব অপমান সহ্য করছিল শুধু মাত্র নিজেদের ভালোবাসার সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য ।
কিন্তু তানিয়া একদিন বলল যে , সে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না । তার ভাই বাড়ীর অমতে একটি মেয়েকে ভালোবাসা করে বিয়ে করে নিয়েছে ।
তাই তানিয়ার বাবা মা আর দেরি না করে মেয়ে তানিয়ার বিয়ের জন্য ছেলে দেখছে । তার বাবা মা চায় না যে তানিয়ার সাথে ফিরোজের বিয়ে হোক । তাই সে আর কোন সম্পর্ক রাখতে পারবে না ।
সব শুনে ফিরোজ খুব করুন সুরে বলেছিল যে , “ তুমি যে বলেছিলে তোমার বাড়ীর লোকদের মানিয়ে নেবে । আমরা সারা জীবন এক সাথে থাকব ?"
তানিয়া রেগে বলেছিল যে , “মানাতে পারলাম না তো কি করবো ?“
ফিরোজ তানিয়ার কথা শুনে খুব দুঃখ পেল , কিন্তু তাকে আর কিছুই বলল না । দীর্ঘ দিনের ভালোবাসার সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটল । সব স্বপ্ন গুলো অহংকারী মন এর ভীষণ আঘাতে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল ।
--------------
হটাত একটা একপ্রেস ট্রেন সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেদ করে বিকট আওয়াজ করে ফিরোজ এর সামনের রেল লাইন দিয়ে চলে গেল । ট্রেন টা চলে যেতেই আবার চারিদিক নিস্তব্ধ , ক্লান্ত ।
ফিরোজ পকেট থেকে মোবাইল টা বের করলো । কল লিস্টে পূর্বের মতো এখনও তানিয়ার নাম্বার টা সেভ করা আছে । শুধুমাত্র এখন তাকে কল করার অধিকার টুকুই আর নেই । মোবাইলে তানিয়ার সেভ করা হাসি মুখের ছবিটা দেখতে দেখতে ফিরোজের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল । সেই সঙ্গে ছবিটাও । এক দু ফোটা অশ্রুর বিন্দু হয়তো গড়িয়ে পড়ল মোবাইল এর স্কিনে তানিয়ার হাসি মুখের উপর । সব কিছু ঝাপসা হয়ে গিয়েছে , গোধূলি লগ্নে সূর্য অস্তমিত প্রায় । চারিদিকে কেমন একটা বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে । ফিরোজের সাথে সাথে সমগ্র প্রকৃতিও যেন গভীর শোকে আচ্ছন্ন । ওদের একটু একলা থাকতে দাও ।
................................................ সমাপ্ত ......





Others News

ভুল / তারিফ আলম

ভুল / তারিফ আলম


*ভুল*
লেখা – তারিফ আলম

আমার রুমের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে এলাম । দিদিমার ঘুমের ওষুধের কৌটোটা চুরি করে নিয়ে এসেছি । দেখলাম তার মধ্যে ৭ টা মতো বড়ি আছে । সব গুলো এক সাথে খেয়ে ঘুমালে আর কোন দিন ঘুম ভাঙ্গবে না মনে হয় । যদি ভেঙে যায় ? এদিকে নিজের ওড়না টা সিলিং ফ্যানে বেঁধে রেখেছি , গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বো ভাবছি ...............কি করবো বলুন তো ?
ওহ ...... আপনাদের তো বলাই হয় নি । আমি তুলসী , ক্লাস টেন এ পড়ি মোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে । আমার বাবা অমিত মাইতি একটি প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার । গ্রামের সকলে তাঁকে খুব সম্মান করেন । আমিও আমার বাবা – মা কে খুব ভালোবাসি ।
কিন্ত আমার জীবন টা পুরো বদলে গেল যখন ভালোবাসা টা অন্য কাউকে দিতে গিয়েছিলাম ......... সে রকি । কলেজে পড়ে , খুব বড়লোকের ছেলে । স্কিন টাইট গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট – এ তাকে খুব সুন্দর লাগতো । তার এক কান দুল আর গলায় ও হাতে চেন – মনে হতো যেন হিন্দি সিনেমার হিরো বরুন এর মতো । আমি যখন স্কুলে যেতাম বা স্কুল থেকে ফিরতাম সে তার নতুন সুন্দর দামী বাইক টা নিয়ে আমার চলার পথের আশে – পাশে চক্কর দিত , আর আমাকে মাঝে মাঝে ইশারা করতো । আমি সব দেখলেও তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতাম ।
একদিন আমি যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছিলাম তখন সে তার বাইক নিয়ে আমার পথ আগলে দাঁড়ায় , তারপর আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার বাইক নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় । আমি বাড়ী ফিরে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে চিরকুট টি ব্যাগ থেকে বের করে দেখি যে তাতে লেখা ... I LOVE YOU TULSI ,
মনটা সেদিন কেমন এক অজানা অনুভুতিতে ভরে গিয়েছিল । তার পরের দিন আমার মোবাইলে অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন আসে । রিসভ করতে , ও দিক থেকে রকির গলা । কেমন আছো তুলসী । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না , তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ?
আমি সে দিন লজ্জায় কোন উত্তর দিতে পারি নি । সারা রাত একটুও ঘুম আসে নি । সারা রাত শুধু তার কথা ভেবেছিলাম । সকালে যখন আবার রকি ফোন করে জানতে চায় তখন তাকে মানা করতে পারি নি । বলে দিয়েছিলাম যে , আমিও তাকে ভালোবাসি ।
সেই দিন স্কুল যাওয়ার পথে সে তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় , লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না । সে আমাকে তার বাইকে বসতে অনেক অনুরধ করায় আমার ইচ্ছা না থাকলেও তার মন রাখতে চেপে বসেছিলাম । সে বাইক ছুটিয়ে সে দিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মনালিসা পার্ক এ । সেই পার্কে অনেক যুবক যুবতী বিভিন্ন স্থানে বসে প্রেম করছিল । আমি প্রথম ঐ পার্কে গেলাম । এক পাশে বসে আমি আর রকি গল্প করছিলাম । রকি সে দিন হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । রকি তার মোবাইল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছবি আর ভিডিও তুলছিল । সে আমার বক্ষকে অর্ধ অনাবৃত করে ছবি আর ভিডিও তুলতে শুরু করে । আমি বাধা দি , ছবি আর ভিডিও ডিলিট করতে বলি , কিন্তু সে ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলে যে সে সে গুলো দেখে পরে ডিলিট করে দেবে । আমি তাকে বিশ্বাস করছিলাম । তার ভালোবাসাকে বিশ্বাস করেছিলাম । তাই আর কিছু বলেছিলাম না ।
কিন্তু যখন স্কুলে আমার সিনিয়র কাকলি দি এর কাছে জানতে পারলাম যে , রকি একটা বাজে ছেলে । কাকলি দি এর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক করে তার সর্বনাশ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে , তখন থেকে তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি । তার ফোন রিসিভ করতাম না । একবার ফোন করতে তাকে আমি বলেছিলাম যে , সে একটা শয়তান ।
সে শুনে হা হা করে শয়তানের হসি হেসে বলেছিল , তার সাথে বাইকে চেপে যদি না যাই সে আমার ক্ষতি করে দেবে । আমি তার ফোন নাম্বার রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দিয়েছিলাম ।
তারপর দিন যখন স্কুলে গিয়েছি তখন বান্ধবী রিনা ছুটে এসে আমাকে ক্লাস রুমের এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা ভিডিও দেখাল । সেই ভিডিও টা পার্কে তোলা রকির ভিডিও যেখানে আমার অর্ধ নগ্ন বক্ষ দেখা যাচ্ছে । রিনা বলল প্রায় সবার ওয়াটস ওয়্যাপ এ এই ভিডিও টা কেউ সেন্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
ভিডিও টা দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি , লজ্জায় আর ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম । কাঁদতে কাঁদতে কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম তা জানি না । যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কমন রুমে শুয়ে আছি । আমকে ঘিয়ে সকল শিক্ষক - শিক্ষিকা । একটু দূরে দেখলাম স্কুলের হেড স্যার এর সাথে আমার বাবা । বাবাকে স্কুল থেকে খবর দিয়ে হয়তো ডেকে এনেছে । বাবা সব দেখেছেন । ভাবছেন তার মেয়ে কত নোংরা , কত অসভ্য । কি লজ্জা .........উউ ফফফফ কি কষ্ট । মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে । বাবার কত সম্মান আজ সব আমি মাটিতে মিলিয়ে দিলাম , কেন যে এত বড় ভুল করলাম , কেন যে রকির মতো একটা শয়তানকে ভালবাসতে গেলাম । তার অন্তরের রুপ না বুঝে কেবল বাইরের রুপের উজ্জলের আলোক বশীভূত হয়ে কি ভুল না করে ফেলেছি । আমি কাঁদছিলাম , কমন রুমের বাইরে উৎসুক ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় । নিজের বুকে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে ধরেছিলাম । যেতে কেউ না দেখে এই ‘নারী বক্ষ’ । উফফফফ কি লজ্জা । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ।
বাবা এসে আমাকে কিছু বললেন না , শুধু মাথায় হাত বোলালেন , আমি তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলাম , বাবার চোখেও জল ছিল ।
বাবার সাথে বাড়ী ফিরতেই মা দৌড়ে এসে আমার চুল মুঠি ধরে একটার পর একটা চড় মারতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন , কেন এই অসভ্য নোংরা মেয়েটাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম । আমি কাঁদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরে ফেলো মা , আমি একটা নোংরা মেয়ে , তোমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করেছি । আমার বাঁচার কোন অধিকার নাই , আমাকে মেরে ফেলো মা ......মেরে ফেলো ।
বাবা আর দিদিমা এসে মা এর হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে । আমি কাঁদছিলাম .........অনেক কাঁদছিলাম নিজের ভুলের জন্য ।
ওহ ...... আপনাদের নিজের দুখের কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেল ......... এখন রাত ২ টা বাজে । বাড়ীর সকলে গভীর নিদ্রাতে মগ্ন । আমার হাতে ঘুমের ওষুধ আর ফ্যান এ টাঙ্গানো আমার ওড়নাটা । আপনারাই বলুন আমি এখন কি করবো ?